নির্বাচিত কবিতা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বালিঝুড়ি
পরাগ রিছিল
সব সম্পর্কই কি বালিঝুড়ি নদী—
হারিয়ে যায় ঝুরঝুর জলের
বানে?
ধসে পড়ে মাটি, পায়ে
দাঁড়ানোর!
তবু কোথাও ঝোরা ছিল, উজানে
বইতো নির্জন একান্ত গোপনে...
দূরে কোথাও উল্কাপাত,
দেহটা জ্বালিয়ে পুড়ে যায় নক্ষত্র
জ্যোতি।
সব সম্পর্কই কি বালিঝুড়ি নদী...
ঠিকানা
মালিহা জেরিন
আলগা হয়ে গেলেও দুধেল গাইয়ের বাছুর
সে খবর আর তার জানা হয় না কখনো—
তবু সেই ঘ্রাণ
জুড়ে থাকা কবোষ্ণ উষ্ণতা
ঘুমভাঙা মুগ্ধতার মতন আজও
নুয়ে থাকে তারই আর্তিতে
সাজানো সাঁচি পানের পরতে পরতে
আদুরে আহ্লাদি সুরে
গোছানো রয়েছে যে ধানের আঘ্রাণ
সে-ও কি আজ আর
তারে কোনোভাবে ভোলে?
সময়ের কানে কথা কয় পূর্বজের ধ্বনি
সে কি গান?
সে কি সম্মুখ অজানায় ডাক?
ছেঁড়া শিকড়ের ফাঁক গলে
যেন দাঁড়িয়ে থাকেন পিতামহ—
এক প্রাচীর
এক গভীর গম্ভীর নিঃশ্বাস যেন
যেন জানান দেন—
অথচ মানুষই যতদূর যায় যাক
অগণ্য শূন্যতার যোজন দূরত্ব ভেদেও
দুধেল গাই, সাঁচি পান, ধান
আর নিকোনো উঠোনের টানে
ফের তবু ফিরে আসে
এই শিকড়ের আপ্যায়নে
দূরে চাঁদ, কাছে পরাজয়
মোস্তফা মহসীন
তোমার ঘামের গন্ধে আমি ফুলের কথাই ভাবি; এ
বসন্তে রেণু এলে দুজনেই দেবো পাড়ি! আঁকাবাঁকা
ছুটে চলা পাহাড়ের সারি, জোনাক আলোয় হাঁটি
দুজনে; মেলেনি স্বস্তির ছাউনি। বয়সের দোষে হালকা
হোঁচট খেলে; স্পর্শের দূরত্ব কমে যায় সংগোপন-ভূমিকম্পে।
ঠোঁটের কম্পন নাকি নিয়ন্ত্রণে আসে শরীরের মোহমুক্তি?
খেইহীন নিদ্রার্থীর মতো ঘাসের মাজারে ঝিমিয়ে নেতিয়ে পড়ি।
সেদিন সকালে আড়মোড়া ভাঙতে না ভাঙতেই দেখি;
সরাসরি সূর্যের আলোয় দাঁড়ানো তোমার বাবা,
পাশে চকচকে এক বিএমডব্লিউ গাড়ি।
যে অশ্রু ঝরেছে, তা অপমানের গ্লানি।
মাথা চুলকাতে গিয়ে বুঝি কত বেশি সুবোধ বালক আমি!
পথের দিশায় চোখ কচলাতে কচলাতে পায়ে এসে
ঠেকে ভারী শরণার্থী-ক্লান্তি।
লক্ষণীয়ভাবে আজ নিজেকে প্রকাশে উন্মুখ দূরের চাঁদ;
পাশে শেয়াল, পাহাড়ে দেশি হাতি।
কচ্ছপের মতো খোলসে স্বরূপ ঢেকে যাবো
পতেঙ্গার দিকে; সমুদ্রের কাছাকাছি।
বিবাগি পইতা
নীহার মোশারফ
এত কারুকাজ, অদূরে পাখি, শ্রাবণের গান
আবছা আলোয় বন্ধ্যা যে নদী
সেখানে বংশ বাড়ে না।
বিবাগি পইতা হাতে সন্ধ্যার মিটিমিটি আগুন
নিভে গেলে কুটুম আসে
কবিতার ছন্দ-সুরে আকাশ থাকে ঝুলে
কথার পরতে পরতে মোহ
মুখ তার যৌবনের প্রথম আধার।
নিতম্বে নৃত্যের ছক, বুকের জমিনে উর্বর পাহাড়
নদীর ঢেউয়ে অল্পতেই কাবু অনেকে
কী টান তার জন্য, শরীরের ভাঁজ খোলে সে
নগ্ন দেহে তারে অষ্টাদশী লাগে।
ইচ্ছে প্রবল হলে বয়সে কী আসে যায়
ঘুমভাঙা চড়ুই সুখ ওঠানামা করে।
রবার্ট
ফ্রস্টের সঙ্গে একদিন
গাফফার মাহমুদ
জলের অস্তিত্ব এবং আগুন আবিষ্কার
পাথর ঘষে ঘষে মানুষের আধুনিক সভ্যতা
বরফকুচি গলে সুবিশাল জলরাশির পৃথিবী
খানাখন্দ পুকুর ভরাট করে কী এক বসবাস
আমরা কভু কি ভেবেছি এরই নাম বাঁচা নয়
বেঁচে থাকার জন্য পথঘাট-সবুজ শস্যভূমি
উঁইটিবি, পুঁইমাচা, পাখিকুজন একদিন হবে
নিরেট পাথরখণ্ডের মতো অপ্রচল পড়ে থাকা
সিসার বিচ্ছুরণ পুড়ছে লোকালয় মানুষের মুখশ্রী
রবার্ট ফ্রস্টের সঙ্গে ভিডিওকলে জেনেছি একদিন
তিনি শুধালেন, জল এবং অগ্নি ধ্বংস করবে পৃথিবী!
চাঁদের ভাঙা ব্যাকরণ
তানভীর আহমেদ হৃদয়
চাঁদ আজ তার ব্যাকরণ ভুলে গেছে। তাই রাতজুড়ে আকাশে কমা, সেমিকোলন আর বিস্ময়সূচক চিহ্নের বৃষ্টি। আমি একটি ফুলের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে দেখি, সে আসলে একটি পুরোনো দরজা। দরজাটি খুলতেই একটি শিশুর হাসি সাতটি পাহাড়কে কাগজের নৌকা বানিয়ে ভাসিয়ে দিল।




