তারাঝরা অনাথ আকাশে নিঃসঙ্গতার সুর বাজে

বইটি প্রকাশ করেছে কবি প্রকাশনী
বইটির নামকরণে পিয়াস মজিদ কী বোঝাতে চেয়েছেন, তা নিয়ে দুই ধরনের প্রসঙ্গ উত্থাপন করা যায়। প্রথমত তারাঝরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সম্ভাষণ’ কবিতায় উল্লেখ করা একটি ফুলের নাম:
সামনেই লতা ভরেছে সাদা ফুলে—
বিলিতি নাম, মনে থাকে না—
নাম দিয়েছি তারাঝরা;
অ্যারোমেটিক জুঁইয়ের বাংলা কোনো নাম না থাকায় রবীন্দ্রনাথ এ নামকরণ করেন। ফুলের গঠন ঠিক তারার মতোই। কবিতাটিতে রবীন্দ্রনাথ প্রেয়সীর জন্য তারাঝরা ফুল এনেছেন কিন্তু প্রশ্ন জাগে এ গ্রন্থে পিয়াস মজিদ কার জন্য তারাঝরার উল্লেখ করেছেন?
আবার তারাঝরা অনাথ আকাশের আক্ষরিক অর্থ অভিভাবকহীন, শূন্য বা নিঃসঙ্গ আকাশ। যে আকাশে কোনো তারা বা আশ্রয় নেই অথবা বিশালত্বের মাঝে একা দাঁড়িয়ে থাকা বিষণ্ন এক বিস্তৃতি। কবি তার জীবনের চল্লিশ বছর পেরিয়ে স্মৃতিচারণ করেন এবং ভাবেন তিনি মূলত একা। উত্তরটা একদিকে কবির নিজ সত্তা এবং অন্যদিকে একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবীর যান্ত্রিকতায় পর্যুদস্ত নিঃসঙ্গ মানুষের ব্যঞ্জনাময় রূপের প্রকাশ। তবে এ জীবনযন্ত্রণা শুধু দেশীয় সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়, তা বৈশ্বিক পরিস্থিতির পর্যবেক্ষণজাত। কবি যখন বলেন ‘:...ঢাকায় মুস্তাকিমে ভাজা হচ্ছে কাবাব, বৈরুতে-গাজায় একের পর এক /ফুটছে বোমারু ইসরাইল।’...(চন্দ্রা)
এ যুদ্ধময় পৃথিবীতে কবি বাসে চেপে যেদিকে যেতে চান সেদিকেই শান্তির আকুতি জানান। কিন্তু পৃথিবীর সর্বত্র বেলেল্লাময় বা উচ্ছৃঙ্খলতায় পরিপূর্ণ। এই অস্তমিত সময়ে এসে কবির গ্রেগর সামসারূপী সত্তার প্রকাশ ঘটছে: ‘প্রায় চল্লিশটি ডিসেম্বরের/ মৃতদেহ মাড়িয়ে, এখনও আমার ভাঙচুর অটুট আছে, ভাঙা ভাঙা /আমারই ভিত্তিভগ্নস্তূপে’। (প্রচ্ছন্ন, আচ্ছন্ন)
পরিচিত কারও মৃত্যুর দিকে তাকিয়ে কবি স্মৃতিময় গোলকধাঁধায় আটকে যান। ক্ষতময় জীবনের অকালে ঝরে যাওয়া জীবনগুলো তাকে বন্ধুহীন অস্তিত্বের স্বাদ দেয়। ঘুমিয়ে উঠেই তিনি হয়ে যান অন্য মানুষ। যান্ত্রিক নিয়মে ব্রাশ করে শুরু করেন রুটিন অনুযায়ী গতিশীল জীবন। নিজ সত্তা থেকে পালাতে চান প্রতিনিয়ত। কিন্তু পৃথিবীর নিয়মে বাধা পড়েন। যদিও প্রেমিকাকে আশ্রয় করে পালাতে চান লোকালয় থেকে। কিন্তু সেখানেও ভঙ্গুর পৃথিবীর ছোঁয়া লেগে ব্যর্থতার অনুরণন ধ্বনিত হয়। সব আকুল বাসনাকে ত্যাগ করতে হয়। আধুনিক মানুষের জীবন শুধু তার একার নয়। সে জীবনকে ভাগ করে নেয় সবাই মিলে। মনে একাকিত্ব বহন করলেও কবির জীবন, সময়, অর্থ, প্রতিভা ভাগ হয়ে যায় যান্ত্রিক নিয়মানুযায়ী। বলছেন: ‘হেলে পড়ে আছি গাছটার কাছে, কেউ নিচ্ছে পাতা, কেউ ছায়া, সর্বাত্মক দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে কেউ নিচ্ছে হেলে পড়ার বিরল প্রতিভা।’ (এক একটা শুক্রবার) স্বপ্নের মাঝে নিজেকে নিয়ে ভাবলেও বাস্তবে তা হয় না।
শরীরের মৃত্যুর আগেই ঘটে যায় মনের মৃত্যু। তবে মানুষ বাঁচে তীব্রভাবে। যদিও দুশ্চিন্তায় শেষরাতে ঘুম ভেঙে যায়। কবি বলেন: ‘বেঁচে থাকার মতো ব্যর্থতা আর সফলতা নিয়ে স্থবির বয়ে চলি নদী থেকে সমুদ্রগামী’ (ভার) বেঁচে থাকা যার কাছে ব্যর্থতা তিনি নদীর মতোই চড়াই-উতরাই পেরিয়ে জীবনের নিয়মে সাগরে মেশেন। যেন জীবন মানে শুধু মৃত্যুরূপী গন্তব্যে পৌঁছানো, আর কিছু নয়। গ্রামের সুবাস গায়ে দিয়ে নগরে ঢুকে পড়া মানুষের মতো আহাজারি করেন প্রতিনিয়ত।
পূর্ণিমার আকাশ নয় অমাবস্যাই তার কাছে সত্য। বলেন: ‘...আমি /সেই সীমাবদ্ধ শূন্য, আমি সেই অসীম অনন্ত; স্বপ্ন ও বাস্তবের ভারে মাত্র / দুটি চোখ অজস্র সন্তাপে ভিজে থাকে’ (কয়েদ কলোনি) কবি সত্তাজাত কথা বলতে দ্বিধায় আটকে যান। স্রোতের বিপরীতে বয়ে চলা কবিকে দেখে পৃথিবীর মানুষ তাকে পরিহাস করে। কিন্তু কবি স্মরণ করিয়ে দেন: ‘আমাকে পরিহাস করলে করো। জেনে রাখো-আমার স্বরে তোমার সময়ও কথা বলে।’ (মিনিমাল) বাস্তব ও ভাবনার ভয়াবহতায় কবি থেকে গেছেন একাকী শহরে। আর সবাই নিয়মের মাঝে আবদ্ধ। কিন্তু কবি মূলত সেসব মানুষের প্রতিনিধি হয়েই লিখে চলেন। ফলে তিনি পৃথিবীতে বেঁচে আছেন মূলত নিঃসঙ্গতাকে সঙ্গী করে। বলেন: ‘এখনও যেখানে আছি, চ্যাপটা কিন্তু আদতে সেও ভূগোল, তারাঝরা অনাথ আকাশে আমার জন্মের সুর নাকি শোনা যাবে’ (ক্রিমসন) কবিতার শাব্দিক নিয়মে ঝরে পড়ে বিষণ্নতার সুর। নাগরিক জীবনের বিশৃঙ্খলা ও যান্ত্রিক নিয়মের অবাধ বাড়াবাড়িতে কবির স্বভাবজাত মন হয়ে উঠেছে নিঃসঙ্গ। আর এ নিঃসঙ্গতাই শৈল্পিক নিয়মে আবদ্ধ হয়ে শুনিয়ে যায় সময়ের বিবিধ সুর।
তারাঝরা
অনাথ আকাশে। পিয়াস মজিদ।
প্রকাশক: কবি প্রকাশনী। প্রচ্ছদ: সব্যসাচী হাজরা।
পৃষ্ঠা: ৪৮। মূল্য: ২০০ টাকা।



