প্রিয় ৫ বই

হাসনাত আবদুল হাই
- কাঁদো নদী কাঁদো— সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ
- পথের পাঁচালী— বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
- তাড়িখোর— আমোস টুটুওয়ালা
- পেদ্রো পারামো— হুয়ান রুল্ফো
- দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি— আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
বাংলা ভাষায় সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ তার বর্ণনাভঙ্গি এবং ভাষা ব্যবহারের জন্য আমার প্রিয় উপন্যাস। এই বর্ণনাভঙ্গি বাংলা ভাষায় নতুন। প্রধান চরিত্রের অন্তর্দ্বন্দ্ব কাহিনিতে মনস্তাত্ত্বিক মাত্রা যোগ করে আধুনিকতা এনেছে। উপন্যাসের ভাষা শুধু মার্জিত আর শানিত নয়, বর্ণনাকারী আর ঘটনার সঙ্গে এমন দূরত্ব রচনা করে যে, মনে হয় সে সুদূর অতীতের কথা বলা হয়েছে।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহের পূর্বসূরি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ বাংলা সাহিত্যের এক ক্লাসিক। এ উপন্যাসে দুর্গা, অপু, হরিহর, সর্বজয়া আর ইন্দিরা ঠাকরুনের গল্প বলা হলেও এখানে উঠে এসেছে আবহমানকালের গ্রাম বাংলা তার দারিদ্র্য, সংগ্রাম, পশ্চাতপরতা আর সৌন্দর্য নিয়ে। তিন প্রজন্মের চরিত্র এনে এ উপন্যাসে কালের বহমানতার কথা বলেছেন লেখক।
আফ্রিকার ঔপন্যাসিক আমোস টুটুওয়ালার ‘তাড়িখোর’ এক অনবদ্য সৃষ্ট। ইউরোবা ভাষা ও ঐতিহ্যে মৌখিক গল্প বলার যে রীতি, সেটি ব্যবহার করে এ উপন্যাস লিখেছেন লেখক। তার ইংরেজি কিংস ইংলিশ না হয়ে অনুসরণ করেছে ইউরোবা ভাষার বাক্যবন্ধ, যা এক নতুন ইংরেজির সৃষ্টি করেছে। এই নিরীক্ষার মাধ্যমে টুটুওয়ালা দেখিয়েছেন উপনিবেশের ভাষাকে দেশজ ভাষার অধীন করা সম্ভব। বর্ণনাকারী বৃদ্ধ তাড়িখোর এবং উৎকৃষ্ট তাড়ি যে বানায় তার খোঁজে বেরিয়ে সে যেসব বিচিত্র অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়, তার সঙ্গে মিল রয়েছে রূপকথার, মিথলজির এবং ম্যাজিকের। এসব উদ্ভট ঘটনা বাস্তব মনে হয় শুধু লেখার গুণে। আনন্দ, কৌতুক, বিস্ময় নিয়ে পড়তে হয় এ অতুলনীয় উপন্যাস। মেক্সিকোর লেখক হুয়ান রুল্ফোর ‘পেদ্রো পারামো’ শুধু লাতিন আমেরিকা নয়, বিশ্বসাহিত্যে ক্লাসিক হয়েছে তার কাহিনি এবং বর্ণনাশৈলীর জন্য। কোমালা নামের গ্রামে এসে হুয়ান প্রেসিয়াদো নামে এক তরুণ তার বাবা পেদ্রো পারামোর খোঁজ করে, কেননা তার মা মৃত্যুর আগে বাবার নাম আর ঠিকানা বলে গিয়েছেন। হুয়ান তার মায়ের বান্ধবী ডলরেসের মুখে পেদ্রো পারামোর কুকীর্তির কথা শোনে। সেই সঙ্গে পরিচিত হয় অনেক মৃত ব্যক্তির আত্মার সঙ্গে যারা অতৃপ্ত হয়ে কোমালা গ্রামে তাদের অভিশপ্ত জীবনের কথা বলে যায়। সরলরৈখিক নয়, খণ্ডে খণ্ডে ভেঙে ভেঙে পেদ্রো পারামো আর কোমালা গ্রামের কাহিনি বলেছেন লেখক, যেখানে বাস্তব আর অতিপ্রাকৃত মিলেমিশে একাকার। তার এই বর্ণনাশৈলীই পরবর্তীকালে ম্যাজিক রিয়েলিজম ধারার সূচনা করেছে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো পড়তে হয় হুয়ান রুল্ফের এ উপন্যাস।
আমার প্রিয় পাঁচ উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে হেমিংওয়ের ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’। মাত্র দুটি মানব চরিত্র আর সমুদ্রে হাঙরের শিকার মার্লিন মাছ নিয়ে এ উপন্যাসের কাহিনি। ঘটনার বিস্তারে অপরিসর আর দুটি মানব চরিত্র নিয়েই এ উপন্যাস হয়েছে এপিকধর্মী। কেননা এর কাহিনি শুধু সান্তিয়াগো নামে চরিত্রের নয়, সমগ্র মানবজাতির এবং বৈরী পরিবেশে তাদের টিকে থাকার সংগ্রামের। এ উপন্যাসে হেমিংওয়ে লিখেছেন— মানুষকে ধ্বংস করা যেতে পারে কিন্তু পরাজিত কখনোই নয়।




