মস্তিষ্কের জটিল রোগ থেকে বাঁচাবে কিটো ডায়েট!

মস্তিষ্কের রোগ নিয়ে বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ নতুন কিছু নয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিভ্রংশ, পারকিনসনস কিংবা অন্যান্য স্নায়বিক অবক্ষয়জনিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে। এসব রোগের কার্যকর চিকিৎসা নিয়ে বিশ্বজুড়ে গবেষণা চলছে বহু বছর ধরে। এমন সময় একটি খাদ্যাভ্যাসকে ঘিরে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে গবেষকদের মধ্যে। যে খাদ্যতালিকাটি এতদিন মূলত দ্রুত ওজন কমানোর উপায় হিসেবে পরিচিত ছিল, সেটিই হয়তো ভবিষ্যতে মস্তিষ্কের কিছু জটিল রোগ প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
কল্পনা করুন, এক সকালে আপনার ডাইনিং টেবিলে সাজানো রয়েছে মাখন আর পনিরের মতো বিভিন্ন চর্বিযুক্ত খাবার। ওজন কমানোর জন্য যারা মরিয়া, তারা হয়তো এমন দৃশ্য দেখে কিছুটা আঁতকে উঠতে পারেন। কিন্তু আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানে এই চর্বিবহুল খাবারই অনেকের কাছে পরম বন্ধু হয়ে উঠেছে, যা কিটোজেনিক বা সংক্ষেপে কিটো ডায়েট নামে পরিচিত।
সাধারণ মানুষের ধারণা, কিটো ডায়েট কেবল শরীরের মেদ ঝরিয়ে একটি সুন্দর অবয়ব দেওয়ার হাতিয়ার। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের নতুন একটি গবেষণা এই ধারণার পরিধিকে আরও অনেক দূর বাড়িয়ে দিয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, যে ডায়েট আপনি ওজন কমানোর জন্য বেছে নিচ্ছেন, তা কেবল আপনার ওজন বা মেদই কমায় না, বরং নিঃশব্দে আপনার মস্তিষ্ককে রক্ষা করতে পারে আলঝেইমার্স বা পারকিনসন্সের মতো মারাত্মক ও ধ্বংসাত্মক রোগ থেকে।
পর্তুগালের ইউনিভার্সিটি অব কয়েনব্রার একদল গবেষক সম্প্রতি একটি বড় ধরনের বৈজ্ঞানিক গবেষণা চালিয়েছেন। তারা বিগত বছরগুলোতে হওয়া ডজন খানেক পূর্ববর্তী গবেষণা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। এই বিশ্লেষণের মূল উদ্দেশ্য ছিল কিটো ডায়েটের সঙ্গে মানুষের স্নায়ুক্ষয়কারী রোগ বা নিউরোডিজেনারেটিভ ডিজিজের সম্পর্ক খুঁজে বের করা। গবেষণার তালিকায় ছিল আলঝেইমার্স, পারকিনসন্স এবং হান্টিংটন্সের মতো জটিল ও নিরাময়অযোগ্য রোগ।
সাধারণত আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যে খাবার খাই, তা থেকে পাওয়া গ্লুকোজই হলো শক্তির মূল উৎস। মস্তিষ্ক মূলত এই গ্লুকোজের ওপরই নির্ভরশীল। কিন্তু আলঝেইমার, পারকিনসন কিংবা হান্টিংটন ডিজিজের মতো ভয়াবহ স্নায়বিক রোগগুলোর ক্ষেত্রে দেখা যায়, আমাদের মস্তিষ্ক গ্লুকোজ ব্যবহার করার স্বাভাবিক ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। গবেষকরা এখন বলছেন, কিটো ডায়েট এমন একটি বিকল্প ব্যবস্থার দিকে ইঙ্গিত করছে যা মস্তিষ্কের এই শক্তির সংকট দূর করতে পারে। অর্থাৎ, শরীরের বিপাকীয় ব্যবস্থাকে পরিবর্তনের মাধ্যমে মস্তিষ্ককে রোগের হাত থেকে রক্ষা করার এক অভিনব কৌশল হতে পারে এই বিশেষ ডায়েট।
কিটো ডায়েট বা কিটোজেনিক ডায়েট মূলত ফ্যাট এবং প্রোটিন সমৃদ্ধ একটি খাদ্যতালিকা, যেখানে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ থাকে অত্যন্ত কম। যখন আমরা কার্বোহাইড্রেট কমিয়ে ফেলি এবং ফ্যাটের ওপর জোর দিই, তখন শরীর শক্তির উৎস হিসেবে গ্লুকোজের বদলে ফ্যাট পোড়াতে শুরু করে। জৈবিকভাবে এই অবস্থাকে বলা হয় কিটোসিস। এই প্রক্রিয়ায় ফ্যাট অণু থেকে কিটোন নামক এক ধরনের উপাদান তৈরি হয়, যা আমাদের শরীরের শক্তি সরবরাহের বিকল্প মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই কিটোনগুলো শুধুমাত্র শরীরের ওজনই কমায় এমনটা না। এরা মস্তিষ্কের জন্য একটি জরুরি জ্বালানি হিসেবেও কাজ করতে পারে।
গবেষকরা তাদের গবেষণাপত্রে উল্লেখ করেছেন, আলঝেইমারের রোগীদের ওপর করা বিভিন্ন পরীক্ষায় দেখা গেছে যে, যখন মস্তিষ্ক গ্লুকোজ থেকে শক্তি পেতে ব্যর্থ হয়, তখন এই কিটোনগুলো একটি জরুরি শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে। এটি মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ বা নিউরনের স্থায়িত্ব এবং কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে। শুধু তাই নয়, পারকিনসন এবং মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসের মতো রোগের ক্ষেত্রে কিটোনগুলো প্রদাহ কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। এমনকি কিটো ডায়েট কোষের ভেতরে অটোফেজি বা সেলুলার ক্লিনিং প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে এবং অন্ত্রের এমন কিছু ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি ঘটায়, যা মস্তিষ্কের সার্বিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সহায়ক।
এখানেই শেষ নয়, কিটোন বডির আরও কিছু চমৎকার গুণাগুণ গবেষণায় উঠে এসেছে। পারকিনসন্স এবং মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস রোগে আক্রান্ত ইঁদুরের ওপর করা পরীক্ষায় দেখা গেছে যে, কিটোন শরীরের প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন কমাতে সাহায্য করে। এর পাশাপাশি এটি শরীরের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কোষীয় পরিচ্ছন্নতা প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় অটোফ্যাজি বলা হয়। অটোফ্যাজি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোষ তার ভেতরের পুঞ্জীভূত ক্ষতিকর ও মৃত অংশগুলো পরিষ্কার করে ফেলে। একই সাথে এই ডায়েট অন্ত্রের এমন কিছু উপকারী ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিতে সহায়তা করে, যা মানুষের উন্নত মস্তিস্কের কার্যকারিতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এই সমস্ত ইতিবাচক দিকগুলো একত্রিত করলে দেখা যায় যে, কিটো ডায়েট এবং এর ফলে শরীরে তৈরি হওয়া বিপাকীয় পরিবর্তনগুলো মস্তিষ্কের ক্ষতি করার জন্য দায়ী ক্ষতিকর প্রক্রিয়াগুলোকে সরাসরি প্রতিরোধ করতে সক্ষম।
তবে এর কিছু বড় সমস্যাও রয়েছে। কিটো ডায়েট মানিয়ে নেওয়া সাধারণ মানুষের জন্য বেশ কষ্টসাধ্য। এই ডায়েট কঠোরভাবে অনুসরণ করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয় না। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে এই ডায়েট অনুসরণের ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য, অনিদ্রা এবং রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। অতীতের কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে, ভুল পদ্ধতিতে দীর্ঘদিন কিটো ডায়েট অনুসরণ করলে তা টাইপ ২ ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই কোনো কিছুকেই অন্ধভাবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই। যেকোনো ডায়েট বা জীবনযাত্রার পরিবর্তন করার আগে শরীরের চাহিদাকে প্রাধান্য দেওয়া জরুরি।
বিজ্ঞান আমাদের এমন এক অবস্থানে এনে দাঁড় করিয়েছে যেখানে আমরা জানি যে, আমাদের ডায়েট কেবল আমাদের পেটের ক্ষুধা মেটায় না, বরং এটি আমাদের মস্তিষ্কের বার্ধক্যকেও ধীর করে দিতে পারে। কিটো ডায়েট হয়তো অদূর ভবিষ্যতে আলঝেইমার কিংবা পারকিনসনের মতো রোগের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠবে। তবে সে পর্যন্ত আমাদের ধৈর্য ধরতে হবে এবং বিজ্ঞানের পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। বর্তমান জীবনযাত্রার অনিয়ম থেকে মুক্তি পেতে পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
সূত্র : সায়েন্স এ্যালার্ট










