অনুমতির চক্করে ধুঁকছে যাত্রা
- শীতের মৌসুম কড়া নাড়লেও নেই যাত্রাশিল্পীদের ব্যস্ততা
- অনুমতির জটিল চক্রে হাইকোর্টে রিটও হয়েছিল
- সরকারি নিবন্ধনের পরও কেন জেলা প্রশাসনের অনুমতি

মোহাম্মদপুরের একটি বাড়িতে কেয়ারটেকার হিসেবে কাজ করেন ষাটোর্ধ্ব তাজেল মিয়া। ‘রূপবান’ যাত্রাপালায় তাজেল চরিত্র দেখে মুগ্ধ হয়ে তার বাবা রুস্তম মিয়া সন্তানের নাম রেখেছিলেন তাজেল। একসময় পল্লীর জনজীবনে যাত্রাপালা ভীষণ প্রভাব ফেলেছিল। তাজেল বলছিলেন, ‘কত রাইত যে যাত্রাপালা দেইখ্যা কাটাই দিছি, তার হিসাব নাই।’
অন্যদিকে, রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার চৌপুকুরিয়া গ্রামের আব্দুল কাদের মোল্লা, পেশায় নৈশপ্রহরী। ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে দিনের বেলায় রাজার পোশাক পরে ঘোড়ায় চড়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াতেন। ২০২২ সালে এক সাক্ষাৎকারে আব্দুল কাদের বলেছিলেন, কিশোর বয়সে রূপবান যাত্রাপালায় তাজেলের জরির পোশাক আর ঘোড়া দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন, এর পর থেকে তিনিও নিজেকে রাজা ভাবতে শুরু করেন এবং রাজার পোশাক পরে অন্যদের খোঁজখবর নেন।
গ্রাম-বাংলার অসংখ্য মানুষের কৈশোরকে রাঙিয়ে দিয়েছিল যে যাত্রাপালা, তা এখন শুধুই অতীত। যাত্রার সেই জৌলুস আর নেই। পেশাও বদল করে নিয়েছেন অনেক যাত্রাশিল্পী। তবে কেউ কেউ এখনো আশায় আছেন, যদি ফেরে যাত্রার সুদিন। কীভাবে ফিরবে সুদিন, কেন যাত্রাপালা জৌলুস হারাল? তা জানতে যাত্রাদলের মালিক, গবেষক ও যাত্রাশিল্পীদের সঙ্গে কথা বলেছে আগামীর সময়। তারা বলছেন, অনুমতির আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সময় উপযোগী নতুন গল্পে যাত্রা নির্মাণ না হওয়ার কারণেই শিল্পমাধ্যমটি এখন ধুঁকছে। সাধারণত কার্তিক থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত (বিশেষ করে হেমন্তের শেষ থেকে শীতকাল জুড়ে) গ্রামীণ মেলা, উৎসব ও তীর্থস্থান কেন্দ্র করে যাত্রাপালার আসর বসে। কোথাও শারদীয় দুর্গাপূজাও হয়ে ওঠে যাত্রাপালা মঞ্চায়নের কেন্দ্রস্থল। শীতের মৌসুম দরজায় কড়া নাড়লেও এবার নেই যাত্রাশিল্পীদের ব্যস্ততা।
যাত্রাশিল্প মালিক সমিতির সভাপতি এম এ মান্নান আগামীর সময়কে বললেন, ‘এখন যাত্রাপালা করার জন্য অনুমতি নেওয়াটাই বড় জটিলতা। জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে অনুমতি নিতে আবেদন করার পর সেটি পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে পরে জেলা প্রশাসন অনুমতি দেয়। এতে অনেক সময় লেগে যায়।’
২০২২ সালের ১১ এপ্রিল, ৫ জুন, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২৩ অক্টোবর ও ১ ডিসেম্বর মোট পাঁচবার যাত্রা অনুষ্ঠানের জন্য অনুমতি চেয়ে আবেদন করেও যাত্রাপালা মঞ্চায়নের অনুমতি পাননি নজরুল মাতুব্বর। তিনি বরগুনার পায়রা যাত্রা ইউনিটের স্বত্বাধিকারী। তার যাত্রাদল শিল্পকলা একাডেমিতে নিবন্ধিত। তাকেও অনুমতি নিতে জটিলতায় পড়তে হয়। বিষয়টি নিয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছিলেন নজরুল মাতুব্বর। সে সময় নজরুল মাতুব্বর সংবাদমাধ্যমে বলেছিলেন, ‘সরকার ২০১২ সালে যাত্রাশিল্প উন্নয়ন নীতিমালা তৈরি করেছে, তারপরও স্থানীয় প্রশাসন কেন যাত্রাপালা মঞ্চায়নের অনুমতি দেয় না?’
যাত্রাশিল্প উন্নয়ন নীতিমালা ২০১২-এ বলা আছে, ‘যেকোনো স্থানে যাত্রা প্রদর্শনী করিতে হইলে পূর্বেই স্থানীয় জেলা প্রশাসনের অনুমতি লইতে হইবে। অনুমতির জন্য আবেদন পাওয়ার ৭ (সাত) কর্মদিবসের মধ্যে জেলা প্রশাসককে অনুমতির বিষয়টি নিষ্পত্তি করিতে হইবে। মৌসুমে অনুমতিজনিত প্রশাসনিক জটিলতায় যাত্রা পরিক্রমা যাহাতে বন্ধ না হয়, সে বিষয়ে জেলা প্রশাসক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।’
যাত্রাদল সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তারা জেলা প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও অনুমতি নিতে পারছেন না। যাত্রাশিল্প মালিক সমিতির সভাপতি এম এ মান্নান বললেন, ‘আমরা জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করি। তারা সেটি পুলিশের কাছে পাঠান। এরপর দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়।’
এ বিষয়ে তিনজন জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলেছে আগামীর সময়। তারা বলেছেন, ‘যাত্রার অনুমতি দিতে গেলে পুলিশের (ডিএসবি) একটা সুপারিশ লাগে।’ অন্যদিকে যাত্রা-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিল্পকলা একাডেমির সরকারি নিবন্ধন থাকার পরও কেন জেলা প্রশাসন থেকে অনুমতি নিতে হবে? প্রতি বছরই যাত্রাদলের নিবন্ধন তালিকা হালনাগাদ করে শিল্পকলা একাডেমি। যাচাই-বাছাইয়ের পর বিভিন্ন দলকে নিবন্ধন দেওয়া হয়, বিভিন্ন কারণে নিবন্ধন বাতিলও করা হয়। শিল্পকলায় নিবন্ধিত যাত্রাদল রয়েছে ২২৭টি। এর মধ্যে প্রায় ১৯টি দলের মালিক মারা গেছেন। আরও ১৩ থেকে ১৪টি দলের নিবন্ধনের মেয়াদ শেষ হলেও নবায়ন করা হয়নি। যাত্রাদলের মালিক এম এ মান্নান বললেন, ‘শিল্পকলা তো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রের নিবন্ধিত যাত্রাদলকে কেন অনুমতির জন্য জটিলতায় পড়তে হবে? তাহলে নিবন্ধন নিয়ে কী লাভ হলো?’
গবেষক এম এ মজিদ আগামীর সময়কে বললেন, ‘মূলত দুটি কারণে যাত্রাশিল্প প্রাণ হারাচ্ছে। এর একটি হলো অনুমতির দীর্ঘসূত্রতা। জেলা প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরে অনুমতি নেওয়াটা যাত্রাশিল্পীদের জন্য কঠিন কাজ। আরেকটি হলো নতুন পালা তৈরি হচ্ছে না। পুরনো গল্পের পালা দেখে দর্শক হতাশ হচ্ছেন। সময় উপযোগী করে পালায় নতুন গল্প বলা জরুরি। এ ছাড়া পেশাদার আয়োজকেরও অভাব রয়েছে।’ এম এ মজিদ যাত্রাপালাকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক। বাংলাদেশ যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদের কার্যকরী সভাপতি এবং যাত্রাশিল্প নীতিমালা কমিটিরও নির্বাহী সদস্য। তিনি বলেছেন, ‘যাত্রাশিল্প নীতিমালা নিয়ে সবশেষ বৈঠকে আলোচনা হয়েছিল অনুমতির জটিলতা কীভাবে কমানো যায়। তবে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।’
গত জুনে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি যাত্রাশিল্পের মানোন্নয়ন বিষয়ক কর্মশালার আয়োজন করে। ওই আয়োজনে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেছিলেন, ‘যাত্রাদল ও সার্কাসের প্রাথমিক অনুমতি সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকেই প্রদান করা হবে, যাতে জেলা প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত হয়রানির শিকার হতে না হয়।’ যাত্রাশিল্পকে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পুনরুজ্জীবিত করার কথাও বলেছিলেন মন্ত্রী। তিনি জানিয়েছিলেন, ‘সুস্থ ও রুচিশীল বিনোদন নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয় থেকে একটি যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে।’
কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি বলে মনে করছেন যাত্রাশিল্প সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, যাত্রাশিল্পকে বাঁচাতে হলে অনুমতির জটিলতা দূর করতে হবে। পাশাপাশি সময় উপযোগী করে পালা নির্মাণ করতে হবে। তাদের প্রশ্ন, অনুমতি জটিলতা কাটবে কবে?



