বাবা দিবস
যে গল্প থেকে শুরু হয়েছিল বিশেষ একটি দিন

ছবি: এআই
আজ বিশ্ব বাবা দিবস। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও দিনটি পালিত হচ্ছে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার আবহে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাবাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ, ছবি ও শুভেচ্ছাবার্তায় সরব হয়েছেন অনেকে। তবে বাবা দিবস কেবল আবেগ প্রকাশের একটি উপলক্ষ নয়। এর পেছনে রয়েছে একজন বাবার ত্যাগ এবং এক কন্যার ভালোবাসা থেকে জন্ম নেওয়া একটি ইতিহাস।
বর্তমানে বিশ্বের শতাধিক দেশে বাবা দিবস পালিত হলেও এর সূচনা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে একজন নারীর ব্যক্তিগত অনুভূতি থেকেই বিশেষ এই দিনটির ধারণা জন্ম নেয়। সেই নারীর নাম সোনোরা স্মার্ট ডড। ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের স্পোকেন শহরে বসবাসকারী সোনোরা ১৯০৯ সালে একটি গির্জায় মা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন। মায়েদের সম্মান জানাতে বিশেষ আয়োজন দেখে তার মনে প্রশ্ন জাগে, বাবাদের জন্যও কি এমন কোনো দিন থাকা উচিত নয়?
এই প্রশ্নের পেছনে ছিল তার নিজের জীবনের গল্প। সোনোরার বাবা উইলিয়াম জ্যাকসন স্মার্ট ছিলেন মার্কিন গৃহযুদ্ধের একজন প্রবীণ সৈনিক। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি একাই ছয় সন্তানকে বড় করে তোলেন। সন্তানদের মানুষ করতে গিয়ে তিনি যে ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন, তা সোনোরার মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। বাবার প্রতি সেই শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা থেকেই তিনি একটি বিশেষ দিবস চালুর উদ্যোগ নেন।
সোনোরার প্রচেষ্টায় ১৯১০ সালের ১৯ জুন ওয়াশিংটনের স্পোকেন শহরে প্রথমবারের মতো বাবা দিবস পালিত হয়। এটিই ইতিহাসের প্রথম আনুষ্ঠানিক বাবা দিবস হিসেবে বিবেচিত হয়। শুরুতে দিবসটি সীমিত পরিসরে পালিত হলেও ধীরে ধীরে এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে মানুষ বাবাদের সম্মান জানাতে বিশেষ কর্মসূচি আয়োজন শুরু করে।
তবে জাতীয় স্বীকৃতি পেতে বাবা দিবসকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। কয়েক দশক ধরে নানা আলোচনা ও উদ্যোগের পর ১৯৬৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জুন মাসের তৃতীয় রোববারকে বাবা দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেন। পরে ১৯৭২ সালে প্রেসিডেন্ট দিবসটিকে আনুষ্ঠানিক জাতীয় স্বীকৃতি দেন। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়মিতভাবে জুন মাসের তৃতীয় রোববার বাবা দিবস পালিত হয়ে আসছে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দিবসটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বহু দেশে বাবা দিবস পালিত হয়। যদিও সব দেশে একই দিনে দিবসটি উদযাপিত হয় না। তবু অধিকাংশ দেশই জুন মাসের তৃতীয় রোববারকে বাবা দিবস হিসেবে পালন করে।
বাংলাদেশে বাবা দিবসের জনপ্রিয়তা তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক সময়ের। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসারের পর দিনটি আরও বেশি পরিচিতি পেয়েছে। এদিন অনেকেই বাবার সঙ্গে তোলা ছবি প্রকাশ করেন, স্মৃতিচারণ করেন কিংবা বাবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে লেখেন। যাদের বাবা আর বেঁচে নেই, তারা স্মৃতির পাতায় ফিরে গিয়ে বাবাকে স্মরণ করেন আবেগভরা কথায়।
বাবা দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়। এটি পরিবারের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্যের অবদানকে স্মরণ করার উপলক্ষ। সন্তানের জীবনে বাবার ভূমিকা অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়। পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা থেকে শুরু করে সন্তানের শিক্ষা, মূল্যবোধ ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাবার অবদান অপরিসীম। অনেক বাবা তাদের ভালোবাসা প্রকাশ করেন না কথায়, বরং দায়িত্ব পালন ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে।
আজকের ব্যস্ত জীবনে বাবা-সন্তানের সম্পর্কও অনেক ক্ষেত্রে বদলে যাচ্ছে। সময়ের অভাব, কর্মব্যস্ততা কিংবা দূরত্বের কারণে অনেক অনুভূতি প্রকাশ করা হয়ে ওঠে না। বাবা দিবস সেই না-বলা কথাগুলো বলার একটি সুযোগ এনে দেয়। একটি ফোনকল, একটি আলিঙ্গন কিংবা কয়েকটি আন্তরিক শব্দও একজন বাবার কাছে অমূল্য হয়ে উঠতে পারে।
এক শতাব্দীরও বেশি আগে একজন কন্যার হৃদয়ে জন্ম নেওয়া যে ভাবনা থেকে বাবা দিবসের সূচনা হয়েছিল। আজ তা বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। আর সেই কারণেই বাবা দিবস শুধু একটি দিবস নয়। এটি বাবা নামের মানুষটির প্রতি সম্মান জানানোর এক অনন্য উপলক্ষ।







