ছাত্র আন্দোলন ও আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা

শহিদুল ইসলাম
জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমির (নায়েম) ইনডাকশন ট্রেনিংয়ে অংশগ্রহণ করেছিলাম। প্রশিক্ষণ হয়েছিল ২০২৪ এর ১৫ জুলাই থেকে ২৮ আগস্ট পর্যন্ত ৪৫ দিন। ঐ সময় ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়েছিল। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। কোটা সংস্কার ছিল তাদের আলোচ্য বিষয়। পরবর্তী সময়ে কোটা সংস্কার করার পরও থেমে থাকেনি আন্দোলন। তারা এক দফা দাবি নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। সরকার পতনের আন্দোলন। ১৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোটা আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। ছাত্ররা স্লোগান দিতে থাকে চাইতে গেলাম অধিকার হয়ে গেলাম রাজাকার। সরকার লেলিয়ে দেওয়া হায়নারা ছাত্রদের ওপর রামদা, হকিস্টিক, রড, লাঠি, আগ্নেয় অস্ত্র নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে। আন্দোলন বেগবান হয়।
১৬ জুলাই আন্দোলন বেগবান হলে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে বুকে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়। গ্রেপ্তার এবং মামলা অব্যাহত রাখা হয়। মাঝে মাঝে হঠাৎ গুলাগুলির শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। বোমার আওয়াজ। চারদিকে ধূয়ার কুন্ড। ছাত্ররা জীবন বাজি রেখে আন্দোলন করছে। কারফিউয়ের পর কারফিউ চলছে দেশে। আমরা ক্লাস করতে করতে ডিরেক্টর এ্যাডমিন প্রফেসর ড. শাহ মো. আমির আলী স্যার এসে বললেন আজকে আর কোনো ক্লাস হবে না। আপনারা হোস্টেলে চলে যান। তারপর সাধারণ ছুটি ঘোষণা হলো। ক্লাস বন্ধ হয়ে গেল। প্রশাসন থেকে জানানো হলো আপনারা নিরাপদে হোস্টেলে অবস্থা করেন। ঢাকা কলেজ, নিউ মার্কেট, সাইন্সল্যাবসহ সারা দেশে রণক্ষেত্র। পুলিশ ছাত্রদের ওপর হয়ে গলি চালাচ্ছে। মিছিলে মিছিলে রাজপথ প্রকম্পিত হলো। পুলিশের গুলিতে ৭৫০ জন নিহত হলো। এক দফা আন্দোলন সরকার পতন। সরকার পতন না হলে উপায় নেই, মৃত্যু ছাত্র জনতার জন্য রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হলো। ছাত্ররা তা প্রত্যাখ্যান করলেন। ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হলো।
৩ আগস্ট শহীদ মিনারে একত্রিত হয়ে ছাত্র জনতা শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবি জানায়। নেতৃত্ব দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সমন্বয়ক মো. নাহিদ ইসলাম। শেখ হাসিনা আন্দোলনরত ছাত্রদের আলোচনায় বসার প্রস্তাব দেন। কিন্তু ছাত্ররা তা প্রত্যাখ্যান করে। ৪ আগস্ট ছাত্ররা সর্বাত্মক অসহোযোগ আন্দোলনের ডাক দেয়। সরকার কারফিউ জারি করে। ৫ আগস্ট সরকারের কারফিউকে অগ্রাহ্য করে সারা দেশ থেকে ছাত্র জনতা ঢাকামুখী লং মার্চ করে। রাজধানী জনসমুদ্র রূপ লাভ করে। ছাত্ররা প্রধান মন্ত্রীর কার্যালয় এবং গণভবন ঢুকে পড়ে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে সামরিক হেলিকপ্টারে করে পালিয়ে যান ভারতে। ক্ষমতা চলে গেল সেনাবাহিনীর হাতে। দ্রুত অন্তবর্তী সরকার গঠন করা হবে বলে সেনাবাহিনীর প্রধান ওয়াকার-উজ-জামান ঘোষণা দিলেন। আর কত রক্ত লাগবে। নেতাজি সুবাস চন্দ্র বসু বলেছিলেন তোমরা আমাকে রক্ত দাও আমরা তোমাকে স্বাধীনতা দেব। যে দেশে স্বাধীনতা এবং শান্তি আছে তার পিছনে আছে দীর্ঘ রক্ত পাতের ইতিহাস। ছাত্র আন্দোলন দ্বিতীয় স্বাধীনতা দিল। ‘৬৯ এর আইয়ুব খান বিরুধী গণঅভ্যুথান এবং ‘৯০ এর এরশাদ বিরোধী আন্দোলন এবং ‘২৪ এর ছাত্র আন্দোলন বাঙালি জাতির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ দিক।
আমি নায়েমে প্রশিক্ষন নিতে এসে বুদ্ধিজীবী হোটেলে ১১ তলায় অবস্থান করেছিলাম ১১০৯ নম্বর কক্ষে। হোটেল থেকে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার থেকে গরম পানি এবং গ্যাস নিক্ষেপ করতে দেখলাম। হঠাৎ গুলির আওয়াজে প্রকম্পিত ক্যাম্পাস। হঠাৎ নির্দেশনা আসলো। আপনারা ক্যাম্পাসের বাহিরে কেউ যাবেন না। তারপর প্রশিক্ষণের তাড়া। সকাল ৬টা থেকে বিকাল সাগে ৪টা পর্যন্ত প্রশিক্ষণ। মাঝে মাঝে ৯টা পর্যন্ত। রাতে লাইব্রেরি ওয়ার্ক। তারপর রুমে এসে ১২টা-১ টা পর্যন্ত পড়াশুনা। কোর্স কোডিনেটর শেখ মোহাম্মদ আলী স্যার প্রতিদিন দিবসের কার্যক্রমের ওপর হোয়াটস অ্যাপে ম্যাসেজ দিতেন। পরীক্ষা এবং এসাইনমেন্ট লেখার তাড়া। আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। ক্ষণিকের আনন্দের জন্য আমরা বিমানযোগে কক্সবাজার গিয়েছিলাম। হোটেল সি প্যালেসে দুই রাত অবস্থান করেছিলাম। যা আমাদের অভিজাত্যকে বাড়িয়ে দেয়।
ট্রেনিং চলছে। সরকারি ছুটির দিনও ট্রেনিংয়ে ছুটির ব্যবস্থা নেই। মেচ নাইটে ডিরেক্টর এডমিন প্রফেসর ড. শাহ মো. আমীর আলী স্যারের গান, ‘সুন্দর এক গানের পাখি মন নিয়ে সে খেলা করে।’ গানটা এত ভালো লাগছিল যে শুনে পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম। আমরা ছাত্র আন্দোলনের সময় পত্রিকা পড়ার এবং টেলিভিশন দেখার সুযোগ কম পেয়েছিলাম। আন্দোলনে জয়ী হয়ে ছাত্র নেতারা বললো সিদ্ধান্ত আমরা ক্যান্টনম্যান্ট থেকে নেব না। আমরা সিদ্ধান্ত দেব শাহবাগ থেকে। পরবর্তীতে নতুন অন্তবর্তী সরকার গঠিত হলো। অন্তবর্তী সরকারের প্রধান হলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সরকারের গঠিত টর্চার সেল আয়না ঘর যা হিটলারের কনসেন্ট্রশন ক্যাম্প সমজাতীয় বলে সুধী মহলও মনে করেন।
মানুষের মাঝে বৈষম্য বিরাজ করুক এটা কোন ব্যক্তি চাইবে না। তার জন্য জীবন বাজি রেখে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। তার জন্য রক্ত দরকার। বাংলার বীরের ছেলেরা এই আন্দোলনে লড়াকু সৈনিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে জয়ী হয়েছে। আমরা তাদের স্বাগত জানাই। জাতি চেয়ে আছে নতুন এক বাংলাদেশের প্রত্যাশায়। যেখানে থাকবে না কোনো বৈষম্য। দেশ পাবে শান্তি ও স্বস্তির ঠিকানা, সবাই মিলে মিশে জাতিকে গড়ে তুলতে হবে। তবেই ছাত্র আন্দোলন স্বার্থক হবে। নইলে আন্দোলনে শহীদদের আত্মার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে।
লেখক: প্রভাষক দর্শন বিভাগ, সরকারি ইস্পাহানী ডিগ্রি কলেজ, কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।
E-mail: [email protected]




