ঝরাপাতার সংসার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাবা আর দেরি না করে গাড়ি ছেড়ে দিল। রিয়ার ভিউ মিররে দেখলাম, দাদু হাত নেড়েই চলেছেন। আয়নায় ক্রমে ছোট হতে হতে হারিয়ে গেলেন তিনি। শহর ছেড়ে যতই দূরে যাচ্ছি, ততই রাস্তার দুপাশের খ্রুশ্চোভকা অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকগুলো কমে আসছিল। বসতবাড়ির জায়গা নিল কংক্রিট আর মরচে পড়া ধাতব জঙ্গল। মাইলকে মাইল চলল এ দৃশ্য। দোনেৎস্কের একসময়ের বিখ্যাত ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবশিষ্ট বলতে এ-ই আছে এখন। নিশ্চল, নিশ্চুপ। অথচ একসময় এই জায়গাগুলো ছিল নানান ছন্দের শব্দময় প্রাণবন্ত এক পৃথিবী। যন্ত্র আর মানুষ— দুয়ের মিলেমিশে তৈরি করা একটানা শব্দের বুনন। যন্ত্রের ছন্দময় ঘটঘটাং, ক্যান্টিনে শ্রমিকদের আড্ডার হৈ-হল্লোড় আর দূরে কোথাও চলতে থাকা কনভেয়ার বেল্টের নিরন্তর গুঞ্জন। সেইসব ছবি আর শব্দ এখন কেবলই স্মৃতি। দোনেৎস্ক ছেড়ে গ্রাম এলাকায় ঢোকার সময় বিদ্রোহীদের হাতে থাকা প্রথম সামরিক চেকপোস্ট পার হয়েছি আমরা। দোনেৎস্কের আশপাশের এই গ্রামাঞ্চল নিয়ে বলার মতো বিশেষ কিছু নেই। আমার যে বন্ধুরা পশ্চিম ইউক্রেন গিয়েছে, তাদের মুখে সেখানকার সৌন্দর্যের প্রশংসার শেষ নেই। আমি নিজে কখনো সেখানে যাইনি। ইউক্রেন নিয়ে আমার ভৌগোলিক জ্ঞান একেবারেই কম— দক্ষিণে ক্রাইমিয়া, পশ্চিমে দনিপ্রোপেত্রোভস্ক আর উত্তরে খারকিভ; এই হচ্ছে আমার দৌড়। আকাশ-পাতাল এমনসব ভাবনা ভিড় করছিল মনে। হঠাৎ ভারী অস্ত্রশস্ত্র হাতে থাকা একদল যুবককে দেখে যেন বাস্তবে ফিরলাম। যুবকরা ইশারা করে আমাদের গাড়ি থামাল। হাতে অস্ত্র থাকলেও সবার পরনের পোশাক বেসামরিক। আশপাশে জনবসতির চিহ্নমাত্র নেই। এরা কারা, কোত্থেকে এলো? সবাইকে ঘিরে ধরল ভয়। মুখ ফ্যাকাশে।
একে আশপাশে জনবসতি নেই, তার ওপর অস্ত্রধারীদের পরনে ইউনিফর্ম না থাকা ভয় বাড়িয়ে দিয়েছিল। বাবা গাড়ির জানালা দিয়ে মুখ বের করে ওদের সঙ্গে কথা বলল। ভাগ্য ভালো, দুয়েকটা হালকা প্রশ্ন করেই আমাদের ছেড়ে দেওয়া হলো। হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম আমরা। পথে এখন পর্যন্ত বিচ্ছিন্নতাবাদী যোদ্ধারা কোনো সমস্যা করেনি। বাবাকে এখনো ভানিয়া আঙ্কেলের পরিচিত সেই লোকদের নামও বলতে হয়নি। আমরা যেখানে থাকব, সেই দাচাটা কেমন হতে পারে তা নিয়ে একের পর এক কল্পনার ফানুস ওড়াচ্ছিল সাশা। বেচারা পরে না বেশি হতাশ হয়, সে জন্য বাবা ওকে বোঝানোর চেষ্টা করল। জানাল, অনেক দিন ধরেই সেখানে নিয়মিত কেউ থাকে না। মায়ের খালাতো ভাইবোনেরা কখনো-সখনো একবেলার জন্য বেড়াতে যায় মাত্র। ‘মনে করো, আমরা সামার ক্যাম্পে যাচ্ছি, সাশা। ওখানে তো বেশিদিন থাকব না,’ বলল বাবা।
কয়েকটা পুরনো, বাতিল কয়লা খনি পেরিয়ে এগিয়ে চললাম আমরা। প্রতিটি খনি এলাকার মধ্যে অদ্ভুতরকম মিল। খুঁড়ে জমিয়ে রাখা মাটির উঁচু উঁচু ঢিবি। কিছুটা পিরামিডের মতো দেখতে। পাশের গর্তগুলোতে পানি জমে লেকের চেহারা নিয়েছে। রোদ পড়ে ঝলমল করছিল লেকের পানি। চারপাশের ম্লান, বিবর্ণ পরিবেশের বিপরীতে চোখে পড়ারই মতো দৃশ্যটা।
দূরে খনি শ্রমিকদের ঘরবাড়ির ভাঙাচোরা অবয়ব চোখে পড়ছিল— পরিত্যক্ত, বিস্মৃত। কে বলবে এইসব ঘরে একসময় ছিল সুখে-দুঃখে ভরা সংসার! কে জানে কতদিন খালি পড়ে আছে। জানালার পাল্লা ভাঙাচোরা। দরজাগুলো হাট করে খোলা।
ইউক্রেন সেনাবাহিনীর লোকেরা দেখলাম পরিত্যক্ত ফ্ল্যাটবাড়িগুলোর একটাতে ক্যাম্প করেছে। সরকার-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ঢোকার পর এটাই আমাদের সামনে পড়া প্রথম চেকপয়েন্ট। ক্যাম্পের লোকেরা ইশারা করায় গাড়ি থামাল বাবা।
পেছনে তাকিয়ে বাবা আমাদের জানিয়ে দিল, সেনাদের সঙ্গে কথা বলার দরকার হলে সে-ই তা করবে। তাকে সাহায্য করারও দরকার নেই। গাড়ি থামানোর পর বাবাকে নামতে বলা হলো। এক তরুণ সেনা মিনিট কয়েক ধরে এটা-সেটা জানতে চাইল তার কাছে। আরও দুজন আমাদের গাড়ির ট্রাঙ্কে থাকা মালপত্রগুলো ঘেঁটে দেখছিল। বাবা গাড়িতে ফিরে এলে আগের সেনাটাই এবার সাশাকে নামতে বলল। শুনেই ‘না না’ বলে উঠল মা। তরুণ সেনাটা ভদ্রভাবে বুঝিয়ে বলল, ঘাবড়ানোর কিছু নেই। মা সাশার সঙ্গে যেতে চাইল তখন। কিন্তু সেনাটা মানা করল। জানাল, সাশাকে দূরে কোথাও নেওয়া হবে না। হলোও তাই। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ফিরে এলো সাশা। বলা হলো, এবার নিজেদের গন্তব্যে রওনা হতে পারি আমরা। সাশার জন্য কিন্তু তরুণ সেনার জেরা করার অভিজ্ঞতা মনে হলো এক মহা আনন্দের ব্যাপার। আমার ছোট ভাইটি এটা নিয়ে কথা বলেই যাচ্ছে। তাকে সেনার করা প্রশ্নগুলো ছিল খুবই সাধারণ। ‘তোমরা কোথায় যাচ্ছো?’, ‘গাড়ির ভেতরে কী আছে?’, ‘তোমাদের পরিবারে মানুষ কয়জন?’, ‘তোমাদের বাড়ি কোথায়?’ এইসব সাধারণ জিজ্ঞাসা। আসল বিষয়টা হলো, বাবা আর সাশা একই রকম উত্তর দেয় কিনা, তা মিলিয়ে দেখা। ভাগ্য ভালো, সাশা ইগরের কথা বলে বসেনি। অনেক দুশ্চিন্তা করলেও আমাদের যাত্রা অন্তত এখন পর্যন্ত মোটের ওপর ঝামেলাহীন। সরকার-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ঢোকার পর অবশ্য আরও কয়েকবার গাড়ি থামানো হয়েছে। তবে বাবাকে শুধু আইডি কার্ড দেখিয়ে আমাদের গন্তব্যের কথা জানাতে হয়েছে। অবশেষে আমরা ভলনোভাখায় পৌঁছলাম। ছোট একটা শহর। একটাই বড় রাস্তা। আমরা যেখানে যাচ্ছি, তা এখান থেকে গাড়িতে ১০ মিনিটও না। কয়েকটা পানির বোতল আর কোল্ড ড্রিংকস কিনতে একটা দোকানে থামল বাবা। মা সঙ্গে করে যথেষ্ট রুটি, কোলবাসা, চিজ, সালো, টমেটো আর শসা নিয়ে এসেছিল। দাচার গ্যাসের চুলা যদি কাজ না করে, সেটি ভেবেই তার এই প্রস্তুতি। কয়েক মিনিটের মধ্যেই গাড়ি দাচার মেইন গেটে থামল। বাবা শক্তপোক্ত লোহার গেটটা খুলে আধা-পাকা ড্রাইভওয়ে দিয়ে ভেতরে ঢুকলেন। গাড়িটা পার্ক করা হলো বাড়ির পেছনে। সাফ-সুতরো করার পর ঘরের কাছাকাছি নিয়ে আসা হবে। মালপত্র নামিয়ে ভেতরে নেওয়া সহজ হবে তাতে। দাচার পেছনের উঠোনটাকে মনে হলো ভাঙাচোরা লোহা-লক্কড়ের ভাগাড়। মরচে পড়া ভাঙা জানালার পাল্লা, বেড়ার অংশ, এমনকি একটা আস্ত পুরনো বিদ্যুতের খুঁটিসহ রাজ্যের জঞ্জাল পড়ে আছে। দেখে মনে হয়, ছোটবেলায় মায়ের খালাতো ভাইবোনদের এই জায়গাটা এত খাটিয়েছিল যে তারা এখনো সেটি পুরোপুরি ভুলতে পারেনি। তাই জমিটা এভাবে চরম অনাদরে ফেলে রেখেছে। নাকি এটাই দোনেৎস্কের শিল্পশ্রমিকদের স্বভাব? চাষের জমির চেয়ে হয়তো শিল্পকারখানাকেই তারা শ্রদ্ধাভক্তি করে বেশি। উঠানটার অনুভূতি শক্তি থাকলে সে চরম অভিমান করত, সন্দেহ নেই। বিপদের দিনে এ জমিটুকুই পরিবারের সবাইকে খাবার জুগিয়ে প্রাণে বাঁচিয়েছিল। আর দুঃসময় কেটে যাওয়ার পর তাকেই এমন অবহেলায় পড়ে থাকতে হলো।
পরবর্তী সংখ্যা থেকে প্রতি শুক্রবার উপন্যাসটি পড়ুন আগামীর সময় অনলাইনে






