বাংলাদেশের তুলনায় গুজরাটের ইলিশের স্বাদ কেমন?

সংগৃহীত ছবি
ইলিশের কথা উঠলেই সবার আগে আসে বাংলাদেশের পদ্মা, মেঘনা, যমুনা কিংবা চাঁদপুরের কথা। রুপালি আঁশের এই মাছ শুধু বাঙালির খাবারের তালিকায় নয়, এটি বাঙালির সংস্কৃতি ও আবেগের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের গুজরাটে পাওয়া যায় ইলিশ।
এ কথা কথা শুনলে অনেকেরই অবাক লাগতে পারে। গুজরাটের সমুদ্র ও নদীর মোহনায়ও ইলিশ ধরা পড়ে। এমনকি এই মাছ এখন গুজরাটের স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে ভারতের পূর্বাঞ্চলের বাজারেও যাচ্ছে। গুজরাটের ইলিশের গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে আরব সাগর এবং নদীর মোহনা। ইলিশ মূলত সামুদ্রিক মাছ হলেও প্রজননের সময় এটি সমুদ্র থেকে নদীর অপেক্ষাকৃত কম লবণাক্ত পানির দিকে চলে আসে।
বর্ষাকালে নদীতে পানির প্রবাহ বাড়লে এবং পানির লবণাক্ততার পরিবর্তন হলে ইলিশ নদী ও মোহনা অঞ্চলে ঢোকে। গুজরাটের নর্মদা নদীর মোহনা, খাম্বাত উপসাগর এবং রাজ্যের বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায় এভাবেই ইলিশের উপস্থিতি দেখা যায়।
বিশেষ করে ভরুচ এলাকার নর্মদা নদীর মোহনা গুজরাটের ইলিশের জন্য পরিচিত। স্থানীয় জেলেরা মৌসুমে নদী ও মোহনায় জাল ফেললে রুপালি ইলিশ উঠে আসে। ভেরাভাল, পোরবন্দর, ভালসাদ ও নবসারি উপকূলেও ইলিশ ধরা পড়ার খবর পাওয়া যায়। অর্থাৎ বাংলাদেশের মতো বিশাল নদীব্যবস্থা না থাকলেও গুজরাটের সমুদ্র, নদী ও মোহনার ভৌগোলিক অবস্থান ইলিশের বিচরণের জন্য উপযোগী।
স্থানীয়ভাবে ইলিশের ধরনভেদে আলাদা নামও রয়েছে। এর মধ্যে ‘চাকসি’ নামটি বিশেষভাবে পরিচিত। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও জেলেদের কাছে ভালো মানের চাকসি ইলিশের চাহিদা রয়েছে। সমুদ্র থেকে ধরা অন্য ধরনের ইলিশকে ‘পালওয়া’ নামেও ডাকা হয়। মাছের আকার, ধরন, অবস্থান এবং ধরার সময়ের ওপর এর মান ও দামে পার্থক্য দেখা যায়।
ইলিশের মৌসুমে মাছের সরবরাহ বেশি থাকলে দাম কমে আসে। আবার সরবরাহ কম হলে বড় ও ভালো মানের মাছের দাম অনেক বেড়ে যায়। সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে গুজরাটে ভালো মানের চাকসি ইলিশের দাম প্রতি কেজি প্রায় ১ হাজার ২০০ ভারতীয় রুপি পর্যন্ত ওঠার তথ্য পাওয়া গেছে। তুলনামূলক নিম্নমানের বা ছোট মাছের দাম কয়েকশ রুপি কেজিতেও পাওয়া যায়। আবার বেশি সরবরাহের সময় গড় দাম আরও নিচে নেমে আসতে পারে। ফলে গুজরাটে ইলিশের কোনো একটি নির্দিষ্ট দাম নেই; মৌসুম, আকার, মান, ডিমের উপস্থিতি ও মাছের সতেজতার ওপর দাম নির্ভর করে।
বাঙালির কাছে ইলিশ মানেই শুধু মাছ নয়, স্বাদেরও একটি আলাদা পরিচয়। সরষে ইলিশ, ভাপা ইলিশ, ইলিশ ভাজা কিংবা ইলিশের ঝোল, যে পদই হোক, মাছের নিজস্ব তেল ও গন্ধই খাবারটিকে আলাদা করে তোলে। গুজরাটের ইলিশেও সেই পরিচিত তৈলাক্ত স্বাদ ও ইলিশের বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তবে বাংলাদেশের পদ্মা-মেঘনা অববাহিকার ইলিশের সঙ্গে এর স্বাদের পার্থক্য রয়েছে।
কারণ কী? কারণ মাছের বিচরণক্ষেত্র। গুজরাটের অনেক ইলিশ সরাসরি সমুদ্র বা মোহনা থেকে ধরা হয়। ফলে মাছের পরিবেশ, খাদ্যাভ্যাস ও পানির লবণাক্ততার পার্থক্য স্বাদেও প্রভাব ফেলে। স্থানীয়দের কাছে গুজরাটের ভালো মানের চাকসি বেশ সুস্বাদু হলেও বাঙালির দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় পদ্মা-মেঘনার ইলিশের স্বাদ ও ঘ্রাণের সঙ্গে সেটিকে এক করে দেখা হয় না।
বাংলাদেশের ইলিশের প্রতি পশ্চিমবঙ্গের মানুষের আলাদা দুর্বলতা থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় গুজরাটের ইলিশ সেখানকার বাজারে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের ইলিশের সরবরাহ কম থাকলে বা দাম বেড়ে গেলে ভারতের বিভিন্ন বাজারে গুজরাটের ইলিশের চাহিদা বাড়ে। গুজরাটের সমুদ্র ও নদী-মোহনা থেকে ধরা মাছ পরিবহনের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারে পৌঁছে যায়।
তবে বাংলাদেশের পদ্মা-মেঘনার ইলিশ সাধারণত বেশি তেলযুক্ত, নরম ও সুগন্ধি হওয়ায় স্বাদের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত। এখন পর্যন্ত স্বাদে সবচেয়ে সেরা বাংলাদেশের ইলিশ। মিয়ানমারের ইলিশের স্বাদও ভালো, কিন্তু মাছের উৎস ও মৌসুমভেদে তেল ও স্বাদে পার্থক্য দেখা যায়। এদিকে, গুজরাটের ইলিশও সুস্বাদু, তবে অনেক সময় বাংলাদেশের নদীর ইলিশের তুলনায় তেল ও ঘ্রাণ কিছুটা কম মনে হতে পারে।





