ঝরা পাতার সংসার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শীতের রাতে লেপের ওমই জীবন।
বাবা-মা ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি মারিউপোলের নতুন দুই বেডরুমের ফ্ল্যাটে উঠেছে। ৫০০ স্কয়ারফুট মতো ফ্ল্যাটটা শহরের প্রিমোরস্কি এলাকায়। ওদিকে ভাড়া লেফট ব্যাংক এলাকার চেয়ে বেশি। কিন্তু সাশার স্কুল আর সিটি সেন্টার খুব কাছে বলে বাবা ঠকেনি তা চোখ বন্ধ করে বলা যায়।
কাতিয়া আমাকে রেলস্টেশনে বিদায় জানাতে এলো। কিয়েভে প্রথম আসার সময় এ ট্রেনে করেই এসেছিলাম আমি। সারারাত জার্নিসহ ১৯ ঘণ্টার পাড়ি। এত লম্বা ভ্রমণে সময় কাটতেই চায় না।
অনেক দিন পর বাড়ি যাওয়া নিয়ে বেশ উত্তেজনা বোধ করছি। আবার মাত্র দুসপ্তাহ হলেও কাতিয়াকে ছেড়ে এতদিন থাকবো ভেবেও মনটা কেমন করছে। একটু অবাকই হলাম। কতদিনেরই বা বন্ধুত্ব ওর সঙ্গে!
এবারের ট্র্রেনযাত্রাটা কিন্তু সেই গরমের সময়ের মতো হলো না মোটেই। তখন তা-ও একটু তাজা বাতাসের জন্য জানালার পাল্লাটা খোলা যেতো। কিন্তু এখন ভরা শীত। বাইরে হাড়কাপানো ঠান্ডা আর ভেতরে সিদ্ধ হওয়ার মতো গরম। আমাদের কামরার রেডিয়েটর ব্যাপক গর্জনের সঙ্গে গরম হাওয়া দিয়ে যাচ্ছে। অনেক চেষ্টা করেও জানলা খোলা গেল না।
কামরার তাপ কমানো বাড়ানোর কাজটা অ্যাটেনডেন্টের। ট্রেনের শুরুর দিকের ছোট কেবিনটায় তিনি বসেন। এখন আমাদের ভাগ্য নির্ভর করছে পুরোই তার হাতে। দুচারজন যাত্রী সাহস করে অভিযোগ করতে গেলেন। আর্জি শুনে অ্যাটেনডেন্ট সন্ন্যাসীর মতো স্মিত হাসলেন। জননেতার ভাব নিয়ে একটু মাথাও নাড়লেন। কিন্তু কাজের কাজ করলেন না কিছুই।
আমাদের কামরায় মানুষ চারজন। এক দম্পতি ও তাদের টিনেজ ছেলে আর আমি। সবার জন্য একটা করে বাংক। বাপ আর ছেলে যেটুকু না হলেই না সেটুকু কাপড় পড়ে আছে। আরেক সুতা কমলে অভিযোগ করা ছাড়া আর উপায় থাকবে না মেয়েদের। এই অবস্থায় আমি পড়ে আছি জিন্স আর টপ। ঘেমে একশা হয়ে যাচ্ছি। কিন্তু কাপড় চোপড় যে কমাবো তার প্রস্তুতি নেই।
কিছু যাত্রী অনেক সময় চুপিচুপি দুই বগির মাঝখানের জোড়ায় গিয়ে দাঁড়ায়। জায়গাটা ট্রেন চলার সঙ্গে সঙ্গে দুলতে থাকে, বেশ ঘটঘটাং শব্দও হয়। দুই পাশের ফাঁক দিয়ে হিমেল বাতাস ঢোকে। রুশ ভাষায় ট্রেনের এই জায়গাকে বলে তাম্বুর। যাত্রীরা জায়গাটাকে অঘোষিত ধূমপানের জায়গা বানিয়ে ফেলেছে, যেন এটা ট্রেনের অংশই নয়। তারা দিব্যি সিগারেট ফুঁকতে থাকে। ভাবে, ধোঁয়া বুঝি ফাঁক দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যাবে। কিন্তু সেই ধোঁয়া আসলে ঠান্ডা বাতাসের সঙ্গে মিশে বগির ভেতরে ঢুকে পড়ে। ফলে করিডোরজুড়ে সব সময় একটা গা গুলানো গন্ধ ভাসে। বাসি সিগারেটের ধোঁয়া, টয়লেটের দুর্গন্ধ আর হিমেল বাতাস মিলে তৈরি হয় বিচ্ছিরি গন্ধটা। কিছুতেই যায় না।
আমাকে নিয়ে যেতে স্টেশনে দেখি বাড়ির সবাই হাজির। এমনকি বেনিচকাও! সবার আদরের কুকুরটাকে দেখেই মনে পড়ল, ওর জন্য নববর্ষের গিফট কিনতে ভুলে গেছি। মারিউপোলে ওকে বেশ করে খাইয়ে দিতে হবে। আর না হয় অন্ধকারে জ্বলজ্বল করা একটা কলার কিনে দেবো।
আমাদের ঝিগুলিটাকে বেশ নতুনের মতো দেখাচ্ছে। দাচায় থাকার সময় বাবা তাহলে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জ্ঞান ভালোই কাজে লাগিয়েছেন গাড়ির পেছনে। কিয়েভে এখন সোভিয়েত আমলের গাড়ি খুব একটা চোখে পড়ে না। শহরের কেন্দ্রে তো নয়ই, এমনকি কেন্দ্র থেকে একটু দূরে আমাদের ক্যাম্পাসের আশপাশেও না। মাঝেমধ্যে দু-একটা লাদা নিভা দেখেছি, কিন্তু ঝিগুলি একটাও না। হয়তো লোকে ভাবে, এমন গাড়ি চালালে সবাই তাদের সেকেলে মনে করবে। এমনকি সুন্দর, আভিজাত্যপূর্ণ ভলগা গাড়িও এখন রাস্তায় প্রায় দেখাই যায় না।
ফ্ল্যাটে ঢুকে এককথায় মুগ্ধ হয়ে গেলাম। স্রেফ চার দেওয়াল আর ছাদে ঘেরা একটা জায়গা কীভাবে যে ভালোবাসা আর যত্নের ছোঁয়ায় মায়াময় ‘ঘর’ হয়ে ওঠে!
দোনেৎস্ক থেকে পালানোর সময় মা তার প্রিয় টুকটাক স্মৃতিঘেরা আর শখের জিনিসগুলো যখের ধনের মতো আগলে রেখে নিয়ে এসেছিল। সেগুলো এখন এই নতুন ফ্ল্যাটের দেওয়ালে আর শোকেসে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা। দাদু দেয়ালে টানানো ছবি থেকে হাসছেন, ক্রিমিয়া ভ্রমণের স্মৃতি উঁকি দিচ্ছে ওয়্যাড্রোবের ্ওপর থেকে আর সাশার তামার তৈরি গোল্ড মেডেল গর্বের সাথে ঝুলছে ওর নিজের বেডরুমে।
মা’র নিপূণ হাতের ছোঁয়ায় পুরো ফ্ল্যাটটা জুড়ে অন্যরকম এক উষ্ণতার পরশ। নানা রঙের দৃষ্টিনন্দন ব্যবহারে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে ঘরের ভেতরটা। অনেকদিন পরে মনটা শান্ত লাগছিল খুব। কী স্বস্তি! কী যে আপন আপন লাগছে সবকিছু! সেই দোনেৎস্ক ছাড়ার পর থেকে কাল পর্যন্ত একবারও এমন অনুভূতি হয়নি।
ডাইনিং টেবিলের আয়োজনও পুরো ফ্ল্যাটের মতোই মন কাড়ল আমার। মা যেন বেছে বেছে আমার পছন্দের আইটেমগুলোই বানিয়েছে! বোর্শ, পিলমিনি, ওভেনে ঝলসানো চিকেন, সালাদ, কাশা আর কম্পোৎ।
ফার্নিশড ফ্ল্যাটটাতে ভালো একটা ওভেন আছে। তবে ভাড়া নেওয়ার সময় কোনো ফ্রিজও ছিল না। বাবা নিজেই ফ্রিজ আর মাইক্রোওয়েভ কিনেছেন। নতুন চাকরি পেয়ে জমানো পয়সায় হাত দিতে খুব একটা ভয় পায়নি বাবা। তবে ওয়াশিং মেশিন কেনার মতো পকেটের অবস্থা নাই তার। ওয়াশিং মেশিন কেনার জন্য অবশ্য তেমন তাড়া নেই। সেটা প্রথম মাসের বেতন পেলেই কেনা যাবে। আয়ের কাগজপত্র দেখাতে পারলেই কিস্তিতেও কেনা যাবে জিনিসটা। ও হ্যাঁ, আগামী সপ্তাহেই কাজ শুরু করতে হবে বাবাকে।
টিভিটা বসানো হয়েছে ছোট বেডরুমদুটোর বাইরের খালি জায়গাটার একদিকে দেয়ালে। বাসায় খাওয়াদাওয়া, গপসপ করা আর টিভি দেখার মেইন জায়গা এটাই। দেখার মতো কিছু পাওয়া যায় কি না, সে আশায় একটার পর একটা চ্যানেল বদলাতে লাগলাম। তবে টিভিতে মা’র আগ্রহ একেবারেই নাই এখন। আগে যেসব রুশ চ্যানেলে তাঁর প্রিয় সিরিয়ালগুলো দেখাত, ইউক্রেনের সরকার-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সেগুলো এখন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
আমাকে রাতে ঘুমাতে হবে সাশার ছোট্ট ঘরটায়। সেখানে একটা ছোট সিঙ্গল খাট। সেটাই প্রায় ঘরের পুরো জায়গা নিয়ে নিয়েছে। খাটের নিচে পাতা একটা মাদুরে ঘুমায় সাশার ‘ছেলে’ বেনিচকা। দোনেৎস্ক থেকে পালিয়ে আসার সময় ওর বিছানাটা ফেলে আসতে হয়েছিল। আমার জন্য ঘরের এক কোনায় একটা সাদামাটা ফুটন বিছানা পেতে দিয়েছে মা।
ট্রেনে নির্ঘুম রাত কাটানোর পর আমার চোখে রাজ্যের ঘুম নেমে আসছে। কিন্তু সাশার কথা যেন আর ফুরাতেই চায় না। ভলনোভাখার বন্ধুদের গল্প থেকে শুরু করে মারিউপোলে বেনিচকার খুঁজে পাওয়া সজারুটার কাহিনি—আজ রাতেই সব বলে ছাড়বে।
রাতভর বারবার ঘুম ভেঙে যাচ্ছিল। আমার ফুটনের পাশের জানালাটা ঠিকমতো বন্ধ হয় না। ফাঁক দিয়ে হু হু করে ঠান্ডা বাতাস ঢুকছিল। মাঝরাতের দিকে শীতে আমার মুখ যেন অবশ হয়ে গেলো। মুখ মুড়ি দিতে কম্বলটা টেনে তুললাম, কিন্তু তাতে আবার পা দুটো ঠান্ডার মধ্যে বেরিয়ে রইল! পা ঢাকতে কম্বলটা নিচে নামাতেই আবার মুখে ঠান্ডার কামড়। কী যন্ত্রণা! শেষমেষ গুটিশুটি মেরে এমনভাবে শুলাম, যাতে মুখ আর পা দুটোই কম্বলের নিচে থাকে। বাকি রাতটা এভাবেই কাটলো।
আজ ডিসেম্বরের শেষ দিন—নববর্ষের আগের দিন। নতুন বছর বলতে প্রচলিত ইংরেজি নববর্ষই, অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের নববর্ষ নয়। আজ রাতের খাবার বানাতে মাকে সাহায্য করছি আমি। আমার দায়িত্ব পড়েছে সালাদ বানানোর।
ঝরাপাতার সংসার
১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দুনিয়ার এই দিকটায় নববর্ষের খাবারের টেবিলে অলিভিয়ে সালাদ আর ‘হেরিং আন্ডার আ ফার কোট’ না থাকলে চলবেই না। অলিভিয়ে সালাদ বানানো সহজই। আলুসহ কয়েকরকম সবজি, ডিম আর মুরগির মাংস সেদ্ধ করে ছোট ছোট টুকরো করে কাটতে হবে। তার সঙ্গে মেশাতে হবে একটু আচার কুচি। তারপর সবকিছু মেয়োনিজ দিয়ে ভালোভাবে মাখিয়ে নাও। হয়ে গেলো অলিভিয়ে সালাদ!
হেরিং আন্ডার আ ফার কোটের জন্য একটু কায়দা করতে হয়। এটা আসলে কয়েক পরতে সাজানো এক ধরনের সালাদ। এর মধ্যে দেয় হেরিং মাছ, আলু, গাজর, বিট, পেঁয়াজ আর ডিম। এটাতেও সবশেষে ওপর থেকে ঢেলে দেওয়া হয় একগাদা মেয়োনিজ। আস্তরণটা বেশ পুরুই হয়।
হেরিংয়ের সালাদের নামটা শুনে এর মধ্যে ফার অর্থাৎ কিনা পশম খুঁজতে যাবেন না যেন! হেরিং মাছের টুকরোকে পুরোপুরি ঢেকে রাখা বিটের পুরু স্তরটাই হচ্ছে ‘ফার কোট’! বিটের এই আস্তরটাই এ সালাদকে দেয় গভীর, মাটির ঘ্রাণ মাখা স্বাদ আর জাঁকালো উজ্জ্বল রং।
(চলবে)




