কাজলরেখার পালঙ্ক

অলংকরণ: ফারজিন জামান খান
পালঙ্ক থেকে পালঙ্কে, নিঃশ্বাস থেকে নিঃশ্বাসে, বালিশ থেকে বালিশে, ঘর থেকে ঘরে নৈঃশব্দ্য ছড়িয়ে যেতে যেতে এমন একটা অবস্থানে এনে দাঁড় করায় যে, কুমার কঙ্কনের দুই হাত আঁকড়ে ধরে বলেই ফেলে, ‘আজীবন শুধু তোমার মতো একজনকেই চেয়েছি আমি।’ আসলে ‘আমি আর কাজলরেখাকে চাই না’— কথাটা গোপন রাখলে নিষিদ্ধ সঙ্গম হয়ে ওঠে পবিত্র, আবিরমাখা। রঙে রঙে জড়িয়ে কুমার দেহ ভরো ভরো সুখে তাই কাজলরেখার দেহের রঙ, ঘ্রাণ, উষ্ণতা, সান্নিধ্য সব ভুলে যেতে থাকে। ভুলে ভুলে কঙ্কনের নগ্ন ডানায় মাথা রেখে ঘুমিয়ে যায়। ওদিকে কাজলরেখা দক্ষিণের খোলা জানালার ওই পারে ধূপছায়া ছড়িয়ে পড়লে এপারে পালঙ্ক সাজায়। কত কত ফুলের পাপড়ি বিছিয়ে দেয়। পিচরঙা গোলাপ, জুঁই, গন্ধরাজ, বেলি, কামিনী, তরতাজা হাসনাহেনা আর ছাতিম ফুল। কৃত্রিম সুগন্ধির প্রয়োজনও হয় না।
কুমার জানে কাজলরেখা আটপৌরে, ম্যাড়ম্যাড়ে, সুগন্ধিহীন। ভুলে যাওয়া সহজ ওকে। আর কঙ্কন? সজীব, সবুজ, চঞ্চল; মলমল খাস মসলিনের মতো মোলায়েম আর আকর্ষণীয়। আকর্ষণ থেকে নিতান্ত অনিচ্ছেতে সরে এসে কাজলরেখার সাজানো পালঙ্কে অভ্যাসবশত শুয়ে পড়ে কুমার একটা ভুল করে বলেই ফেলে, ‘কঙ্কন, আমি ক্লান্ত ভীষণ, এক গ্লাস বরফ ঠান্ডা শরবত এনে দেবে?’ ওই মুহূর্তে কাজলরেখার কঙ্কন হয়ে যেতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে কঙ্কনের মতো সাজানো পালঙ্কে কলকল ঢেউ হয়ে ভেসে যেতে, রেশম রেশম কুমারকে আলুথালু করে দিতে। কিন্তু গত একশ আশি দিনের ঘটনাপরম্পরা মেলাতে গিয়ে কোনো ইচ্ছে পূরণ করা সম্ভব হয় না। কাজলরেখার জন্য বরং যেটা সহজ হয় সেটাই ও করে। কাজলহীন চোখে ক্লান্ত অথচ তৃপ্ত কুমারের দিকে তাকিয়ে থাকে। একভাবে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কাজলরেখার দুই চোখ দিয়ে জল গড়ায়। আহারে! ‘বাপে কান্দে ঝিয়ে কান্দে কান্দে পশুপাখি/অরণ্য জঙ্গলায় কন্যা রইল সে একাকী।’
কন্যা সাজানো পালঙ্কের পাশে একাকী দাঁড়িয়ে থাকে আর চম্পানগরের হীরাধন সাধুর অভিশপ্ত রাজকুমার বেঘোরে ঘুমায়। কয়েক দিন আগেও কুমারের সর্বাঙ্গে সুচ গাঁথা ছিল, কাজলরেখা বহু সাধ্য-সাধনা করে একেকটা সুচ টেনে তুলেছে। এখন শুধু দুই চোখের দুই পাতায় বিদ্ধ সুচ দুইটা তোলা বাকি। কাজলরেখা কি বরাবরের মতো নিজের হাতে ওই সুচ দুইটা টেনে তুলবে? শাপমুক্ত করবে কুমারকে? কিন্তু ওই সুচজোড়া তুললেই তো সুচরাজার জীবনে সবরকম প্রাপ্তিযোগ ঘটবে আর বিনিময়ে কাজলরেখা সব হারাবে। ধর্মমতি শুকপাখি তো ভবিতব্য জানিয়েই দিয়েছে। কিন্তু শুকপাখি কোথায়? সে কি শূন্যে মিলিয়ে গেছে? সে কি আর আসবে না? ‘তোমার সকল দুক্ষু দূর হইয়াছে’ বলে কি সে একবারও পিছু ডাকবে না? কাজলরেখা শুকপাখির খোঁজে এদিকে তাকায় ওদিকে তাকায়। কাউকে কোথাও দেখা যায় না। খোলা জানালার অপর পাশে সুনসান প্রকৃতির ভেতরে শুধু কানাকানি চলে, ‘শোনো গো শোনো কন্যা, শোনো অভাগী/তোমার কপালে দুক্ষু, আমি করবাম কী?’
দুঃখে দুঃখে কাজলরেখার দেহ মড়মড় করে আর কুমার সাজানো পালঙ্কে ঘুমায়। এ পালঙ্কেই তো একদিন ফুটেছিল লক্ষ কোটি ফুল। ফুলের শয্যায় বসে রাজকীয় আভরণ, প্রসাধন, চন্দন বাটা, বাহারি সুগন্ধি আর অলংকারে অপরূপা হয়ে সেজেছিল তৃষ্ণার্ত কাজলরেখা। মিশি দিয়ে দাঁত উজ্জ্বল করেছিল। পাট পাট করে দিঘল বেণি করে থোকা থোকা ফুল গুঁজেছিল। কাজলরেখার তেজস্বী সৌন্দর্যে চতুর্দিক হয়ে উঠেছিল ম্লান। দেখে কুমারের চোখের পলক পড়ছিল না। সুরাপাত্র ফেলে কাজলরেখার দুধধোয়া পদতলে নিজেকে সমর্পণ করতে করতে বলেছিল, ‘তুমিই আমার প্রথম, তুমিই আমার শেষ।’ কথায় কথায় ওর কস্তুরির সুগন্ধি মাখা দেহের ঘ্রাণ নিতে নিতে চুম্বনের দাগ এঁকে দিয়েছিল। আলিঙ্গনে বাঁধতে বাঁধতে শয্যাকে করে তুলেছিল পালকের মতো নরম, ভারহীন। হায়! আজ কোথায় সেই সজ্জা, কোথায় সেই শয্যা! যেই পালঙ্ক লিখে রেখেছিল অকথিত অপঠিত স্বপ্নের আখ্যান, কোথায় সেই পালঙ্ক! কাজলরেখার ঠোঁটে, চোখে কোথায় সেই তৃষ্ণার বৃষ্টি! যেই কুমার এক লহমায় দেহের ছায়া হতে জানে সেইবা কোথায়!
হঠাৎ মনে পড়ে যায়, এখনই কাজে ছুটতে হবে, রান্না বসাতে হবে, প্রিয় কুমারের পছন্দের সব খাবার রান্না করতে হবে। কী রাঁধবে আজ? শাহি পোলাও, কোরমা, মোরগ মোসাল্লাম, ডাল মাখানি, রেশমি কাবাব, তান্দুরি, রুমালি রুটি, টিক্কা, কোফতা, শরবত, ফালুদা, ফিরনি, হালুয়া, জিলাপি, কুলফি, গোলাপজাম না শাহি টুকরা? না দুঃখের বাটনা বেটে সুখের পাঁচফোড়নে রাজকীয় কোনো পদ রাঁধবে? কঙ্কন কী খেতে ভালোবাসে? মাছ? না মাংস? কাজলরেখা তো মাছ খায় না, মাংস খায় না। নিরামিষাশী কাজলরেখার দাঁতে মাংস কাটতে মন চায় না। দাঁতে দাঁতে ও শুধু দুঃখ কাটে আর বিনবিন করে, ‘জাগো জাগো সুন্দর কুমার রে কত নিদ্রা যাও/আমি অভাগিনী ডাকি আঁখি মেইলা চাও।’
সহসা নিজের প্রতি বিতৃষ্ণায় কাজলরেখার ঠোঁট, জিহ্বা, মুখগহ্বর তিতা হয়ে যায়। সেই যে সেই বয়ঃসন্ধিকাল পার হওয়ার সময়ে যেই কিশোর বাড়ির দরজার কাছে সুগন্ধি গোলাপ ফুল রেখে যেত, নাম না জানা গাছের বাকলে ওর নাম লিখে রাখত তার মুখটা মনে পড়ে। ওই মুখ আশ্চর্য সুন্দর। পেলব, মসৃণ তার ত্বক, দৃষ্টি হীরার মতো স্বচ্ছ। কাজলরেখাকে দেখলেই সে নির্বাক তাকিয়ে থাকত, যেন কোনো রাজকুমারীকে দেখছে। ওই কিশোরের কাছে কাজলরেখা সবচেয়ে দামি ছিল। সেই দামি কাজলরেখা কি না এখন পালঙ্কের লোভে অভাগিনী সাজছে? কঙ্কন দাসীর কাছে হেরে যাওয়ার লজ্জায় কুমারের আনুকূল্য চাইছে?
সহসা রাগে, ক্ষোভে ক্ষতবিক্ষত হয় কাজলরেখা। সুচরাজার দেহ থেকে খুলে রাখা সুচগুলো নিজের দেহে গাঁথে। রক্তের প্রকট গন্ধে ওর সর্বাঙ্গ জেগে ওঠে। তখনই কাজলরেখার মনে পড়ে যায়, ওর এই নাম কুমারেরই দেওয়া। কুমার কি তাহলে এতটুকু করবে না, গর্ত খুঁড়ে ওই মুখপুড়ী কঙ্কনকে মাটিচাপা দেবে না? কিন্তু কুমার তো কাজলরেখাকে চায় না। কাজলরেখাও কি কারও প্রাণের বিনিময়ে ওই পালঙ্কে নিজের পুনঃঅভিষেক চায়? কী করে কী করে ভেবে যখনই কাজলরেখা ছটফট ছটফট করে তখনই হাওয়া বিদীর্ণ করে শুকপাখি ডেকে ওঠে। সমাধান জানায়, এই নাম ঝেড়ে ফেলতে পারলেই কাজলরেখার পালঙ্ক আঁকড়ে থাকার লোভ ঝরে যাবে। তাই করে কাজলরেখা। কুমারের দেওয়া নামটা পোশাকের মতো খুলে পালঙ্কের ওপরে রেখে ছন্দময় পায়ে দরজার বাইরে বেরিয়ে যায়।



