শিশুর ভুল শুধরে দিবেন যে ভাবে

আত্মীয়-স্বজনের সামনে মা-বাবা শিশুকে যেভাবে শুধরে দেন, তা শিশুর মানসিক প্রতিক্রিয়ার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে
ক্লাসে ভুল উত্তর দিয়ে সহপাঠীদের হাসি শোনা, সবার সামনে হেঁটে যাওয়ার সময় হঠাৎ হোঁচট খাওয়া কিংবা স্বজনদের সামনে কোনো শব্দের ভুল উচ্চারণ–এমন অভিজ্ঞতা কমবেশি সব শিশুর জীবনেই আসে। পুরো ঘটনাটি হয়তো ঘটে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় হলো, কয়েক বছর পার হয়ে যাওয়ার পরও শিশুটি হয়তো স্পষ্ট মনে রাখতে পারে ঠিক কে তার দিকে তাকিয়ে হেসেছিল বা কে কী মন্তব্য করেছিল।
বড়দের কাছে এসব ঘটনা নিতান্তই ছোটখাটো ভুল, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভুলে যাওয়ার কথা। কিন্তু শিশুদের জন্য আসল গল্পটা শুরু হয় এখান থেকেই। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, শিশুরা কোনো ঘটনায় কতটা আঘাত পাবে, তা নির্ভর করে ভুলটির চেয়েও বেশি মানুষের প্রতিক্রিয়ার ওপর। একটি সাধারণ ভুল কখনোই একজন শিশুর মনে দীর্ঘমেয়াদি ছাপ ফেলে না, যতক্ষণ না সেটির সঙ্গে চারপাশের মানুষের উপহাস বা বিচারমূলক দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত হয়।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুরা বুঝতে শেখে যে সমাজ বা চারপাশের মানুষ কীভাবে তাদের দেখছে। একটা বয়সে গিয়ে তারা খুব বেশি সচেতন হয়ে ওঠে যে তাদের প্রতিটি কাজ প্রশংসা কিংবা সমালোচনার কারণ হতে পারে। একই ভুল দুজন শিশুর জীবনে ভিন্ন অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে কেবল অন্যের আচরণের কারণে। যেমন–পড়ার সময় কোনো শিশু আটকে গেলে শিক্ষক যদি তাকে ভালোবেসে শুধরে দেন, শিশুটি বিষয়টি সহজেই ভুলে যায়। কিন্তু সেই ভুল নিয়ে যদি সবাই হেসে ওঠে বা পরে কেউ তা নিয়ে মজা করে, তবে ঘটনাটি তার মনে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করে।
এই নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াগুলো শিশুদের মধ্যে এক ধরনের হীনম্মন্যতা তৈরি করে। ভুল করা আর নিজেকে ‘খারাপ’ বা ‘অযোগ্য’ মনে করার মধ্যে বড় তফাৎ রয়েছে। অন্যেরা যখন কোনো ভুল দেখে হাসাহাসি করে বা খোঁচা দেয়, তখন শিশুটি ভাবতে শুরু করে, “আমি বোধহয় কোনো কাজের নই” বা “সবাই আমাকে বোকা ভাবছে।” এই চিন্তা তাদের ব্যক্তিত্বকে দুর্বল করে তোলে। এমনকি অনেকে বড় হয়েও পুরোনো সেই ঘটনা মনে করে মানসিকভাবে কষ্ট পেতে থাকে, যাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় ‘পোস্ট-ইভেন্ট প্রসেসিং’ বলা হয়। এর ফলে তারা পরবর্তীতে একই ধরনের সামাজিক পরিস্থিতি এড়িয়ে চলতে শুরু করে।
অভিভাবক হিসেবে শিশুদের সব বিব্রতকর মুহূর্ত থেকে দূরে রাখা সম্ভব নয়। শিশুরা ভুল করবেই, কিন্তু সেই ভুলের পর তারা ঘরে কেমন পরিবেশ পাচ্ছে–সেটাই আসল। কোনো শিশু পুরোনো কোনো বিব্রতকর ঘটনার কথা বললে শুরুতেই “কেউ ওসব মনে রাখেনি” বলে উড়িয়ে না দিয়ে, তার মন দিয়ে কথা শোনা উচিত। এছাড়া, শিশুর সেই ভুলকে পারিবারিক আড্ডায় মজার গল্প বানিয়ে না বলা এবং ভুল আর শিশুর মেধা বা ব্যক্তিত্বকে এক করে না দেখা ভীষণ জরুরি। একটি ছোট্ট অস্বস্তিকর মুহূর্ত যেন শিশুর নিজেকে যোগ্য মনে করার ক্ষমতাকে কেড়ে নিতে না পারে, সেই নিরাপদ পরিবেশটি তৈরি করে দেওয়াই হলো আসল কাজ।
সূত্র: টাইমস এন্টারটেইনমেন্ট





