বাবার জন্য সন্তানের সবচেয়ে বড় উপহার কী

প্রতীকী ছবি
বাবা সন্তানের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিয়ামত। পৃথিবীতে এমন অসংখ্য বাবা আছেন, যারা সন্তানের হাসির জন্য নিজের স্বপ্ন কোরবানি করে দেন, সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য দিন-রাত পরিশ্রম করেন। নিজের কষ্ট গোপন রেখে পরিবারের জন্য নিরাপত্তার দেয়াল হয়ে দাঁড়ান। তাই বাবা দিবস এলে অনেকেই বাবাকে নানা ধরনের উপহার দেন। কিন্তু একজন মুসলিম সন্তানের খোঁজ নেয়া উচিত; ইসলামের দৃষ্টিতে বাবার জন্য সবচেয়ে মূল্যবান উপহার কী? একজন বাবার প্রকৃত প্রাপ্তি কি দামি পোশাক, মোবাইল ফোন, ফুল কিংবা অন্য কোনো বস্তুগত উপহার? নাকি ইসলাম আরও গভীর ও স্থায়ী কোনো উপহারের কথা বলে?
পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে বিচার করলে দেখা যায় যে, একজন বাবার জন্য সন্তানের সবচেয়ে বড় উপহার হলো তার নেককার জীবন, আনুগত্য, দোয়া এবং এমন আমল, যার কল্যাণ মৃত্যুর পরও বাবার কাছে পৌঁছাতে থাকে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বাবা-মায়ের প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,
وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا
‘তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন, তোমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে।’ (সুরা আল-ইসরা, আয়াত : ২৩)
লক্ষ্য করলে দেখা যায়, তাওহীদের নির্দেশের পরপরই আল্লাহ পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের কথা উল্লেখ করেছেন। এটি তাদের মর্যাদার গুরুত্বকে স্পষ্ট করে। তাই একজন সন্তানের প্রথম উপহার হওয়া উচিত তার সুন্দর আচরণ। অনেক বাবা সন্তানের কাছ থেকে অর্থ বা উপহার নয়, বরং সম্মান, ভালোবাসা এবং আন্তরিক ব্যবহার প্রত্যাশা করেন। সন্তানের একটি কোমল কথা, একটি সম্মানজনক আচরণ বা একটি খোঁজখবর অনেক সময় হাজার টাকার উপহারের চেয়েও মূল্যবান হয়ে ওঠে।
ইসলামের দৃষ্টিতে নেককার সন্তান নিজেই বাবা-মায়ের জন্য সবচেয়ে বড় উপহার। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
«إِنَّ أَطْيَبَ مَا أَكَلَ الرَّجُلُ مِنْ كَسْبِهِ، وَإِنَّ وَلَدَهُ مِنْ كَسْبِهِ»
‘মানুষের উপার্জিত সম্পদের মধ্যে সবচেয়ে পবিত্র হলো তার নিজ উপার্জন, আর তার সন্তানও তার উপার্জনেরই অংশ।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৫২৮; তিরমিজি, হাদিস : ১৩৫৮)
এই হাদিসের আলোকে একজন সন্তানের চরিত্র, জ্ঞান, নৈতিকতা ও সাফল্য বাবার জীবনের এক অব্যাহত অর্জন। একজন সন্তান যখন সততা, তাকওয়া ও মানবিকতার পথে চলে, তখন সেটি বাবার জন্য গর্বের বিষয় হওয়ার পাশাপাশি আখিরাতের জন্যও পাথেয় হয়ে যায়।
সন্তানের সবচেয়ে বড় উপহারগুলোর একটি হলো বাবার জন্য দোয়া করা। কোরআনে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের এই দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন,
رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
‘হে আমার প্রতিপালক, তাদের প্রতি দয়া করুন, যেমন তাঁরা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন।” (সূরা আল-ইসরা, আয়াত : ২৪)
এই দোয়া শুধু জীবিত বাবা-মায়ের জন্য নয়; মৃত্যুর পরও তাদের জন্য রহমতের আবেদন। পৃথিবীর কোনো উপহার মৃত্যুর পর বাবার সঙ্গে থাকে না, কিন্তু সন্তানের আন্তরিক দোয়া তার কবরকে আলোকিত করতে পারে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
«إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثٍ... أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ»
‘মানুষ মারা গেলে তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি আমল ছাড়া... তার মধ্যে একটি হলো নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।’ (মুসলিম, হাদিস : ১৬৩১)
এই হাদিস স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, একজন নেক সন্তান তার বাবার মৃত্যুর পরও উপকার করতে পারে। তাই বাবা দিবসে যদি কোনো সন্তান সত্যিই বাবাকে কিছু দিতে চায়, তবে তার উচিত বাবার জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করা।
জীবিত বাবার জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপহার হলো তার সেবা ও আনুগত্য। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেছেন, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল কোনটি? তিনি বলেন, ‘সময়ের মধ্যে নামাজ আদায়।’ এরপর বলেন, ‘পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার।’ (বুখারি, হাদিস : ৫২৭; মুসলিম, হাদিস : ৮৫)
এ হাদিসে পিতা-মাতার হককে কত উচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে তা স্পষ্ট। বৃদ্ধ বয়সে বাবার পাশে দাঁড়ানো, তার প্রয়োজন পূরণ করা, তাকে সময় দেওয়া এবং তার একাকীত্ব দূর করা এমন উপহার, যার বিকল্প কোনো বস্তুগত সামগ্রী হতে পারে না।
মৃত বাবার জন্য সবচেয়ে মূল্যবান উপহার হলো তার অসমাপ্ত কল্যাণকর কাজগুলোকে এগিয়ে নেওয়া। হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, আমার মা হঠাৎ মৃত্যুবরণ করেছেন। আমি মনে করি, তিনি সুযোগ পেলে সদকা করতেন। আমি যদি তার পক্ষ থেকে সদকা করি, তাহলে কি তিনি সওয়াব পাবেন? রাসুল (সা.) বললেন, “হ্যাঁ।” (বুখারি, হাদিস : ২৭৬০; মুসলিম, হাদিস : ১০০৪)
এই নীতির আলোকে বাবার পক্ষ থেকে সদকা করা, মসজিদ নির্মাণে সহযোগিতা করা, কূপ খনন, দ্বীনি শিক্ষা বিস্তার বা অন্য কোনো জনকল্যাণমূলক কাজে অংশগ্রহণ করা বাবার জন্য স্থায়ী উপহার হতে পারে।
এ ছাড়া বাবার আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপহার। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
«إِنَّ مِنْ أَبَرِّ الْبِرِّ أَنْ يَصِلَ الرَّجُلُ أَهْلَ وُدِّ أَبِيهِ»
‘সর্বোত্তম সদাচরণের একটি হলো, কোনো ব্যক্তি তার পিতার প্রিয়জনদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৫৫২)
অর্থাৎ বাবার মৃত্যুর পরও তার বন্ধু, আত্মীয় এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের সম্মান করা সন্তানের দায়িত্ব এবং এটি বাবার প্রতি ভালোবাসার বাস্তব প্রকাশ।
আজকের ভোগবাদী সমাজে উপহারের ধারণা অনেকাংশে বস্তুগত সামগ্রীর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। অথচ ইসলাম শেখায়, একজন বাবার জন্য সবচেয়ে মূল্যবান উপহার হলো এমন সন্তান, যে আল্লাহভীরু, চরিত্রবান ও দায়িত্বশীল; যে জীবিত অবস্থায় বাবাকে সম্মান করে, বার্ধক্যে সেবা করে এবং মৃত্যুর পর তার জন্য দোয়া, সদকা ও নেক আমলের মাধ্যমে কল্যাণ পৌঁছে দেয়।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক




