আহমদ রফিকের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার
বুদ্ধিজীবীতার একটা বড় নির্ণায়ক বা ক্রাইটেরিয়া হলো তাদের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা

আহমদ রফিক (১২ সেপ্টেম্বর ১৯২৯ - ২ অক্টোবর ২০২৫)
আহমদ রফিক (১২ সেপ্টেম্বর ১৯২৯ - ২ অক্টোবর ২০২৫) বাংলাদেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের এক অনন্য নাম। তিনি একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, অনুবাদক, সম্পাদক ও চিকিৎসক ছিলেন। ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শাহবাজপুরে তার জন্ম; পিতা আবদুল হামিদ, মাতা রহিমা খাতুন। নড়াইল মহকুমা হাই স্কুল থেকে প্রবেশিকা, সরকারি হরগঙ্গা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে ১৯৫৮ সালে এমবিবিএস পাশ করেন। ডাক্তারি পেশায় না গিয়ে তিনি সাহিত্য, গবেষণা ও সমাজচিন্তায় নিজেকে নিয়োজিত করেন।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তার অংশগ্রহণ ছিল ঐতিহাসিক। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, স্বাধীনতা সংগ্রাম, নজরুল, জীবনানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, চে গুয়েভারা এবং বাংলাদেশের কবিতা নিয়ে তার গবেষণা ও প্রবন্ধ নতুন প্রজন্মকে পথনির্দেশ করতে পারে। রবীন্দ্রনাথের জীবন ও লেখনী নিয়ে বিশেষ অবদানের জন্য কলকাতার টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট তাকে ‘রবীন্দ্রত্ত্বাচার্য’ উপাধিতে ভূষিত করে। তার প্রকাশিত গ্রন্থে কবিতা, ছোটগল্প, প্রবন্ধ-গবেষণা, শিল্পকলা, বিজ্ঞান ও অনুবাদ মিলিয়ে বিপুল কর্মযজ্ঞ রয়েছে। ‘নির্বাসিত নায়ক’, ‘বাউল মাটিতে মন’, ‘রক্তের নিসর্গে স্বদেশ’, ‘একুশের ইতিহাস আমাদের ইতিহাস’, ‘ভাষা আন্দোলন : ইতিহাস ও তাৎপর্য’, ‘রবীন্দ্রনাথের রাষ্ট্রচিন্তা ও বাংলাদেশ’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। বাংলা একাডেমি তার রচনাসমগ্র প্রকাশ শুরু করেছে; ২০২২ সালে প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়। পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৭৯), একুশে পদক (১৯৯৫), অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৫), রবীন্দ্রত্ত্বাচার্য উপাধি (১৯৯৭) এবং ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল আজীবন সম্মাননা (২০২২)। ২০২৫ সালের ২ অক্টোবর বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগে তিনি তার দেহ ইব্রাহিম কার্ডিয়াক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দান করে যান। ৪ অক্টোবর কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে হাজারো মানুষ তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানায়।
তিনি মূলত কবি, তবে কবিপরিচয় ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছে তার অনেকগুলো পরিচয়। সমাজ-গবেষক, নামকরা প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট, নিরপেক্ষ রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ভাষাসংগ্রামী। রবীন্দ্র গবেষক হিসেবে তিনি খ্যাতিমান দুই বাংলাতেই। কলকাতার ‘টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ থেকে পেয়েছেন ‘রবীন্দ্রতত্ত্বাচার্য’ উপাধি এবং স্বদেশে রবীন্দ্র পুরস্কার। সাহিত্যকর্মে সামগ্রিক অবদানের জন্য পেয়েছেন সৃজনশীলতায় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মান ‘একুশে পদক’। ব্যক্তিগত জীবন, রাজনৈতিক চিন্তা ও দর্শন, বুদ্ধিজীবীতার স্বরূপ, বর্তমান সময়ের সাহিত্যের ভুবন, বহুমাত্রিক বিষয়াদি নিয়ে তার মুখোমুখি হয়েছিলেন শিমুল সালাহ্উদ্দিন।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আলাপ শুরু করা যাক, আপনি পড়াশোনা করেছেন চিকিৎসাবিজ্ঞানে, গবেষণা করেছেন রবীন্দ্রনাথ নিয়ে, ট্যাগোর রিসার্চ সেন্টার থেকে রবীন্দ্রতত্ত্বাচার্য উপাধি পেয়েছেন। আপনার এতগুলো কবিতার বই, মোটমাট প্রায় পঞ্চাশের অধিক বইয়ের মধ্যে— চিকিৎসাবিজ্ঞান নিয়ে লেখা বইপত্র আছে, বাংলাভাষা সাহিত্য রাজনীতি রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে বইপত্র আছে, সংস্কৃতি নিয়ে প্রবন্ধাবলী রয়েছে, তো, আপনার কী মনে হয়না আপনার গবেষক পরিচয়ের আড়ালে আপনার কবি-পরিচয় বা কবিসত্ত্বা আসলে অনেক নিচে পড়ে গেলো! ঢাকা পড়ে গেলো!
আহমদ রফিক : এ বিষয়ে আমি আপনার সাথে পুরোপুরি একমত। আমাকে কবি হিসেবে অনেকে চেনেওনা, জানেওনা। অনেকে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম। এর কারণ হলো, নানা বিশেষ বিষয়ের কারণে, সমাজ, রাজনীতি, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ভাষা আন্দোলন, রবীন্দ্রনাথ বিষয়ক প্রবন্ধগুলো একটা তাগিদ হিসেবে এসেছিল। তাগিদ হিসেবে আসার কারণে কবিতা লেখা হলো মাঝে মধ্যে, আর প্রবন্ধ নিয়মিত তাই আমার প্রবন্ধের বইটা বেরুলো আগে। ১৯৫৬ সালে এসব লেখা, ৫৮ সালে বই হিসেবে বেরুলো।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : মানে শিল্প সংস্কৃতি জীবন যে বইটা?
আহমদ রফিক : হ্যাঁ, শিল্প সংস্কৃতির জীবন নামে বইটা। অথচ কবিতার বইটা বেরুলো ১৯৬৬ সালে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : নির্বাসিত নায়ক?
আহমদ রফিক : হ্যাঁ নির্বাসিত নায়ক।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : এবং দ্যাট ওয়াজ গুড। বইটা নিয়ে তো সেই সময় সিনিয়র অনেকেই প্রতিক্রিয়া দিয়েছিলেন, বিশেষত বামপন্থী অনেকেই! এবং অনেকেই লোকেট করেছিলেন যে এই কবিতাগুলো বিশেষ একধরনের বাকভঙ্গি নিয়ে আসছে!
আহমদ রফিক : আমি স্কুলজীবন থেকেই কবিতা লিখছিলাম। মেডিকেল কলেজে তখনকার দিনে, শিল্প সংস্কৃতি, কাব্য সাহিত্য নিয়ে ছাত্ররা খুব মশগুল ছিলো এবং এ বিষয়ে আগ্রহের কারণে মেডিকেলের লেখাপড়ার দিকে তাদের ঝোঁকটা কম ছিলো, একেক জন সাত আট বছরে পাশ করেছে এমন দৃষ্টান্ত আছে। কবিতা প্রিয় বিষয় হওয়া সত্ত্বেও ধীরেসুস্থে লিখেছি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : এই সময় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তো বৈরী ছিলো!
আহমদ রফিক : রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণেই আর কী! তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের স্টুডেন্টস ইউনিয়নের ম্যাগাজিনের একটু বাংলা অংশ রাখা হয়েছিল, আমাদের পড়াশুনা সব কিছু হতো ইংরেজিতে, বাংলা অংশে ছিলো একটি কবিতা একটি প্রবন্ধ একটি ছোটগল্প। আমি কিন্তু কবিতাটাই লিখেছিলাম। নাম ছিলো সংকেত। এটা ১৯৫০ সালের ঘটনা, তখন আমি ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র। এর আগে স্কুল ম্যাগাজিনে কবিতা, কলেজ ম্যাগাজিনে কবিতা বিষয়ক প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক পরিবেশের কারণে প্রবন্ধই একটু আগে প্রাধান্য পেয়েছে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : ঢাকা মেডিকেল কলেজ?
আহমদ রফিক : হ্যাঁ, তো আপনি একটু আগে যা বললেন এটা খুব সত্যি। মানে সঠিক কথা যে আমার কবিস্বত্ত্বা আমার গবেষকসত্ত্বা ও প্রাবন্ধিকসত্ত্বার আড়ালে ঢাকা পড়ে গেলো।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আপনার জন্ম ১২ সেপ্টেম্বর ১৯২৯ এ, এবং সেটা কুমিল্লায়। ১৯২৯ মানে হলো ৪৭ সালে দেশভাগের সময় আপনার বয়স ১৮, তারপর তো ভাষাআন্দোলনে আপনি বড় ভূমিকাই রেখেছেন, পাকিস্তান পিরিয়ডের পর ১৯৭১ এ আরেকটা—
আহমদ রফিক : আরেকটা বড় পরিবর্তন।
এই ছিয়াশি বছর বয়সে পৌঁছে, যে গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য, নদী, আকাশ, শস্য, এগুলো আমাকে খুব প্রভাবিত করেছিল শৈশবে।খুব ভালো লাগতো চেয়ে থাকতে
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : বড় পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশ হলো, তো আপনার যৌবন আসতে আসতেই তিনটা আমল আপনি দেখেছেন। আপনার শৈশবের কোন ঘটনাগুলো আপনার মনে পড়ে স্যার সবার আগে?
আহমদ রফিক : আমার জন্ম গ্রামে। গ্রামের নাম শাহবাজপুর।এটা, তখনকার দিনের কথাই বলি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমার নবীনগর থানার মেঘনাপাড়ের একটি গ্রাম।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : এখন কী বদলেছে আপনার সেই ঠিকানা?
আহমদ রফিক : শাহবাজপুর তো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মধ্যেই। ব্রাহ্মণবাড়িয়া এখন কুমিল্লার মধ্যে, কুমিল্লা তখন ত্রিপুরার মধ্যে। আমি যখন জন্মালাম তখন আমার জেলার নাম ছিলো ত্রিপুরা। তো, ঐসময় যেটা আমার মনে পড়ে, এখনো মনে হয়, এই ছিয়াশি বছর বয়সে পৌঁছে, যে গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য, নদী, আকাশ, শস্য, এগুলো আমাকে খুব প্রভাবিত করেছিল শৈশবে। খুব ভালো লাগতো চেয়ে থাকতে। দেখতে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আপনার ভেতরের যে কবি, সে কী এই শৈশবের স্মৃতির ভেতর দিয়ে জেগে উঠেছে বলে আপনি মনে করেন?
আহমদ রফিক : জেগে ওঠা নয় ঠিক, কিন্তু ভিত্তিটা তৈরি হচ্ছিলো। আরেকটা জিনিস সেটা আমি নিজেও তখন বুঝিনি, ঐসময়, যুক্তি ও সচেতনতা, যেটা হয়তো সেই বয়সে কেউ কেউ অর্জন করতে পারেনা, সেটা আমি অর্জন করেছিলাম। এবং রোমান্টিকতা।এটারই অংশ।তা না হলে শর্ষে ফুলের রঙ দেখে এত অভিভূত হওয়ার কোনতো কারণ ছিলোনা। এবং বাড়ির পাশের মেঘনা তখন বিশাল নদী, তার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং গভীরতা নিয়ে এত মুগ্ধতা। মেঘনা নিয়ে কবিতাও লিখেছি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : বাড়ির কাছেই ছিলো স্যার মেঘনা?
আহমদ রফিক : কাছাকাছিই ছিলো। খুব কাছেনা, কিন্তু দূরে তাকালে দেখা যেত।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : মানে কী স্যার!হাঁটা দুরত্বে ছিলো?
আহমদ রফিক : হ্যাঁ, হাঁটাদুরত্বে, বাড়ি থেকে দেখা যায়, কয়েক মিনিট হাঁটলেই। সেই মেঘনা দিয়ে পালের নৌকার যাওয়া, মহাজনি নৌকার যাওয়া, ধ্বসনামাপাড়, এগুলি আমার কবিতার মধ্যে আছে। তো, এইগুলো, আমার যতটুকু মনে আছে, শৈশবের স্মৃতি। এর আগেই আমার বাবা মারা গেলেন—
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : মানে আপনার আটবছর বয়সে?
আহমদ রফিক : না না, আটবছর বয়সে না, বাবা মারা গেছেন আরো আগে। ১৯৩৭ সালে আমরা গ্রাম থেকে চলে আসি।বাবা মারা গেছেন আমার দেড় বছর বয়সে, মেঘনায় ঝড়ে নৌকা ডুবিতে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আহা!
আহমদ রফিক : বাবা মারা যাবার পর স্বভাবতই আমার বড়ভাই যিনি তখন ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলে পড়তেন, সংসারের দায়ভার নিতে বাধ্য হন।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : বড় ভাইয়ের ইচ্ছায় ডাক্তারি পড়তে গেলেন! তার আগেই তো আসলে আপনি বিপ্লবী হয়ে গেছেন!
আহমদ রফিক : ডাক্তারি পড়তে গেলাম বড় ভাইয়ের—
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : প্ররোচনায়?
আহমদ রফিক : প্ররোচনা বলবো না, তার ইচ্ছায়। কিন্তু আসলে আমি ডাক্তারি পড়তেও যাই নাই। মুন্সিগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসে আমি কিন্তু ভর্তির ফরমফিলাপ করলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমেস্ট্রিতে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আচ্ছা।
আহমদ রফিক : সেই সঙ্গে তিনি (বড়ভাই) চাইলেন তাই আবার একটা ফর্মফিলাপ করে রাখলাম ঢাকা মেডিকেলে। উনি খুব চেয়েছিলেন আমি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ি। কিন্তু ইন্জিনিয়ারিং-এ আমার একেবারেই ঝোঁক ছিলোনা। আরেকটা কথা এখানে, আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস হারিয়েছি স্কুলজীবনেই।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : কিভাবে? জানতে চাই।
আহমদ রফিক : আমার মা সৈয়দ পরিবারের মেয়ে, কিন্তু গোঁড়া ছিলেন না। নামাজ রোজা নিয়ে চাপাচাপিও করতেন না। কিন্তু আমি মায়ের দেখাদেখি গ্রামে থাকাকালীন নামাজ রোজা করেছি ঐ কম বয়সে। ছোটোবয়সে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আচ্ছা।
আহমদ রফিক : পরে স্কুলে গিয়ে পড়াশোনার পরিপ্রেক্ষিতে, আমার মনে প্রশ্ন জাগলো। তার আগে গ্রামে থাকাকালীন একটি ঘটনা। খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমি তখন ত্রিশ রোজা রাখি, খুবই কম বয়স। শৈশব ও কৈশোরের মাঝামাঝি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : ত্রিশ রোজা করেছেন? আপনি?
আহমদ রফিক : ত্রিশ রোজা করেছি। নামাজ পড়েছি পাঁচ ওয়াক্ত। শবেবরাতের রাতে আমি শুনলাম—
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : এই রাতে মানুষের সারাবছরের রুটি রুজি নির্ধারিত হয়?
আহমদ রফিক : হ্যাঁ নির্ধারিত হয়, এটা নয়, শুনেছিলাম গ্রামের বিভিন্নজনের কাছে যে, সমস্ত প্রকৃতি মধ্যরাতে তার সৃষ্টিকর্তার কাছে মাথা নোয়ায়। তো, আমার খুব একটা ইচ্ছে জাগলো, সারারাত জেগে নামাজও পড়লাম, শবেবরাতের নামাজ, এবং দেখলাম যে আসলেই গাছপালা মাথা নোয়ায় কী না!গাছপালা ঘেরা বাড়ি, দেখলাম, একটি গাছও মাথা নোয়ালো না। আমার কাছে একটু ধাক্কাই লাগলো, নড়াইলে এসে পড়াশোনার পরিপ্রেক্ষিতে আমার মনে হলো যে ঈশ্বর যদি থাকবেনই তাহলে গরিব মানুষগুলোর অবস্থার পরিবর্তন ঘটে না কেনো? বা যারা অপরাধী, অপরাধ করে, সাজা পায়না কেন!এটার পেছনে আরেকজনের অবদান আছে সে হলো ওমর খৈয়াম। আমি স্কুল থেকে একটা বই নিয়েছিলাম। পোয়েমস অব শেলী এন্ড ওমর খৈয়াম। তখন থেকেই ওমর খৈয়ামের প্রতি আমার অনুরাগ, রুবাই গুলো পড়ে আমার খুব ভালো লেগেছিল এবং কান্তিচন্দ্র ঘোষের অনুবাদ এবং নরেন্দ্রদেবের অনুবাদ এই বইগুলো আমার কাছে ছিলো। ওমর খৈয়ামের এই ‘নাস্তিবাদচতুষ্পদীগুলা’ আমার মুখস্ত ছিলো।
আমি স্কুল থেকে একটা বই নিয়েছিলাম। পোয়েমস অব শেলী এন্ড ওমর খৈয়াম। তখন থেকেই ওমর খৈয়ামের প্রতি আমার অনুরাগ, রুবাই গুলো পড়ে আমার খুব ভালো লেগেছিল এবং কান্তিচন্দ্র ঘোষের অনুবাদ এবং নরেন্দ্রদেবের অনুবাদ এই বইগুলো আমার কাছে ছিলো
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : বাহ্।
আহমদ রফিক : ওইখানে, উনি বলছেন, ‘অস্তি নাস্তি শেষ করেছি দার্শনিকের গভীর জ্ঞান, বীজগণিতের সূত্ররেখায়, যৌবণে মোর ছিলো ধ্যান।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : বাহ!
আহমদ রফিক : এইগুলো বলে বলেছেন, ‘বিদ্যারসে যতই ডুবি, মনটা জানে মনেস্থির, দ্রাক্ষারসের জ্ঞানটা ছাড়া, রস জ্ঞানে নই গভীর’।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : কী দুর্দান্ত!
আহমদ রফিক : যাই হোক, ভদ্রলোক জ্যোতির্বিদ, বিজ্ঞানী এবং কবি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : হ্যাঁ।
আহমদ রফিক : এই সচেতনতা, রাজনীতিচেতনা কিংবা আমার ব্যক্তিচেতনায় এইদিকটা, খৈয়াম খুব প্রভাব ফেলেছিলো। সবমিলিয়ে নাইনটেনে পড়ার সময় আমি—
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আপনি সংস্কারমুক্ত হয়েছিলেন ঈশ্বর বিষয়ে বিশ্বাস নিয়ে!
আহমদ রফিক : ঈশ্বরে বিশ্বাস নাই আমার। সুতরাং ধনলাভের ব্যাপারটিও আমার কাছে প্রাসঙ্গিক নয়।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : তার মানে উচ্চমাধ্যমিকে তখন বিজ্ঞান বিভাগে পড়ছিলেন আপনি!
আহমদ রফিক : কিন্তু ওখানে ঐঘটনার কথা বলতে গিয়ে একথা বললাম যে আমি ঈশ্বরে বিশ্বাসী নই কিন্তু ঘটনায় বিশ্বাসী।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : ঘটনা?
আহমদ রফিক : ঘটনা মানে ইভেন্ট।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : ইভেন্ট?
আহমদ রফিক : ইভেন্ট, মানে ঘটনার অসম্ভব প্রভাব—
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : প্রভাব আছে?
আহমদ রফিক : হ্যাঁ, প্রভাব আছে মানুষের জীবন ধারায়। আছে জীবনের অনেক ক্ষেত্রে। আমার জীবনে যেমন আমি কেমিস্ট্রি পড়ার জন্য একেবারে মন-প্রাণ দিয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য জার্নিক সাহেবের, মানে হেড অব দি ডিপার্টমেন্ট এর রেকমেনডেশন জমা দিয়ে চলে এলাম। আমার সারা জীবন এই রোমান্টিকতার কারণে বৈষয়িকচিন্তা-ভাবনা কমছিলো। আমি এখনও কম বলেই মনে করি। তো, যাই হোক, আমি আর খোঁজ নিতে গেলাম না। আমি হলের রেসিডেন্ট হিসেবে ফর্মফিলাপ করে জমা দিলাম। আমি আর খবর নিতে গেলাম না। কারণ আমার যা রেজাল্ট, এই মেট্রিকে এবং আইএসসিতে স্ট্যান্ড করেছিলাম। কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরীক্ষা দিয়েছিলাম। মেট্রিক এবং আইএসসি দুটোই। তো স্বভাবতই ভর্তি হবো জার্নিক সাহেবের রেকমেন্ডেশনে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : জার্নিক সাহেব মানে?
আহমদ রফিক : ঐ কেমেস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের হেড অব দি ডিপার্টমেন্ট জার্নিক সাহেব ছিলেন তখন।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আচ্ছা, উনি আপনাকে রেকমেন্ড করে দিয়েছিলেন!
আহমদ রফিক : ঐ উনি মার্কশীটটা দেখে সঙ্গে সঙ্গে খসখস করে লিখে রেকমেনডেট করে দিলেন। সেই জন্য আমি আর খবর নিতে গেলাম না। তারপরে আমি যখন খবর নিতে গেলাম গিয়ে শুনি আমি সিলেক্টেড হয়েছি কিন্তু নন-রেসিডেন্ট স্টুডেন্ট হিসেবে। আমি বললাম ঐখানে হাউসটিউটরকে যে, আমার তো ঢাকা শহরে পরিচিত কেউ নাই।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : থাকার জায়গা নাই!
আহমদ রফিক : আমি হল ছাড়া থাকবো কোথায়? উনি বললেন, তুমি আগে এসে খবর নিলে না কেনো? আমি তখন এমনি বয়স্কদের মুখের উপর কথা বলতে অভ্যস্ত নই। বললাম না, আমার রেজাল্টই তো যথেষ্ট। আমাকে খবর নিতে হবে কেন?
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : খবর নিতে হবে কেন! হাহাহা! আচ্ছা!
আহমদ রফিক : আমি রাগ করে মনে মনে বললাম যে, থাকলো আমার কেমিস্ট্রিপড়া।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : কেমিস্ট্রি পড়লেনই না?
আহমদ রফিক : না, পড়লামই না। এটা একটা বড় ঘটনা আমার জীবনের। এজন্যে ভবিষ্যতের শিক্ষাবিপর্যয় রাজনৈতিক কারণে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : হ্যাঁ!
আহমদ রফিক : এই ঘটনার প্রসঙ্গে আরেক টি কথা বলি। একবার হঠাৎ করে মা’র ইচ্ছা হলো গ্রামে গিয়ে শ্বশুরের ভিটায় থাকবেন। আর কাউকে খুঁজে পাওয়া গেলনা। আমাকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন। আমি তখন ক্লাস থ্রি পরীক্ষা দিয়ে ফার্স্ট হয়ে ফোরে উঠেছি। ওখানে গিয়ে নামকরা স্কুল, ওখানে ভর্তি হওয়ার জন্য আমাকে আমার বড় চাচা, খুব নামী লোক, তখনকার দিনের রেওয়াজ অনুযায়ী আমাকে আবার থ্রিতে ভর্তি করে দিলেন্ ভালো হয়। তাতে পোক্ত হয়ে যাবো।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : পোক্ত হওয়ার জন্য ড্রপ!
আহমদ রফিক : উনি আবার আমাকে থ্রিতে ভর্তি করে দেবার কারণে আমি এক বছর পেছালাম। একবছর যদি আমি না পেছাতাম, তাহলে ১৯৫৪ সালের আগেই আমার পড়া শেষ হয়ে যায়। আমি আর ১৯৫৪ সালে বিরানব্বইর ক ধারা বিপর্যয়ে পড়ি না। আমি স্বাভাবিকভাবেই মেডিকেল পাস করি এবং আমার মেডিক্যালের ক্যারিয়ার নষ্ট হয়না। কিন্তু ঘটনাটি ঘটলো। ঘটনাই অঘটনটি ঘটালো?
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : ঘটনায় আপনার আস্থা আছে, বলেন আপনি!
আহমদ রফিক : ভীষণভাবে আস্থা আছে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আপনার মেডিক্যাল পড়তে, এই সব গণ্ডগোলসহ কত বছর লাগলো?
আহমদ রফিক : গণ্ডগোল মানে ৫৪ সালের ৩০ মে ৯২(ক) ধারা জারি হলো। মানে নব্য কলোনিয়াল শাসন শুরু হলো, ব্যাপক ধর পাকড়। তখন আমার নামে অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট। আমার এক মাস বাকী আছে পরীক্ষা দেয়ার। জুন মাসে পরীক্ষা। এ অবস্থায় আমি মধ্যরাতে হোস্টেল ছাড়লাম। অ্যারেস্ট ওয়ারেন্টের কথা জানলাম এই জন্য যে, আমার এক জুনিয়র ছাত্র আমাকে খুব পছন্দ করতো রাজনৈতিক কারণে। ও চাঁপাইনবাবগঞ্জেরছেলে, সাদেক নাম। ও আমাকে মধ্যরাতে এসে বললো, আমাদের ছেলে পিলেদের মাঝরাতে পড়ার অভ্যাস ছিলো এনাটমি আর ফিজিওলজি বইটই। আমাকে বললো যে, গেটের কাছে, রাত তখন বারোটা। বললো, ‘গেটের কাছে আপনার খোঁজ করতাছে আই.বি’র (ইন্টিলিজেন্স ব্র্যাঞ্চ) ওয়াচার’। আমি তখন মধ্যরাতে কি করবো আর। উঠে শার্টপ্যান্ট পরে ভেতরের রাস্তা দিয়ে হাসপাতালের স্টুডেন্টস কেবিনে চলে গেলাম। ওখানে রাতটা কাটিয়ে আমাদের আরেক ছাত্র, কবির নাম। পরবর্তী কালে সার্জন, মেডিক্যাল কলেজের প্রিন্সিপাল, বামরাজনীতি করতো। ওর একটা সাইকেল ছিলো, ওকে বললাম ভোরবেলায় আমাকে আজিমপুর কলোনীতে পৌঁছে দেবে। সে খুব ভোরে মানে, ঊষাকালে আর কি আমাকে সাইকেলের পেছনে বসিয়ে ওখানে আমার এক কাজিন, এ কে এন আহমদ, নামকরা লোক বাংলাদেশ ব্যাংকের সেকেন্ড গভর্নর, আমার ফার্স্টকাজিন—
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : উনার কাছে নিয়ে গেলো!
আহমদ রফিক : ওখানে দিনের বেলাটা থাকলাম তারপর অন্য জায়গায়। নানা জায়গায় দেড়বছর কাটিয়ে ফিরে এলাম। ফিরে আসবার পরে ভর্তি হতে দিচ্ছেনা, পলিটিক্যাল কারণে। অনেক চেষ্টা করে এক বছর সময় নষ্ট করে ভর্তি হয়ে সাতান্নতে পরীক্ষা দেই, রেজাল্ট বের হলো আটান্নর জানুয়ারিতে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আটান্নতে আপনি ডাক্তার হলেন?
আহমদ রফিক : ডাক্তার হলাম।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : প্র্যাকটিস করেছেন কোথায়?
আহমদ রফিক : তার পরে তো ইন্টার্নশিপ করে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করার কথা। পলিটিক্যাল কারণে ইন্টার্নশিপ দিলো না। কাজেই তখন আমি আবার দ্বিতীয়বার বললাম থাকলো আমার ডাক্তারী জীবন!
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : মেডিক্যাল লাইফ?
আহমদ রফিক : তখন মেডিক্যাল এসোসিয়েশন করি। ডক্টর নন্দীর সাথে খুব ঘনিষ্ঠতা। ডাক্তার নন্দীর রিকমেনডেশনেই হলো আমার প্রথম চাকরি। অ্যালবার্ট ফার্মাসিউটিক্যালস তখনকার দিনের বাংলাদেশে একনাম্বার ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি। ওখানে টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজারের দায়িত্ব নিলাম। অর্থাৎ মেডিক্যাল লাইনের বদলে ড্রাগ সেক্টরে চলে গেলাম। বাকী জীবনটা ড্রাগ সেক্টরেই চাকরি করলাম।
একত্রিশ তারিখে মৌলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে বার লাইব্রেরিতে’সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হলো। সেখানে আমি গিয়েছিলাম কয়েকজন বন্ধু-বান্ধব সঙ্গে নিয়ে। তখনই প্রথম ভাসানীকে দেখি
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : মানে এই যে ঘটনাগুলি, বিচিত্র অর্জন আসলে। আমরা একটু পিছিয়ে যাই। বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনে খুবই ওতোপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন আপনি। পার্টিকুলারলি সেই দিনের কথা যদি বলতেন।
আহমদ রফিক : কোনদিন?
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : একুশে ফেব্রুয়ারিতে ঘটনাটা ব্লাস্ট করলো।
আহমদ রফিক : একুশ তারিখ না বলে বিশ তারিখ বলা ভালো। তার আগে এক দু লাইনে বলি, সাতাশে জানুয়ারি, নাজিমুদ্দিন সাহেব তখন প্রধানমন্ত্রী, পাকিস্তানের। উনি পল্টন ময়দানে বক্তৃতা করলেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দুই হতে চলেছে। এবং বললেন, এটা আমার কথা না, এটা কায়দে আজমের কথা। কায়দে আজম মানে মোহাম্মদ আলী—
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : জিন্নাহ!
আহমদ রফিক : এটা শুনেই পরদিন আটাশে জানুয়ারি, একচুয়ালি ঊনত্রিশে জানুয়ারি থেকেই তো শুরু হলো, এই স্কুল কলেজগুলোতে শিক্ষায়তনে ধর্মঘট। সভা, সমাবেশ, মিছিল ইত্যাদি। একত্রিশ তারিখে মৌলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে বার লাইব্রেরিতে’সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হলো। সেখানে আমি গিয়েছিলাম কয়েকজন বন্ধু-বান্ধব সঙ্গে নিয়ে। তখনই প্রথম ভাসানীকে দেখি। তেল চিটচিটে বেতের টুপি পরা এবং জ্বালাময়ী বক্তৃতা। ঐসময়ে, মানে চার তারিখে বেলতলায়, তখন আমতলায় না, মিটিং এ সিদ্ধান্ত হলো যে একুশে ফেব্রুয়ারি পূর্ববঙ্গীয় ব্যবস্থাপক পরিষদের বাজেট অধিবেশন শুরু হবে কাজেই ঐদিন দেশব্যাপী—
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : একটা হরতাল বা একটা কিছু কর্মসূচী
আহমদ রফিক : না, কর্মসূচী হরতাল, মিছিল, সভা, প্রতিবাদ ইত্যাদি ইত্যাদি। এই কর্মসূচী সর্বদলীয় কমিটিও সমর্থন করলো। এটার প্রস্তুতি খুব ভাল ভাবে চলার পর যে দিনটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো— বিশে ফেব্রুয়ারি। বিশে ফেব্রুয়ারি বিকেল বেলা। আমার এখনো মনে পড়ে, চোখের সামনে ভাসে যে, সেক্রেটারিয়েট থেকে একটা ঘোড়ার গাড়ি, ঢাকা তখনও ঘোড়ার গাড়ি প্রধান, ঘোড়ার গাড়ির সামনে মাইক ফিট করে এগিয়ে আসছে, বলতে বলতে যে, ঢাকায় আগামী এক মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করা হলো। সভাসমাবেশ, মিছিল নিষিদ্ধ করা হলো। তাৎক্ষনিকভাবে আমাদের হোস্টেলে ছাত্র ঘোরাঘুরি, আড্ডা, জটলা, গল্প করছিলো। তখন ঐ জটলা থেকে শ্লোগান উঠলো— ১৪৪ ধারা মানি না, ১৪৪ ধারা ভাঙবো। ঐদিন সন্ধ্যায় আমি ফজলুল হক হলে গেলাম। আমার বন্ধুদের সঙ্গে আনোয়ারুল হক খান, গাজীউল হক, সাঈদ আতিকুল্লাহ, মোশাররফ হোসেন ইত্যাদি ওদের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম যে, ওরা কি ভাবছে? ওদেরও একই কথা, যে কোন মূল্যে ১৪৪ ধারা ভাঙতে হবে। এটা ছিলো সাধারণ ছাত্র সমাজের—
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : স্বতস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া!
আহমদ রফিক : হ্যাঁ, আমি কথাটা বারবার বলি যে, ছাত্রসমাজ খুব পরিকল্পনা করে—
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : এটা খুব প্লানড কিছু না তাহলে!
আহমদ রফিক : একদম না।
আবদুল মতিন সাহেব প্রস্তাব করলেন, শামসুল হক সাহেব ‘সর্বদলীয় কমিটি’র পক্ষ থেকে বলতে এসে ছাত্রছাত্রীদের বাঁধার সম্মুখীন হলেন এবং সিদ্ধান্ত হলো ১৪৪ ধারা ভাঙার। শুরু হয়ে গেল টিয়ার গ্যাস, লাঠিচার্জ
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : স্বতস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া!
আহমদ রফিক : হ্যাঁ, আমি কথাটা বারবার বলি যে, ছাত্রসমাজ খুব পরিকল্পনা করে—
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : এটা খুব প্লানড কিছু না তাহলে!
আহমদ রফিক : একদম না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : একদম স্বতস্ফূর্ত?
আহমদ রফিক : খুবই স্বতস্ফূর্ত। অথচ রাজনৈতিকরা চাইলো, সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্যরাও, যে, সামনে ইলেকশন, সম্ভাবনা আছে, কাজেই এখন সরকারের সঙ্গে সংঘাতে যাওয়া ঠিক হবে না। কাজেই ১৪৪ ধারা ভাঙা ঠিক হবে না। তারা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো এগারো-তিন ভোটে যে ১৪৪ ধারা ভাঙা হবে না। তিন ছাত্রনেতা যুবনেতা অলি আহাদ, আবদুল মতিন, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ভিপি গোলাম মওলা এরা আপত্তি জানালেন। বললেন যে, সাধারণ ছাত্ররা এটা মানবে না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : এই তিনজন ভোট দিলেন পক্ষে?
আহমদ রফিক : হ্যাঁ। আর বাস্তবে দেখা গেল যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসগুলো, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের হোস্টেলগুলো, ইডেন কলেজ, ঢাকা কলেজ, জগন্নাথ কলেজ বিশেষ করে মিটফোর্ডের, ‘মিটফোর্ড মেডিক্যাল স্কুল’ নাম ছিলো তখন, ছাত্রসমাজ একেবারে একপায়ে খাঁড়া যে, তারা ১৪৪ ধারা ভাঙবে এবং একুশের কর্মসূচী গ্রহণ করবে। এ উপলক্ষ্যে প্রতিটি সভাসমিতিতে, সভা-সমাবেশে আমি উপস্থিত ছিলাম কখনো একা, কখনো বন্ধুবান্ধব সঙ্গে নিয়ে।পরদিন সকালে আমতলার মিটিং-এ সিদ্ধান্ত হলো, গাজীউল হকের সভাপতিত্বে, আবদুল মতিন সাহেব প্রস্তাব করলেন, শামসুল হক সাহেব ‘সর্বদলীয় কমিটি’র পক্ষ থেকে বলতে এসে ছাত্রছাত্রীদের বাঁধার সম্মুখীন হলেন এবং সিদ্ধান্ত হলো ১৪৪ ধারা ভাঙার। শুরু হয়ে গেল টিয়ার গ্যাস, লাঠিচার্জ। আমার এখনও মনে আছে, ট্রাকে দেখা যাচ্ছে উত্তোলিত বজ্রমুষ্ঠি। আমার বন্ধু, মানে মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র আলী আজমল, আমার বন্ধু, আনোয়ারুল হক খান, হাবিবুর রহমান এবং আরো বেশ কয়েকজন চেনামুখ এবং অনেকেই গ্রেফতার বরণ করলো। আমি গ্রেফতারবরণ করলাম না ইচ্ছে করেই যে, কাজ করতে হলে কিছু ছেলেপেলের বাইরে থাকা দরকার। সেদিন সবারই লক্ষ্য ছিলো মেডিক্যাল হোস্টেল এবং সেখান থেকে পরিষদ ভবনের কাছাকাছি পৌঁছানো। ওখানে একটা শ্লোগানই ছিলো ‘চলো, চলো, অ্যাসেম্বলি চলো, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, রাজবন্দীদের মুক্তি চাই।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : স্যার, আপনার কি এই শ্লোগানগুলোর বাইরে আর কোন শ্লোগান মনে আছে? ২০ তারিখের আগে, একুশ তারিখের আগের শ্লোগান এবং পরের শ্লোগান?
আহমদ রফিক : আগের শ্লোগানগুলির মধ্যে মূলত ছিলো, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘রাজবন্দীদের মুক্তি চাই’, ‘সর্বস্তরে বাংলা চালু করো’— আর ছিলো পুলিশি জুলুম চলবে না এবং কোন কোন মিছিলে তখন শ্লোগান ছিলো যে, ‘উর্দু বাংলা ভাই ভাই’— এটা মানে কিছুটা আপসকামী। কিন্তু খুব কম শোনা গেছে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : ’উর্দু বাংলা ভাই ভাই’ কিন্তু আমরা বাংলা চাই?
আহমদ রফিক : হ্যাঁ, বাংলা চাই। এবং যেজন্য এর আগে দেখা গেলো, মতিন সাহেব আমাকে বললেন যে, তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারীরা পোস্টকার্ডে বাংলা নাই দেখে প্রতিবাদ করলো, সভা করলো। সেখানেও ছিলো ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, উর্দুর সঙ্গে বিরোধ নাই’। তবে সেটা ১৯৪৭ এর নভেম্বরে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আচ্ছা
আহমদ রফিক : মানে একটা কম্প্রোমাইজিং। পরবর্তী সময়ে শ্লোগানগুলি অবশ্য ‘পুলিশি জুলুম চলবে না’। ‘উর্দুর জুলুম চলবেনা’, ‘লীগশাহীর পতন চাই’, ‘রক্তের বদলে রক্ত চাই’, ‘নুরুল আমিনের কল্লা চাই’ ইত্যাদি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আচ্ছা, আমতলার জমায়েতের কথা বলছিলেন—
আহমদ রফিক : আমার মনে আছে এখনো যে, মেডিকেল হোস্টেলে জমায়েতের চেষ্টা ছিলো কাঠের গেট খোলা, তা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। পুলিশের লাঠি খেয়ে আবার ফিরে আসা ঢেউয়ের মতোন। এগোনো, পেছানো। পরে এলিসকমিশনের রিপোর্ট দেখে জানলাম ওরা তিনটা বিশ মিনিটে গুলি চালিয়েছিল। এখন কথাটা হলো গুলি চালানোর মতো পরিস্থিতি ছিলো কি না। আমরা নিরস্ত্র এবং পুলিশ সশস্ত্র। আমাদের চেষ্টা তখন চলছিল শুধু পরিষদ ভবনের সামনে যাওয়ার এবং তিনটার সময় অধিবেশন শুরু হবে, তিনটার আগে পৌঁছানো এবং পরিষদ সদস্যদের কাছ থেকে কথা নেওয়া মানে—
বাইশ তারিখের মিছিলের পরে আমাদের হোস্টেলে তেইশ তারিখ সকালবেলা আমরা কিছু সিনিয়র ছাত্র সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা এক রাতের শ্রমে ছোট্ট একটা শহীদ মিনার বানাই
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : বাংলার পক্ষে সম্মতি আদায় করা!
আহমদ রফিক : সম্মতি আদায় করা যে তারা বাংলা রাষ্ট্রভাষার পক্ষে প্রস্তাব গ্রহণ করবে এবং গণপরিষদে সেটা পাশ করানোর চেষ্টা করবে— এটাই ছিলো দাবী। সেইখানে গুলি চালানোর তো কোন প্রয়োজন ছিলো না। যদিও এলিস সাহেব চেষ্টা করলেন এটাকে জায়েজ করতে এই বলে যে, ‘গুলি চালানো যথার্থ হইয়াছিলো’।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : এরপরতো ছাত্র সমাজ আরো ফুঁসে উঠলো—
আহমদ রফিক : এখানে আরেকটি ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা না হলে আরো অনেক কিছু হতো না। সেটা হলো বাইশ তারিখের মিছিলের পরে আমাদের হোস্টেলে তেইশ তারিখ সকালবেলা আমরা কিছু সিনিয়র ছাত্র সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা এক রাতের শ্রমে ছোট্ট একটা শহীদ মিনার বানাই।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : এক রাতেই বানিয়েছিলেন?
আহমদ রফিক : হ্যাঁ, এক রাতেই তৈরি হলো। এবং এই শহীদ মিনার মানুষকে এতো আকর্ষণ করলো এবং ঢাকাইয়া মহল্লার অধিবাসীরা এত পছন্দ করেছিলো যে—
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : দলে দলে লোকজন গিয়ে দেখলো?
আহমদ রফিক : অবস্থা দেখে ছাব্বিশ তারিখে হোস্টেল ঘেরাও করে পুলিশ এটা ভেঙে শেষ ইটের টুকরোটি নিয়ে চলে যায়।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : স্যার, ঐ শহীদ মিনার যে, সেটির ডিজাইন কে করেছিলেন?
আহমদ রফিক : এটা করেছিলেন বদরুল আলম। এমনকী তাতে সাঁটা যে স্মৃতিফলক করে সেখানে লেখা হয়েছিলো ‘শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ’। আমরা কিন্তু ‘মিনার’ বলিনি। ‘শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ’ লোকের মুখে মুখে—
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : মিনার হয়ে গেল?
আহমদ রফিক : এটা আমরা চাইনি। ‘শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ’ এই ফলকটাও বদরুলের হাতে লেখা ছিল।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : বাহ্। স্যার, এই ঘটনার সময় তো আপনি ছাত্র এবং—
আহমদ রফিক : তৃতীয় বর্ষের ছাত্র।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। আটান্ন সালে আপনার জীবনে দুইটা ঘটনা ঘটেছে। একটা হলো আপনি ডাক্তার হলেন, আরেকটা আপনার প্রথম প্রবন্ধের বইটা বের হলো। বইটা কিভাবে বের হলো?
আহমদ রফিক : এই প্রবন্ধগুলো মূলত রাজনৈতিক ভাষ্যে সাহিত্যকথা। সাহিত্য-রাজনীতির কম্বিনেশন বলা চলে। এইগুলো লেখার পর আমার মনে হলো যে একটা প্রবন্ধের বই বের করা উচিত, তখন কোহিনূর লাইব্রেরি ছিলো পুরনো ঢাকায় মানে আশেক লেনে, তো ওইখানে ওরাই প্রথম আমার বইটা গরজ করে নিয়ে প্রকাশ করেছিল। কিন্তু প্রচ্ছদটা ভালো হয়নি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আপনার পছন্দ হয়নি?
আহমদ রফিক : না, কাজী আবুল কাশেমের করা। প্রচ্ছদ ভালো ছিলো না। কিন্তু ছাপাটাপা খুব সুন্দর ছিলো। এই বইটা আমার প্রথম বই। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ নিয়ে, যেমন— কবিতার ওপর, ‘কাব্যের স্বপক্ষে’। আমাদের সাহিত্য নিয়ে দুটো তিনটে প্রবন্ধ। একটা ছিলো আমাদের কবিতা। আরেকটা হলো ‘কথাশিল্প, জীবন, প্রত্যয় ও সাফল্য’— কথাশিল্প নিয়ে। এই, তখন তো আমাদের প্রকাশনায় খুব কম বই।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আপনার কবিতার বই তখনো বের হয়নি?
আহমদ রফিক : সে বই পরে বের হলো। মানে কবিতার বইটা। প্রবন্ধের বইটাতে একটু কড়া সমালোচনাই ছিলো আমাদের কবিতার মান এবং ছোটগল্পের মানটান ইত্যাদি নিয়ে। যেজন্য বইটা লেখার পরিপ্রেক্ষিতে সাহিত্যজগতে আমার অনেক শত্রু তৈরি হলো। মানে অনেক বন্ধু শত্রু হলো।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : এর আগে যারা বন্ধু ছিলো তারা শত্রু হয়ে গেল?
আহমদ রফিক : যেমন হাসান হাফিজুর রহমান, ওর সঙ্গে আমার তুই তুই সম্পর্ক, হাসান আমাকে বললো, তুই আমার সম্পর্কে এমন করে লিখেছিস? শামসুর রাহমান ক্রুদ্ধ হলো।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : শামসুর রাহমান ক্রুদ্ধ হলেন?
আহমদ রফিক : হ্যাঁ, শামসুর রাহমান ক্রুদ্ধ হলেন, মুনীর চৌধুরী ক্রুদ্ধ হলেন।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : উনাদের মতোন মানুষেরাও সমালোচনা নিতে পারেন নাই?
আহমদ রফিক : না। ওঁরানিতে পারেন নাই।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : উনারা তো তখন উচ্চ আসনে আসীন। উনাদের ক্রুদ্ধ করে আপনি লিখেছেন কিভাবে?
আহমদ রফিক : কিছু সমস্যা হয়েছে। কিন্তু আমি তো লিখেছি। আরেকটা ঘটনা বলি, মানে সাধারণত এসব কথা লেখা যায় না তো, বলাও উচিত নয়।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : হ্যাঁ, বলেন—
প্রকাশকের সাথে পরিচয়ের পরিপ্রেক্ষিতে আমার হঠাৎ মনে হলো যে, অনেকগুলো কবিতা লেখা হলো, অনেকদিন ধরে ধীরে সুস্থে। বই বেরোনোর দরকার। ওরা রাজী হলো এক কথায়। চার ফর্মার বই মানে চৌষট্টি পৃষ্ঠা। এই ‘নির্বাসিত নায়ক’
আহমদ রফিক : মাহবুবা জামাল জাহেদী তখন বাম রাজনীতির লোক। আমাদের ভাষা আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা ছিলো তার। ও তখন পাকিস্তান অবজার্ভারে সাহিত্য পাতার সম্পাদক। আমার প্রকাশক তাকে বই পাঠিয়েছে আমাকে না জানিয়েই রিভিউর জন্য। অনেক দিন হল রিভিউ ছাপা হয় না। প্রকাশক আমাকে বলে আপনি একটু কথা বললে ভালো হতো, আপনার তো পরিচিত মানুষ। আমি জাহেদীকে ফোন করলাম। জাহেদী আমাকে বললো, ‘রফিক সাহেব বইটা তো আমার কাছে ভালোই লেগেছিলো। তো বইটা আমি মুনীর ভাইকে (মুনীর চৌধুরী) দিয়েছিলাম মানে, রিভিউ করার জন্য। মুনীর ভাই তো ওটা দিচ্ছেন না’। আমি বললাম, উনি যদি না দেন আপনার তো সাহিত্যসম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব বইটি উনার কাছ থেকে ফেরত নিয়ে অন্য কারও কাছে রিভিউ করার জন্য দেয়া। কিন্তু মজাটা হলো নানা কারণে বাংলাদেশের কোথাও বইটির সমালোচনা, আলোচনা হয়নি। কোথাও না। এবং কোলকাতার দেশ পত্রিকায় পাঠিয়েছিল আমার প্রকাশক। দেশ-এ এটার খুব প্রশস্তিমূলক আলোচনা কেউ করেছিল বইটার। খুব প্রশংসা করে শুধু এক জায়গায় ওরা, আন্দাজ করতে পারেন আপনি, এক জায়গায় ওরা দ্বিমত পোষণ করলো। বললো যে, বঙ্কিমচন্দ্র সম্বন্ধে উনি যে কথা লিখেছেন, সে সম্বন্ধে আমরা একমত নই।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : বাহ্। খুব ভালো। তাদের মতামত তারা দিয়েছে অন্তত।
আহমদ রফিক : সেইখানে আরো তিনটা গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ ছিলো একটা হলো কালিপ্রসন্ন সিংহের উপরে ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’। দুই নম্বর হলো দীনবন্দু মিত্রর উপরে, তিন নম্বর হলো মীর মশাররফ হোসেনের উপরে। মীর মশাররফ হোসেনের ওপর ওইটা আমার প্রথম লেখা, মানে পূর্ব বাংলায়।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : প্রথম লেখা? কেউ লেখেনি এর আগে?
আহমদ রফিক : মুনীর চৌধুরীর লেখা এরপর বেরিয়েছে, চারবছর পর।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : চারবছর পর!
আহমদ রফিক : ওই উপলক্ষে মুনীর চৌধুরী আমাকে একদিন ফোন করেছিলেন। কি উপলক্ষে আমার মনে নেই। অনেক কিছু নিয়ে কথা হলো। তার সুন্দর ভাষায় উনি আমাকে বললেন ফোনে, ‘আমি তো আপনার সম্বন্ধে আমার বইতে কিছু নিন্দে মন্দ করেছি’। ঠিক এই ভাষায়। আমি বললাম নিন্দে মন্দ তো করতেই পারেন আপনি। আমি আমার মতো করে লিখেছি। আপনি, আপনার মতো করে লিখেছেন। তাতে অসুবিধা কোথায়? তখন বোঝা গেলো উনি বইটা পড়েছিলেন। না পড়লে উনি এটা বলতেন না। ও আরেকটা কথা, উনি বললেন, ‘মীর মশাররফ হোসেনকে আপনি অনেক বেশি মার্কস দিয়েছেন,
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আচ্ছা।
আহমদ রফিক : তো, উনি না পড়লে কিভাবে জানলেন আমি মীর মশাররফ হোসেনকে অনেক মার্কস দিয়েছি! তাকে উপরে তুলে দিয়েছি। বইটা নিশ্চয়ই উনি পড়েছিলেন। কিন্তু তার ছোটগল্প সম্বন্ধে কিছু মন্তব্য ছিলো সেজন্য তিনি বইটার সমালোচনা করেন নাই।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আচ্ছা। শামসুর রাহমান, মুনীর চৌধুরী এইরকম সব মানুষদের ক্ষেপিয়ে তোলার আট বছর পর আপনার প্রথম কবিতার বইটি বেরুলো, ‘নির্বাসিত নায়ক’।
আহমদ রফিক : হ্যাঁ।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : এর আগে আপনি একটা ইন্টারভিউতে বলেছিলেন যেটা, আপনি বিশেষ গুরুত্ব দেন, আপনার এই বইটাকে!
আহমদ রফিক : হ্যাঁ।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : প্রথম কবিতার বইটা কিভাবে বের হলো?
আহমদ রফিক : ওই যে আমার মনে হয় ঢাকা শহরটাকে প্রাধান্য করে উঠতি শহরে এবং শহুরে সমাজ সামন্ততান্ত্রিক এবং নব্য পুঁজিবাদী যে দূষিত ব্যবস্থা এইগুলোর বিরুদ্ধেই কবিতাগুলো লেখা।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : এবং অনেক বেশি রাজনৈতিক চেতনাবাহী?
আহমদ রফিক : হ্যাঁ। রাজনৈতিক চেতনার কবিতা। ইতিমধ্যে পরিচয় হলো কোহিনূর লাইব্রেরীর সঙ্গে। আমার প্রবন্ধের বইয়ের প্রকাশক। ওই বইটা বিক্রি হলো ভালো। পরবর্তী সময়ে বইটা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের রেফারেন্স তালিকায় ছিলো। যারা এই বইটা পড়েছেন ছাত্রাবস্থায়, প্রফেসর আকরাম হোসেন, দ্বিতীয়জন হলেন কবি আসাদ চৌধুরী, অন্যজন হলেন কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন। সেলিনা হোসেন আমাকে বলেছিলেন, আপনার ওই বইয়ের অনেক লাইন আমার মুখস্থ ছিলো। প্রকাশকের সাথে পরিচয়ের পরিপ্রেক্ষিতে আমার হঠাৎ মনে হলো যে, অনেকগুলো কবিতা লেখা হলো, অনেকদিন ধরে ধীরে সুস্থে। বই বেরোনোর দরকার। ওরা রাজী হলো এক কথায়। চার ফর্মার বই মানে চৌষট্টি পৃষ্ঠা। এই ‘নির্বাসিত নায়ক’। এটার প্রচ্ছদ করেছিলো চট্টগ্রামের শিল্পী আশীষ চৌধুরী। আশীষের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব ওই উপলক্ষে এবং আরেকটা মজার কথা আপনাকে বলি যে আমার কাছ থেকে প্রচ্ছদ আঁকার জন্য একটি পয়সাও নেয়নি। বললো যে, ‘আমি শুধু এর বদলে এক কপি ‘শিল্প-সংস্কৃতি’ চাই।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আগের বইটা? এক কপি চাই?
আহমদ রফিক : এক কপি চাই আর আপনাকে এক পয়সা দিতে হবে না। মানে আমাকে কোন পারিশ্রমিক দিতে হবে না।
হয়তো যারা কবি-সাহিত্যিক তারা বেশিরভাগই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তারা বলে, আপনি ডাক্তার। মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র। আপনি আবার কী সাহিত্য করবেন?
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : বাহ্
আহমদ রফিক : পরবর্তী কবিতার বইটার কভার করেছিলেন কাইয়ূম চৌধুরী।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : দ্বিতীয় বই?
আহমদ রফিক : দ্বিতীয় এবং তৃতীয় বইয়ের। দ্বিতীয় বই ‘বাউল মাটিতে মন’ আর তৃতীয় বই’রক্তের নিসর্গে স্বদেশ’। কাইয়ূম চৌধুরীর করা।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : ষাটের দশক বলেন, সত্তরের দশক বলেন এবং তারপরও আশির দশকের অনেককে নিয়ে লিখেছেন আপনি। আপনার কবিতা নিয়ে সে রকম কেউ কী লিখেছে?
আহমদ রফিক : না, লেখেনি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : এই যে না লেখা, এইটা কিন্তু একধরণের নীরব ইগনোরেন্স। আমার মনে হয়।
আহমদ রফিক : হ্যাঁ। নিশ্চয়ই।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : এটা নিয়ে আপনার কোন বেদনাবোধ আছে?
আহমদ রফিক : একটু তো থাকবেই। কারণ, আমার কথা হলো যে তুমি মূল্যায়ন করো, যে জন্য মুনীর চৌধুরী সম্বন্ধে এতোগুলো কথা বললাম। মূল্যায়ন করো, আমার দোষ-ত্রুটি থাকলে দেখাও, দোষ থাকলে দোষ, ত্রুটি থাকলে ত্রুটি, গুণ থাকলে গুণ। কিন্তু আমি কিছুই বলবো না, লিখবো না এটা ঠিক নয়, এর কারণ আমি জানি না। আটান্ন সালের কারণতো বোঝেনই। তাই না? পরবর্তীকালের কারণ একটাই আমার মনে হয়েছে, হয়তো যারা কবি-সাহিত্যিক তারা বেশিরভাগই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তারা বলে, আপনি ডাক্তার। মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র। আপনি আবার কী সাহিত্য করবেন?
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : হা হা হা, ভ্যালিড কথা!
আহমদ রফিক : আমার মনে হয় এরকম কোন কারণ থাকবে। তা না হলে এত উদাসীনতা কেনো, অন্যদের ক্ষেত্রে তো তা দেখিনা। কিন্তু বিশ্বসাহিত্যে খ্যাতিমান লেখকের দেখা মেলে, এমন কি পশ্চিম বঙ্গেও।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : ষাটের দশকে আপনার সময়ে?
আহমদ রফিক : আমি ‘নাগরিক’ বলে একটা পত্রিকা বের করি ১৯৬৪ থেকে সত্তর পর্যন্ত এই সাত বছর সচল এবং এটাতে লেখেনি তৎকালীন প্রতিষ্ঠিত লেখক এমন কেউ নাই। প্রতি সংখ্যায় শামসুর রাহমানের একটা বা দুটো কবিতা থাকতো। হাবীব ভাইয়ের মানে আহসান হাবীবের একটা বা দুটো কবিতা থাকতো। শওকত ভাইয়ের একটা গল্প থাকতোই।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আমি কয়েকটা সংখ্যা দেখেছি। খুবই রিচ।
আহমদ রফিক : এটার একটা ভালো বিভাগ ছিলো বিদেশী পত্রপত্রিকা দেখে করা ‘বুক রিভিউ বিভাগ’—বই পুস্তক সমালোচনা বিভাগ। এটা খুব জরুরী মনে হয়ে ছিলো, মানে আমি বললে আপনার কাছে কেমন লাগবে জানি না, প্রথম সংখ্যায় আমি বেনামে লিখেছিলাম, ‘সাহিত্যের দর্শনের ভূমিকা, জ্যাঁ পল সার্ত্রেকে নিয়ে। আমার মনে হয় বাংলাদেশে সার্ত্রের ওপরওটাই প্রথম লেখা।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : অনেক প্রথমের জন্ম দিয়েছেন আপনি, যেটা হলো আপনার ছোটগল্পের বইটা ১৯৬৬তে—
আহমদ রফিক : অনেক রঙের আকাশ?
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : হ্যাঁ, অনেক রঙের আকাশ। কিন্তু এই যে আপনাকে নিয়ে না লেখা, সেটা তো বললামই আমি। আপনি যদি আপনার কবিতাগুলোকে বিশ্লেষণ করেন—আপনার প্রবন্ধ, বিশেষ করে রাজনৈতিক প্রবন্ধ এবং রবীন্দ্রনাথ বিষয়ক, সাহিত্য বিষয়ক অন্যদের সমালোচনা, এসব আপনার কবিতাকে ছাপিয়ে গেছে। এ সময়ের তরুণদের কাছে কবি পরিচয়ে আপনি পরিচিত না।
আহমদ রফিক : এটা আমার দুর্ভাগ্য যে আমি কবি পরিচয়ে পরিচিত না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : কোন ভাবেই না, এবং এর সাথে আপনি ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক, সেটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আমাদের এখানে, সবকিছু মিলে। আমরা তো বিভিন্ন রকম হুজুগে বিশ্বাস করি, গিমিকেও।
আহমদ রফিক : সেটাই মুশকিল।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : তো, আপনার কবিতার প্রথম পাঠক তো ছিলেন আপনি এবং যদি আমরা একজন মানুষও হয়তো নাও খুঁজে পেতে পারি, যে হয়তো আপনার সব কবিতা পড়েছে। কারণ, আপনি খুবই কম পঠিত। আপনার কবিতাকে আপনি কিভাবে বিশ্লেষণ করেন! বা আপনার কবিতা নিয়ে কি আপনার কোন সমালোচনা আছে?
আহমদ রফিক : আমার সমালোচনা আছে। প্রথম দিকের কিছু কিছু কবিতা তো , তরুণ বয়সে লেখা, ফলত দুর্বল— তাছাড়া প্রকৃতি নিয়ে রোমান্টিকতার প্রাধান্য—
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আবেগের তারল্য আছে। রাজনৈতিক চেতনার কারণে উচ্চকণ্ঠরব আছে!
আহমদ রফিক : উচ্চকণ্ঠের বিষয় আছে সেখানে আবার কোথাও কোথাও দেখা যাবে কবিতার ব্যাকরণিক দিকগুলো অপেক্ষাকৃত দুর্বল। কিন্তু ঐ যেমন ধরেন আমার দ্বিতীয় বইটি, আমি তখন বাংলা ও বাঙালী নিয়ে খুব আবেগতাড়িত—
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : তখন কোন সাল? নাইনটিন সেভেনটি?
আহমদ রফিক : হ্যাঁ, ঊনিশ’শো সত্তুর বের হয়েছে কিন্তু লেখাটা ষাটের দশকে। ‘বিষয় ব্ঙ্গ প্রকৃতি’, ‘বাংলা ও বাঙালী’র জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি ইত্যাদি। এবং আমার কাছে বাংলা মানে প্রকৃতি। ঐগুলোর মধ্যে জীবনানন্দের এক ধরণের প্রভাব আছে। আমি মনে করি আমার কবিতার সঙ্গে জীবনানন্দের কবিতার, মানে রূপসী বাংলার কথা বলছি, রূপসী বাংলার সঙ্গে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। চেতনার দিক থেকেও। মেরুপ্রমাণ প্রভেদ।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আর টাইম স্প্যান! আপনার কবিতা তো অনেক বেশি সেই সময়ের দলিল।
আহমদ রফিক : আমি চেষ্টা করেছি সময়কে ধরতে। সময় আমার কাছে একটা গুরুত্বপূর্ণ সূচক। এবং উল্লেখযোগ্য সূচক।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আপনি যে এ চেষ্টা করেছেন এটা বোঝা যায় আরেকভাবে। সেটা হলো সেভেনটির পর আপনার কবিতার বই বের হলো সেভেনটি নাইনে।
আহমদ রফিক : হ্যাঁ।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : এবং সে বইটার নাম ‘রক্তের নিসর্গে স্বদেশ’।
আহমদ রফিক : খুব ভালো সূত্র ধরেছেন আপনি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : সেভেনটি ফাইভের পরে, সেভেনটি ফাইভের ঘটনাবলী, প্রেক্ষাপটটি কি বলছিলেন?
আহমদ রফিক : একাত্তরকে প্রেক্ষাপট করে লেখা, লেখা হয়েছে বাহাত্তরে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : খুব স্পষ্টতই বোঝা যায় একাত্তর, পঁচাত্তর এই সমস্ত, এই সময়ের কবিতাগুলো নিয়ে বইটা!
আহমদ রফিক : স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে যে অস্থিরতা, তার নানান দিকগুলো কিন্তু আছে কবিতায়। আমার কবিতা মূলত রাজনীতি প্রধান। যেটা অনেকের পছন্দ নয়। বিশেষ করে যারা আর্টস পড়ে এসেছে বা শিল্প মানে কলাকৈবল্যবাদে বিশ্বাসী তাদেরও পছন্দ নয়।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : কলাকৈবল্যবাদীদের ভালো তো না লাগারই কথা।
আহমদ রফিক : হ্যাঁ। আর তরুণ প্রজন্ম অনেকেই মনে করে যে, আমার কবিতায় আধুনিকতার প্রকাশ কম। আধুনিকতা বলতে যা কিছু বোঝায় সেটা নিয়ে বিতর্কে আমি যেতে পারি, যেমন বুদ্ধদেব, অচিন্ত্যকুমার, সুধীন্দ্রনাথ, বিষ্ণু দে, এদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বিতর্ক, মানে ব্যক্তি আধুনিকতার যে বিতর্ক, যে বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে রবীন্দ্রনাথ ‘শেষের কবিতা’ লিখে দেখালেন, ‘আমি তোমাদের চেয়ে কম আধুনিক নই’।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : হুমম… ভ্যালিড পয়েন্ট—
আহমদ রফিক : একারণেই আমি বলি যে আধুনিকতার বিষয়টি খুব চলমান, বিতর্কিত ও আপেক্ষিক। ফলে এই তত্ত্বের ভেতর দিয়ে নিজের কবিতা তো বিবেচনা করা খুব সহজ নয়। তবে আমার মনে হয় আমি উল্লেখযোগ্য কিছু কবিতা লিখেছি। ভাষা আন্দোলন, আমাদের স্বাধীকার আন্দোলন নিয়ে, মুক্তিযুদ্ধের সময়টাকে নিয়ে, আমাদের দেশমাতৃকা নিয়ে, পরে শুধু সময়ের দলিল হিসেবেও কিছু উল্লেখযোগ্য কবিতা আমি লিখেছি। নিছক ব্যক্তিক উপলব্ধি থেকে, নান্দনিকতা প্রধান।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আপনি প্রচুর রোমান্টিক কবিতাও লিখেছেন—
আহমদ রফিক : হ্যাঁ, রোমান্টিক কবিতাও প্রচুর লিখেছি—
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আপনার বইয়ের নামগুলো থেকেই বোঝা যায়।ভালোবাসা ভালো নেই, বাউল মাটিতে মন, নির্বাসিত নায়ক!
আহমদ রফিক : হ্যাঁ, ভালোবাসা ভালো নেই, তারপর ইচ্ছামতির ঘরে—
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : পড়ন্ত রোদ্দুরে, বিপ্লবফেরারী, তবু!
আহমদ রফিক : বিপ্লব ফেরারী , তবু টা অবশ্য একটু বেশি রাজনীতিগন্ধী, তবে প্রেম ছাড়া রাজনীতিও তো হয়না।দুয়েকটা প্রেমের কবিতা থাকলেও এটা মূলত সামাজিক রাজনৈতিক সংকট নিয়ে লেখা। রিপ্রিন্ট হয়েছে বইগুলো, ইদানিং কেউ কেউ আবার আমাকে বলেছে, যে আপনার কবিতাগুলো ভালোছিলো। কেউ কেউ ইতিবাচক সমালোচনাও করেছে আমার কবিতা নিয়ে। সম্প্রতি মুনীর সিরাজ, আমিনুর রহমান সুলতান, এরকম অনেকেই। ওরা বেশ ইতিবাচক মূল্যায়নই করেছে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : স্যার আপনার প্রবন্ধের যে বইটা পড়ে আমি আপনার লেখনীর প্রতি প্রথম শ্রদ্ধাশীল হয়েছি সেটা বেরিয়েছে আমার জন্মের বছরকয়েক আগে। বুদ্ধিজীবীর সংস্কৃতি। আমার ধারণা, আমার মতো অনেকেই এই বইটা পড়ে বুদ্ধিজীবীতা সম্পর্কে, বুদ্ধিজীবীর দায় সম্পর্কে চেতনা তৈরি করতে পারবেন। আমার প্রশ্ন হলো, এই ২০১৪ সালের ডিসেম্বরের বাংলাদেশে যে ধরনের বুদ্ধিজীবীতার চর্চা হচ্ছে সেটাকে স্যার আপনি কিভাবে দেখেন?
আহমদ রফিক : আমি যখন বইটা লিখেছিলাম তখন বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে এক ধরনের সততা ছিলো। এখন অবস্থা খুবই খারাপ। খারাপ অবস্থা। এখন আমাদের বুদ্ধিজীবীরা দুই রাজনৈতিক প্লাটফর্মে বিভাজিত।এবং বুদ্ধিজীবীদের প্রধান, আমরা যদি পশ্চিমা বিশ্বের উদাহরণ নিই, যেমন বার্ট্রান্ড রাসেল, রোঁমা রোঁলা এমনকী আইনস্টাইন বা চমস্কি, এইসব মণীষীর দিকে যদি তাকাই তাহলে দেখবো যে বুদ্ধিজীবীতার একটা বড় নির্ণায়ক বা ক্রাইটেরিয়া হলো তাদের নিরপেক্ষতা।রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা।নিরপেক্ষভাবে তাকিয়ে সমাজকে দেখা, রাজনীতিকে দেখা, ইত্যাদি ইত্যাদি।এটাই বেসিকপয়েন্ট, এখানে আমাদের বুদ্ধিজীবী কম।তারা হয় আওয়ামী লীগ। নয় বিএনপি। হয় এ দল নয় ও দল।কিন্তু বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা হলো নিরপেক্ষভাবে জীবনকে দেখা, সমাজকে দেখা, রাজনীতিকে দেখা, তাকে বিশ্লেষণ করা।সমাজকে এগিয়ে নেবার জন্য জাতিকে পরামর্শ দেয়া এবং উদ্বুদ্ধ করা। সে দায়িত্বটি বর্তমান বুদ্ধিজীবী তকমাধারীরা পালন করছেন না।এর মধ্যে অবশ্য হাতেগোনা দু’চারজন আছেন ব্যতিক্রম যারা এই বিন্দুতে দাঁড়ানো এবং নিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : স্যার, আপনি যে হাতে গোণা বললেন, এমন হাতেগোনাও আমি খুঁজে পাচ্ছি না যারা কোন একটি বিশেষ দলের পক্ষে নন!
আহমদ রফিক : (উচ্চ স্বরে হাসি) হাহাহা, তুমি হাতে গোণার মতোনও পাচ্ছো না! হ্যাঁ হাতে গুণেও পাওয়া কঠিন।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : না স্যার, আপনি কাদেরকে হাতে গোনেন? আপনি কাদের নিয়ে আশাবাদী?
আহমদ রফিক : আমার মনে হয় তরুণদের মধ্যে পাওয়া যাবে। এখন মুক্তচিন্তার সময় আসছে।তথ্য গোপন করার দিন তো শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে তরুণদের নিয়ে আমি খুবই আশাবাদী। তাদের মধ্যে এমন সংখ্যা কম নয়।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : এতো সম্ভাবনা বা আশাবাদের কথা বললেন স্যার। আপনি আপনার বিবেচনায়, মানে বলতে চাইছি, আপনার বয়সের তুলনায় আপনি এখনো সুস্থ, আপনি এখনো সভাসমিতিতে যান, আপনি রবীন্দ্রনাথের জীবনী যা প্রকাশিত হয়েছে তার পরের খণ্ডগুলো নিয়ে ভয়ঙ্কর পরিশ্রমের কাজ করছেন বাংলা একাডেমির হয়ে—
আহমদ রফিক : হ্যাঁ, এক খণ্ডের কাজ শেষ, আরেক খণ্ড দ্রুতই জমা দিতে হবে। তুমি তো বেশ খোঁজখবর রাখো দেখছি—
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : হ্যাঁ স্যার, খোঁজ খবরের অংশ হিসেবেই আপনার কাছে জানতে চাইছি, আপনি তো ত্রিকালজ্ঞ।ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান আমল, বাংলাদেশ— তিনটা কাল দেখেছেন। দেশ নিয়ে অগ্রজদের পরামর্শ বা বুদ্ধিইতো আসলে তরুণরা নেবে। যদিও, মিডিয়াতো আর আপনাদের কাছে নাই, তাই আপনাদের কথা শোনার জায়গাও খুব কম।সেজন্যই স্যার জানতে চাই, একজন তরুণ হিসেবেই জানতে চাই, আপনার বিবেচনায় কারা সেই নিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবী? এই বাংলাদেশে?যাদের কথা তরুণদের শোনা উচিত?
আহমদ রফিক : খুঁজতে গেলেতো গা-উজাড়। অনেকে মারাও গেছেন। এই মুহূর্তে নাম ঠিক খুঁজে পাচ্ছি না। একটু বয়স্ক অনেকে ছিলেন আমাদের। সরদার ফজলুল করিমের কথা বলতে হবে। যারা দলীয় সমর্থক নন, আমি মনে করি, প্রত্যেকের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা থাকবে, সামাজিক সচেতনতা থাকবে কিন্তু দলীয়—
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : প্রভাববলয়ের বাইরে থাকবে—
আহমদ রফিক : দলীয় প্রভাববলয়ের বাইরে থাকবেন সেই বুদ্ধিজীবী। যেটা আমি আমার জীবনে রক্ষা করে আসছি। পঞ্চাশের শেষ দিক থেকে। এখনো ধরে রেখেছি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : কেউ কেউ এই নিরপেক্ষতা বজায় রাখার পরও তো স্যার আপনাকে আওয়ামী ঘেঁষা মনে করেন—
আহমদ রফিক : এটা ঠিক নয়। আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড তার কার্যকারণ নিয়ে প্রচুর সমালোচনা আমি করেছি। এমনকী স্বয়ং শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়েও আমার সমালোচনা আছে। আমার একটা বই আছে বাঙালির স্বাধীনতা যুদ্ধ। তার মধ্যে আমি বলেছি যে উনি ২৫ মার্চের মধ্যরাতে ধরা দিয়ে ভীষণ ভুল করেছেন। না দিলে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটটা এবং চিত্রপট ভিন্ন হতো। তাজউদ্দীন সাহেবকে এতো বিরূপতার মুখোমুখি হতে হতো না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : এতো রক্তপাতও হতো না!
আহমদ রফিক : এতো রক্তপাত হতো কি না বলা কঠিন। এটা ঠিক না যে আমি আওয়ামীঘেঁষা। আমার এখন রাজনৈতিক চিন্তাটা হলো সাধারণ মানুষের পক্ষে যে বা যারা কাজ করবে, সমাজের পক্ষে কাজ করবে আমি তাকেই সমর্থন করবো। যে কাজটিকে আমি মানুষের পক্ষে কাজ মনে করবো না সেটার সমালোচনা করবো। সুতরাং আমাকে আওয়ামীলীগপন্থী মনে করার কোন কারণ নাই। বিএনপি-পন্থী তো নয়ই।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : স্যার, এই সময়ে আপনি যে তরুণদের উপর আস্থা রাখছেন, যাদের বলছেন যে দলীয় প্রভাবলয়ের বাইরে থেকে কথা বলে বা কাজ করতে চায় বা চিন্তা করে, তাদেরকে স্যার আপনি কি বলবেন?
আহমদ রফিক : তাদেরকে আমি বলবো যে, সংস্কৃতিজগতের কাজটিও এই জনচেতনার, জনমানুষের, যে চিন্তাটা ছিল বাহান্নতে, যে চিন্তাটা তৈরি হয়েছিল একাত্তরে, যেখানে হেলালউদ্দিনের কথা আমি লিখেছিও কয়েক জায়গায়, কালের কণ্ঠেও লিখলাম, যে দিনমজুর, বা কৃষক লাঙ্গল জোয়াল ছেড়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে লড়াই করেছে, দেশ স্বাধীন করেছে কিন্তু এখন খুবই দুর্দশাময় জীবনযাপন করছে, তাদেরতো স্বাধীনতা নামক অমৃতের ভাগ একটু হলেও পাওয়া দরকার ছিলো। কিন্তু তারা পায়নি। এটা যেদল, যে-শ্রেণিই বলবো, দলের কথা বাদই দিলাম, যে শ্রেণি এই যুদ্ধ রাজনৈতিকভাবে পরিচালনা করেছে, যুদ্ধ শেষে জয়ের সমস্ত অধিকার গ্রহণ করেছে, শাসনপরিচালনার ভার গ্রহণ করেছে, সেই শ্রেণীর স্বার্থই পূরণ হয়েছে, পেশাজীবীদের মধ্যে, ব্যবসায়ীদের মধ্যে নানাভাবে। নাহলে এই দেশে রাতারাতি এত বেশি পরিমাণে ধনিক শ্রেণির লোক, শিল্পপতির জন্ম হতো না। কৃষক, দিনমজুর, সমাজের নিচেরতলার মানুষদের ঠকিয়ে একটা শ্রেণি এই সম্পদ গড়েছে। আমরা যতই বলি দেশ এগুচ্ছে, কিন্তু এগুচ্ছে কারা। এই ঠগ ধনিকশ্রেণী আরো সমৃদ্ধ হচ্ছে এই এগিয়ে যাওয়ায়। হেলালউদ্দিনের কিছু হচ্ছে না। তারা ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছে, নিঃস্ব হচ্ছে। স্বাধীনতায় তার হিস্যাটির খবর কেউ রাখেনি। সাধারণমানুষদের মধ্যে এই হেলালউদ্দিনদের সংখ্যাই বেশি। গ্রাম-গ্রামান্তরে। গ্রামের চরিত্রটা পাল্টানো দরকার। রবীন্দ্রনাথ একটা কথা বলেছিলেন, বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন ছেড়ে চলে আসলেন সময়, বললেন যে গ্রাম পড়ে আছে মধ্যযুগে, শহর আধুনিক যুগে, গ্রাম ও শহরের মধ্যে মহাসাগরের ব্যবধান, সেজন্যই তিনি গ্রামোন্নয়ন পল্লীউন্নয়ন গিয়ে কাজ করা শুরু করলেন। সমবায় করা শুরু করলেন। কিন্তু এত বছরেও এই বদলটা আমরা করতে পারিনি। গ্রামের প্রকৃত উন্নয়ন হয়নি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : স্যার ক্যাপিটালিজমের নীতিই তো এমন, ধনী আরো ধনী হবে, গরীব আরো নিঃস্ব হবে—
আহমদ রফিক : গরীব যদি নিঃস্ব না-ও হয়, তার গরীবত্ব কমছে না, তার শ্রেণিবদল ঘটছে না। যতই ইউনুস সাহেব গ্রামীণ ব্যাংক করুন বা নোবেল পুরস্কার পান, বা সামাজিক ব্যবসার প্রসারের কথা বলুন। এখানে আমার বড় একটা আপত্তি, সামাজিক ব্যবসায়— ব্যবসা তো ব্যবসা, এখানে মুনাফা হলো বড় শব্দ, ব্যবসা দিয়ে তো আর দারিদ্র বিমোচন হয় না। রবীন্দ্রনাথ যেখানে, ১৯০৫ সালে, কালিগ্রাম কৃষি ব্যাংক চালু করলেন ১২ শতকরা সুদে ধার দিয়ে, আর গ্রামীণ ব্যাংক চলছে ২৫ থেকে ৪৫ শতকরা সুদে। কেনো? আমি এই প্রশ্নটা সবাইকে করি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : না স্যার, এইটা, আপনি রবীন্দ্রনাথকে বেশি ভালোবাসেন, ইউনুস সাহেবকে কম ভালোবাসেন!
আহমদ রফিক : (হাসি) না, আমি বলছি রবীন্দ্রনাথ ১২ শতাংশ সুদে দিয়েছেন ঋণ আর আপনি দিচ্ছেন ২৫ থেকে ৪৫ শতাংশ সুদে, কেনো? যে দরিদ্র লোকটি ঋণটি নিচ্ছে সে কিভাবে এই সুদের টাকা শোধ করবে!
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : স্যার, ব্যবসা তো, ব্যাংকের কর্মচারীদের বেতনের বিষয় আশয় আছে তো!
আহমদ রফিক : হ্যাঁ, ব্যবসা, আমি সেটাই বলি, সামাজিক ব্যবসা। ব্যবসা তো দারিদ্র বিমোচন করে না। সেটা অংশত করলেও পুরোপুরি করে না। যেমন এনজিওরা যেটা করছে, আমি এনজিওবিরোধী। এতে করে সমাজের তৃণমূল স্তরে যে লড়াইটা শুরু হওয়ার কথা, শ্রেণিসচেতনতা, শ্রেণিসংগ্রাম বলে যে বিষয়গুলি আছে, সেই শ্রেণিসংগ্রামের স্পৃহাকে গলা টিপে হত্যা করা হচ্ছে। পিছিয়ে দেয়া হচ্ছে। ঐ যে ভুলায়ে ভালায়ে যদি একফোঁটা দুধ শিশুর মুখে দেয়া হয় তো শিশু চুপ করে, এখানে তেমনিভাবে কিছু অর্থ তাদের হাতে দিয়ে তাদের কে মানসিক এবং আর্থিকভাবে ঋণগ্রস্থ করা হচ্ছে, সুতরাং তারা যারা ঋণ দিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে কোন কথা বলার সাহস আর ধরে রাখতে পারছে না। এটা শ্রেণিবৈষম্য তৈরির বড় হাতিয়ার হয়ে উঠছে। এটাও একটা বড় কারণ, যার জন্য শ্রেণিসংগ্রামগুলো দাঁড়াচ্ছে না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : তার মানে কী স্যার, আমাদের গ্রামের যেই সবচেয়ে নিঃস্ব মানুষগুলি, যারা দিন আনে দিন খায়, যারা হয়তো পাঁচ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে সপ্তাহে হয়তো তিনশো বা পাঁচশো টাকা কিস্তি দিয়ে টেনেটুনে বেঁচে আছে, তারা কী কোনদিন ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না?
আহমদ রফিক : কোনদিন না। এরা নিজেরা যদি এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে শ্রেণিসংগ্রামের মাধ্যমে নিজেদের পরিবর্তন না ঘটায়, তাহলে অবস্থার পরিবর্তন কোনদিনই হবে না। এবং এই মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত এবং শোষকশ্রণি তাদের শোষণ চালিয়ে যাবে। আমি বহু বামপন্থী, মার্কসবাদীদেরও বলেছি যে গার্মেন্টস সেক্টরে কাজ করো, সবচেয়ে বাজে শোষণের শিকার এই সেক্টর, কিন্তু এটা এতই বাজে জায়গা যে এখানে ট্রেড ইউনিয়ন পর্যন্ত করা যায় না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : গার্মেন্টস এর শ্রমিকদের আসলে সচেতন হতে হবে কোন দিকটা দিয়ে?
আহমদ রফিক : নিজেদের অধিকারের বিষয়েই তাদের সচেতন হতে হবে। ঐক্যবদ্ধ শক্তি ও নিরাপদ পরিবেশের বিষয়ে। তুমি চিন্তা করতে পারো রানা প্লাজার ভয়াবহতাটা। কী বিশাল একটা ডিজাস্টার হলো। কিছু কিছু আন্দোলন তো হচ্ছে। মারাও যাচ্ছে, খুনও হচ্ছে। অনেক নারীকর্মী ধর্ষিতা হচ্ছেন। তারপরও তারা যদি এই চেতনাটাকে শাণিত না করে, লড়াইয়ের পর্যায়ে নিয়ে না যায়— বৃহত্তর লড়াইয়ের পর্যায়ে তাহলে তো কাজ হবে না। অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে না। তেমনি তৃণমূলের যারা মানুষ, হেলালউদ্দিনের মতোন, হাফিজউদ্দীনরা, ওদেরও এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে, লড়াইয়ে যদি না নামে তাহলে একদিন নিজেদের অস্তিত্ব হারাবে। আমি নিজে মধ্যবিত্ত, কিন্তু রাজনীতি সচেতন মধ্যবিত্ত, যে আমি বুঝি, মধ্যবিত্ত শ্রেণিও শোষণ করছে। রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে শোষণ করছে নানাভাবে নিম্নবিত্ত এবং নিম্নমধ্যবিত্তশ্রেণিগুলোকে। তো, সেই শোষণের জায়গাটা যদি বন্ধ করতে হয় তাহলে লড়াই ছাড়া কী চলবে!
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : অবশ্যই লড়াই ছাড়া চলবে না, কিন্তু স্যার, লড়াইটা কোন পর্যন্ত! আমি স্যার একটা জিনিস আপনাকে নোটিস করি, এই যে শিল্পসাহিত্য বলেন, সংস্কৃতি বলেন, যা কিছু বলেন, আহমদ রফিককে একটা কথা বলতে হলে এখন কোথায় বলতে হয়! হয় একটা টেলিভিশন চ্যানেলের মধ্য দিয়ে বলতে হয়, অথবা একটা দৈনিক পত্রিকার মধ্য দিয়ে বলতে হয়, অথবা রেডিওতে গিয়ে বলতে হয়, অর্থাৎ একটা মাধ্যম, একটা প্রচারমাধ্যম দরকার হয়। এই দেশে প্রচারমাধ্যমও তো স্যার সব উচ্চবিত্তের দখলে।
আহমদ রফিক : কিন্তু তার মধ্যে কথা হলো, যারা সচেতন, সংস্কৃতিজগতে এখন মধ্যবয়সী এক সময়ের তরুণরা কাজ করছে, তারা যদি তাদের গণসংস্কৃতিচর্চা বা পথনাটক থেকে শুরু করে বিভিন্ন পরিবেশনার মাধ্যমে, ধরো গণসঙ্গীত, গণনাট্য, এগুলোর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে যায় তাহলে অবস্থাটার বদল হতে পারে। উদাহরণ নিতে পারো চল্লিশের দশক থেকে। চল্লিশের দশককে দামাল দশক বলি আমরা। সেসময় সলিল চৌধুরী, হেমাঙ্গ বিশ্বাসেরা গণসঙ্গীত গেয়েই দেশে গণসচেতনতা তৈরি করেছিলেন।মানুষ জেগে উঠেছিল। আমার মনে আছে উনিশশো চুয়ান্ন সালের প্রথমদিকে, এই জানুয়ারি টানুয়ারির দিকে, কড়া শীতের মধ্যে, আমাকে রায়পুরার তাত অঞ্চলে নিয়ে গিয়েছিলেন রমেন মিত্র, তার ছদ্মনাম ছিলো রমজান ভাই। সেখানে দেখলাম লোকজন রাজনীতি সচেতন। মাকুর খটাখট আওয়াজের মধ্যে তারা সলিল চৌধুরীর গান গাইছেন। এক সময় মাওলানা ভাসানী লালটুপি সম্মেলন করলেন, বিশাল কৃষক সম্মেলন। এই জায়গাগুলোকে যদি আপনি জোরদার করতে পারেন তাহলে আপনার রাজনীতি শক্তিশালী হবে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : এই ক্যাপিটালিস্ট সোসাইটিতে রাজনীতিই তো থাকতেছে না স্যার!
আহমদ রফিক : আমি সমাজ ও শ্রেণিসচেতন রাজনীতিতে বিশ্বাসী। সেটা হোক সাহিত্য সংস্কৃতির মাধ্যমে অথবা সরাসরি রাজনীতির মাধ্যমে। যে দলীয় রাজনীতি এখন চলছে, সুবিধাবাদের রাজনীতি, সেগুলোও টিকবে না। আর এসব চলতে থাকলে মানুষের মুক্তি সম্ভব না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আপনি তো স্যার যাদের কথা বলতেছেন তারা বামপন্থী। তারা তো স্যার শতধাবিভক্ত!
আহমদ রফিক : না না। আমি বামপন্থীদের কথা বলছি না। আমি আমার বিশ্বাসের কথা বলছি। বামপন্থীদের ব্যাপারেও আমার আপত্তি আছে। আমি আপনার সাথে একমত। তারা শতধাবিভক্ত হয়ে শহরকেন্দ্রিক, ঢাকা— রাজধানীকেন্দ্রিক রাজনীতি করছে শুধুমাত্র মিডিয়ার সুবিধা নেবার জন্য এবং ক্ষমতায় থাকা দলের কাছ থেকে উচ্ছ্বিষ্টের লোভে তারা রাজনীতি করছে। একারণেই কিছু হচ্ছে না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : কিন্তু একটা ওয়ে আউট তো লাগবে স্যার!
আহমদ রফিক : আমি মনে করি যে তরুণরা যদি সংঘবদ্ধ হয়, সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে বা রাজনীতিচর্চার মাধ্যমে তাহলেই কেবল এই বন্ধ্যা অবস্থা থেকে, মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া থেকে আমরা জীবনের দিকে ফিরতে পারি। আমি আজকেই একটা প্রবন্ধ লিখছিলাম, বাংলা একাডেমি আমাকে এবার বহুকাল পরে মনে করেছে, যে, অমর একুশে বক্তৃতা বোধহয় এই লোককে দিয়ে লেখানো যায়, তো আমি লিখলাম, আমি আশা করছি ভবিষ্যতের জন্য, ভবিষ্যতে তারুণ্যের এমন একটা অংশ তৈরি হবে, যারা সচেতনভাবে সংস্কৃতি এবং রাজনীতির মাধ্যমে সাধারণমানুষের কাছে পৌঁছাবে। এবং পৌঁছে তাদের মতোনই শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সচেতন তরুণদের সঙ্গে নিয়ে জনগণকে সংশ্লিষ্ট করে, বিপ্লবের মধ্য দিয়ে সমাজপরিবর্তনের একটি উদাহরণ তৈরি করবে। এটা যদি তরুণরা করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশের মুক্তির সম্ভাবনা আছে, তা না হলে মুক্তিযুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধ চীৎকার করে মুক্তির কোন সম্ভাবনা নেই। এটা বলেই আমি বক্তৃতাটি শেষ করেছি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : বাহ্! একটা ভিন্ন প্রসঙ্গে যাই স্যার। সেটা হলো, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বিভিন্ন রকমের নিরীক্ষা—কাব্যে হচ্ছে, গদ্যে হচ্ছে। এবং আমরা অনেকেই দেখতে পাচ্ছি যে নব্বই দশকের বিশেষ করে কবিতায় এমন অনেক কবিরাই লিখেছেন যারা কলোক্যাল ভাষা ব্যবহার করেছেন এবং তাতে একধরণের ভাষা বিকৃতির অভিযোগও উঠেছে, এই প্রসঙ্গে স্যার আপনার মতামত কি?
আহমদ রফিক : রাইসুদের একটা চেষ্টা ছিলো। তার মধ্যে কিছু পজিটিভ দিকও আছে। কিন্তু এই বিষয়টি নিয়ে কবিতা সম্বন্ধে বলা হয় যে, কবিতার কবিতা হয়ে উঠা দরকার। সুধীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে আরো অনেকেই বলেছেন এ কথাগুলো, বিষ্ণু দে এবং পরবর্তী সময়ে আরও অনেকে বলেছেন এ কথাটা। সেই হিসেবে আমি এই ভাষা বিকৃতির পক্ষে আমি নই। এটা আমার ধারণা যে তারুণ্যের একটা অংশ এটাকে চমক হিসেবে ব্যবহার করতে চাচ্ছে। ভেতরে ছোট ছোট মিশ্র বাক্য বলছে তো!
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : হ্যাঁ।
আহমদ রফিক : এদের এই লাইনটা আমি সঠিক বলে মনে করি না। এটা ঐরকম যে, আমি যেহেতু গতানুগতিক পথে গিয়ে নিজের প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে পারছি না, কাজেই আমি একটু নতুনত্ব, অভিনবত্ব সে অভিনবত্ব, নতুনত্ব রুচিশীল হোক বা না হোক, মানে লালিত্য নয় বা সুন্দর বা সৌন্দর্যমণ্ডিত নয়, পৃথিবীর না হোক, কিন্তু খস খস করে কথা বলে বা ধাক্কা দিয়ে কথা বলে আমি একটু জায়গা করে নিতে চাই। বিষয়টি অনেকটা এই ধরণের বলে আমি মনে করি এবং এটা কবিতার ধারাকে সমৃদ্ধ করবে, এটা আমি মনে করি না। আর এই ব্যাপারে আমার একটা বইও আছে, দশকভাঙাবিচার। গতবার বের হলো।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : ওটা আমি পড়েছি। এখানে আপনি এ ব্যাপারে বলেছেন।
আহমদ রফিক : ’দশকভাঙাবিচার’।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : দশক হিসেবে আপনার আপত্তির কথা আপনি বলেছেন কিন্তু দশক ছাড়া আর কিভাবে মানে একগুচ্ছ কবিকে আমি সিলেক্ট করবো? আর কোন ওয়ে কি আছে?
আহমদ রফিক : না দশকের প্রশ্নটা আসে না এইজন্যে যে; কবির আবির্ভাব দশক তার সৃষ্টিকর্ম শুধুমাত্র নিজের দশকের প্রতিনিধিত্ব করে না, প্রতিফলিত করে। আমি যদি সময়টাকে গ্রহণ করি যে এই সময়ের কবি তাহলে দশকটা তার কবিতার চরিত্রে না, ব্যক্তির সময়সীমার চরিত্রে। আমি এই সময়ে লিখছি। মানে আমি পঞ্চাশের দশক থেকে লেখা শুরু করেছি এবং ষাটের দশকেরও কবি। যেমন বিষ্ণু দে, তিরিশের দশকের কবি বিষ্ণু দে চল্লিশে এসে একদম ভিন্ন। ‘সন্দ্বীপের চর’ থেকে শুরু করে মানে পরবর্তী সব কবিতা একেবারে ভিন্ন চরিত্রের। চোরাবালির সঙ্গে তার পরবর্তী কবিতার কোন মিল নেই। তিরিশের কবি বললে কি তার কাব্যচরিত্র যথার্থভাবে প্রতিফলিত হয়?
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : না হয় না!
আহমদ রফিক : কাজেই তাকে যদি আমি তিরিশের কবি বলি, বলা ঠিক হবে? আবার কোনো কবিকে পরিচয় করতে গেলে তার প্রথম পর্ব থেকে মেনে নিয়ে, বলতে পারি যে তিরিশের দশকে জন্ম তার বা তিরিশের দশকে কবিতার রাজ্যে তার আবির্ভাব। এভাবে বলা বোধ হয় ভালো। আমার তাই মনে হয়।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আচ্ছা স্যার সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার, আমাদের ভাষা আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শ্লোগানগুলোর একটা ছিল।
আহমদ রফিক : হ্যাঁ, ভাষা আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শ্লোগান ছিল। এবং আমি মনে করি যে এটা শুধু তাই না, স্বাধীন বাংলাদেশে যখন নাকি সংবিধানে বলা হল যে, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। আমি এটা আমার লেখাতেও বলেছি যে, আমি যদি উচ্চশিক্ষা, বিজ্ঞানশিক্ষা, উচ্চআদালতে বাংলা ভাষার ব্যবহার না করি তাহলে এতে আমি সংবিধান লঙ্ঘন করছি, ঠিক কি না?
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : অবশ্যই।
আহমদ রফিক : তো সেই সংবিধান লঙ্ঘন সবাই করে যাচ্ছি। মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী, থেকে শুরু করে সাংসদ, সবাই। এবং সেদিকে চেষ্টাও নেই আমাদের। আসলে তখনই কিন্তু আমাদের শ্রেণীর প্রশ্নটা আসে। যে প্রধানত যেই শ্রেণী একাত্তরের লড়াইটা চালনা করেছে মূলত রাজনৈতিক ভাবে, সেই শ্রেণীর আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে, তাদেরতো আর তাদের লাইন বাদ দিয়ে লুপলাইনে যাওয়ার বা প্যারালাল মানে সমান্তরাল অন্য লাইনে যাওয়ার যে পরিশ্রম সে পরিশ্রমটা করার কোন প্রয়োজন নাই, তারা নতুন করে উচ্চ শিক্ষায় বাংলা ব্যবহার করার যে শ্রমটুকু দিতে হবে পরিবর্তনের জন্যে মানে পরিভাষা টরিভাষা এগুলোর মাধ্যমে। এই শ্রমটুকু দেয়ার তো আর কোন দরকার নেই। ইংরেজি যদি আমি চালিয়ে যাই, তবে বিশ্বেও আমি সমাদৃত হবো এবং দেশে এটা আমার শ্রেণীতে সীমাবদ্ধ থাকবে। এর সুবিধাগুলো আমার শ্রেণীর জন্যে সমৃদ্ধির কারণ হবে, সুবিধার কারণ হবে। সাধারণ মানুষের সেখানে বড় একটা প্রবেশাধিকার থাকবে না। শ্রেণিস্বার্থের এই সুবিধাবাদী টানেই বাংলাভাষার দুর্দশা।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : বাংলা একাডেমীর ভূমিকাকে আপনি কি রকম দেখেন আমাদের শিল্প-সাহিত্যে?
আহমদ রফিক : বাংলা একাডেমীর ভূমিকা মানে?
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : বাংলা একাডেমীর ভূমিকা মানে, বাংলা একাডেমী তার শ্লোগান হলো জাতির মননের প্রতীক। বাংলা একাডেমী দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করছে, বাংলাদেশ থেকে সে বয়সে বড়, ১৯৫৩ যদি হয় তবে ষাট বছর পঁয়ষট্টি প্রায়।
আহমদ রফিক : না ওটা ১৯৫৫ থেকে শুরু। দীর্ঘ সময়।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : ১৯৫৫ থেকে শুরু হলেও… দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করছে বাংলা একাডেমি।
আহমদ রফিক : হুম।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আমি যদি বাংলা ভাষার গুরুত্বপূর্ণ কবিতার একটি কাব্য সংকলন চাই, বাংলা একাডেমী ওটা আমাকে দিতে পারে না। আমি যদি বাংলা ভাষার একটি গুরুত্বপূর্ণ গল্পের সংগ্রহ চাই যে গুরুত্বপূর্ণ গল্পকার কারা কারা ?
আহমদ রফিক : এখানে আমি আপনার কথা বুঝতে পেরেছি। এখানে আমি একটা কথা বলি, আমার বন্ধুরা আবার অখুশি হবেন। আমিতো আবার কাউকে কাউকে অখুশি করে দেয়ার লোক। বাংলা একাডেমী আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে ডুবে গেছে, আমি মনে করি আজকের এগুলো বাংলা একাডেমীর কাজ না। অমুকের জন্মদিবস পালন, অমুকের মৃত্যুদিবস পালন, অমুক উৎসব তমুক উৎসব ইত্যাদি বাংলা একাডেমির করণীয় নয়।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : এবং উৎসবের জন্যে ভাড়া দেওয়া।
বইমেলা জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের কাজ। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র আর প্রকাশকরা মিলে তাই এটা করতে পারে। যেহেতু জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র বুক প্রমোশনের দায়িত্বে আছে, তারা এবং প্রকাশকরা মিলে বইমেলা আয়োজন করা উচিত। বাংলা একাডেমীর এটা ছেড়ে দেয়া উচিত
আহমদ রফিক : হ্যাঁ। তো কথাটা হলো বাংলা একাডেমি আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে ডুবে গেছে। বাংলা একাডেমি প্রথম যখন হয় কথাই ছিলো ঐ একুশ দফায় বাংলা ভাষার গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করা। একুশ দফায় যে দফাতে, উনিশ নম্বর দফায় বাংলা একাডেমী প্রতিষ্ঠা করার কথা বলা হয়েছিলো, সেখানে বলা হয়েছিলো বাংলা ভাষার গবেষণাগার। ভাষার গবেষণা ব্যাপারটাই ছিলো প্রধান জিনিশ। সেটা হয়তো ইদানীং হচ্ছে কিছুটা কিন্তু যেটুক হচ্ছে সেটুকু বাংলা একাডেমী একটা যে— জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে খুবই অপ্রতুল এবং তারা অনেকটা পথভ্রষ্ট, পথবিচ্যুত বলে আমি মনে করি। যে কথাগুলো আপনি বললেন মানে সেই বিশিষ্ট জনদের নিয়ে গবেষণাপত্রগুলো সেখানে তৈরি হওয়া উচিত। ছোট গল্পকারদের গল্প সংকলন, কবিদের কবিতা সংকলন, এগুলো তাদের বের করা উচিত জাতির মননের প্রতীক যদি হয় জাতীয় পর্যায়ে যারা বিশিষ্ট, যারা জাতির মুখ উজ্জ্বল করেছে, পথ দেখিয়েছে, তাদের পরিচিতি ঘটানোটা প্রয়োজন, সেগুলো, যেমন বঙ্গসাহিত্য করেছে। অনেক আগে মানে রবীন্দ্রনাথের আমলে, তাদের ওখানে কিন্তু গবেষণার বিষয়টিই প্রাধান্য ছিলো। শেষের দিকে দেখলাম ঐ পশ্চিমবঙ্গ বাংলা একাডেমী এরাও কিন্তু চেষ্টা করছে ঐদিকটাতে। এরা কিন্তু আনুষ্ঠানিকতা খুব একটা করে না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : না অনুষ্ঠান করাটাতো বাংলা একাডেমীর কাজ না।
আহমদ রফিক : এই যে মেলা আমি এটার ঘোরবিরোধী। এটাও বাংলা একাডেমীর কাজ না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : মেলার কাজ অন্যরা করবে!
আহমদ রফিক : হ্যাঁ?
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : মেলা করবে প্রকাশকরা।
আহমদ রফিক : আর ধরো ঐ যে প্রতিষ্ঠানটা আছে, বই, পত্রিকা বের করে। মানে…ঐ।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : বই পত্রিকা? জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র?
আহমদ রফিক : বইমেলা জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের কাজ। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র আর প্রকাশকরা মিলে তাই এটা করতে পারে। যেহেতু জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র বুক প্রমোশনের দায়িত্বে আছে, তারা এবং প্রকাশকরা মিলে বইমেলা আয়োজন করা উচিত। বাংলা একাডেমীর এটা ছেড়ে দেয়া উচিত।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : কিন্তু স্যার, বাংলা একাডেমীর, তরুণ লেখকদের পরিচর্যা করাও তো তাদের দায়িত্ব।
আহমদ রফিক : মানে তরুণ লেখক প্রকল্প।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : ঐ প্রকল্পতো নাই স্যার।
আহমদ রফিক : এখন শেষ হয়ে গেছে?
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : ঐ প্রকল্পতো স্যার নব্বই পর্যন্ত ছিলো তারপর দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর দুই হাজার নয় দশে একবার শুরু হলো, ঐটার প্রথম ব্যাচে আমরা ছিলাম, মানে ঐটার অবস্থাও যাচ্ছে তাই। মানে যা কিছু বলা হয়। আমার দেখা যেটা, একজন বিশিষ্ট কবি ষাটের দশকের, তিনি তরুণ লেখক প্রকল্প নিয়ে যে প্রস্তাবনা দিয়েছিলেন একাডেমিকে, প্রস্তাবের পর একাডেমী দেখলো যে সেটা করার সামর্থ তার নাই, বা পলিটিকালি করা যাবে না, তখন তারা আর ডাকলোই না সেই শ্রদ্ধেয় কবিকে, না ডেকে এমন একজন দলীয় লোককে দায়িত্ব দেয়া হলো প্রকল্পটা মানের দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হলো দারুণভাবে।
আহমদ রফিক : কাকে?
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আমার নামে নাম ষাটের দশকের একজন শিক্ষক কবি!
আহমদ রফিক : ও আচ্ছা।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : মানে না ডেকে তারা যেটা করলেন মানে একটা লাম-সাম ভাবে করলেন, প্রকল্পটা আসলে ঝুলে গেল। যেটা আবার শুরু হয়েছে। যেটা হলো আসলে, কম্পিউটার শিক্ষা আর কিছু সম্পাদন কৌশল শিক্ষাতেই সীমাবদ্ধ। বাছাই করে একজন তরুণ লেখককে নিয়ে, তাকে যে ধরণের মানসিক সাপোর্ট তাকে দেয়া, তাকে নার্স করা সেই জায়গাটা আসলে নেই। অথচ এটা করা উচিত ছিলো।
আহমদ রফিক : হ্যাঁ বাংলা একাডেমীর লেখক তৈরি করা, কবি তৈরি করায় সাহায্য করতে পারে। এদের কিছু না কিছু দায়িত্ব পালন করতে পারতো। আমি বলবো যে বাংলা ব্যাকরণ নিয়ে ভালো কাজ করেছে বাংলা একাডেমি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : ভালো কাজ করেছে! আপনি ব্যাকরণ বইটা দেখেছেন?
আহমদ রফিক : মানে ঐ ভাবে ভালো কাজ…
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : যেমন—
আহমদ রফিক : হ্যাঁ ভালো কাজের পাশাপাশি যে কাজগুলো করছে এটা কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ নয়, এতে আপনার সঙ্গে আমি একমত।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : স্যার আপনার ব্যক্তি জীবন নিয়ে জানতে চাই স্যার। স্যার আপনি স্যার প্রেমে পড়েছিলেন?
আহমদ রফিক : আমি বিয়ে করেছিলাম?
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : প্রেমে পড়েছিলেন কোন?
আহমদ রফিক : প্রেমে পড়েছিলাম? প্রেমে বয়সটা বোধ হয় তিপ্পান্ন, চুয়ান্ন হবে।ৱ
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : স্যার ভাষা আন্দোলনের পরে স্যার?
আহমদ রফিক : ভাষা আন্দোলনের পর পরই।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : স্যার যার প্রেমে পড়েছিলেন, তাকেই কি ঘরণী করেছিলেন?
আহমদ রফিক : তাকেই বিয়ে করেছিলাম। বিয়ে করার পরেতো আর প্রেম থাকে না। তখন এটা ট্রান্সফরমেশন হয়। যাকে বলে রূপান্তর। এটা ব্যক্তি জীবনে তুমি বুঝতে পারবে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : জী স্যার আমি বুঝি স্যার। (হাসি)।
আহমদ রফিক : (হাসি) আর তার আগে যেগুলো তা প্রেম নয় ঠিক, ভালো লাগা। যেমন স্কুল জীবনে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : মানে আপনিতো সে ভাবে মানে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করেন না।
আহমদ রফিক : না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন না।
আহমদ রফিক : না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : এর মধ্যে কবি অরুণাভ সরকার মারা গেলেন।
আহমদ রফিক : কে?
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : কবি অরুণাভ সরকার। তিনি নিজের দেহ দান করেছেন।
আহমদ রফিক : আমিও যেটা করছি। আমি দেখেছি আমাদের সাথের কমরেডরা পর্যন্ত মারা যাওয়ার পরে ওদের নিয়ে মিলাদ মাহফিল হয়। আমি খুব আপত্তিকর মনে করি এটা। যেমন ফরহাদ। কমরেড ফরহাদ ঈশ্বরে বিশ্বাস করতেন না, তা সত্ত্বেও তার মিলাদ মাহফিল হলো।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : কমরেড ফরহাদের মিলাদে আমি গিয়েছিলাম।
আহমদ রফিক : যেহেতু বলছিলাম মিলাদ মাহফিল হয়। সে জন্য আমি একটা ইচ্ছা পত্র লিখে রেখেছি যে আমার মৃত্যুর পর কোন রকম ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সমাধীস্থ যেন না করা হয়। এবং এরকম কোন আচার অনুষ্ঠান মানে মিলাদ মাহফিল যেন না করা হয়। অনুষ্ঠান-টনুষ্ঠান। এমনিতে যেভাবে আছে সেভাবে যেন মৃতদেহটাকে কবর দিয়ে দেয়া হয়। না হয় একটা কফিনের মধ্যে পুরে নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। তখন আমাকে, যাদেরকে বলছিলাম, তারা বললো যে, স্যার সমাজেতো এভাবে করা যাবে না। ইদানীং ভাবছি ঠিকই তো, ওরাও বিপদে পড়বে।
আমি বহু জিনিসকে লেখায়, ভাবনায় ধারণ করেছিলাম, লিখেছি, আরও জিনিস রয়েছে যে লেখার সময় পাব কি না জানি না। কিন্তু জীবন নিয়ে তৃপ্ত হলেও আমি সমাজের জীবন নিয়ে তৃপ্ত নই
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : স্যার আমাদেরকে বিপদে ফেলে আপনার লাভ নেই।
আহমদ রফিক : (হাসি) তার চেয়ে দেহ দান করে দেয়াই ভালো।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : হ্যাঁ। স্যার আপনি কি এ ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? বা নেবেন মানে?
আহমদ রফিক : নেবো। নেবো।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : যেটা জানতে চাই স্যার, হুমায়ুন আজাদ স্যার মারা যাবার পর জানাজা নিয়ে একটা জটিলতা তৈরি হয়েছিলো।
আহমদ রফিক : হ্যাঁ জটিলতা তৈরি হয়েছিলো আমি জানি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আমরা যারা তাকে ভালোবাসি, মানে ভালোবাসতাম।
আহমদ রফিক : হুম।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আমাদের জন্য কিন্তু একটু বেশী পেইনফুল ছিলো। পেইনগুলো হয়েছে এই কারণে যে, মানে একদিকে তাকে যে আমরা ভালোবাসি, তার মতাদর্শ বলেন তার চিন্তা বলেন যেগুলোকে যেমন শ্রদ্ধা করি আবার ডায়াস্পোরাও আছে। আমি তো একটা সমাজ-স্তরে বসবাস করি, এর একধরণের আচার আছে, এক ধরণের রিচ্যুয়ালস আছে।
আহমদ রফিক : হুম, হুম।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : স্যার তাতে একটা বড় কনফ্লিক্ট তৈরি হয়।
আহমদ রফিক : হ্যাঁ কনফ্লিক্ট। আমি যেটা করলাম, ইচ্ছাপত্রটা তৈরি করেছিলাম। তারপরে নানান অভিজ্ঞতার মধ্যে দেখছি যে এটা কার্যকর হবে না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : রাইট।
আহমদ রফিক : তার চেয়ে দেহ দান করে দেয়াই সহজ।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : রাইট। স্যার এমনিতে আপনি, মানে কবর নিয়ে তো একধরণের জটিলতা আছে। আপনি মনে করবেন না যে আমি রসিকতা করছি। স্যার এগুলো নিয়ে কি আপনার কোন কংক্রিট চিন্তা ভাবনা আছে? বিশেষ করে কবর।
আহমদ রফিক : না না একদম নেই। এর জন্যেই তো বললাম যে দেহদান করে দিলে আর কবরের প্রশ্ন আসে না। বুদ্ধিজীবীর কবরস্থানে আমাকে কবর দেয়া লাগবে, এসব নিয়ে আমার কোন ইচ্ছা অনিচ্ছা মানে মোহ নেই।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : স্যার আপনার জীবনে, জীবন নিয়ে আপনি কতটা তৃপ্ত?
আহমদ রফিক : হ্যাঁ, এ জীবন নিয়ে তৃপ্ত বটে, কারণ আমি বহু জিনিসকে লেখায়, ভাবনায় ধারণ করেছিলাম, লিখেছি, আরও জিনিস রয়েছে যে লেখার সময় পাব কি না জানি না। কিন্তু জীবন নিয়ে তৃপ্ত হলেও আমি সমাজের জীবন নিয়ে তৃপ্ত নই। পঞ্চাশের দশকে আমরা যারা বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেছিলাম, সমাজের পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিলাম যারা, তাদের মধ্যে অনেকেই, কেউ কেউ এখনও মনে করে যে আমরা যা চেয়েছিলাম তার বিন্দু মাত্র অর্জিত হয়নি। এবং হওয়ার আপাতত কোন সম্ভাবনাও নেই। সম্ভবত একটি ক্ষোভ, অসন্তোষ, অতৃপ্তি নিয়ে এই বিশ্ব ছেড়ে চলে যেতে হবে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : স্যার বাংলাদেশ পাওয়া এটা আপনার জীবনে স্যার কেমন অভিজ্ঞতা মানে স্বাধীন বাংলাদেশ পাওয়া।
আহমদ রফিক : স্বাধীন বাংলাদেশতো আসলেই দরকার ছিলো, কারণ জিন্নার পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের থাকার কোন প্রশ্নই আসে না। সাতচল্লিশে একটা মস্ত বড় ভুল ছিলো বাঙালি মুসলমানের, মানে মুসলিম লীগের পিছনে গিয়ে দেশবিভাগকে নিশ্চিত করা। বাঙালি মুসলমানই কিন্তু দেশ বিভাগ নিশ্চিত করেছে। এবং সেই সঙ্গে আবার কনট্রাডিকশন হলো যে তারা দেশ বিভাগ, ভারত বিভাগতো করলো, করে বললো যে বঙ্গবিভাগ চাই না। কারণ হলো যে পুরো বাঙলার উপর আধিপত্য বিস্তার। তো যাই হোক, সে হিসেবে এই ভুলটি হওয়ার ফলে পরবর্তী সময়টি ভিন্ন ভাবে আসলো। পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের মানসিকভাবে থাকার কোন প্রশ্নই ছিলো না। সেই বিচ্ছিন্নতাটা দরকার ছিলো, কিন্তু যেভাবে হয়েছে, সেটা আমি মনে করি সঠিকভাবে হয়নি। সংক্ষিপ্ত পথে কোনদিন মহৎ অর্জন, বৃহত্তর অর্জন করা যায় না। ন’ মাসে যুদ্ধ যে জিনিশ এনে দিয়েছে সে জিনিশের তুলনায় আমার মনে হয়, এটাই স্বাভাবিক শ্রেণীপ্রভাবের জন্য।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : স্যার শ্রেণীর এই যে বৈষম্য, আপনি স্যার এর আগেও একটা ইন্টার্ভিউতে বলেছেন যে, আমাদের ভাষার যে বিকৃতি ইত্যাদি তার জন্য এই শ্রেণী বৈষম্য দায়ী, আপনি বলেছেন যে, আমাদের দেশে যেই লেখক বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, ছাত্রসমাজ যে কোন রকম ভূমিকা রাখতে পারছে না, এর কারণও ঐখানে প্রোথিত। এই বৈষম্য কমানোর কোন উপায়তো আল্টিমেটলি নেই।
আহমদ রফিক : কেন থাকবে না?
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : উপায়টা কি স্যার?
আহমদ রফিক : আমি বলছি না যে সব শ্রেণী একাকার হয়ে যাবে। কিন্তু কথাটা হলো শ্রেণি বৈষম্য কমানো। আমি একেবারে বৈষম্যহীন সমাজ যেটা চিন্তা ভাবনা করে দেখেছি, এই পর্যন্ত কোথাও হয় নি। চীন বলো, সোভিয়েত ইউনিয়ন বলো। তবু কথাটা হলো অর্থনৈতিকভাবে, সামাজিকভাবে বৈষম্য যতটা কমানো সম্ভব, একজন মানুষ মানুষ হিসেবে তার অধিকার অর্থাৎ খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আবাসন, এই মৌল বিষয়গুলোতে অধিকার থাকবে তার। প্রতিভায় সব এক হবে মানে নেই, হয়ও না। মানে প্রতিভার, মেধার পার্থক্য থাকে, থাকবেই। এটা মানুক বা না মানুক আমি মনে করি। কিন্তু সেখানে তার যে এক্সেসটুকু দরকার, এটুকু থাকা দরকার। তার মানে ন্যূনতম যে প্রয়োজনগুলো সে প্রয়োজনগুলো তো সমাজ তাকে দেবে। রাষ্ট্রও তাকে দেবে, সে রাষ্ট্রটা বাংলাদেশে কি হয়েছে? সে রাষ্ট্রতো, বাংলাদেশতো জইন উদ্দিন, আদিল উদ্দিন, দেলয়ার, হেলাল উদ্দিনরা, মানে একদম নিম্নবর্গীয় গরীবের মানুষকে যুদ্ধে যোগদান করালো। মারা গেলো, ফিরেও আসলো। তাদেরতো একটা স্বপ্ন ছিলো জীবন যাপনের নিশ্চয়তাগুলো, সুস্থ স্বাভাবিক জীবন যাপন এগুলো তো হয়নি। সেগুলো যদি না হয় তাহলে এ বাংলাদেশ কি সবার জন্য আকাঙ্ক্ষিত? তাহলে? অথচ পাকিস্তান থেকে আমাদের আলাদা হওয়া প্রয়োজন এই জন্যে বললাম যে নয় মাসের সংক্ষিপ্ত যুদ্ধ তার বদলে যদি সর্বদলীয় এবং বিশেষ করে যারা সমাজ পরিবর্তনে বিশ্বাসী সবাই মিলে যদি একটি দীর্ঘস্থায়ী গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে ভারতের বা সোভিয়েত ইউনিয়নের পুরোপুরি সাহায্য না নিয়ে, সমর্থন নিয়ে কিন্তু সাহায্য না নিয়ে যদি সেই আন্দোলনটি, সেই সংগ্রামটি পরিচালনা করা হতো দীর্ঘ সময় নিয়ে তাহলে বাংলাদেশেই আজকে যারা পাকিস্তানপন্থী তারা পাকিস্তানপন্থার দিকে ধাবিত হতো না। বা এইযে ধর্মীয় জঙ্গিবাদের উদ্ভব, সেটারও সম্ভাবনা কম থাকতো যদি সুশাসন নিশ্চিত হতো। দেশে গণতন্ত্র আছে কি? গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো কি পালিত হচ্ছে? হচ্ছে না, আজকে সাত খুন, কালকে পাঁচ খুন, পরশু দিন অমুক, তমুক, কিন্তু এগুলো সুবিচার হওয়া মানে দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : ’পাওয়ার’।
আহমদ রফিক : এ কাজটি কিন্তু হচ্ছে না। না বিএনপি না আওয়ামীলীগ কারও আমলেই কিন্তু হচ্ছে না। না স্বৈর-শাসনে। না সামরিক শাসনে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : স্যার ভারতের ভূমিকাকে আপনি কিভাবে দেখেন? ভারতীয় বিশেষ করে আপনার সম…
আহমদ রফিক : হ্যাঁ বর্তমানে ভারতের ব্যাপার নিয়ে যেমন সীমান্তে ফেলানি হত্যা নিয়ে আমি তিন তিনটা লেখা লিখেছি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : সেই বিষয়গুলোতে মানে আপনি সবসময় স্যার উচ্চকণ্ঠ বিরোধী ছিলেন। মানে প্রতিবাদ করেছেন। কিন্তু স্যার আমাদের এখানে যারা, আওয়ামী রাজনীতি করেন…..
আহমদ রফিক : না সেটাতো করলে হবে না। এই যে স্থলসীমান্ত চুক্তি, ছিটমহল, এবং পানি বন্টন, তিস্তা, পদ্মা, মেঘনা, বা যাই হোক। উপরে ব্রহ্মপুত্র , ব্রহ্মপুত্রে নাকি বাঁধ দেয়ার চিন্তা ভাবনা করছে ওরা। তো এগুলো তো শুভলক্ষ্মণ নয়, প্রতিবেশী সুলভ আচরণ নয়।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : স্যার এর মধ্যে আমি একটা জিনিস আবিষ্কার করলাম, যেটা হলো আগরতলা বা এর পরে একটা বিদ্যুৎ কেন্দ্র তো তার বিনিময়ে তারা যেটা করছে, ওরা আসলে এইখানে ওদের ট্রানজিটটা চায়। ঐখান থেকে যাতে কলকাতায় ওদের সুবিধা হয়।
আহমদ রফিক : হুম।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : ভয়ংকর বিষয় হলো স্যার এটা বহু আগে থেকে স্যার এই ট্রানজিটটা চালু আছে। বিকল্প উপায়ে।
আহমদ রফিক : হুম।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আমি দেখি যে শ্যামলী পরিবহন আগরতলা থেকে বেনাপোলে মাঝখানে ঢাকা হয়ে, শ্যামলী পরিবহন ওদেরকে পার করে। এই যে সুবিধাগুলো স্যার। নদী বলেন, বন্দর বলেন, এই শোষণ কি একাত্তর সালে ওদের ভূমিকার জন্যে আরও বেশী ওরা পারছে স্যার?
আহমদ রফিক : না ওরা পারছে কিন্তু আমাদের সরকার দৃঢ় অবস্থান নেয় বা নিতে পারলে এটি পারতো না করতে। কিন্তু নিচ্ছে না, এমনকি বিএনপি তো ভারত বিরোধী বলে পরিচিত। তো কই বিএনপির আমলে ও তো স্বচ্ছ বহির্বিশ্ব নীতি বিশেষ করে ভারতবর্ষের সঙ্গে শক্ত বিদেশ নীতি গ্রহণ করেনি। নিজের অবস্থানটাকে শক্ত করতে হবে। নিজের অবস্থান যদি দুর্নীতিতে ভাসিয়ে দেই, একেবারে সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে একেবারে নিম্নতম পর্যায়ে যদি দুর্নীতির আখড়া হয়, তো সেই দেশ কি শক্ত অবস্থানে দাঁড়ায় কখনো?
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : স্যার আপনি যদি অনুমতি দেন আরেকটা প্রশ্ন করতে, সেটা হলো আপনাদের সমসাময়িক মুনতাসীর মামুন বা শাহরিয়ার কবির, তাদের ভূমিকাকে স্যার আপনি কিভাবে দেখেন?
আহমদ রফিক : কারা?
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আমি কিন্তু স্যার নাম ধরেই কিন্তু বলেছি।
আহমদ রফিক : তারা কিন্তু যেভাবে বলছে, তারাতো মনে হয় উন্মুক্ত ভারতপ্রেমী।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : হ্যাঁ স্যার।
আহমদ রফিক : খানিকটা?
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : খানিকটা না মনে হয় স্যার!
আহমদ রফিক : পুরোটাই?
আহমদ রফিক : (হাসি) সেটা স্বদেশের স্বার্থের বিনিময়ে হওয়া উচিত নয়। এক কথায়। কারণ হলো আমি বলি যে একাত্তরে ভারত যে সাহায্যটা করেছে, সেটা আমি স্বীকার করি, প্রকাশ্যে বলতে আমি দ্বিধা করি না। আমাকে ভারতপন্থী বলুক আর যাই বলুক, তারা যদি সাহায্যটা না করতো তাহলে নব্বই হাজার পাকিস্তানীকে বাঙ্কার থেকে তোলা সম্ভব হতো না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : হুম।
আহমদ রফিক : তা করতে গেলে যা বললাম দরকার ছিলো গেরিলাযুদ্ধ। সেই যুদ্ধের প্রস্তুতি কিন্তু আমাদের ছিলো না। তাতে বহু লোক মারা গেছে। এই জিনিসগুলোও কিন্তু স্বীকার্য। এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন যদি সাত বার সিকিউরিটি কাউন্সিলের ভেটো না দিতো তাহলেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন কঠিন হতো।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : স্যার একটা জিনিস কিন্তু বার বার না বলছে, সাতবার?
আহমদ রফিক : সাতবার ভেটো দেয় সোভিয়েত রাশিয়া, মার্কিন চীন পাকিস্তানের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে, যেটুকু করেছে, আমি কিন্তু বরাবরই সেটুকু স্বীকৃতি দেয়া সঠিক মনে করি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : মানে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ…
আহমদ রফিক : কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। তাই বলে যে আমার নিজের স্বার্থ আমি বিলিয়ে দেবো সেটাও আমি সঠিক বলে মনে করি না। সে জন্য আমি তিস্তা নিয়ে লিখেছি এবং এর আগে ফারাক্কা নিয়েও লিখেছিলাম। তো এই যে সীমান্ত হত্যা এখনও চলছে। এটাতো মারাত্মক অপরাধ।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : অপমানজনক।
আহমদ রফিক : অপমানজনক এবং অমানবিক। এইসব নিয়ে সরাসরি ভারতের সাথে শক্ত মাটিতে দাঁড়িয়ে কথা বলা উচিত।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : স্যার ভারতের কথাতো বললেন। মোটামুটি আমাদের কাভার করে যাচ্ছে।
আহমদ রফিক : আরতো কিছু থাকার কথা না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : স্যার আপনার ছেলেমেয়েদের কথা যদি বলেন।
আহমদ রফিক : আমার ছেলেমেয়ে নেই। স্ত্রী মারা গেছেন ২০০৬-এ।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আপনাকে স্যার দেখাশুনা করছেন কে?
আহমদ রফিক : দেখাশুনার মধ্যে আমার এই যে ড্রাইভার মানে চালক, কালাম, আবুল কালাম, ও আমার সঙ্গে আছে ২৮ বছর। তো ও-ই এখন আমার বইটই খুঁজে দেয়া ইত্যাদি। বাজারহাট করা, সবকিছু মানে দেখাশুনা করা।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : স্যার আপনার দিন কিভাবে কাটে স্যার?
আহমদ রফিক : বই পড়ে এবং লিখে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : স্যার এখনতো রবীন্দ্রনাথের ঐ জীবনী লেখার ধরণের কাজের মধ্য দিয়ে—
আহমদ রফিক : ওই লেখার মধ্যেই জীবনটাকে খুঁজে খুঁজে পাই বলে মনে করি। আর কিছু টিভির খবর-টবর দেখি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : খবর দেখেন স্যার?
আহমদ রফিক : খবরই দেখি। অন্য কিছু না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : টক শো স্যার?
আহমদ রফিক : না। এগুলো দু একবার দেখেছি কিন্তু ওদের ভাষা, উচ্চারণ, বাদ-প্রতিবাদ, চীৎকার, চেঁচামেচি এগুলো দেখলে মনে হয়েছে যে এরা টক শো’র উপযুক্ত না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আপনি ভোর বেলা ঘুম থেকে কয়টায় উঠেন স্যার ?
আহমদ রফিক : ভোরে উঠি, ছয়টা থেকে সাতটার মধ্যে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : সাতটায়? সাতটার মধ্যে উঠে যান।
আহমদ রফিক : সাড়ে ছয়টা, সাতটা।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : নাস্তা কি স্যার বাইরে থেকে আসে?
আহমদ রফিক : না ঘরে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : মানে তিনিই করেন সব। রান্নাবান্না। এমনিতে স্যার আপনার পড়াশুনার আগ্রহ তো বিভিন্ন দিকে ছড়ানো।
আহমদ রফিক : হুম।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : চিকিৎসা বিজ্ঞান হোক, লিটারেচার হোক। লিটারেচার এর মধ্যেও বিভিন্ন ভাগে হোক। সর্বসাম্প্রতিক স্যার কি পড়লেন? যেমন আপনার এই কাজ ছাড়া স্যার। কাজের ভিতরেও তো অনেক কিছু পড়তে হচ্ছে। তরুণদের লেখা পড়েন স্যার?
আহমদ রফিক : তরুণদের লেখা যদি পাই তাহলে পড়ি। আবার আজকাল স্মৃতিও ভালো থাকে না সবসময়। গিয়ে খোঁজাখুঁজি করে টরে পড়া হয় না। এমন অনেকে আছে যে বই দেয়। দিলে বই পড়ি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : বাহ।
আহমদ রফিক : তা না হলে ঐ দশকের বই লিখলাম কিভাবে?
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : হা হা হা।
আহমদ রফিক : কেউ কেউ বই পাঠায়, বই দেয়। আমার এক বড় ভাই ওয়াশিংটন ডিসি থাকেন, তিনি মাঝে মাঝে বেশ কিছু বই পাঠায়। ইংরেজি ভাষার বই।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আপনার দিন নিয়ে জানলাম। খাওয়া মানে, শারীরিক ভাবে সুস্থ আছেন তো?
আহমদ রফিক : মোটামুটি। ২০০২ এ স্টেনটিং করা হলো। হার্টে দুটো ব্লক ছিলো। ওরা বলেছিল পাঁচ বছর চলবে, ফাঁকি দিয়ে অনেকদিন কাটিয়ে দিলাম।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : হা হা হা।
আহমদ রফিক : আর সামান্য একটু ডায়াবেটিস আছে। দিনে একটা করে ট্যাবলেট খেলেই চলে যায়।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : বাহ।
আহমদ রফিক : আর খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে আমি বরাবরই খুব পরিমিত। অনেকে বলেন আপনি এই পরিমিত আহারের জন্যেই তো বোধ হয় এতদিন বেঁচে আছেন, ইত্যাদি। তো এই আর কি চলে যাচ্ছে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আপনার আন্ডারগ্রাউন্ড জীবনের কথাতো বলাই হলো না, আন্ডার গ্রাউন্ডে ছিলেন। এটাতো মজার জায়গা স্যার।
আহমদ রফিক : কষ্টকর জীবন যাপন করেছি তখন। একবেলা খেলাম, এর পরের বেলা খেলাম না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : ঐটা নিশ্চয় আপনাকে অনেক কষ্টসহিষ্ণু করে তুলেছে।
স্যার আপনার বন্ধুদের কথাতো জানা হলো না। আপনার ‘বন্ধু’ শব্দটার পরেই কার কথা আপনার মনে পড়ে?
আহমদ রফিক : মানে এখন?
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : সব মিলিয়ে স্যার। তখন, এখন, স্কুল লাইফে নিশ্চয় একজনের কথা মনে পড়ে।
আহমদ রফিক : সেটা বাদ দিয়ে? বন্ধু...
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : মানে আপনার সাহিত্যিক বন্ধু।
আহমদ রফিক : খুঁজে পাওয়া মুশকিল। আমি আরেকটা কথা বলে নিই, যেটা বলা হয় নি কিন্তু বলা দরকার, আমি ছাত্র জীবনে, মানে স্কুল থেকেই একটু একাকীত্ব বোধে তাড়িত মানে—
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : একা থাকতে পছন্দ করেন?
আহমদ রফিক : মানে নিঃসঙ্গতা, মানে এই বাবা না থাকা, বড় ভাই কাজ নিয়ে ব্যস্ত, অভিভাবকত্ব ফলানোর সুযোগ নেই, তো আমি একাকীত্ব বোধে ভুগেছি বলতে গেলে। এই যে একটা নিভৃতচারীতা সেটা আমার স্বভাবের অঙ্গ হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে আমি লিখেছিও আমার ঐ ‘কেমন আছেন’ বলে বইটাতে। সৎ বন্ধু যার নেই সে খুব দুর্ভাগা। একজন সৎ বন্ধু থাকা মানুষের খুব পরম ভাগ্যের ব্যাপার। তো সেরকম বন্ধু খুঁজে পাই না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : স্যার আমি খুব আশা করেছিলাম আপনি এমন কোন নাম বলবেন, সমসাময়িক বা একই সময়ের কেউ। আপনার খুব ভালো বন্ধু।
আহমদ রফিক : এই যেমন ধরো, অনেকেই আছেন যাদের স্কুল জীবনের বন্ধুও আছে, খুব খাতির। কিন্তু আমার বেলায়, আমার দুর্ভাগ্য কিনা জানি না বা স্বভাব বৈশিষ্ট্যের কারণে কিনা জানিনা তেমন ছিলো না। আনোয়ারুল হক খান। খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলো আমার। তার নানা পশ্চিম বঙ্গের খুব নামকরা মানুষ। খুব বন্ধু ছিল। ও আবার তেপ্পান্নর-ই ব্যাচ। আমি তখন ফাইনালে। ওরা তেপ্পান্নতে আমি চুয়ান্নতে। তো এরকম দু একজন ছিলো কিন্তু এদের। আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলো।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : ইউনিভার্সিটির?
আহমদ রফিক : হ্যাঁ!
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : মানে তুই তুকারি সম্পর্ক ছিলো কাদের সাথে?
আহমদ রফিক : তুই তুকারি সম্পর্ক ছিলো যেমন হাসান, সালাম, দেবদাস বা এমনি দু’চারজন।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আপনার আপোষহীন স্বভাব, চাঁছাছোলা কথাবার্তা—
আহমদ রফিক : হয়তো বা এসব কারণেও হতে পারে যেমন আরেকজন আছে যশোরের আফসার সিদ্দিকী পরে বিএনপিতে যোগ দিলেন, আমি বলেছি যে, তুমি এটা কি করলে? কমিউনিস্ট হয়ে, ভাসানি-ন্যাপ করে শেষ পর্যন্ত বিএনপি, যাই হোক তো খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলো ছাত্র জীবনে। ওর ও জীবনে ভালো ক্যারিয়ার হয়ে উঠলো না। তাকেও প্রতারিত করেছেন খালেদা জিয়া অনেক। অনেক কাজ করেছে বিএনপির জন্যে কিন্তু কিছু দেয়নি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : স্যার কবি আহমদ রফিকের কাছে আমার শেষ প্রশ্ন...
আহমদ রফিক : কি শেষ প্রশ্ন?
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আমি কিন্তু স্যার প্রথম আপনাকে আপনার কবিতা নিয়েই শুরু করেছিলাম। তো আমি মনে করি আপনি খুবই গুরুত্বপূর্ণ সব কাজ করেছেন কিন্তু আপনি মৌলিক ভাবে একজন কবি সবার আগে। এবং সেই পরিচয়টাই বড় হওয়া উচিত।
আহমদ রফিক : হুম। আমিও মনে মনে তাই মনে করি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : যেটা হলো স্যার আপনি আজকে যদি কোন কবিতা পড়তে বসেন, আহমদ রফিক নতুন একজন কবির কাছে কি আশা করে? কি পড়তে চায়?
আহমদ রফিক : কবি বলে কথা নেই, আমি কবি, সাহিত্যিকদের সামাজিক দায়বদ্ধতায় বিশ্বাসী। এই কথাটা অনেক দিন আগে কাদেরকে যেন বলেছি। দৈনিক বাংলার ইন্টারভিউতে বলেছিলাম। ছাপাও হয়েছিলো ছবি-টবিসহ। আমি সে কথাটা এখনও বলি যে কবিরও সামাজিক দায়বদ্ধতায় বিশ্বাস করি। নান্দনিকতাকে বাদ দিয়ে নয়। বা কবিতার সৌন্দর্যকে বাদ দিয়ে নয়। দুটো পাশাপাশি চলবে। সমাজ চেতনা, সমাজপরিবর্তনের মানে সেসবে কবির দায়বদ্ধতা আছে বলে আমি মনে করি। কেউ কেউ যেমন কমিউনিকেশনের কথা চিন্তা করতেন। তেমনি আমি মনে করি যে এটাও কবির একটা দিক। এবং সে জন্য কেউ চাক বা না চাক তাদের লিখার মধ্যে যেন বাস্তবতাগুলো ফুটে উঠে। সেটা অনেক সময় দেখা যায় যে, নান্দনিক চিন্তার এই যে সুধীন দত্ত লিখলেন যে মানে ঐ লাইনটা আর কি যেনো, ভুলে গেলাম—
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : অন্ধ হলে কী প্রলয় বন্ধ থাকে!
আহমদ রফিক : হ্যাঁ এটা তার সাথে যায় না। এর জন্য আমি বলি, মানে কবির দ্বিমাত্রিকতা, যেমন নান্দনিকতার দিক তেমনি সামাজিক দায়বদ্ধতার দিকেও থাকা উচিত। কাজেই আমি প্রত্যাশা করি ধ্রুপদী সাধনা করেও কবিতা সমাজসংলগ্ন থাকবেন।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : থ্যাঙ্ক ইউ স্যার। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আমি বোধ হয় বিরক্তই করলাম আপনাকে।
আহমদ রফিক : না না বিরক্ত না। ভালো লেগেছে তোমার সঙ্গে কথা বলে। তোমাকেও ধন্যবাদ।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : থ্যাঙ্ক ইউ স্যার।
(সাক্ষাৎকারটি আগামী প্রকাশনী প্রকাশিত শিমুল সালাহ্উদ্দিনের বই, কবির মুখোমুখি কবি থেকে নেয়া হয়েছে। এর কিছু অংশ এর আগে দৈনিক ইত্তেফাকের ঈদসংখ্যা ও বিডিনিউজের আর্টসে এ প্রকাশিত)




















