সুতরাং

রাত সাড়ে ১০টার দিকে মোবাইলে একটা কল এলো। অপরিচিত নম্বর। ধরতেই একজন মহিলা বললেন, ‘তুমি কি বাসায় ফিরছ?’
আমি বললাম, ‘কোন বাসায়?’
মহিলা একটু চুপ থেকে বললেন, ‘সরি। ভুল নম্বর।’
এই পর্যন্ত ঠিক ছিল। কিন্তু পরদিন আবার একই সময়ে ফোন এলো, ‘আজ এত দেরি হচ্ছে কেন?’
আমি বললাম, ‘আপনি কাকে খুঁজছেন?’
মহিলা বললেন, ‘ওহ! আবার ভুল নম্বর।’
তৃতীয় দিনও ফোন এলো। এবার আমি নিজেই বললাম, ‘আজও কি ভুল নম্বর?’
মহিলা হেসে ফেললেন। বললেন, ‘তুমি খুব মজার মানুষ।’
এভাবে আমাদের কথা হয়ে গেল। নাম জানলাম না। ঠিকানাও না। শুধু জানলাম, মহিলার একটা ছেলে আছে। ছেলেটা চাকরি করে। রাতে বাসায় ফিরতে দেরি করে।
আমি একদিন বললাম, ‘আপনার ছেলেকে বলবেন, এত রাতে বাইরে না থাকতে। মায়েরা চিন্তা করেন।’
মহিলা বললেন, ‘বলেছি। ছেলেরা কি আর মায়ের কথা শোনে!’
কথাটা শুনে আমার একটু খারাপ লাগল। আমার মা-ও এমন করতেন। রাতে একটু দেরি হলেই ফোন দিতেন। তবে এখন আর কেউ ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করে না, কখন ফিরব।
এর পর থেকে রাত সাড়ে ১০টায় কলের অপেক্ষায় থাকি। একদিন ফোন এলো না। পরের দিনও না। তৃতীয় দিন আমি নিজেই ফোন করলাম। নম্বর বন্ধ।
কয়েক দিন পর আবার কল এলো। এবার একজন পুরুষ কণ্ঠ। বললেন, ‘আপনি কি আমার মায়ের সঙ্গে কথা বলতেন?’
আমি একটু চমকে গেলাম। বললাম, ‘হ্যাঁ। উনি কেমন আছেন?’
লোকটি বললেন, ‘মা গত সপ্তাহে মারা গেছেন।’
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম।
লোকটি আবার বললেন, ‘মা প্রায়ই আপনাকে ফোন করতেন। মা জানতেন, আপনি তার ছেলে নন। তবু ফোন দিতেন।’
আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘কেন?’
লোকটি বললেন, ‘মা আসলে আমাকে ফোন করতে চাইতেন। কিন্তু আমি অনেক দিন ধরে ফোন ধরতাম না। একদিন আপনার নম্বরে ভুল করে ফোন চলে যায়। তারপর থেকে আপনাকেই ফোন করতেন।’
আমি ফোনটা কানে ধরে বসে রইলাম। লোকটি বললেন, ‘মা বলতেন, ছেলেটা অন্তত ফোন ধরে।’
লোকটি ফোন রেখে দেন। হঠাৎ মনে হলো, পৃথিবীতে কিছু মানুষ আছেন, যাদের ফোন ধরার মতো একজন মানুষও নেই। আর কিছু মানুষ আছেন, যাদের ফোন ধরার মতো অনেক মানুষ আছে। শুধু নিজের সময়টাই নেই।



