৫০ বছরেও ‘শিশু’ শিশু একাডেমি
- আমলানির্ভরতা কমিয়ে সৃজনশীল সংস্কারের দাবি

২০২৪ সালের ৫ আগস্টে হামলায় মুছে গেছে শিশু একাডেমির সামনে থাকা ‘দুরন্ত’ ভাস্কর্যের অস্তিত্ব
দোয়েল চত্বরের পাশ দিয়ে শিশু একাডেমিতে প্রবেশ করলেই একসময় চোখে পড়ত ‘দুরন্ত’ ভাস্কর্যটি। চাকা নিয়ে ছুটে চলা শিশুর সেই ভাস্কর্য যেন প্রতিষ্ঠানটিরই প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল— গতি, তারুণ্য আর সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ের। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভেঙে ফেলা হয় ‘দুরন্ত’। একই সময়ে ভাঙচুর করা হয় শিশু একাডেমির প্রশাসনিক ভবন, মুদ্রণ শাখা, জাদুঘর, প্রশিক্ষণকক্ষসহ প্রায় সবকিছু। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সংস্কার হয়নি ভাস্কর্যটি। ভাঙা সেই স্তম্ভ যেন নীরবে জানান দিচ্ছে, কোথাও যেন থমকে গেছে শিশু একাডেমির গতিও। দাপ্তরিক কাজ ও দিবসকেন্দ্রিক কিছু আয়োজন নিয়মিতভাবে চললেও শিশু একাডেমিকে আরও সৃজনশীল, কার্যকর ও সময়োপযোগী করে তুলতে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট অনেকে। সাহিত্যিক দীপু মাহমুদ আগামীর সময়কে বললেন, ‘সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু প্রশাসনিক দক্ষতা দিয়ে নয়, বরং বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান, পেশাগত অভিজ্ঞতা এবং সৃজনশীল নেতৃত্বের মাধ্যমেও পরিচালিত হতে হয়। বর্তমানে শিশু একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্বে আছেন একজন প্রশাসন ক্যাডারের সরকারি কর্মকর্তা। ব্যক্তিগত যোগ্যতা বা প্রশাসনিক দক্ষতার প্রশ্ন এখানে বিবেচ্য নয়। মূল প্রশ্ন হলো, একটি জাতীয় শিশু-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে কেমন ধরনের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে রাষ্ট্র অগ্রাধিকার দেবে?’
১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ শিশু একাডেমি এ বছর ৫০-এ পা দিয়েছে। কিন্তু সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে এখনো দৃশ্যমান কোনো আয়োজন নেই। শিশু একাডেমির কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগামী অক্টোবরে ৫০ বছর পূর্তির অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে মন্ত্রণালয় থেকে সবকিছু চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হচ্ছে না। শিশু একাডেমির মহাপরিচালক মোছা. আরজু আরা বেগম আগামীর সময়কে বললেন, ‘আমরা ৫০ বছর উদযাপনের পরিকল্পনা করছি। কবে, কী কী আয়োজন হবে— এটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।’
পুরো রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কার না হলে শিশু একাডেমি আলাদা করে খুব ভালো হয়ে যাবে, এটা আশা করা যায় না।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিশু একাডেমির মূল উদ্দেশ্য দেশের শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের পাশাপাশি তাদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশে সহায়তা করা। বর্তমানে ৬৪টি জেলা এবং ছয়টি উপজেলা— কেশবপুর, পরশুরাম, মিঠাপুকুর, কুলাউড়া, শ্রীনগর ও বাবুগঞ্জে শিশু একাডেমির কার্যক্রম চলছে। নামে স্বায়ত্তশাসিত হলেও বাস্তবে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকাণ্ডের বড় একটি অংশ মন্ত্রণালয়নির্ভর। প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ কার্যক্রমের নীতিগত ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয় মন্ত্রণালয় পর্যায়ে।
শিশু একাডেমির কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে শিশুদের সচেতন করার লক্ষ্যে শিশু একাডেমিতে গড়ে তোলা হয়েছিল ‘শিশু জাদুঘর’। ৭২টি শোকেসে ত্রিমাত্রিক শিল্পকর্মের মাধ্যমে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় পর্যন্ত ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছিল সেখানে। হামলায় জাদুঘরটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকে এখনো তা চালু হয়নি। এ ছাড়া পোর্টেবল সুইমিংপুলে সাঁতার শেখানোর কার্যক্রমটি বন্ধ আছে। সবশেষ রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তীর অনুষ্ঠান করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এ বিষয়ে শিশু একাডেমির অনুষ্ঠান কর্মকর্তা মেহের আলীর কাছে জানতে চাইলে আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘নিয়মিত অনুষ্ঠানগুলো হচ্ছে। প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও চলমান আছে।’ তবে জুলাই অভ্যুত্থানে ভাঙচুরের কারণে যে ক্ষতি হয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন তিনি।
সাহিত্যিক দীপু মাহমুদ বললেন, ‘বাংলাদেশ শিশু একাডেমি কোনো সাধারণ প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান নয়। এটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল শিশুদের সাহিত্যচর্চা, শিল্পবোধ, সাংস্কৃতিক বিকাশ, কল্পনাশক্তি এবং মানবিক মূল্যবোধের বিকাশকে কেন্দ্র করে। শিশু একাডেমির কাজ শুধু শিশুদের জন্য কিছু কর্মসূচি পরিচালনা করা নয়, বরং ভবিষ্যৎ নাগরিকদের মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্য জাতীয় পরিবেশ তৈরি করার গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।’ শিশু একাডেমির বর্তমান কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অন্তত ছয়জন সাহিত্যিকের সঙ্গে কথা বলেছে আগামীর সময়। তাদের মধ্যে একজন সাবেক মহাপরিচালকও রয়েছেন। তবে তারা কেউই নাম প্রকাশ করে মন্তব্য করতে রাজি হননি। একজন সাহিত্যিক বললেন, ‘এগুলো বলে আর কী হবে? পুরো রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কার না হলে, শিশু একাডেমি আলাদা করে খুব ভালো হয়ে যাবে, এটা আশা করা যায় না।’
তবে শিশু একাডেমির কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে তাদের মধ্যে প্রায় অভিন্ন মত পাওয়া গেছে। তাদের ভাষ্য, পরিবর্তন আনতে হবে নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠানের গঠনতন্ত্রেও। শিশুদের সাহিত্য, সংস্কৃতি, মনস্তত্ত্ব ও সৃজনশীলতার সঙ্গে যাদের গভীরভাবে সম্পৃক্ততা রয়েছে, তাদের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে প্রশাসনিক ও সৃজনশীল— দুই ধরনের দক্ষতার সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার উপযোগী নেতৃত্ব প্রয়োজন।
শিশু একাডেমি বলছে, শিশুদের পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা, নাটক, সংগীত, চিত্রাঙ্কন, বিজ্ঞানচর্চা ও বিভিন্ন সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিশুদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করাই শিশু একাডেমির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। প্রতিষ্ঠানটি থেকে প্রকাশিত হয় শিশু পত্রিকাসহ বিভিন্ন প্রকাশনা। তবে এ পত্রিকা ও প্রকাশনাগুলোর মান নিয়েও সাহিত্য অঙ্গনে প্রশ্ন রয়েছে। ছড়াকার সুমন মাহমুদ আগামীর সময়কে বললেন, ‘শিশু পত্রিকাটি আরও মানসম্পন্ন করা উচিত। যোগ্য সম্পাদনা পর্ষদের মাধ্যমে এটি বের করা উচিত।’
৫০ বছরে পা দেওয়া বাংলাদেশ শিশু একাডেমির সামনে এখন প্রশ্ন শুধু সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের নয়; বরং আগামী ৫০ বছরে প্রতিষ্ঠানটি শিশুদের জন্য কেমন সাংস্কৃতিক ভবিষ্যৎ নির্মাণ করবে, সেটিও। শিশু একাডেমির মহাপরিচালক মোছা. আরজু আরা বেগম বললেন, ‘দুরন্ত ভাস্কর্যটি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, দ্রুতই এটি করা হবে। শিশু একাডেমি আরও গতিশীল ও সৃজনশীল হয়ে শিশুদের মনন বিকাশে কাজ করবে।’






