চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্রের ডানতীর রক্ষা বাঁধে ধস
৪০০ কোটির বাঁধ তবু ভাঙনের ভয়
- তিন সপ্তাহ আগেও দেখা দিয়েছিল ভাঙন
- কয়েক দফা মেরামত হলেও আসেনি স্থায়ী সমাধান
- নিম্নমানের জিও ব্যাগ ও বালু কম ভরার অভিযোগ
- নতুন করে বন্যা ও ভাঙন আতঙ্কে মানুষ

তিন সপ্তাহ আগেও একই এলাকার তিনটি স্থানে দেখা দিয়েছিল ভাঙন। তখন জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে চেষ্টা করা হয় পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার; কিন্তু সে ব্যবস্থা দিতে পারেনি স্থায়ী সমাধান।
ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন থেকে কুড়িগ্রামের চিলমারীকে রক্ষায় নির্মিত হয়েছিল ডানতীর রক্ষা বাঁধ। উদ্দেশ্য ছিল, নদীপাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের আতঙ্ক দূর করা। কিন্তু প্রায় সাড়ে ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণের এক দশক না পেরোতেই সেই বাঁধই এখন বারবার ধসে পড়ছে। সর্বশেষ কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে একই স্থানে আবারও দেখা দিয়েছে ভাঙন। ফলে নতুন করে ভাঙন ও বন্যার ভয় তাড়া করছে নদতীরবর্তী বাসিন্দাদের।
তারা বলছেন, গত সোমবার রাতে ব্রহ্মপুত্র নদের ডানতীর রক্ষা বাঁধের প্রায় ৩০ মিটার অংশে ধস দেখা দেয় নতুন করে। তিন সপ্তাহ আগেও একই এলাকার তিনটি স্থানে দেখা দিয়েছিল ভাঙন। তখন জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে চেষ্টা করা হয় পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার; কিন্তু সে ব্যবস্থা দিতে পারেনি স্থায়ী সমাধান।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য বলছে, ২০১৬ সালে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন থেকে চিলমারীকে রক্ষায় প্রায় সাড়ে ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় টেকসই বাঁধ। প্রকল্পের আওতায় ফকিরেরহাট থেকে রমনা ইউনিয়নের জোড়গাছহাট বাজারের ভাটি পর্যন্ত নদের তীরে ব্লক ডাম্পিং, পিচিং এবং নির্মাণ করা হয় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ।
তবে স্থানীয়দের ভাষ্য, নির্মাণের দুই বছর না পেরোতেই বিভিন্ন স্থানে শুরু হয় ধস। এরপর কয়েক দফা মেরামত করা হলেও আসেনি স্থায়ী সমাধান। ফলে বর্ষা এলেই নতুন করে শুরু হয় উদ্বেগ।
কাঁচকোল-সড়কটারি এলাকায় প্রায় ৩০ মিটার জায়গা জুড়ে ব্লক ধসে ভেঙে গেছে সড়ক। শুধু একটি স্থান নয়, প্রায় এক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে সাতটি স্থানে ধস বা সৃষ্টি হয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা। ভাঙনের শঙ্কায় দিন কাটছে নদপাড়ের মানুষের।
তাদের অভিযোগ, চলতি মাসে তিন দফায় ২৪ হাজার জিও ব্যাগ ফেলার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৮ লাখ টাকা। তবে কাজের মান নিয়ে রয়েছে অনিয়মের অভিযোগ। তাদের দাবি, নিম্নমানের জিও ব্যাগ ব্যবহার, বালু কম ভরা এবং তদারকির ঘাটতির কারণে কয়েক দিনের মধ্যে ব্যাগগুলো হারাচ্ছে কার্যকারিতা। তিন সপ্তাহ আগে ১৮ হাজার জিও ব্যাগ ফেলার জন্য প্রায় ৮১ লাখ টাকা ব্যয় করা হলেও নতুন করে আবারও ছয় হাজার জিও ব্যাগ বরাদ্দ দিতে হয়েছে।
‘যখন বাঁধ ভাঙি যায়, তখন আত্মা ছাড়ি যায়, আল্লাহ আল্লাহ করি’— ভাঙনের দিকে তাকিয়ে বলছিলেন কাঁচকোল-সড়কটারি এলাকার ফেলানী বেগম।
স্থানীয় বাসিন্দা ফরজ উদ্দিন ব্যাপারী বললেন, ‘রাতে ভাঙনের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে, আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম সবাই। মাইকে ঘোষণা দেওয়ার পর হাজারো মানুষ ছুটে আসেন জিও ব্যাগ নিয়ে। সারা রাত নিজেরাই চেষ্টা করেছি ভাঙন ঠেকানোর।’
তিনি মনে করেন, শুধু জিও ব্যাগ নয়, স্থায়ীভাবে ব্লক ডাম্পিং এবং নদের মাঝখানের ডুবোচর খনন করা প্রয়োজন।
একই ধরনের আশঙ্কার কথা বললেন রফিকুল ইসলাম, আবুল হোসেনসহ কয়েকজন। তাদের ভাষ্য, ডানতীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের পর কয়েক বছর স্বস্তি মিলেছিল কিছুটা। কিন্তু বারবার ধসের কারণে আবারও ফিরে এসেছে দুঃস্বপ্ন। বাঁধের বড় অংশ ভেঙে গেলে বিস্তীর্ণ এলাকা আবার পড়বে নদীভাঙন ও বন্যার ঝুঁকিতে— আশঙ্কা তাদের।
প্রায় সাড়ে ৪০০ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের এক দশকও পার হয়নি। অথচ প্রতি বর্ষায় একই স্থানে ধস, নতুন বরাদ্দ, আবার মেরামত— এই চক্রই যেন পরিণত হয়েছে নিয়মে। বারবার অস্থায়ী মেরামতের পরিবর্তে প্রকল্পটির প্রকৌশলগত দুর্বলতা খতিয়ে দেখে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধান নিশ্চিত করার কথা বলছেন স্থানীয়রা।
অবশ্য ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছে পানি উন্নয়ন। কুড়িগ্রাম পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসানের ভাষায়, ভাঙন ঠেকাতে জরুরি ভিত্তিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে আরও ছয় হাজার জিও ব্যাগ। এ নিয়ে চলতি মাসে মোট ২৪ হাজার জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছে।
জিও ব্যাগে বালু কম ভরার অভিযোগ প্রসঙ্গে তার বক্তব্য, জনপ্রতিনিধি, উপজেলা প্রশাসন ও পাউবো কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে পরীক্ষা করা হয়েছে ব্যাগ। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি ব্যাগে ২৫০ কেজির বেশি বালু থাকার কথা। প্রয়োজন হলে আবারও তা যাচাই করা হবে।




