কাফকা অথবা আমি আমরা আমেরিকা দেখিনি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
তখন হলিউডের চিত্রনাট্য আর হোয়াইট হাউজের কূটনীতি একাকার হয়ে যায়। এটিই আমেরিকার সেই পরম কৌতুক, যেখানে পবিত্র গ্রন্থ আর পপ-কালচারের কোনো তফাত থাকে না
নিৎশে যখন ঈশ্বরের মৃত্যুর পর এক পরম শূন্যতার কথা বলছিলেন, ঠিক তখনই আটলান্টিকের ওপারে ফ্রাঞ্জ কাফকা দেখছিলেন এক নতুন ঈশ্বরের জন্ম— যার নাম আমেরিকা। কাফকার উপন্যাসের কিশোর কার্ল রসম্যান যখন নিউ ইয়র্ক বন্দরে পৌঁছায়, তখন স্বাধীনতার দেবী মশাল নয়, বরং এক উদ্যত তলোয়ার উঁচিয়ে তাকে স্বাগত জানায়। স্বাধীনতার ২৫০ বছরের মহোৎসবে দাঁড়িয়ে সেই তলোয়ারের ছায়া আরও দীর্ঘ, আরও ধারালো দেখায়। তবে কাফকা যেখানে আমলাতন্ত্র আর যান্ত্রিক পুঁজির এক বদ্ধ গোলকধাঁধায় কার্লকে বন্দি করেছিলেন, আমেরিকা ঠিক সেখানেই জন্ম দিয়েছে এক তীব্র, উন্মাতাল ও গতিশীল আত্মহননের দর্শন। কাফকার সেই নিষ্প্রাণ করিডর থেকে বের হয়ে আমরা যদি জ্যাক ক্যেরুয়াকের জরাজীর্ণ গ্যাসোলিন-গন্ধী গাড়ির ব্যাকসিটে গিয়ে বসি, তবে দেখা যাবে ‘আমেরিকান ড্রিম’ আসলে কোনো গন্তব্য নয়, তা হলো এক অন্তহীন, উদ্দেশ্যহীন হাইওয়ে। ক্যেরুয়াকের ‘অন দ্য রোড’ উপন্যাসের সেই ছটফটে তরুণরা যেভাবে দিগন্তের দিকে ছুটেছিল, তা আসলে কাফকার সেই যান্ত্রিক দাসত্ব থেকে পালানোর এক মরিয়া, অস্তিত্ববাদী চেষ্টা। কিন্তু সেই হাইওয়ে আজ ২৫০ বছর পর এসে কোথায় মিশেছে? তা গিয়ে ঠেকেছে টেরি গিলিয়ামের ‘ফিয়ার অ্যান্ড লোথিং ইন লাস ভেগাস’-এর সেই অ্যাসিড-পোড়া, ড্রাগ-আক্রান্ত মরুভূমিতে, যেখানে জনি ডেপ ওরফে রাউল ডিউক তার লাল ক্যাডিলাকে চড়ে শিকারি হাঙরের মতো তাড়া করছেন ‘আমেরিকান ড্রিম’।
এ হাইওয়ের পাশে দাঁড়িয়েই বিট প্রজন্মের আরেক ঋষি অ্যালেন গিন্সবার্গ যখন আক্ষেপ করে চেঁচিয়ে উঠেছিলেন, ‘আমেরিকা, আই হ্যাভ গিভেন ইউ অল অ্যান্ড নাউ আই অ্যাম নথিং’— তখন তিনি আসলে এই মেগাসিটির আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই দীর্ঘশ্বাসের ভাষা রূপায়ণ করেছিলেন। গিন্সবার্গের সেই বিলাপ আজও প্রতিধ্বনিত হয় ওয়ালস্ট্রিটের টাই-পরা স্যুট আর লস অ্যাঞ্জেলেসের ফুটপাতে শুয়ে থাকা গৃহহীন মানুষের ছেঁড়া কম্বলের মাঝে। এদের মধ্যকার দূরত্ব আসলে খুব বেশি নয়; এরা একই মুদ্রার দুটি পিঠ, যা ট্যারান্টিনোর ‘পাল্প ফিকশন’-এর স্ক্রিপ্টের মতো লিনিয়ার বা সরল নয়, বরং খণ্ডিত আর নির্মম। আমেরিকার ফুটপাতে ফ্রস্টবাইটে আঙুল জমে যাওয়া কিংবা তীব্র গরমে হাইড্রেট হতে না পারা যে গৃহহীন মানুষটি একা পড়ে থাকে, তার ভেতর এক আদিম, মহাজাগতিক দার্শনিক পেইন লুকিয়ে আছে। সে শুধু অন্ন বা আশ্রয়ের অভাবে কাঁদছে না, সে আসলে কাঁদছে এ ব্যবস্থার এক চূড়ান্ত ও নির্মম প্রত্যাখ্যানের শিকার হয়ে। সে কাফকার উপন্যাসের সেই কার্ল রসম্যান, যাকে সমস্ত অধিকার থেকে বিচ্যুত করে এক অন্তহীন শূন্যতায় ছুড়ে দেওয়া হয়েছে। এ শূন্যতার ওপরই দাঁড়িয়ে আছে হোয়াইট সুপ্রিমেসি। এটি শুধু গায়ের রঙের শ্রেষ্ঠত্ব নয়, এটি এক কাঠামোগত অহংকার, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এক অদ্ভুত শুদ্ধতার ভ্রম তৈরি করে । শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদ কাফকার সেই কঠোর আমলাদের মতোই শীতল, যা অন্য সব সংস্কৃতি, অন্য সব রক্তকে তার পবিত্র আঙিনায় অনন্ত সন্দেহের চোখে তাকিয়ে থাকে, জেরা করে।
ট্যারান্টিনোর ভিনসেন্ট ভেগা আর জুলস উইনফিল্ড যখন স্যুট পরে ক্যাফেতে বসে দার্শনিকতার ছলে মানুষের মগজ উড়িয়ে দেয়— সেখানে এজাজিয়েল ২৫:১৭ অধ্যায়ের এক ভুল, কাল্পনিক বাইবেল পাঠ খুনের বৈধতা হয়ে ওঠে। আর ঠিক তখনই এক পরাবাস্তব কৌতুকের মতো ট্রাম্প যখন সেই হিংস্র, বানানো উক্তিকেই সত্য মনে করে আউড়ে যান, তখন হলিউডের চিত্রনাট্য আর হোয়াইট হাউজের কূটনীতি একাকার হয়ে যায়। এটিই আমেরিকার সেই পরম কৌতুক, যেখানে পবিত্র গ্রন্থ আর পপ-কালচারের কোনো তফাত থাকে না। এ ভুল বাইবেল পাঠের আড়ালেই ঢাকা পড়ে থাকে ভিয়েতনামের জঙ্গল থেকে শুরু করে ইরাকের তপ্ত বালুচর, আফগানিস্তানের রুক্ষ পাহাড় আর চূর্ণ-বিচূর্ণ সিরিয়া-ফিলিস্তিন। কোল্ড ওয়ারে জিতে যাওয়ার পর যে ‘জিরো-সাম গেম’-এর জন্ম হয়েছিল, তার তাপমাত্রা আজ হিমাঙ্কের নিচে। ইরানের যুদ্ধের উত্তাপ্ত আসলে সেই জিরো-সাম খেলারই পরম নিয়তি— যেখানে তেহরানের ওপর চেপে বসা নিষেধাজ্ঞা, যুদ্ধের দামামা আর মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে ওড়া স্টিলথ যুদ্ধবিমানের গর্জন প্রমাণ করে, অন্য এক প্রাচীন সভ্যতার সম্পূর্ণ ধ্বংস ছাড়া সাম্রাজ্যের এ জয়োৎসব সম্পূর্ণ হয় না।
কিন্তু এ বরফশীতল ভূরাজনীতি আর বোমারু বিমানের হিংস্রতার বিপরীতে এক অলৌকিক, আধ্যাত্মিক সেতুর জন্ম হয় সুদূর নিউ ইয়র্ক সিটির কোনো এক হোম স্টুডিওতে। রজার ওয়াটার্স যখন গিটারের তারে আঙুল ছুঁইয়ে গাজার উদ্দেশ্যে কিংবা আক্রান্ত দূর প্রাচ্যের উদ্দেশ্যে গেয়ে ওঠেন— ‘আই ক্যান ফিল ইয়োর পেইন ফ্রম নিউ ইয়র্ক সিটি’ তখন টাইম স্কয়ারের জাঁকজমক আর গাজা বা ইরানের ধ্বংসস্তূপের কান্নার মধ্যবর্তী কয়েক হাজার মাইলের দূরত্ব উড়ে যায়। গিন্সবার্গ যে ‘মোলক’ বা হিংস্র সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার দিকে আঙুল তুলেছিলেন, ওয়াটার্সের গান সেই দানবের বুকে এক তীব্র আধ্যাত্মিক সুচ ফুটিয়ে দেয়। এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ের ছায়া যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের রক্তভেজা মাটিতে এসে পড়ে, সেই অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ওয়াটার্সের এই আর্তি প্রমাণ করে যে, সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে বসেও এক বিপন্ন মানবাত্মার ক্রন্দন অন্যপ্রান্তের রক্তাক্ত আত্মার সঙ্গে একাত্ম হতে পারে।
কাফকা তার উপন্যাসের শেষে ওকলাহামার এক রহস্যময় ‘থিয়েটার’-এর কথা বলেছিলেন, যেখানে যে কেউ এসে নিজের পরিচয় মুছে নতুন পরিচয় বেছে নিতে পারে। আজকের হলিউড, ওয়ালস্ট্রিট কিংবা পেন্টাগন— সবই যেন সেই ওকলাহামা থিয়েটারের একেকটি শাখা। হলিউড বিশ্বকে এক রঙিন আফিম সরবরাহ করে, যা গিলটি-প্লাস্টিকের মোড়কে ঢেকে রাখে ফুটপাতের সেই লাখো মানুষের দীর্ঘশ্বাস এবং পারস্য উপসাগরের জলে ওড়া বারুদের গন্ধ। আমেরিকা তার ২৫০ বছরের উদযাপনে আজ বিশ্ব জুড়ে যে ভূরাজনৈতিক আধিপত্যের মশাল দেখাচ্ছে, তা আসলে এক জটিল হ্যালুসিনেশন, ঠিক যেমনটা লাস ভেগাসের ক্যাসিনোর নিওন আলোয় জনি ডেপ দেখেছিলেন। সেখানে ক্ষমতা আর ধ্বংসের কোনো নৈতিক সীমারেখা নেই; সেখানে রাষ্ট্রপ্রধানের মুখে ভুল বাইবেল আওড়ানোর পেছনে লুকিয়ে থাকে এক অদ্ভুত ও পবিত্র নির্মমতা।
লাস ভেগাসের সেই মরুভূমির সূর্যাস্তের দিকে ধেয়ে যাওয়া লাল ক্যাডিলাক গাড়িটির মতো আমেরিকা আজও এক তীব্র গতিতে ছুটে চলেছে— যার ফুয়েলে মিশে আছে রক্ত, যার ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে পাল্প ফিকশনের চড়া সুর আর গিন্সবার্গের ক্ষুব্ধ আবৃত্তি, আর যার চালকের আসনে বসে থাকা ক্লান্ত পথিক বুঝতে পারছেন না, সামনের দিগন্তে ওকলাহামার মুক্তি অপেক্ষা করছে, নাকি কাফকার সেই উদ্যত তলোয়ার। কাফকা তার এ উপন্যাসটি শেষ করেননি, হয়তো একে অসমাপ্ত রাখাই ছিল তার চূড়ান্ত সাহিত্যিক এক্সপেরিমেন্ট। হয়তো, আমেরিকার কোনো শেষ পৃষ্ঠা থাকতে পারে না; এর শেষ দৃশ্যটি সবসময়ই একটি খোলা হাইওয়ে, যার গন্তব্য চিরকালই এক অনির্ণেয়, রহস্যময় গোলকধাঁধা। একটি চিরস্থায়ী পরীক্ষা, যার কোনো চূড়ান্ত মীমাংসা নেই। আর ঠিক যেই মুহূর্তে আমেরিকার উদ্দেশে ভূমধ্যসাগরের ‘অবৈধ সাগরপথে’ নৌ-প্যাট্রলের চোখ ফাঁকি দিয়ে অভিবাসনপ্রত্যাশী বোঝাই একটি ট্রলার ছুটে যাচ্ছে পাসপোর্টহীন আন্তঃমহাদেশীয় যাত্রী নিয়ে; তখন কাফকার মতো আমিও কোনো দিন আমেরিকা না গিয়ে এ লেখাটি লিখলাম।




