বিষাদ সিন্ধুতে উঠে এসেছে কারবালার ভয়াবহ ‘ইতিহাস’

ফাইল ছবি
ইসলামের সুদীর্ঘ ইতিহাসে ১০ মুহাররম বা আশুরার দিনটি নানা তাৎপর্যপূর্ণ কারণে যুগে যুগে প্রসিদ্ধ ও মহিমান্বিত। তবে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মত তথা মুসলিম হৃদয়ে এই দিনটি চিরতরে এক গভীর ক্ষত হয়ে আছে। ফোরাত নদীর তীরে, কারবালা প্রান্তরে তার প্রিয় দৌহিত্র ইমাম হোসেন (রা.)-এর মর্মান্তিক শাহাদত বরণের মধ্য দিয়েই মূলত এই শোকাবহ অধ্যায়ের সূচনা হয়।
ফোরাত নদীর তীরে ঘটে যাওয়া সেই জঘন্য ও শোকাবহ অধ্যায় অন্য সব ঐতিহাসিক ঘটনাকে ছাপিয়ে এক চিরন্তন বেদনার প্রতীক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে আবেগপ্রবণ বাঙালি মুসলমানদের মনন ও মরমী চেতনায় কারবালার এই বিয়োগান্তক ঘটনা এতটাই গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে যে, তা নিয়ে বাংলা সাহিত্যে রচিত হয়েছে অসংখ্য কালজয়ী গদ্য-পদ্য।
এই ধারায় ঔপন্যাসিক মীর মশাররফ হোসেনের বিষাদ সিন্ধু যেন বাঙালির ঘরে ঘরে কারবালার সেই ভয়াবহ ইতিহাস ও শোকগাথাকে এক জীবন্ত রূপকল্পে রূপান্তর করেছে।
এ উপন্যাস রচিত হয়েছে উপক্রমণিকা, মহররম পর্ব, উদ্ধারপর্ব, এজিদবধ পর্ব ও উপসংহারে। এতে যে বিষয়গুলো প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়েছে সেগুলো হলো- মহান আল্লাহ্র ওপর সকল অপকর্মের দায়ভার চাপানো। অর্থাৎ অদৃষ্টবাদী মতবাদ প্রতিষ্ঠা; ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইনের প্রতি আমীরে মু‘আবিয়ার অপরিসীম ভালোবাসা প্রদর্শন;
ইমাম হাসানের সঙ্গে ইয়াযীদের সংঘাতের মূল কারণ একজন নারী। যে নারীকে ইয়াযীদ বিয়ে করতে চেয়েছিলেন, ইমাম হাসানও তাকেই বিয়ে করতে চান। আর এ থেকেই ইয়াযীদের সঙ্গে ইমামের শত্রুতা শুরু হয় এবং তাকে ইয়াযীদের প্ররোচনায় বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়;
ইমাম হুসাইন তার ভাইয়ের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যই ইয়াযীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। অবশেষে কারবালায় নির্মমভাবে নিহত হন।
অর্থাৎ একটি বিয়ের বিষয়কে কেন্দ্র করে পুরো উপন্যাস রচিত হয়েছে। ফলত উমাইয়্যার শাসনব্যবস্থার অত্যাচার ও তাদের অনৈসলামী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ইমামগণের প্রতিরোধের বিষয়কে তিনি তার উপন্যাসে কোথাও আনেননি।
প্রকৃতপক্ষে মীর মশার্রফ হোসেনের বিষাদ সিন্ধু একটি কাল্পনিক উপন্যাস বা উপাখ্যান। এতে শুধু কয়েকটি ঐতিহাসিক নাম ব্যবহার করা হয়েছে এবং ইমাম হাসানকে বিষ প্রয়োগে হত্যা ও কারবালায় ইমাম হুসাইনের সপরিবারে শাহাদাত বরণের সত্য কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ঐতিহাসিকভাবে সত্য আর কোনো ঘটনাই বর্ণিত হয়নি। তাই এটাকে ‘ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস’ বলাটা কতটুকু যুক্তিযুক্ত সেটাও বিবেচনার বিষয়।
১৮৮৫ থেকে ১৮৯১ সালের মধ্যে তিন খণ্ডে প্রকাশিত মীর মশাররফ হোসেনের এই উপন্যাস বাঙালি মুসলিম সমাজে কেবল একটি সাহিত্যকর্ম হিসেবে থাকেনি, বরং মহররম ও কারবালার মূল বয়ানে পরিণত হয়েছে। কিন্তু ইতিহাসের সাপেক্ষে পড়লে একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন ওঠে, মীর মশাররফ হোসেন কি ইতিহাস লিখেছিলেন নাকি ইতিহাসের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে একটি সাহিত্যিক কল্পনা গড়ে তুলেছিলেন?
মূলত বিষাদ সিন্ধু যে একটি ধর্মীয় গ্রন্থ নাকি ঐতিহাসিক গ্রন্থ, এ নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। অনেকে একে ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাসও বলেছেন। বাংলাদেশের লক্ষ-কোটি মুসলমানের কাছে এটি ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক গ্রন্থ হিসাবেই সমাদৃত। এতে বর্ণিত প্রতিটি ঘটনাকে এ দেশের মানুষ সত্য বলে গ্রহণ করে এবং এ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে থাকে।,
তবে এতসব সংগতি-অসংগতির পরও বিষাদ-সিন্ধুকে বাংলা সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা হিসেবে স্বীকার করতে হবে। উনিশ শতকের শেষভাগে বাঙালি মুসলমান যখন নিজের পরিচয় ও সাহিত্যের ভাষা খুঁজছিল, তখন এই উপন্যাস তাদের সামনে একটি শক্তিশালী পরিচয়সূত্র তৈরি করে দেয়।
তবে এই অবদানের উল্টো পিঠও আছে। কারবালার রাজনৈতিক ও আদর্শিক মাত্রাগুলো বাঙালি পাঠকের কাছে অনেকটাই ঢাকা পড়ে গেছে। ত্যাগ ও বেদনার আবেগ আছে, কিন্তু ইমাম হুসাইন (রা.)-এর অবস্থানের রাজনৈতিক ও নৈতিক যুক্তিগুলো অনেকের কাছে পরিচিত নয়। কারণ, বিষাদ-সিন্ধু সেই দিকটির চেয়ে আখ্যানের করুণ রসকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।




