রুপালি পর্দায় জীবনানন্দ দাশ
- ঈদের সিনেমা হিসেবে মুক্তি পেয়ে হলগুলোতে মহাসমারোহে চলছে কবি জীবনানন্দ দাশকে উপজীব্য করে চলচ্চিত্র বনলতা সেন। অনেকেই এনেছে চলচ্চিত্রটির বিরুদ্ধে দুর্বোধ্যতার অভিযোগ। কাজললেখার পাঠকের জন্য চলচ্চিত্রটি নিয়ে কলম ধরেছেন পরিচালক মাসুদ হাসান উজ্জ্বল নিজেই

অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করেন, জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ কবিতাকে কেন্দ্র করে সিনেমা বানানোর কথা আমার মাথায় এলো কেন? প্রশ্নটি শুনলে আমি প্রায়ই ভাবি, এর সরল কোনো উত্তর নেই। কারণ, আমি আসলে কোনো কবিতাকে চলচ্চিত্রে রূপান্তর করতে চাইনি। আমি খুঁজতে চেয়েছি সেই শূন্যস্থানটিকে, যেখানে কবিতা জন্ম নেয়; সেই অন্ধকারখানিকে, যেখানে মানুষ তার হারিয়ে যাওয়া মুখগুলোর সন্ধান করে। আমার কাছে ‘বনলতা সেন’ হয়তোবা কোনো নারী নন। মানুষের দীর্ঘ ক্লান্ত যাত্রার শেষে কল্পিত এক আশ্রয়। এমন এক বিন্দু, যেখানে পৌঁছানোর জন্য আমরা সারা জীবন হাঁটি, অথচ পৌঁছানোর পর মুহূর্তেই বুঝতে পারি— সেটি কখনোই কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থান ছিল না।জীবনানন্দ দাশের কবিতার ভেতরে আমি সবসময় একটি গভীর অস্তিত্ববাদী বেদনা খুঁজে পাই। তার চরিত্ররা যেন পৃথিবীতে বাস করলেও পৃথিবীর নাগরিক নয়। তারা স্মৃতি, সময় এবং আকাঙ্ক্ষার মধ্যবর্তী কোনো ভূখণ্ডে বসবাস করে। আমার মনে হয়েছে, আধুনিক মানুষও ঠিক এমনই। প্রযুক্তি আমাদের সংযুক্ত করেছে, কিন্তু আমাদের একাকিত্ব কমায়নি। আমরা অসংখ্য মানুষের মুখ দেখি, অথচ একজন বনলতা সেনের খোঁজেই জীবন পার করে দিই।‘বনলতা সেন’ চলচ্চিত্রটি নির্মাণের ইচ্ছা মূলত সেখান থেকেই এসেছে। আমি দেখতে চেয়েছি, একজন মানুষ যদি তার কল্পনা, স্মৃতি এবং প্রেমের প্রতি সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করে, তাহলে তার ভেতরে কী ঘটে। সে কি মুক্তি পায়, নাকি আরও গভীর গোলকধাঁধায় প্রবেশ করে?আমার কাছে প্রেম কখনো সামাজিক সম্পর্কের বিষয় নয়; বরং একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক সংকট। আমরা যাকে ভালোবাসি, তাকে কি সত্যিই ভালোবাসি, নাকি তার মধ্যে নিজের হারিয়ে যাওয়া কোনো অংশকে খুঁজে ফিরি? ‘বনলতা সেন’-এর মোহীন চরিত্রটি সেই প্রশ্নেরই অনুসন্ধান। সে একজন নারীর সন্ধান করছে বলে মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে সে নিজেরই সন্ধান করছে। সে সময়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজের ভগ্ন স্মৃতিগুলো একত্র করার চেষ্টা করছে। খানিকটা ভাঙা কাচের টুকরো জোড়া দেওয়ার প্রচেষ্টার মতো। সুতরাং এর চলন যে লিনিয়ার হবে না, সে কথা বলাই বাহুল্য। তবুও এই চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে আমি বারবার অনুভব করেছি, মানুষ মূলত একটি গল্পনির্ভর প্রাণী। আমরা তথ্য দিয়ে নয়, গল্প দিয়ে বেঁচে থাকি। বাস্তবতা প্রায়ই অসহনীয় হয়ে ওঠে বলেই আমরা মিথ তৈরি করি। প্রেম, দেশ, ইতিহাস, ধর্ম— সবকিছুর ভেতরেই কোনো না কোনো বয়ান কাজ করে। ‘বনলতা সেন’ সেই বয়ানের উৎস খুঁজে দেখার একটি প্রচেষ্টা হবে হয়তো। জীবনানন্দের কবিতার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, তিনি কোনো উত্তর দেন না। তিনি রহস্যকে অক্ষত রাখেন। আমিও চলচ্চিত্রে সেই রহস্যকে অক্ষত রাখতে চেয়েছি। কারণ আমি বিশ্বাস করি, শিল্পের কাজ উত্তর দেওয়া নয়; বরং এমন কিছু প্রশ্ন তৈরি করা, যা দর্শকের ভেতরে দীর্ঘদিন প্রতিধ্বনিত হবে।এক অর্থে ‘বনলতা সেন’ আমার কাছে স্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতিরই লড়াই। মানুষ ভুলে যেতে চায়, আবার ভুলে যেতে পারে না। সে এগিয়ে যেতে চায়, আবার বারবার ফিরে তাকায়। এই দ্বন্দ্বই মানব অস্তিত্বের কেন্দ্র। আর সেই কেন্দ্রেই দাঁড়িয়ে আছে বনলতা সেন— কখনো একজন নারী, কখনো একটি শহর, কখনো একটি কবিতা, কখনো বা নিছক একটি মরীচিকা, অথবা অজস্র খণ্ডিত স্মৃতির টুকরো।হয়তো এ কারণেই আমি এই চলচ্চিত্র বানাতে চেয়েছি। জীবনানন্দের কবিতাকে ব্যাখ্যা করার জন্য নয়, বরং তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা অন্ধকারের সঙ্গে কিছুক্ষণ পাশাপাশি হাঁটার জন্য। কারণ, শেষ পর্যন্ত আমি বিশ্বাস করি, প্রত্যেক মানুষের জীবনেই একটি বনলতা সেন থাকে। কেউ তাকে খুঁজে পায়, কেউ পায় না। কিন্তু খোঁজার কাজটি কখনো শেষ হয় না। আর সম্ভবত শিল্পের জন্মও সেখানেই, যেখানে পাওয়া নয়, অনুসন্ধানটাই সবচেয়ে বড় সত্য। আরেকটি বিষয় সম্ভবত পরিষ্কার করা দরকার। আমি কখনোই চাইনি, বনলতা সেন জীবনানন্দ দাশের বিখ্যাত কবিতাটির একটি চলচ্চিত্রিক অনুবাদ হয়ে উঠুক। অনুবাদের একটি সীমাবদ্ধতা আছে, সেখানে মূল রচনার প্রতি একধরনের আনুগত্যের দায় থাকে। কিন্তু আমার আগ্রহ ছিল অন্যত্র। আমি চেয়েছি, এই চলচ্চিত্র যেন জীবনানন্দের কবিতাকে পুনরাবৃত্তি না করে, বরং সেই কবিতার মতোই একটি স্বতন্ত্র শিল্পসত্তা অর্জন করে। অর্থাৎ, বনলতা সেন চলচ্চিত্রটি যেন নিজেই একটি কবিতা হয়ে ওঠে। কবিতা ও গল্পের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। গল্প সাধারণত আমাদের একটি ঘটনার দিকে নিয়ে যায়; সেখানে কারণ ও ফলাফলের সম্পর্ক থাকে, চরিত্রের বিকাশ থাকে, একটি সূচনা, মধ্যভাগ এবং সমাপ্তি থাকে। কিন্তু কবিতা প্রায়ই এই নিয়মগুলো মানে না। কবিতা অনেক সময় কোনো ঘটনা নয়, একটি অনুভূতির স্থাপত্য। সেখানে অর্থ সরাসরি উপস্থিত থাকে না; বরং শব্দ, চিত্রকল্প, নৈঃশব্দ্য এবং অনুরণনের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে জন্ম নেয়।বনলতা সেন নির্মাণের সময় আমি সেই কবিতার যুক্তিকেই অনুসরণ করার চেষ্টা করেছি। এই চলচ্চিত্র দর্শককে কোনো সুস্পষ্ট ন্যারেটিভ বা গল্প বলার প্রতিশ্রুতি দেয় না; বরং এটি দর্শককে একটি মানসিক ও আবেগীয় অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে নিয়ে যেতে চায়। এখানে ঘটনা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেই ঘটনার পর মানুষের ভেতরে যে প্রতিধ্বনি তৈরি হয়।আমি সবসময় মনে করি, মানুষের অনুভূতির নিজস্ব কোনো সরলরৈখিক ব্যাকরণ নেই। স্মৃতি যেমন সময়ের ক্রম মেনে কাজ করে না, স্বপ্ন যেমন যুক্তির নিয়ম মেনে চলে না, তেমনি প্রেম-আকাঙ্ক্ষা কিংবা বিষণ্নতাও কোনো পূর্বনির্ধারিত কাঠামো অনুসরণ করে না। আমরা যখন কাউকে স্মরণ করি, তখন বর্তমানের সঙ্গে অতীত, বাস্তবের সঙ্গে কল্পনা, দৃশ্যমানের সঙ্গে অদৃশ্য— সবকিছু একাকার হয়ে যায়। মানুষের অন্তর্জগৎ আবেগ মূলত খণ্ডিত, বিচ্ছিন্ন এবং তরল। ফলে বনলতা সেন চলচ্চিত্রটিও সচেতনভাবেই কোনো গৎবাঁধা কাঠামো অনুসরণ করেনি। এটি একটি গল্পের চেয়ে বেশি একটি অনুভূতির মানচিত্র, একটি স্মৃতির গোলকধাঁধা, একটি দীর্ঘ স্বপ্নের মতো অভিজ্ঞতা। দর্শককে এখানে উত্তর খুঁজতে নয়, বরং অনুভব করতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কারণ, কখনো কখনো শিল্পের সবচেয়ে গভীর সত্য গল্পের মধ্যে নয়, গল্পের মধ্যবর্তী নীরবতাগুলোর মধ্যে লুকিয়ে থাকে।





