প্রদর্শনী পরিক্রমা
টেরাকোটায় নতুন অর্থে জীবনপাঠ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সৃষ্টির শুরু থেকে মাটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। তাই এ সম্পর্ক শুধু অস্তিত্বের নয়, অনুভব ও আত্মপরিচয়েরও। যে মাটি মানুষের জীবন ধারণ করে, ফসল ফলায়, ঘর নির্মাণের উপাদান জোগায়,
সেই মাটিই মানুষের সৃজনশীলতার এক প্রাচীন আশ্রয়। মাটিকে অবয়ব দেওয়ার মধ্য দিয়ে মানুষ তার চারপাশের জীবন, বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও অভিজ্ঞতাকে ধরে রাখতে চেয়েছে। কখনো দেবদেবীর প্রতিমায়, কখনো দৈনন্দিন জীবনে, আবার কখনো নিছক শিল্পসৃষ্টির আকাঙ্ক্ষায় মাটি হয়ে উঠেছে মানুষের আত্মপ্রকাশের মাধ্যম। এই সম্পর্কের যোগসূত্র আরও জোরালো করেছে টেরাকোটার শিল্পভাষা— যেখানে প্রকৃতির উপাদান মানুষের স্পর্শে রূপান্তরিত হয়ে ধারণ করে সময় ও জীবনের চিহ্ন।
টেরাকোটা শব্দটির অর্থ পোড়ামাটি। মাটিকে কাঙ্ক্ষিত অবয়ব দেওয়ার পর আগুনে পুড়িয়ে স্থায়ী রূপ দেওয়ার এই পদ্ধতি প্রাচীনকাল থেকেই বিশ্বের নানা সভ্যতায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। স্থাপত্যের অলংকরণ, ধর্মীয় নির্মাণ এবং দৈনন্দিন ব্যবহারের সামগ্রী— বিভিন্ন ক্ষেত্রে টেরাকোটার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। ভারতীয় উপমহাদেশের শিল্প-ইতিহাসেও রয়েছে এর দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। প্রাচীন নগরসভ্যতার পোড়ামাটির নিদর্শন থেকে শুরু করে মন্দিরের অলংকরণ পর্যন্ত এই শিল্পমাধ্যম সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বহুমাত্রিক হয়ে উঠেছে। বাংলায় অবস্থিত কান্তজিউর মন্দির এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। শৈল্পিক বা ধর্মীয় আখ্যানের পাশাপাশি এসব ফলকে উঠে এসেছে তৎকালীন সমাজজীবন, মানুষের পোশাক-পরিচ্ছদ, বাদ্যযন্ত্র, পশুপাখি, উদ্ভিদ এবং দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের নানা দৃশ্য। ফলে টেরাকোটা ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জনজীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যমান দলিল।
মাটির মতো সাধারণ একটি উপাদান শিল্পীর দক্ষতা ও কল্পনার স্পর্শে হয়ে উঠেছে ইতিহাস সংরক্ষণের মাধ্যম। ঐতিহ্যের এই ধারাবাহিকতা সমকালীন শিল্পচর্চায়ও নতুন সম্ভাবনার জন্ম দেয়। অতীতের নির্মাণকৌশল ও উপাদানকে ধারণ করেও সমকালীন শিল্পী তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও জীবনবোধের মধ্য দিয়ে টেরাকোটাকে নতুন অর্থে উপস্থাপন করছেন।
শিল্পী রেহানা ইয়াসমিন তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। তার নির্মিত ভাস্কর্যগুলোর বিষয়বস্তু হলো তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও চারপাশের জীবন পর্যবেক্ষণ। অর্থাৎ, শিল্পকর্মগুলোর উৎস শুধু কল্পনা কিংবা পূর্বনির্ধারিত কোনো ধারণা নয়; বরং শিল্পীর দেখা বাস্তবতা, সেই বাস্তবতার সঙ্গে তার মানসিক সংযোগ এবং কোনো কোনো দৃশ্যের প্রতি তার ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া। সেই জীবনকে তিনি মাটির অবয়বে রূপান্তরিত করেন, আর এই রূপান্তরের মধ্য দিয়ে দৈনন্দিনের সাধারণ দৃশ্যও নতুন তাৎপর্য লাভ করে।
মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকা বাউল কিংবা বিশ্রামরত বাউলের ভাস্কর্যটি এমন একটি অবয়ব, যা দর্শককে মানুষের শরীরী ভাষা ও অন্তর্গত অনুভূতির সম্পর্ক নিয়ে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে।
অন্যদিকে, ছাগলকে কেন্দ্র করে নির্মিত ভাস্কর্যটির পেছনে রয়েছে শিল্পীর একটি নির্দিষ্ট বাস্তব অভিজ্ঞতা। ঈদের সময় ছাগলকে বেঁধে রাখার দৃশ্য তার মনে অস্বস্তি তৈরি করে। প্রাণীটির অসহায় অবস্থান এবং সম্ভাব্য করুণ পরিণতি তাকে ভাবিত করে। তার ব্যক্তিগত সংবেদনশীলতা সেই দৃশ্যকে শিল্পে রূপান্তরের প্রেরণা জোগায়। একইভাবে তার প্রতিটি কাজ তার জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত। দৈনন্দিন জীবনের যে দৃশ্য অনেকের কাছে অভ্যাসের অংশ, শিল্পীর কাছে তা হয়ে উঠেছে অনুভবের বিষয়। তার দৃষ্টিতে দৃশ্যমান বাস্তবতা এবং তার প্রতি মানসিক প্রতিক্রিয়া পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। বরং এই দুইয়ের সংযোগেই শিল্পকর্মটির ধারণাগত ভিত্তি নির্মিত হয়েছে। তবে বাস্তবের অনুলিপি তৈরি করাই তার কাজের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়; বরং প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাকে শিল্পের ভাষায় রূপান্তরিত করার মধ্য দিয়ে তিনি পরিচিত দৃশ্যের প্রতি নতুন করে মনোযোগী হওয়ার সুযোগ তৈরি করেন।
এখানে টেরাকোটার উপাদানগত বৈশিষ্ট্যও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। মাটির নিজস্ব গঠনকে ভেঙে শিল্পী তাকে দিয়েছেন নিজস্ব ভাষা। সূক্ষ্ম কাজ আর বিষয় বিস্তু নির্বাচনে তার কাজ দর্শকের সঙ্গে এক ধরনের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সম্পর্ক তৈরি করে। টেরাকোটায় গড়া শিল্পকর্মের এই প্রদর্শনী ‘মাটির মায়া’ চলবে আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত গ্যালারি দি ইলিউশনসে।



