ভ্রান্তিভুলের রবীন্দ্রনাথ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বহুদিন আগে ‘দেশ’ পত্রিকায় একটি রম্য পড়েছিলাম, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে। আমার দুর্ভাগ্য এই সম্পদগুলো আমার হাতে এখন আর নেই। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দেশের বাইরে চলে গেলে, এ সংগ্রহের ভাগ্য পরাভূত হয়। কোথায় যে চলে যায় বা কে নিয়ে যায়, আর খোঁজ নেই। তো সেই রম্যে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ‘সমালোচনা’ ছিল। লেখকের শেষ কথাটি ছিল দারুণ, ‘ঠাকুর [ভগবান অর্থে] যেন মার না খাই।’ মানে রবীন্দ্রনাথকে কটাক্ষ করা মানে পিঠের ছাল না থাকার ব্যবস্থা করা।
কদিন আগে আমি রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে একটি পোস্ট দিয়েছিলাম। আমি আসলে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম যে এর ভিত্তি কী। কেননা, কিছু গ্রুপ এবং ব্যক্তি বিষয়টি নিয়ে নানান কথা বলছিল এবং অনেকেই কিছুটা জলঘোলা করার তালে আছে। সেটি বুঝতে সমস্যা হয় না। কিন্তু যেই না পোস্ট করেছি অমনি কিছু মানুষের জ্বলে ওঠা দেখলাম। মূল প্রতিপাদ্য ছিল রবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষদের নটি/বেশ্যা-পল্লী ছিল (ভাই, একটি বংশের সবাই এত সুফি সাধক ছিল আপনাকে কে বলেছে?)। এখানেই তাদের মূল ক্ষোভ। ওখানে একটি বইয়ের (Calcutta: Myths and History, S N Mukherjee) ১০১ নম্বর পৃষ্ঠা নিয়ে কথাটা উঠেছিল। আরও একটি বইয়ের (Under the Raj: Prostitution in Colonial Bengal, Sumanta Banerjee Page 72) কথাও ছিল। ঐতিহাসিক কিছু বিষয় বলতে গিয়ে লেখক জানিয়েছিলেন, কবির ওই পূর্বপুরুষদের কথা। যে সময়ের কথা বলা হয়েছে, তখন রবীন্দ্রনাথের জন্ম তো দূর, তার বাবারও জন্ম হয়নি। তার ঠাকুরদার বয়স তখন ১১-১২। রবীন্দ্রনাথের বাবা তার ঠাকুরদার সম্ভবত ১৭ বছর বয়সের সন্তান।
মূল কথায় আসি। ওই রেফারেন্সের বিষয়টি বুঝতে অন্তত পেছনের আর একটি পাতা পড়া দরকার। মানে ১০০ নম্বর পৃষ্ঠাও গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, ওই এলাকায় কেবল রবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষ নন; বরং আরও অনেকের একই ব্যবসা ছিল। ১০০ নং পৃষ্ঠা বলছে, এরকম এক ব্যবসায়ী সেখানে একটি মসজিদ পর্যন্ত নির্মাণ করেছিলেন। তবে এও বলা আছে, ওই মসজিদে কেউ যেত কি না, সেটি বলা যাচ্ছে না। তবে বুঝতে পারা সম্ভব, ওই পতিতালয়গুলোতে মুসলমানদের গমনাগমন ছিল।
এখন কথা হলো, রবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষ মানে কিন্তু রবীন্দ্রনাথ নন। আবার এর মানে তার বাবা কিংবা ঠাকুরদাও নন; কিংবা হয়তো নন ঘরের অন্য কেউ। একটি বংশে বহু মানুষ। এই বংশের পূর্বপুরুষ (নারীরা, প্লিজ বিরক্ত হবেন না। হাজার হোক, আমি পুরুষই তো!), ফলে বংশের যত মানুষ সবার দায়িত্ব পরবর্তীকালে একটি মানুষের পক্ষে নেওয়া কি সম্ভব? নাকি সেই দায়িত্ব তাকে দেওয়া ঠিক? আবার, একটু খুশি হয়ে, যদি বলি, রবীন্দ্রনাথের বাবাই (ভুল বুঝবেন না, তিনি যে নন সেটি আমি আগেই বলেছি) হন, তাহলেও সেটির দায়িত্ব রবীন্দ্রনাথ নেবেন কেন? মানে, সেই কারণে তার অবদানগুলো অস্বীকার করা যাবে কি? আমার মনে হয় না। যেমন, এ দেশের এক স্বনামধন্য কবি, বেনজীর আহমদ। তিনি সম্ভবত ডাকাত ছিলেন। প্রয়াত আমীরুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, এই ‘ডাকাত’ আসলে ‘সেই ডাকাত’ নয়। লুণ্ঠিত সম্পদ অসহায়দের দিয়ে দিতেন। কিন্তু ডাকাত তো। সেজন্য বেনজীরের কবিতাকে অস্বীকার করা যায় না।
রবীন্দ্রনাথ আসলে নানাভাবে আমাদের আলোচনায় আসেন। এ দেশে, বিশেষত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে প্রায়ই তিনি উত্তপ্ত আলোচনার শিকার। কী বিষয়? না, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি। এখন চান যে নি, তার তো প্রমাণ আমাদের হাতে নেই। আবার চেয়েছেন সেই প্রমাণও নেই। কেউ কেউ বলছেন, গড়ের মাঠে যেদিন সমাবেশ হয়, সেদিন রবীন্দ্রনাথ কলকাতাতেই ছিলেন না এবং সম্ভবত অসুস্থ ছিলেন। অসম্ভব নয়। তবে কথা হলো, একটি মানুষ, তিনি যতই শিক্ষিত, পরিচিত কিংবা প্রভাবশালী হন, তার পক্ষে সবসময়, সবকিছুতে কথা বলতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। (একটি বিশ্ববিদ্যালয় না হওয়ার জন্য সমাবেশ করতে হলো কেন, আজও আমার মাথায় আসে না। বিশেষত যারা এর আয়োজক তারা সবাই শিক্ষিত, ডাকসাইটে মানুষ তখন। তারা সত্যি এই পশ্চাদপদ এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় চাইছিলেন না কেন? অথচ হওয়া উচিত ছিল উল্টো।
ইংরেজরা চাইছিল এখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয়। যেটি কি না একটি মডেল বিশ্ববিদ্যালয় হবে। কিন্তু একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা একদিনের বিষয় নয়। এটি এক দীর্ঘ প্রক্রিয়া। পুরো সময় ধরেই রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে কিছু বলেছেন এমন কিছু আমি পাইনি। এর মানে কি তিনি কোনোভাবেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারে জড়িত হতে চাননি? হতে পারে। এ বিষয়টি নিয়ে কথা হয়তো বলা যেতে পারে। এই আলোচকদের দলেই একটি অংশ আছে, যারা আবার নজরুলকে রবীন্দ্রনাথের ওপরে স্থান দেয়। কেন এই বোকামিটা করে আমার বোধে আসে না। দুজনের দুই আসন। সেও হয়তো হতে পারে। তারা তাদের মতো থাকুন না! রবীন্দ্রনাথ তো নজরুলকে বলতেন ‘প্রতিভাবান বালক’। তা বয়সে তো তাই। আবার নজরুলের প্রতিভা তো কেউ অস্বীকার করছে না। তিনিও করেননি। নজরুল তো ‘কবিহারা’ লিখেছিলেন। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে। তাহলে যাদের নিয়ে এখন কাইজ্জা (অশুদ্ধ বাংলা), তারা কিন্তু নিজেদের মধ্যে সমস্যা দেখেননি। মুশকিল হয়, নজরুলকে তখন অনেকেই ‘কাফের’ আখ্যা দিয়েছিলেন।
মূল আলোচনা ছিল, রবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষদের ব্যবসা নিয়ে। তার বাবা কিংবা ঠাকুরদার বেশ্যা-পল্লীর ব্যবসা ছিল না। অন্তত এমন কোনো কিছু আমাদের কাছে নেই। তবে তাদের নানা ব্যবসা ছিল এবং তখনকার যুগে নটি, বেশ্যা-পল্লী ইত্যাদি আভিজাত্যের প্রতীক ছিল। মূলত, অভিজাত শ্রেণির মানুষদের বাইজি, নটি, বেশ্যা এগুলো না থাকলে সমাজে একটু গুরুত্ব কমে যেত। সেক্ষেত্রে, রবীন্দ্রনাথের একেবারে কাছের পূর্বপুরুষদের সেদিকে নজর না থাকা আশ্চর্যের হবে। কেননা, তারা অভিজাত এবং ওসব জায়গায় তাদের গমন হবে না, সেটি ভাবার কোনো কারণ নেই। কেননা, তাহলে অত ব্যয় অযথা করবেন কেন? কিন্তু এ জাতীয় ব্যবসা ছিল, তার কোনো দলিল আমাদের হাতে নেই।
একবার এক রাজা তার ছেলের জন্য বউ খুঁজছিলেন। শর্ত ছিল, হবু বউ (মা)কে নটিদের মতো চৌকস হতে হবে। নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী (ন সো রমণ ন হাম রমণীঃ ‘দেশ’, ০১ এপ্রিল, ২০০০; পৃষ্ঠা ৩২) আরও স্পষ্ট করে বলছেন, রাজা শুদ্ধোধন তার পুত্র সিদ্ধার্থের জন্য এমন এক বউ খুঁজছিলেন যার কলাকুশলতা হবে একটি গণিকার মতো। বলবেন না যে, সে তো অনেক কাল আগের। পণ্ডিতরা এও বলছেন সেই সেবাদাসী, নটি-বেশ্যা-বাইজি ইত্যাদি নানারূপে আমাদের সমাজে রয়ে গেছে এবং আধুনিক যে নৃত্য তার স্বীকৃতি ওই সেবাদাসী, বাইজিপাড়া এবং বেশ্যাতী-এর। এবং তারা অভিজাত শ্রেণির পৃষ্ঠপোষকতা সবসময় পেয়েছেন। আমরা জানি, সেবাদাসীদের কথা। মন্দিরে তারা থাকতেন এবং অভিজাত শ্রেণির মানুষরা তার রক্ষক। এই সেবাদাসীরা অবশ্যই অভিজাত শ্রেণির মানুষের ভোগের বস্তু ছিল। সেই ধারা অন্যভাবে, নানাভাবে অনেক দিন চলছিল কিংবা এখনো চলছে। আমরা নৃত্যপটীয়সী সোমা বা জিৎসোমার নাম জানি। তিনি অবশ্যই তখনকার সেরা নটি এবং নৃত্যশিল্পী এবং সে রাজার ভোগের সন্তান। খুব বেশি গভীরে যাওয়ার দরকার নেই। বাণী বসুর মৈত্রেয় জাতক (১৯৯৭) পড়লেই এ বিষয়ে ধারণা পাওয়া যাবে। মানে, সোমার মায়ের সঙ্গে ওই রাজার (অবৈধ?) সম্পর্ক (আবার ঠিক সম্পর্কও নয়; বরং রাজার ইচ্ছে)।
আমাদের দেশের সমস্যা হলো, যে যাকে ভালোবাসে, সে একেবারে জীবন, দেহ, মন, প্রাণ, যৌবন সব দিয়ে দেয়। রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রেও তাই। রবীন্দ্রনাথকে যারা ‘ভালোবাসে’, তারা তেড়ে আসেন, বিপক্ষে গেলে। সেজন্যই মনে হয়, আমার এক কঠিন বন্ধু আমাকে কটাক্ষ করেছেন, যেন রবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষের প্রশ্ন তুলে আমি অন্যায় করেছি। এতে তার যে সাহিত্য-রস সেটি থেকে আমি অনেক দূরে। তিনি শুধু রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য-রস পেয়েছেন। আঁকার-রস বোঝেননি। তার নৃত্য-ভাবনা কিংবা সুর তো নয়ই। সমাজ ভাবনার অবস্থাও তাই। মুশকিল হলো, রবীন্দ্রনাথের প্রশংসা করলে এরা খুশিতে রসগোল্লা থাকেন; একটু ‘সমালোচনা’ করলেই রসগোল্লা একবারে গোখড়া সাপের ফণার মতো ‘চমচম’ হয়ে যায়। রবীন্দ্রসংগীত শোনা, তাকে পছন্দ করা, আর তাকে পাঠ— এক জিনিস নয়। এটি একটু বোঝা জরুরি। যে তাকে পাঠ করবে, সে তাকে পুরোপুরি জানবে বা জানার চেষ্টা করবে। অবশ্যই ক্রিটিক্যালি পড়বে। রবীন্দ্রনাথ পড়া যাবে; ভালোবাসা যাবে, অমৃত বলে গ্রহণ করা যাবে, কিন্তু সমালোচনা করা যাবে না— এই মত অগ্রহণযোগ্য। একই কথা, তথাকথিত নজরুলপ্রেমিকদের জন্য।
এ পক্ষটি আবার ঠিক উল্টো। এখানে আর একটু সমস্যা হলো রাজনীতি। একদল লোক ধরেই নেয়, রবীন্দ্রনাথের সমালোচনা করা মানে, তিনি প্রগতির বিরুদ্ধে। আর এক দল ধর্মের লাইন খুঁজে পায়, নজরুলের মধ্যে। আবার যাই ‘দেশ’ পত্রিকার রেফারেন্সে, একটি জায়গায় (নব্বইয়ের দশক) বিজেপি নিয়ে রম্য আলোচনায় ‘দেশ’-এর লেখক বলেছিলেন, [তারা] নিপাতনে অসিদ্ধ; কিন্তু উৎপাটনে সিদ্ধ। এই দুই গোষ্ঠীর, মানে নজরুল-রবীন্দ্র দ্বন্দ্বকারী, ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য।



