একজন আদর্শ মুসলিম বাবা কেমন হবেন?
- ইসলামের আলোকে আদর্শ পিতৃত্ব
- সন্তান গঠনে একজন মুসলিম বাবার দায়িত্ব
- ইসলামের দৃষ্টিতে সফল বাবার পরিচয়

প্রতীকী ছবি
পরিবার একটি জাতির প্রথম শিক্ষালয়, আর সেই শিক্ষালয়ের অন্যতম প্রধান শিক্ষক হলেন বাবা। একজন সন্তানের ব্যক্তিত্ব, নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও জীবনদর্শন গঠনে বাবার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক সমাজে বাবার দায়িত্বকে অনেক সময় শুধু উপার্জন ও ভরণপোষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ মনে করা হয়। কিন্তু ইসলাম একজন পিতার দায়িত্বকে আরও ব্যাপক ও গভীর দৃষ্টিতে বিবেচনা করে। ইসলাম বাবাকে শুধু পরিবারের অর্থনৈতিক অভিভাবক হিসেবে দেখে না। ইসলাম বাবাকে সন্তানদের ঈমান, চরিত্র, জ্ঞান ও মানবিক গুণাবলি গঠনের অন্যতম দায়িত্বশীল হিসেবে মূল্যায়ন করে।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বহু নবীর পিতৃত্বের আদর্শ তুলে ধরেছেন। বিশেষভাবে ইবরাহিম (আ.), ইয়াকুব (আ.) এবং লোকমান (আ.)-এর জীবন থেকে একজন আদর্শ পিতার বহু গুণাবলি আমাদের শিখানো হয়েছে।
সন্তানের প্রতি একজন বাবার প্রথম দায়িত্ব হলো তাকে ঈমান ও তাওহীদের শিক্ষা দেওয়া। পবিত্র কোরআনে লোকমান (আ.)-এর উপদেশের বর্ণনায় এসেছে:
يَا بُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ ۖ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ
‘হে আমার প্রিয় পুত্র, আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করো না। নিশ্চয়ই শিরক মহা জুলুম।’ (সুরা লুকমান, আয়াত : ১৩)
লোকমান (আ.)-এর এই উপদেশ থেকে বোঝা যায়, একজন আদর্শ বাবা সন্তানের জন্য প্রথমে পার্থিব সাফল্যের চিন্তা না করে; তার ঈমান ও আখিরাতের কল্যাণকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। আজকের সমাজে সন্তানকে ভালো স্কুলে ভর্তি করানো, বিদেশে পড়াশোনা করানো বা আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য বিপুল চেষ্টা করা হয়, কিন্তু অনেক সময় তার দ্বীনি শিক্ষা ও নৈতিক গঠন উপেক্ষিত থেকে যায়। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে এটি একটি বড় ঘাটতি।
একজন আদর্শ মুসলিম বাবা নিজে উত্তম চরিত্রের অধিকারী হবেন। কারণ সন্তান কথার চেয়ে কাজ থেকে বেশি শিক্ষা গ্রহণ করে। রাসলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মানবজাতির জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ। তিনি শিশুদের প্রতি দয়া, স্নেহ ও ভালোবাসার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা প্রতিটি বাবার জন্য অনুসরণীয়। তিনি তার নাতি হাসান ও হুসাইন (রা.)-কে আদর করতেন, কাঁধে বহন করতেন এবং প্রকাশ্যে তাদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতেন।
হাদিসে এসেছে:
كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ
‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (বুখারি, হাদিস : ৮৯৩; মুসলিম, হাদিস : ১৮২৯)
এই হাদিসে পারিবারিক নেতৃত্বকে একটি আমানত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তাই একজন বাবা কেবল সন্তানদের খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করলেই দায়িত্বমুক্ত হয়ে যান না। তাদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বিকাশের বিষয়েও তাকে জবাবদিহি করতে হবে।
একজন আদর্শ মুসলিম বাবা সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। পবিত্র কোরআনে লোকমান (আ.) তার সন্তানকে সম্বোধন করেছেন "يَا بُنَيَّ" অর্থাৎ ‘হে আমার স্নেহের পুত্র’ বলে। এই সম্বোধনের মধ্যে রয়েছে মমতা, আন্তরিকতা ও হৃদ্যতা। সন্তান যদি বাবাকে ভয় পাওয়ার পরিবর্তে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার জায়গা থেকে গ্রহণ করতে শেখে, তবে তার মধ্যে ইতিবাচক মানসিক বিকাশ ঘটে।
ইয়াকুব (আ.)-এর জীবনেও আমরা এ শিক্ষা পাই। তার সন্তানরা নিজেদের ভুল ও অপরাধ স্বীকার করে বাবার কাছেই ফিরে এসেছিল। কারণ তাদের সঙ্গে পিতার সম্পর্ক ছিল আস্থাপূর্ণ ও মানবিক। বর্তমান যুগে অনেক পরিবারে প্রজন্মগত দূরত্ব বেড়ে যাওয়ার একটি কারণ হলো, বাবা ও সন্তানের মধ্যে আন্তরিক যোগাযোগের অভাব।
একজন আদর্শ মুসলিম বাবা সন্তানের জন্য দোয়া করবেন। পবিত্র কোরআনে সন্তানদের জন্য ইবরাহিম (আ.)-এর একাধিক দোয়া উল্লেখ করা হয়েছে:
رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلَاةِ وَمِنْ ذُرِّيَّتِي
‘হে আমার প্রতিপালক, আমাকে নামাজ প্রতিষ্ঠাকারী বানান এবং আমার বংশধরদের মধ্য থেকেও।’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত : ৪০)
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, একজন মুমিন বাবা শুধু নিজের জন্য নয়, সন্তানের দ্বীনি উন্নতির জন্যও আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন। কারণ সন্তানের ভবিষ্যৎ গঠনে দোয়ার গুরুত্ব অপরিসীম।
একজন আদর্শ মুসলিম বাবা ন্যায়পরায়ণ হবেন এবং সন্তানদের মধ্যে বৈষম্য করবেন না। রাসুলুল্লাহ (সা.) সন্তানদের মধ্যে সমতা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। নুমান ইবন বশীর (রা.) বর্ণনা করেছেন, তার পিতা একবার তাকে বিশেষ একটি উপহার দিলে রাসুল (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, অন্য সন্তানদেরও কি একই উপহার দেওয়া হয়েছে? যখন উত্তর হলো না, তখন তিনি বলেন:
اتَّقُوا اللَّهَ وَاعْدِلُوا بَيْنَ أَوْلَادِكُمْ
‘আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করো।’ (বুখারি, হাদিস : ২৫৮৭; মুসলিম, হাদিস : ১৬২৩)
সন্তানদের মধ্যে পক্ষপাতিত্ব পারিবারিক অশান্তি ও সন্তানের মানসিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই একজন আদর্শ বাবাকে অবশ্যই সবার প্রতি ন্যায়সঙ্গত আচরণ করতে হবে।
এ ছাড়া তিনি সন্তানদের উত্তম শিক্ষা প্রদান করবেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
مَا نَحَلَ وَالِدٌ وَلَدَهُ مِنْ نَحْلٍ أَفْضَلَ مِنْ أَدَبٍ حَسَنٍ
‘কোনো পিতা তার সন্তানকে উত্তম চরিত্র ও আদবের চেয়ে শ্রেষ্ঠ উপহার দিতে পারে না।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৯৫২)
এ হাদিসে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, প্রকৃত উত্তরাধিকার কেবল সম্পদ নয়; বরং সুশিক্ষা ও সুন্দর চরিত্র।
বর্তমান সময়ে সন্তানদের সামনে নানা ধরনের আদর্শ উপস্থাপিত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিনোদনজগৎ এবং ভোগবাদী সংস্কৃতি তাদের চিন্তা ও আচরণকে প্রভাবিত করছে। এমন পরিস্থিতিতে একজন মুসলিম বাবার দায়িত্ব আরও বেড়ে গিয়েছে। তাকে সন্তানদের জন্য শুধু উপদেশদাতা নয়, বরং জীবন্ত আদর্শ হতে হবে। সন্তান যেন বাবার মধ্যে সততা, তাকওয়া, দায়িত্ববোধ, মানবিকতা এবং আল্লাহভীতির বাস্তব প্রতিফলন দেখতে পায়।
ইসলামের দৃষ্টিতে একজন সফল বাবা তিনি নন, যিনি কেবল বিপুল সম্পদ রেখে যান। প্রকৃত সফল বাবা তিনি, যিনি এমন সন্তান গড়ে তোলেন, যারা আল্লাহকে চেনে, মানুষের উপকার করে, নৈতিকতার পথে চলে এবং মৃত্যুর পরও পিতার জন্য দোয়া করতে থাকে। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মানুষ মৃত্যুবরণ করলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে নেক সন্তান তার জন্য দোয়া করলে সেই উপকার অব্যাহত থাকে। (মুসলিম, হাদিস : ১৬৩১)
আজকের এই বাবা দিবসে সকল বাবাদের হৃদয়ে ধারণ করতে হবে যে, একজন বাবার প্রকৃত মর্যাদা কেবল পারিবারিক কর্তৃত্বে নয়; বরং দায়িত্বশীল নেতৃত্ব, স্নেহময় অভিভাবকত্ব এবং ঈমানি আদর্শ গঠনের মধ্যেই নিহিত।
একজন আদর্শ মুসলিম বাবা এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের জীবন দিয়ে সন্তানকে শেখান কীভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে সফল জীবন গড়া যায়।
মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে নববী আদর্শের আলোকে সন্তানদের জীবন গড়ে তোলার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক




