বুক রিভিউ
নির্মোহ এবং নিরপেক্ষ ভাষার এক জটিল গল্প

নিজের বই হাতে লেখক
মধ্যযুগের খ্রিস্টান সামরিক সন্ন্যাসী গোষ্ঠী নাইটস টেম্পলারদের বিষয়ে কমবেশি সবার জানা আছে। এই রহস্যময় গুপ্ত সংঘ নিয়ে জল্পনা-কল্পনারও শেষ নেই। ইতিহাসের বাস্তব চরিত্র এই খ্রিস্ট সন্ন্যাসীরা কালের পরিক্রমায় একসময় পরিণত হন মিথে। এই মধ্যযুগীয় ধর্মীয় সংগঠনটি জনপ্রিয়তার দিক থেকে পবিত্র গ্রেইলের রক্ষক এবং যিশুখ্রিস্টের কথিত বংশধারার রক্ষাকর্তা হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে, তারা খলনায়ক হিসেবেও চিত্রিত হয়েছে, বিশেষত স্যার ওয়াল্টার স্কটের ১৮২০ সালের উপন্যাস ‘আইভানহো’ এবং রিডলি স্কটের ২০০৫ সালের চলচ্চিত্র ‘কিংডম অব হেভেন’-এ।
ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ এবং সাংবাদিক ড্যান জোন্স সেই মিথ ভেঙে নাইটস টেম্পলারদের উপস্থাপন করেন সত্যিকার রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে। ‘দ্য টেম্পলার্স : দ্য রাইজ অ্যান্ড স্পেকটাকুলার ফল অব গডস হলি ওয়ারিয়র্স’ বইয়ের পাতায় ড্যান জোন্স লিপিবদ্ধ করেন নাইটস টেম্পলারদের উত্থান, ক্ষমতা এবং পতনের একটি বিস্তারিত ও প্রাণবন্ত ইতিহাস। এখানে ব্যাপক মৌলিক উৎসের ওপর ভিত্তি করে এই খ্রিস্টান ধর্মযোদ্ধাদের এক রোমাঞ্চকর বিবরণ তৈরি করেছেন জোন্স। এতদিন যাদের বীরত্ব এবং কথিত অধঃপতন কিংবদন্তিতে আবৃত ছিল, এই ব্রিটিশ সাংবাদিক সেই পৌরাণিক কাহিনির বদলে ঐতিহাসিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নাইটস টেম্পলারদের বাস্তব চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। এখানে চিত্রিত হয়েছে নাইট টেম্পলারদের সামরিক দক্ষতা এবং সেই সময়ের রাজনীতির জটিল সমীকরণ। কল্পকাহিনি থেকে সত্যকে আলাদা করে এই কিংবদন্তিতুল্য সশস্ত্র ধর্মীয় সংগঠনটির আসল গল্প বলেছেন তিনি। এখানে জোন্স ব্যাখ্যা করেন, কীভাবে টেম্পলাররা ক্রুসেডের সময় তীর্থযাত্রীদের সুরক্ষা দেওয়া থেকে এক বিশাল আর্থিক সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন, কীভাবে ধর্মীয় শাহাদাতের প্রতি তাদের বিশ্বাস আইসিসের মতো গোষ্ঠীগুলোর মধ্যেও দেখা যায় এবং কেন টেম্পলারদের ক্রুসেডের চেতনা ও মুসলিমবিরোধী বক্তব্য শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী ও নব্য নাৎসিদের এক নতুন প্রজন্মকে আকৃষ্ট করছে।
জোন্স তার লেখা এই শেষ গ্রন্থটি ইতিহাসের চারটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের ওপর ভিত্তি করে মোট চার বিভাগে বিভক্ত করেছেন। টেম্পলারদের উৎপত্তি ও বিবর্তন (১১০২-১১৪৪), সৈনিক হিসেবে তাদের খ্যাতি অর্জন (১১৪৪-১১৮৭), ব্যাংকিং জগতে তাদের প্রবেশ (১১৮৯-১২৬০) এবং লোভ ও যৌন অসদাচরণের অভিযোগে তাদের আকস্মিক পতন (১২৬০-১৩১৪)। গ্রন্থের শুরুটা হয়েছে প্রথম ক্রুসেডের পরবর্তী সময়ে, ততদিনে জেরুজালেমে খ্রিস্টান শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। পশ্চিম থেকে তখন পবিত্র ভূমিতে আসা শুরু করেছেন হাজারো তীর্থযাত্রী। কিন্তু এই যাত্রাপথে তারা ডাকাতদের আক্রমণের শিকার হয়ে হারাচ্ছিলেন সব মূল্যবান সম্পদ। এই তীর্থযাত্রীদের রক্ষা করতেই ১১১৯ সালের শেষ দিকে ফরাসি নাইট হিউ অব পেইন্স তার আটজন সঙ্গী নিয়ে এই খ্রিস্টানধর্মীয় যোদ্ধাদের সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন। তখন জেরুজালেমের রাজা দ্বিতীয় বল্ডউইন। তিনিই পবিত্র নগরীতে টেম্পল মাউন্টের (মুসলিমদের কাছে হারাম আল-শরিফ নামে পরিচিত) আল-আকসা মসজিদে এই নাইটদের সদর দপ্তর স্থাপন করতে অনুমতি দেন। এরপর ধীরে ধীরে তাদের সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং সংগঠনটি পোপের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হতে থাকে। কালক্রমে তারা একটি শক্তিধর গোষ্ঠী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সারা ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্য জুড়েই তাদের আধিপত্য বিস্তৃত হওয়া শুরু হয়। তারা অর্থ আত্মসাৎ, লুণ্ঠন এবং মধ্যপ্রাচ্যে মুসলমান গণহত্যার মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। কঠোর ব্রহ্মচর্যের ব্রত গ্রহণ করা সন্ন্যাসীরা একসময় নিজেদের সম্পদের পাহাড় রক্ষা করতে অন্য আরেক যুদ্ধে নেমে পড়েন। তারা প্রথম রিচার্ড এবং ফ্রান্সের সেন্ট লুইয়ের মতো ক্রুসেডার রাজাদের অনুগ্রহ লাভ করেন এবং সব স্তরের দাতাদের সমর্থন পেতে শুরু করেন। এতে এই সংগঠনটি ধনী হয়ে ওঠে। তারা সেই মধ্যযুগেই বিশ্বের বৃহত্তম এবং সবচেয়ে উদ্ভাবনী ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করেন এবং যারা তাদের স্বার্থের জন্য হুমকি হয়ে উঠত তাদের বিরুদ্ধেই চলত গোপনে যুদ্ধ। কালক্রমে তারা সীমান্তের বাইরে অর্থ পাচার এবং নারী কেলেঙ্কারির মতো ঘটনার সঙ্গেও জড়িয়ে যান। যারা আজীবন সন্ন্যাস এবং মানবসেবার পণ করেছিলেন একদিন, তারাই হয়ে উঠলেন অভিজাত, গড়লেন সম্পদের পাহাড়। ক্ষমতা আর সম্পদের নেশায় উন্মত্ত ধর্মযোদ্ধারা মেতে উঠলেন মানুষ হত্যার খেলায়।
এদিকে, এই একতরফা আধিপত্যের সামনে প্রধান হুমকি হয়ে দাঁড়ালেন মিসর ও সিরিয়ার প্রথম সুলতান এবং আইয়ুবীয় রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা আবু নাসির সালাহুদ্দিন ইউসুফ ইবনে আইয়ুব বা সালাদিন। সালাহুদ্দিন আইয়ুবি ইসলামের ভূমি থেকে সব খ্রিস্টানকে বিতাড়িত করার শপথ নিয়েছিলেন। সালাদিনের মৃত্যুর পর, এই নাইট টেম্পলারদের আবার মুখোমুখি হতে হয় মিসর ও সিরিয়ার চতুর্থ মামলুক সুলতান মালিকুয যাহির রুকনুদ্দিন বাইবার্সের। বাইবার্সের হাতে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়ে যখন তারা তাদের সাইপ্রাসের শক্তিশালী ঘাঁটিতে পিছু হটতে বাধ্য হন, তখন ফ্রান্সের প্রতিহিংসাপরায়ণ ও অর্থকষ্টে থাকা রাজা চতুর্থ ফিলিপ তাদের সম্পদের ওপর নজর দেন। তার প্রশাসকরা মিথ্যা ও ভুয়া সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে টেম্পলারদের বিরুদ্ধে নীরবে একটি মারাত্মক মামলা সাজিয়ে তোলেন।
এরপর ১৩০৭ সালের ১৩ অক্টোবর, শুক্রবার, যৌন অসদাচরণ ও ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগে শত শত টেম্পলারকে গ্রেপ্তার, কারারুদ্ধ ও নির্যাতন করা হয় এবং সংঘটি ভেঙে দেওয়া হয়। পোপ গোপনে তাদের বিচার করেন। সর্বশেষ টেম্পলার গ্র্যান্ডমাস্টার জেমস অব মোলেকে ১৩১৪ সালে প্যারিসে পুড়িয়ে মারা হয়। জেমস অব মোলে এবং তার সহযোদ্ধা টেম্পলারদের মৃত্যু এই সংগঠনের সমাপ্তি টেনে দেয়।
জোন্সের এই বইটি চিত্তাকর্ষক গদ্যে লেখা এবং পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে গবেষণালব্ধ। এখানে একদিকে যেমন তুলে ধরা হয়েছে নাইট টেম্পলারদের ইতিহাস, তেমন আরেকদিকে তুলে ধরা হয়েছে তৎকালীন মুসলমান সুলতানদের কথা। ক্রুসেড চলাকালীন মুসলমান সালতানাতের ভেতরের বিভেদ এবং একই সঙ্গে চার্চের সঙ্গে খ্রিস্টান রাজাদের দ্বন্দ্ব বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে গ্রন্থটিতে। আবার, বাইবার্সের বিপক্ষে যুদ্ধ করতে গিয়ে দুর্ধর্ষ মঙ্গল জাতির সেনাপতি হালাকু খানের শোচনীয় পরাজয়ের আখ্যানও লিপিবদ্ধ হয়েছে নির্মোহ এবং নিরপেক্ষ ভাষায়। এখানে আরও উঠে এসেছে হাশাশিনদের কথা। Hashshashin বা অ্যাসাসিন হলো ১১০০ শতাব্দীতে পারস্য ও সিরিয়ায় প্রতিষ্ঠিত নিজারি ইসমাইলি শিয়া মতবাদের একটি গোপন গুপ্তঘাতক গোষ্ঠী। হাসান বিন সাব্বাহ ১০৯০ সালের দিকে এই বাহিনী প্রতিষ্ঠা করেন, যারা মূলত রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিরোধীদের হত্যা করত।
গ্রন্থটি নতুন পাঠক এবং বিশেষজ্ঞ—উভয়ের জন্যই সহজবোধ্য। জোন্স টেম্পলারদের চিত্তাকর্ষক ইতিহাস তুলে ধরার সময় যথেষ্ট নিরপেক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। পাশাপাশি সালাদিন বা বাইবার্সের মতো মুসলমান বীরদের বীরত্বগাথা তুলে ধরেছেন নির্মোহভাবে। জোন্স কেবল ইতিহাসকেই জীবন্ত করে তোলেননি, বরং ধর্মযুদ্ধগুলোকেও বাস্তবতার নিরিখে বর্ণনা করেছেন। সে সময় একটি ঘটনা কীভাবে অন্যটিকে প্রভাবিত করেছিল তা বর্ণনা করেছেন দক্ষতার সঙ্গে। যার ফলে এমন এক ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে, যা অধ্যয়ন ও অনুধাবন করা প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে।






