প্রদর্শনী পরিক্রমা
ক্যানভাসে নীরবতার দৃশ্যভাষা

একক শিল্পপ্রদর্শনী ‘সাইলেন্ট এক্সপ্রেশনস’
কিছু কিছু নীরবতা শব্দের চেয়েও উচ্চকণ্ঠ। সেগুলো কানে শোনা যায় না, চোখে ধরা পড়ে; ভাষায় ধরা দেয় না, অনুভূতিতে প্রতিধ্বনিত হয়। ফারিনা সামহি নেথীর প্রথম একক শিল্পপ্রদর্শনী ‘সাইলেন্ট এক্সপ্রেশনস’ সেই নীরবতারই এক দৃশ্যমান অভিধান, যেখানে প্রতিটি তুলির আঁচড়, প্রতিটি রঙ এবং প্রতিটি প্রতীক এমন এক ভাষা নির্মাণ করে, যার জন্য শব্দের প্রয়োজন পড়ে না।
কোথাও মাছ, কোথাও নারী, কোথাও পাখি, কোথাও আবার জ্যামিতিক ভাঙনের ভেতর থেকে উঠে আসা মুখাবয়ব। চারদিকে উজ্জ্বল রঙের বিস্তার, অথচ প্রদর্শনীর নাম ‘সাইলেন্ট এক্সপ্রেশনস’। এই আপাত বৈপরীত্যই ফারিনা সামহি নেথীর প্রথম একক প্রদর্শনীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক। এখানে নীরবতা কোনো শূন্যতা নয়; বরং রঙ, রেখা ও প্রতীকের সমন্বয়ে নির্মিত এক বিকল্প দৃশ্যভাষা।
রাজধানীর বনানীর এশিয়াটিক সেন্টারের বাতিঘর আর্ট স্পেসে ১ আগস্ট শুরু হয়েছে ফারিনা সামহি নেথীর প্রথম একক চিত্রপ্রদর্শনী ‘সাইলেন্ট এক্সপ্রেশনস’। মঙ্গলদীপ ফাউন্ডেশনের আয়োজনে এবং ফরিদুর রহমান রাজিবের কিউরেশনে সাজানো এ প্রদর্শনীতে শিল্পীর গত চার বছরে নির্মিত ৬১টি অ্যাক্রিলিক চিত্রকর্ম স্থান পেয়েছে। প্রদর্শনীটি চলবে ১০ আগস্ট পর্যন্ত।
শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিল্পী হিসেবে ফারিনা সামহি নেথীর পরিচয় তার শিল্পচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলেও এ প্রদর্শনীর সবচেয়ে বড় শক্তি তার পরিচয়ে নয়, বরং তার স্বতন্ত্র শিল্পভাষায়। লোকজ নন্দনতত্ত্ব, অলংকারধর্মী বিন্যাস এবং সমকালীন চিত্রভাষার সংমিশ্রণে তিনি নির্মাণ করেছেন এমন এক দৃশ্যজগৎ, যেখানে অনুভূতির প্রকাশ ঘটে শব্দের বদলে রঙের মাধ্যমে।
গ্যালারির এক কোণে নীরবে বসে ছিলেন একজন। প্রশ্ন করতেই তার চোখে চোখ পড়ল, কিন্তু কোনো উত্তর এলো না। তিনি শুধু মৃদু হেসে তাকালেন। পাশে ছিলেন মঙ্গলদীপ ফাউন্ডেশনের সুমাইয়া শামস। তিনি জানালেন, তিনিই শিল্পী ফারিনা সামহি নেথী। শ্রবণ ও বাচিক যোগাযোগে সীমাবদ্ধতার কারণে তিনি সরাসরি কথোপকথনে অংশ নেন না। তাই দর্শকের প্রশ্ন ইশারার ভাষায় শিল্পীর কাছে পৌঁছে দিচ্ছিলেন সুমাইয়া শামস, আবার শিল্পীর উত্তরও সেই ভাষা থেকে দর্শকের জন্য অনুবাদ করছিলেন। তখন উপলব্ধি করলাম, ‘সাইলেন্ট এক্সপ্রেশনস’ শুধু একটি প্রদর্শনীর নাম নয়; এটি গ্যালারির ভেতরে ঘটে চলা এক জীবন্ত অভিজ্ঞতারও নাম।
প্রদর্শনীর বিভিন্ন কাজে মাছ, নারী, পাখি ও চোখ বারবার ফিরে এসেছে। এগুলো শুধু অলংকার নয়; যোগাযোগ, স্মৃতি, সহাবস্থান ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক হিসেবেও পাঠ করা যায়। বিশেষ করে চোখ যেন এ প্রদর্শনীর অন্যতম পুনরাবৃত্ত প্রতীক। কখনো তা আত্মদর্শনের, কখনো যোগাযোগের, আবার কখনো নীরব অনুভূতির সাক্ষী হয়ে ওঠে। দর্শকের দিকে নিবদ্ধ সেই দৃষ্টি কোনো উচ্চারণ করে না; বরং নীরবে একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। ফারিনার কাজে বাংলাদেশের লোকজ শিল্পধারার প্রভাব স্পষ্ট হলেও তা অনুকরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পটচিত্র ও নকশাভিত্তিক অলংকরণকে তিনি সমকালীন রঙ, ছন্দ ও বিন্যাসে নতুনভাবে রূপ দিয়েছেন। উজ্জ্বল নীল, লাল, হলুদ ও সবুজের সাহসী প্রয়োগ তার ক্যানভাসকে দিয়েছে প্রাণময় দীপ্তি। তবে কয়েকটি কাজে অলংকারধর্মী মোটিফের পুনরাবৃত্তি এতটাই প্রবল যে, নকশাগত সৌন্দর্য কখনো কখনো মূল আবেগের গভীরতা কিছুটা আড়াল করে ফেলে। তারপরও ‘সাইলেন্ট এক্সপ্রেশনস’ নিঃসন্দেহে এক সম্ভাবনাময় আত্মপ্রকাশ। ফারিনা সামহি নেথী মনে করিয়ে দেন, মানুষের গভীরতম অনুভূতির সবকটির প্রকাশ শব্দে সম্ভব নয়। কখনো একটি দৃষ্টি, কখনো একটি রঙ, কখনো একটি নীরব ক্যানভাস— ভাষার চেয়েও অধিক স্পষ্ট, অধিক গভীর হয়ে ওঠে। তার এ প্রদর্শনী তাই শুধু শিল্পদর্শনের অভিজ্ঞতা নয়; এটি নীরবতার ভাষা শেখারও এক অনন্য যাত্রা।




