স্মৃতি ও অস্তিত্বের ক্যানভাস

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিটি পদচারণায় মানুষ যতটা খুঁজতে যায়, তার চেয়ে অনেক বেশি লাভ করে। জন মুইরের এ কথাটি মনে পড়ে আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকার ‘সার্চ সোল, সয়েল’ প্রদর্শনীতে প্রবেশের পর। শিল্পের ইতিহাসে প্রকৃতি ও পরিবেশকে ঘিরে শিল্পচর্চা নতুন কিছু নয়। বিভিন্ন সময়ে শিল্পীরা প্রকৃতির ওপর মানুষের হস্তক্ষেপ, পরিবেশের ক্ষয় এবং সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কাজ করেছেন। ‘সার্চ সোল, সয়েল’ সেই দীর্ঘ শিল্প-প্রবাহের সমকালীন এক সংযোজন। তবে এ প্রদর্শনীতে প্রকৃতি কোনো দূরবর্তী বিষয় নয়; বরং মানুষের জীবন, স্মৃতি, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এক সক্রিয় পরিসর।
১৮ জুলাই ‘সার্চ সোল, সয়েল’ (মৃত্তিকার সন্ধানে) শীর্ষক দলীয় শিল্পপ্রদর্শনীটি শুরু হয়েছে, যা চলবে ২৮ জুলাই পর্যন্ত। কুন্তল বাড়ৈর কিউরেশনে আয়োজিত এ প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন সমকালীন সাতজন শিল্পী— বনানী সিমলাই, দীপ্র বণিক, খাইদেম সিথি সিনহা, লুৎফা মাহমুদা, মো. ফাইজুল ইসলাম, মো. হাশেম ও রূপশ্রী হাজং। মাটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের কথা ভাবলে প্রথমেই মনে হয় শিকড়ের কথা। শিকড় আসলে স্মৃতি, সংস্কৃতি, খাদ্য, ভাষা, বিশ্বাস ও পরিচয়ের এমন এক জটিল বুনন, যা মানুষকে তার অস্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত রাখে? ‘সার্চ সোল, সয়েল’ সেই প্রশ্নেরই বহুমাত্রিক অনুসন্ধান। প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়া সাতজন শিল্পী ভিন্ন নৃজাতিগোষ্ঠীর। ফলে তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও শিল্পভাষাও আলাদা। কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন কাজকে পাশাপাশি রাখলে প্রদর্শনীর একটি সম্মিলিত অনুভব স্পষ্ট হয়ে ওঠে— মানুষ তার মাটি থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে। এ দূরত্ব শুধু প্রকৃতি থেকে নয়; নিজের স্মৃতি, সংস্কৃতি ও পরিচয় থেকেও দূরে সরে যাওয়ার এক প্রক্রিয়া। প্রদর্শনীর কাজগুলোতে প্রকৃতি কোনো নিষ্পাপ, রোমান্টিক দৃশ্যপট হিসেবে উপস্থিত হয়নি। খাদ্য উৎপাদন থেকে শিল্পায়ন, দূষণ থেকে ভূমিক্ষয়, অভিবাসন থেকে সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার— প্রতিটি অভিজ্ঞতার ভেতরেই প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক নতুনভাবে সামনে এসেছে। এখানে পরিবেশকে কেবল গাছপালা, নদী বা দূষণের প্রশ্ন হিসেবে দেখা হয়নি; বরং মানুষের জীবনযাপন, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের ভেতর থেকে দেখা হয়েছে। পরিবেশ ধ্বংস মানে শুধু একটি বন বা নদী হারিয়ে যাওয়া নয়; কখনো তা একটি স্মৃতি, জীবনযাপন কিংবা সাংস্কৃতিক পরিচয় হারিয়ে যাওয়াও। প্রতিটি শিল্পী নিজস্ব শিল্পভাষায় এ সম্পর্কের ভিন্ন ভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। বনানী সিমলাই খাদ্য, মাটি ও মানব অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের মধ্য দিয়ে মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সহাবস্থানের কথা বলেন। ফাইজুল ইসলাম শিল্পায়ন ও দূষণের ফলে সৃষ্ট অ্যাসিড বৃষ্টির পরিবেশ, কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাবকে শিল্পে তুলে ধরেছেন। লুৎফা মাহমুদা অনুসন্ধান করেছেন অভিবাসন, পরিচয় এবং ‘বাড়ি’ ধারণার মানসিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য। খাইদেম সিথি সিনহা মণিপুরি সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী বস্ত্রশিল্প ও প্রকৃতিনির্ভর নকশার মধ্য দিয়ে সংস্কৃতি ও প্রকৃতির গভীর বন্ধনকে উদযাপন করেছেন। হাশেম পাহাড় ও উর্বর মাটির ক্ষয়কে স্মৃতি, প্রতিরোধ ও টিকে থাকার প্রতীকে রূপ দিয়েছেন। হাজং জনগোষ্ঠীর লোকজ আচার, বিশ্বাস এবং প্রকৃতির সঙ্গে তাদের আধ্যাত্মিক সম্পর্ককে সুচ-সুতার ইনস্টলেশনের মাধ্যমে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন রূপশ্রী হাজং। অন্যদিকে, দীপ্র বণিক ভূদৃশ্য, পরিবেশ ও মানুষের হস্তক্ষেপের পরিবর্তনশীল সম্পর্ককে অনুসন্ধান করেছেন।
কোনো জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি তার ভূগোল থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। পোশাক, নকশা, বিশ্বাস, আচার ও কারুশিল্পের ভেতরেও প্রকৃতির ছাপ থাকে। ফলে কোনো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে দেখার অর্থ অনেক সময় একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের স্মৃতিকেও দেখা। আমাদের স্মৃতি, খাদ্য, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের কতটা এখনো সেই মাটির সঙ্গে যুক্ত? আর কতটা আমরা এরই মধ্যে হারিয়ে ফেলেছি? ‘সার্চ, সোল, সয়েল’-এর সাতজন শিল্পীর কাজ ভিন্ন ভিন্ন পথ ধরে সেই বৃহত্তর প্রশ্নের কাছেই ফিরে আসে। তাই এই প্রদর্শনী শুধু প্রকৃতি রক্ষার নৈতিক আহ্বান নয়; এটি মানুষের নিজের অস্তিত্ব, স্মৃতি ও শিকড় রক্ষার প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে। প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত প্রদর্শনীটি সবার জন্য উন্মুক্ত।




