এবং

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
গভীর রাতে হুট করে কারেন্ট চলে গেল। এখন অবশ্য কারেন্ট যাওয়া নতুন কিছু নয়। কিন্তু আজ অন্ধকারটা একটু বেশিই ঘন মনে হচ্ছে। চার্জার ফ্যানের ব্যাটারি শেষ। পাখাটা আস্তে আস্তে ঘুরতে ঘুরতে বন্ধ হয়ে গেল। আমি অন্ধকারেই হাতড়াতে হাতড়াতে মোবাইল ফোনটা খুঁজলাম। কোথাও নেই। ড্রয়ারে মোমিবাতি আছে। মোমবাতি জ্বালানো যেত; কিন্তু জ্বালালাম না। আমার মোমবাতি-ভীতি আছে। মোমবাতি জ্বালালেই অদ্ভুত সব ছায়া দেখতে পাই।
আমি জানি এটা একটা অসুখ। এবং এই অসুখটার নাম ভয়। যেটা একেক সময় একেক রূপ নিয়ে আসে।
সন্ধ্যাবেলা যখন বাসা থেকে বের হই, মোড়ের ওই বটগাছটার নিচে দাঁড়ালে ভয় ধরে। মনে হয়, মাথার ওপর এত এত পাতা... এর মধ্যে হাজারটা চোখ আমাকে দেখছে।
দুপুরবেলায় বাসে ওঠার পর আরেক ভয়। পাশের সিটে বসে থাকা লোকটা আমার দিকে বারবার তাকাচ্ছে কেন? লোকটা কি ভালো, নাকি পকেটে ধারালো কিছু নিয়ে বসে আছে? কোনো কারণ ছাড়াই বুকের ভেতর ধুকপুক শুরু হয়ে যায়।
সবচেয়ে বোকা ভয়টা হয় বাথরুমে ঢুকে দরজার খিল লাগানোর পর। কলের পানি পড়ছে, আর আমার মনে হচ্ছে— দরজার ওপাশে কেউ একজন চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। আমি খিলটা খুললেই সে সামনে এসে দাঁড়াবে। এসব কথা কাউকে বলা যায় না। মানুষ শুনলে হাসবে। বলবে, ‘তোমার মাথাটা গেছে।’
‘বাবা...’
অন্ধকারে আচমকা ডাকটা শুনে বুকে প্রচণ্ড ধাক্কা লাগল। তাকিয়ে দেখি, দরজার পাশে আবছা একটা ছায়ামূর্তি। আমি কোনোমতে গলা পরিষ্কার করে বললাম, ‘কে?’
মূর্তিটা এগিয়ে এলো। আমার ক্লাস থ্রিতে পড়া ছেলেটা। হাত দিয়ে চোখ ডলছে।
‘কী হয়েছে রে?’
‘ভয় করছে।’
‘কীসের ভয়?’
‘অন্ধকারে রুমের কোণে একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে।’
আমি ছেলেটাকে বুকের মধ্যে টেনে নিলাম। তার শরীরটা হালকা কাঁপছে। এদিকে বিছানা থেকে হঠাৎ ক্যাঁক-ক্যাঁক শব্দ হলো। আট মাসের মেয়েটা ঘুম ভেঙে একটু নড়েচড়ে উঠল। সে এখনো কথা বলতে শেখেনি; কিন্তু হাত দুটো বাড়িয়ে অন্ধকারে তার বাবাকে খুঁজছে।
ছেলেটার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে আমি জানালার দিকে তাকালাম। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। ঠিক তখনই আমার ভেতরের আসল ভয়টা জেগে উঠল। এই ভয়ের কোনো চেহারা নেই, কোনো শব্দ নেই।
আমি ছেলেটার দিকে তাকালাম, তারপর ওই ছোট্ট মেয়েটার আবছা অবয়বের দিকে। আজ আমি আছি, বুকে জড়িয়ে ধরে রাখছি। কিন্তু ১০ বছর পর? ২০ বছর পর?
যে পৃথিবীতে এত ভয়, এত অনিশ্চয়তা— সেখানে এই দুটো ছোট মানুষকে আমি কীভাবে সামলে রাখব? কাল যদি আমার কিছু হয়ে যায়? যদি চাকরিটা না থাকে? যদি কালকের সকালটা আজকের চেয়েও অনেক বেশি অন্ধকার নিয়ে আসে? এই কোমল হাত দুটোকে আমি কোন ভবিষ্যতের মুখোমুখি রেখে যাচ্ছি?
মেঝেতে একটা টিকটিকি ডাকল— টিক-টিক-টিক। ছেলেটা আমার জামা শক্ত করে ধরে বলল, ‘বাবা, অন্ধকার কি কোনো দিন শেষ হবে না?’
আমি তাকে আরও একটু চেপে ধরলাম। মুখের সব ভয় লুকিয়ে খুব স্বাভাবিক গলায় বললাম, ‘হবে রে। সব অন্ধকার শেষেই তো সকাল হয়। তুমি ঘুমিয়ে পড় বাবা।’
ছেলেটা আমার কোলে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ল। আমি জেগে রইলাম। চারপাশের চেনা-অচেনা সব ভয়ের চেয়েও, ভবিষ্যতের ওই কাল্পনিক ভয়টা আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রইল।





