অতএব

দরজায় দুবার টোকা পড়ল। আমি বই থেকে চোখ না তুলেই বললাম, ‘দরজা খোলা আছে টগর। ভেতরে আয়।’
দরজা ঠেলে ঢুকল আনিস। তার গায়ে অদ্ভুত রঙের পাঞ্জাবি। হলুদ আর বেগুনির মাঝামাঝি কিছু একটা। চোখে গোল ফ্রেমের চশমা। আনিস গম্ভীর মুখে বলল, ‘তুই আমাকে টগর বলে ডাকলি কেন?’
‘কারণ টগর ছাড়া আর কেউ এই অসময়ে আসে না।’
‘আমি এসেছি।’
‘দেখতেই পাচ্ছি।’
আমি আবার পাঞ্জাবির দিকে তাকালাম, ‘তোর পাঞ্জাবিটা কী রঙের?’
“এটার নাম ‘অভিমানী হলুদ’। রঙটা শুধু বৃষ্টি নামার আগে পরা যায়।”
আমি বইটা বন্ধ করলাম। আনিসের মাথায় কখন কী চলে, বোঝা মুশকিল। বললাম, ‘বাইরে কি বৃষ্টি আসছে?’
‘না। তবে খুব কালো মেঘ করেছে। তুই চা খাবি?’
‘চা তো তুই খাবি। তবে বাসায় চিনি নেই।’
আনিস পাঞ্জাবির পকেট থেকে ছোট একটি কৌটা বের করল, ‘তোর কাছে চিনি থাকে না, জানি। চিনি আমি সঙ্গে নিয়ে এসেছি।’
রান্নাঘরে গিয়ে চা বসালাম। পানি ফুটতে ফুটতে আনিস এসে দরজায় দাঁড়াল। গম্ভীর গলায় বলল, ‘মানুষ যখন খুব দুঃখে থাকে, তখন তার রসিকতা করার ক্ষমতা বেড়ে যায়। তুই কি এটা জানিস?’
‘না। তুই কি খুব দুঃখে আছিস?’
বাইরে বৃষ্টির হালকা গুড়গুড় শব্দ। জানালা দিয়ে ঠান্ডা বাতাস এসে চায়ের ধোঁয়া উড়িয়ে দিল। আনিস নিচু গলায় বলল, ‘বাবা আজ সকালে মারা গেছেন।’
আমি চায়ের কেটলিটা নিয়ে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। আনিসের মুখে কোনো কান্নার দাগ নেই। সে শান্তভাবে বলল, ‘দুই চামচ চিনি দিস। মুখটা তেতো হয়ে আছে।’
চা বানিয়ে ড্রয়িংরুমে বসলাম। বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি নেমে গেছে।
‘চাচাকে কোথায় রাখা হয়েছে?’
‘হাসপাতালে। ছোট বোন আমেরিকা থেকে না আসা পর্যন্ত দাফন হবে না। কয়েক দিন লাগবে।’
‘তুই একা এখানে চলে এলি কেন? আমাকে বলতি আমি যেতাম।
আনিস ফিসফিস করে বলল, ‘হাসপাতালের বাতাসটা বড্ড ভারী। দম আটকে আসছিল। তাই ভাবলাম, তোর কাছে এসে এক কাপ মিষ্টি চা খাই।’
আনিস চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে বসে রইল। চা ঠান্ডা হয়ে আসছে। সে খাচ্ছে না।
‘জানিস, বাবা চা খেতে একদম পছন্দ করতেন না। বলতেন, চা খেলে নাকি ক্ষতি হয়। অথচ প্রতিদিন বিকালে আমার চায়ের কাপ থেকে এক চুমুক খেতেন।’
আনিস হাসল। বিষণ্ন হাসি। কিন্তু হাসিটা বেশিক্ষণ থাকল না।
‘আজ সকালে বাবাকে এক চুমুক চা খেতে বলেছিলাম। কিন্তু ডাক্তার খেতে দেয়নি। তখনো জানতাম না, এটিই শেষ সকাল।’
বাইরে মেঘ ডাকল। আনিস জানালার দিকে তাকিয়ে হাত দিয়ে চোখ মুছল। চোখে পানি কিনা বোঝা গেল না।
আনিস তার পাঞ্জাবির হাতা ঠিক করে বলল, ‘আমি যাইরে। বাবা হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরবেন। আমি না থাকলে হবে!’
আমি তাকিয়ে রইলাম। আনিসও কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তার মুখে আবার বিষণ্ন হাসি। বাবা যে আর কোনোদিন ফিরবে না বুঝতে পারল বোধ হয়।
আনিস দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। তার চোখে পানি। বাইরে ঝুম বৃষ্টি। বৃষ্টির পানিতে আনিসের চোখের পানি ধুয়ে-মুছে গেল।



