ঝরা পাতার সংসার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মা রোস্ট করার জন্য হাঁস ম্যারিনেট করছিল। পিরোজকি আর নেপোলিয়ন কেকও হবে। বাবার কাজ শুধু ভদকা, সালো আর শ্যাম্পেন আনা। শ্যাম্পেনের বোতলটা খোলা হবে মাঝরাতে ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ করতে!
এ দেশে নিউ ইয়ার্স ইভ মানেই হচ্ছে সন্ধ্যা থেকে অনেক রাত পর্যন্ত এক দীর্ঘ উৎসবমুখর ভোজ। ইউক্রেনে এ রাতের এক ঐতিহ্য হচ্ছে, ঠিক বারোটা বাজলেই প্রেসিডেন্ট জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন। বাবা-মা তো বটেই, আমিও কখনো এটা মিস করি না। ১৯৭০ এর দশকে ব্রেজনেভের সময় ব্যাপারটা চালু হয়েছিল। কীভাবে যে ইউক্রেনের স্বাধীনতার পরও এটা টিকে গেছে!
গণতান্ত্রিক দেশে নাগরিকের একান্ত পারিবারিক মুহূর্তগুলোতে রাষ্ট্রের নাক গলানোটা প্রত্যাশিত না- একথা কেউ বলতেই পারে। কিন্তু এখন এসব বলে আর কী কাজ! দেশের আরও অনেক পরিবারের মতো আমরাও বরাবর খাবার টেবিলে প্রেসিডেন্টের জন্য একটু জায়গা রেখেছি। বাড়িতে হুট করে একজন বাড়তি অতিথি এসে পড়লে কী আর এমন সমস্যা?
অন্যসময় আমাদের বাসার নববর্ষের ডিনারে টেবিলজুড়ে থাকতো অতিথি। আত্মীয় আর বন্ধুদের ভিড়ে গমগম করতো বাড়ি। আর এবার আমরা মাত্রই চারজন। তবে বরাবরের মতোই টিভির কল্যাণে বেশ জমিয়ে বসলাম চারজনই। মাঝরাতের ঠিক পরপরই চ্যানেলগুলোতে উৎসবের বিশেষ আয়োজনের ঢল নামে। কনসার্ট, কমেডি, নাচসহ রাজ্যের মজার মজার আইটেম চলতে থাকে। এ বছরও হচ্ছে ’দ্য ব্লু লাই ‘ নামের শো-টা। আমরা সবাই এটা দেখার অপেক্ষায় ছিলাম। আগামী কয়েকঘন্টা টিভি স্ক্রিন জুড়ে থাকবে বিখ্যাত সব মুখ, হারানো দিনের প্রিয় গান আর চটুল রঙতামাশা। বাবা-মা দুজনেরই এসব খুব পছন্দ। এগুলোকে বলা যায়, ঐতিহ্যের ভেতর ঐতিহ্য। আমরা কখনোই এটা উপভোগ করতে ছাড়ি না।
আরও সপ্তাহদুয়েক মারিউপোল থাকবো আমি। এর মধ্যে থাকবে অর্থোডক্স বড়দিন আর নববর্ষ। প্রচলিত বড়দিন আর রোমান নববর্ষের প্রায় দুসপ্তাহ পরে আসে এগুলো।
বাবা নববর্ষের পরের প্রথম অফিস খোলার দিনই কাজে জয়েন করবে। তার অফিসটা হচ্ছে একটা আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা প্রতিষ্ঠান। যে ধরনের প্রতিষ্ঠান যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের মৌলিক প্রয়োজনগুলো মেটাতে সাহায্য করে আর কী। আমি এটাকে যুদ্ধ বলছি বটে, তবে মানবিক সহায়তা এনজিওগুলো নিরপেক্ষতার নীতি মেনে একে বলে সংঘাত।
মারিউপোলে আমার সময়টা খুব আনন্দে কেটেছিল। কিন্তু কিয়েভে ফিরে এসেও মন খারাপ হয়নি। কারণ কাতিয়া এখানেই আছে—ওকে খুব মিস করছিলাম শহর ছেড়ে থাকার সময়।
গতকাল ওকেলোর সঙ্গে ফোনে কথা হলো। বড়দিনের আগে সেই যে দেখা হয়েছিল তখন থেকে আর কথা হয়নি উনার সঙ্গে। মিনস্ক টু চুক্তির খবর দিতে ফোন করেছিলেন ওকেলো। জানালেন, সপ্তাহখানেক আগে স্বাক্ষর হওয়া চুক্তিটা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন পেয়েছে। আমি ওকেলোকে বললাম, গত রাতে আমাকে শোনানো মিকিতার আশাবাদের কথা। তার ধারণা, যুদ্ধ অবশেষে হয়তো শেষ হতে চলেছে।
ওকেলো তার স্বভাবসুলভ চাছাছোলা ভাষায় মিকিতার আশাবাদ এক ফুঁতে উড়িয়ে দিলেন। কাশ্মীর নিয়ে ১৯৪৮ সালের এ ধরনেরই একটা জাতিসংঘ প্রস্তাবের কথা মনে করিয়ে দিলেন তিনি। ওই প্রস্তাবে নিরাপত্তা পরিষদ যুদ্ধবিরতি, অসামরিকীকরণ আর গণভোটের কথা বলেছিল। দীর্ঘ সাত দশক পরেও তার কোনটাই বাস্তবে রূপ নেয়নি।
নিজের যুক্তিটা তৃুলে ধরতে ওকেলো কাশ্মীর বিষয়ের তিনটি ব্যবস্থার সঙ্গে মিনস্কের তেরোটি পদক্ষেপের তুলনা করে দেখালেন। কাশ্মীরের প্রস্তাবে তা-ও কোনটার পর কোনটা বাস্তবায়ন করতে হবে তার একটা ধারাক্রম ছিল। মিনস্কের ক্ষেত্রে তা-ও নেই। তার মানে এটা বাস্তবায়ন করা হবে আরও কঠিন।
এভাবে মিকিতার মতো শিগগিরই যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আমার উত্তেজনায়ও বরফ ঠাণ্ডা পানি ঢেলে দিলেন ওকেলো। এই মানুষটার আসলে অভিযোগের শেষ নাই। সবকিছুতেই ফাঁক খুঁজবেন। অন্তত মাঝে মাঝে দুচারটা আবেগের কথাকে যুক্তি দিয়ে খারিজ না করে দিলে তার সঙ্গে গল্প করাটা অনেক বেশি মজার হতো। যাই হোক, আমার এখনও আশা, মিকিতা ঠিকই বলেছে। হয়তো সত্যিই আমরা সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে একটু হলেও আলোর আভাস দেখতে পাচ্ছি।
এদিকে একটা দারুণ খবর এসেছে মারিউপোল থেকে! শহরটার কাছে মারিঙ্কায় সংঘাতরেখার দুপাশে চলাচলের জন্য একটা নতুন চেকপয়েন্ট চালু হয়েছে। এর আগে সরকার ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এদিকের এলাকাগুলোর মধ্যে একমাত্র যাতায়াতের পথ ছিল লুহানস্ক অঞ্চলের স্তানিৎসিয়া লুহানস্কায়। সেখানে সাধারণ মানুষকে সেভেরস্কি দোনেৎস নদীর ওপরের এক নড়বড়ে কাঠের সেতু দিয়ে পারাপার করতে হয়। সেতুটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ—যে কোন সময় গোলাগুলির মুখে পড়ার ঝুঁকি নিয়ে পার হতে হয়।
নতুন চেকপয়েন্টের খবর ছড়াতে সময় লাগলো না। কয়েক দিনের মধ্যেই দীর্ঘসময় ধরে বিচ্ছিন্ন থাকা পরিবারগুলো পরস্পরের সঙ্গে দেখা করার প্ল্যান করতে শুরু করল। এক সপ্তাহ পরই বাবার ফোন থেকে আমাকে কল করলেন দাদু। এখন আমি ছাড়া পরিবারের সবাই দোনেৎস্কে। চেকপয়েন্ট পার হতে লম্বা সময় লাগলেও বাকি সবকিছু ঝামেলা ছাড়াই হয়ে গেছে ওদের।
নিজে দোনেৎস্ক যাওয়ার জন্য আর তর সইছে না আমার। বাবা বলেছিল, ক্রসিংয়ের দুপাশেই বাস চলে। তবে সরকার ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের চেকপয়েন্ট দুটোর মাঝখানে দুই-তিন কিলোমিটার ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ এলাকা আছে, যেটুকু হেঁটে পার হতে হবে। তা, এটুকু হেঁটে যেতে আমার কোনো আপত্তি নেই। দাদুকে বলেছি, আগামী মাসেই ইস্টারের ছুটিতে বাড়ি যাব।
আমার ঘরে ফেরার দিন গোনা শুরু হয়ে গেছে। ইগরের সঙ্গে দেখা করার তারিখও ঠিক করে ফেলেছি। ও যুদ্ধের ডিউটি থেকে তিন দিনের ছুটি নেবে। ইগরের জন্য একটা ভালো রেজার ও কয়েকটা ব্লেড কিনেছি—ওর গালভরা উস্কোখুষ্কো দাড়ি আমার মোটেই পছন্দ না।
টিকিট বুক করা হয়ে গেছে। রাতের ট্রেনেই মারিউপোল যাচ্ছি।
দোনেৎস্কে যাওয়ার উত্তেজনায় মারিউপোল পর্যন্ত ১৯ ঘণ্টার ট্রেনযাত্রার কষ্ট গায়েই মাখলাম না। মারিউপোলে এক দিন বিশ্রাম নেওয়া হলো। এবার যাত্রা মারিঙ্কার চেকপয়েন্টের উদ্দেশে। অফিসে যাওয়ার আগে বাবা আমাকে সকাল সকাল সেখানে পৌঁছে দিল। ওপাশেই আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন দাদু।
সীমান্ত পার হতে ঘণ্টাদুই লাগল। বেচারা দাদু অতিরিক্ত উত্তেজনায় অনেক আগেই এসে বসে ছিলেন। তবে যে মানুষ এই মুহূর্তটার জন্য ছয় মাসেরও বেশি ধরে অপেক্ষা করছেন, তাঁর কাছে কয়েক বাড়তি ঘণ্টার অপেক্ষা আর এমন কী!
দাদুর ফ্ল্যাটে যাওয়ার পথে বাসে আমরা একটানা কথা বলছিলাম। মনে হচ্ছিল পুরোনো দিনগুলোতে ফিরে গেছি। সেই যখন দাদু আমার হাত ধরে পার্কে হাঁটতে নিয়ে যেতেন! আমাদের শেষ দেখা হয়েছিল প্রায় আট মাস আগে। আর কিমোতে পড়াশোনা শুরু করার পর থেকে আমার মধ্যে অনেক বদলও এসেছে। কিন্তু আমি ছোট্ট শিশু আর কিশোরী যাই হই, দাদুর সঙ্গে কথা বলা সব সময়ই আনন্দের। তিনি যেন সেই আজব গিরগিটির মতো যেটা পরিবেশের সঙ্গে চোখের পলকে নিজের রঙ পাল্টে নিতে পারে। যখন বেশ ছোট ছিলাম, তখন দাদু এক লহমায় আমার কল্পনার জগতে ঢুকে পড়তেন। কিশোরী বয়সেও কোনো না কোনভাবে আমার মনের কথা বুঝে ফেলতেন তিনি। এমনকি আমি আরও একটু বড় হয়ে কিমোয় ভর্তি হওয়ার পরও দাদু ঠিক ঠিক জানেন কোন বিষয়ে আলাপ আমার আগ্রহ ধরে রাখবে।
এই তিন দিনের বেশিরভাগটাই আমি বাবা-মায়ের খালি ফ্ল্যাটে কাটিয়েছি। শুধু রাতের খাবার, ঘুম আর সকালের নাশতার জন্য দাদুর বাসায় যেতাম। নাশতা সেরেই ফিরতাম বাবা-মায়ের বাসায়। ইগর আমার সঙ্গে দেখা করতে আসত সেখানেই।
এবার ইগর আমার সঙ্গে ফ্ল্যাটে রয়ে গিয়েছিল—এক বছর আগেও যা আমি কল্পনা করতে পারতাম না। এই তিনদিনই আমি ওর জন্য দুপুরের খাবার রান্না করেছি। দুজন ল্যাপটপে সিনেমা দেখেছি। বিকেলে পার্কে গিয়েছি হাঁটতে। আমাদের দুজনেরই প্রিয় ক্যাফেতে কফি খাওয়াও হলো। চোখের পলকেই কেটে গেল সময়টা। এ কয়টা দিন ছিল আমার ছোট জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন। ও হ্যাঁ, আমি ইগরের দাড়িও কামিয়ে দিয়েছিলাম এর মধ্যে। ও একটুও আপত্তি করেনি।
দোনেৎস্কে পরে আবার করে আসবো তা নিয়েও প্ল্যান করলাম আমরা। ঠিক হলো সেটা হবে তিন মাস পর। ইগর বলে দিল, সেবার আমাকে পুরো একটা সপ্তাহ থাকতে হবে।
ঝরা পাতার সংসার
২৩ অক্টোবর ২০২৬
[চলবে]




