অতএব

যুদ্ধের একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে। যুদ্ধ শুরু করেন রাষ্ট্রপ্রধানরা। কিন্তু যুদ্ধের খরচ দিতে হয় সাধারণ মানুষকে।
যারা যুদ্ধ ঘোষণা করেন, তাদের ঘরের খাবার বন্ধ হয় না। যারা ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়েন, তাদের সন্তানদের স্কুল বন্ধ হয় না। যারা যুদ্ধের পরিকল্পনা করেন, তাদের ঘুমের কোনো সমস্যা হয় না। সমস্যা হয় সেই মানুষটির, যিনি যুদ্ধের খবর শুনে বাজারে গিয়ে দেখেন চালের দাম বেড়ে গেছে।
যুদ্ধ এখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে হয় না। যুদ্ধ হয় রান্নাঘরে। বাজারের ব্যাগে। পেট্রলপাম্পে। এমনকি মধ্যবিত্তের মাসের হিসাবেও।
আমেরিকা-ইসরায়েল হুমকি দেয়। ইরান পাল্টা হুমকি দেয়। আর ঢাকার একজন বাবা চিন্তা করেন, মাসের বাকি কটা দিন কীভাবে চলবেন।
কী অদ্ভুত সম্পর্ক! যুদ্ধের সঙ্গে আমাদের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। অথচ যুদ্ধের খবর শুনে মনে হয়, নিজের বাড়ির পাশেই বুঝি একটা ক্ষেপণাস্ত্র পড়তে যাচ্ছে।
ফেসবুক খুললে দেখা যায়, সবাই যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ। কেউ বলছেন আমেরিকা শেষ। কেউ বলছেন ইরান শেষ। কেউ আবার নিশ্চিত করছেন, এবার তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে।
যুদ্ধের আরেকটা অদ্ভুত দিক আছে। যুদ্ধের আগে সবাই শক্তির হিসাব করে। কার কত ক্ষেপণাস্ত্র, কার কত যুদ্ধবিমান, কার কত সৈন্য। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হলে সবচেয়ে বেশি হিসাব করতে হয় সাধারণ মানুষকে। কতক্ষণ বাংকারে থাকতে হবে। কত দূরে পালাতে হবে। সন্তানকে কোথায় লুকাতে হবে। একজন মা তখন আমেরিকা-ইরানের শক্তি নিয়ে ভাবেন না। তিনি শুধু ভাবেন, তার শিশুটি বেঁচে থাকবে কি না।
রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে যুদ্ধ হয়তো কৌশল। সেনাবাহিনীর কাছে দায়িত্ব। অস্ত্র ব্যবসায়ীদের কাছে ব্যবসা। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে যুদ্ধ মানে ধ্বংস। বিপর্যয়।
এই পৃথিবীতে কত সুন্দর সুন্দর জিনিস আবিষ্কার হয়েছে। মানুষ আকাশে উড়তে শিখেছে। সমুদ্রের গভীরে নেমেছে। মহাকাশে ঘর বানানোর স্বপ্ন দেখছে। শুধু একটা জিনিস শিখতে পারেনি। পাশাপাশি বেঁচে থাকা।
যুদ্ধের সময় রাষ্ট্রপ্রধানরা নিজেদের জয় নিয়ে ভাবেন। সেনাপ্রধানরা ভাবেন পরবর্তী আক্রমণ নিয়ে। আর সাধারণ মানুষ ভাবেন, ঘুম থেকে উঠে পৃথিবীটাকে আগের মতো পাওয়া যাবে তো?
একজন মানুষ সারা জীবন পরিশ্রম করে একটা বাড়ি বানান। একজন বাবা সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য টাকা জমাতে থাকেন। একজন মা মেয়ের বিয়ের জন্য গয়না কেনেন। কিন্তু একমুহূর্তের যুদ্ধ তাদের সব হিসাব পাল্টে দেয়।
যুদ্ধের বিজয়ী নির্ধারণ করা যায়। পরাজিতের তালিকাও করা যায়। শুধু মৃত মানুষগুলোর কাছে জানতে চাওয়া যায় না— তারা কোন পক্ষের বিজয় চেয়েছিলেন।



