২৪ ঘণ্টা মাধ্যাকর্ষণ শক্তির বাইরে থাকলে আপনার শরীরে কী কী পরিবর্তন হবে?

কল্পনা করুন যে আপনি এমন একটি কক্ষে আছেন যেখানে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি বলে কিছু নেই। আপনি ওজনহীন অবস্থায় শূন্যে যে ভাসছেন- আপনার শরীরের ভেতরে খুবই দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। যদিও মাধ্যাকর্ষণের বাইরে থাকলে শরীরের দীর্ঘস্থায়ী কোনো ক্ষতি হয় না, কিন্তু সঞ্চালন, স্নায়বিক ক্রিয়াতে, ভারসাম্য রক্ষায়, মস্তিষ্কের কাজে প্রভাব পড়তে পারে।
মধ্যাকর্ষণের বাইরে থাকলে আমাদের শরীরে কী কী পরিবর্তন আসতে পারে তা জানা যাবে, এই লেখায়।
প্রথম প্রতিক্রিয়া : রক্ত সঞ্চালন ঊর্ধ্বমুখী হতে থাকবে
ভারতের এইচওডি ডা. আর আর দত্তের মতে, একজন ব্যক্তি যদি ২৪ ঘণ্টা মাধ্যাকর্ষণের বাইরে থাকে, তাহলে তার শরীর খুব দ্রুতই পরিবর্তন হতে থাকে। পৃথিবীতে মানুষের শরীরে রক্ত পায়ের দিকে প্রবাহিত হতে থাকে। কিন্তু ওজনহীন অবস্থায় রক্তের প্রবাহে সেই নিম্নমুখী চাপ থাকে না। রক্ত তখন বুকে এবং মাথায় চাপ দিতে থাকে। যার কারণে মুখের ফোলা ভাব, নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং অনেক সময় মাথায় ব্যথা দেখা দিতে পারে।
ডা. আর আর আরও বললেন, যে রক্তপ্রবাহ নিম্নাঙ্গগুলোতে চলাচল করত, তা শুরুর দিকে উপরের দিকে মাথায়, মস্তিষ্কে এবং বুকে চাপ প্রয়োগ করতে থাকে।
মস্তিষ্ক তখন রক্তকে শরীরের অতিরিক্ত তরল পদার্থ হিসেবে বিবেচনা করে, সেজন্য প্রসাবের চাপ বাড়তে পারে। প্লাজমার আকার ধীরে ধীরে ছোট হতে থাকে। এই পরিবর্তনগুলোকে ওজনহীনতার ফলে হওয়া সবচেয়ে শুরুর দিকের পরিবর্তন হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
হৃৎপিণ্ড এবং রক্তচাপের মধ্যে পরিবর্তন ঘটে
সাধারণত ওজনহীন অবস্থায় হৃৎপিণ্ডকে বাড়তি কসরতের মাধ্যমে রক্ত মস্তিষ্কে সঞ্চালন করতে হয় না। ওজনহীন অবস্থা হার্টের কাজ কমিয়ে দিতে সাহায্য করে। কারণ তখন মাধ্যাকর্ষের অভাবে শরীর স্বয়ংক্রিয়ভাবেই রক্তকে ওপরের দিকে সঞ্চালিত করতে থাকে, বলছেন ডা. আর আর দত্ত।
এমন পরিস্থিতে রক্ত সঞ্চালনে কিছুটা ওঠা-নামা দেখা দিতে পারে। প্লাজমার আকার কমে যাওয়ার কারণে রক্তচাপের পরিমাণ কিছুটা কমতে থাকে পারে। একজন সুস্থ ব্যক্তির শরীরের কার্ডিওভাস্কুলার সাধারণত সবল থাকে এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শরীর এসব পরিবর্তন সহজেই গ্রহণ করে নেয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই যে, ২৪ ঘণ্টা মাধ্যাকর্ষণের বাইরে থাকা বড় কোনো পরিবর্তন ঘটানোর জন্য আসলেই খুব কম সময়। এই অল্প সময়ের মধ্যে হাড় ভেঙে যাওয়া কিংবা শরীরের মাংসে আঘাত পাওয়ার মতো বড় কোনো দুর্ঘটনা আশা করা যায় না।
"হাড় এট্রপি এবং মাসল ফাংশনে ডিমিনারালাইজেশন সংক্রান্ত ঘাটতির জন্য একদিন নয়, বরং কয়েকদিন কিংবা এক সপ্তাহ মাধ্যাকর্ষের বাইরে থাকতে হবে' বলে বিষয়টি পরিষ্কার করেন ডা. দত্ত।
মস্তিষ্ক সাধারণত এর রেফারেন্সকেন্দ্র চিনতে ভুল করতে শুরু করে
স্নায়বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে চাইলে, মাধ্যাকর্ষণের বাইরে থাকা স্নায়ুর জন্য খুবই এলোমেলো একটি অবস্থা। স্নায়ু বিশেষজ্ঞ ডা. আনন্দির মতে,‘মস্তিষ্ক তখন অঙ্গের ভঙ্গিমা ঠিক রাখতে ক্রমাগত কান, পেশি এবং জয়েন্টের অভন্ত্যরীণ অংশ হতে সংবাদ সংগ্রহ করতে থাকে। মাধ্যাকর্ষের অবর্তমানে এসব কাজে ব্যাঘাত ঘটতে থাকে। কানের ভাস্টিবুলার অ্যাপারেটাসের কাজে শূন্য মাধ্যাকর্ষের কারণে ব্যাঘাত ঘটে।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মাধ্যাকর্ষণের আয়ত্তে আবার ফিরে আসা
আশ্চর্যজনক ঘটনা হলো যে, মাধ্যাকর্ষণের বাইরে যাওয়ার থেকে ফিরে আসাকে তূলনামূলক আরও জটিল হিসেবে দেখা হয়। শরীরের তরল যখন শূন্য মাধ্যাকর্ষণের সামঞ্জস্য লাভ করে, তখন পুরাতন অবস্থায় অর্থাৎ রক্তের পায়ের দিকে সঞ্চালিত হতে থাকা আবার কঠিন হয়ে পড়ে। ডা. আনন্দির মতে, 'এই ২৪ ঘণ্টায় মস্তিষ্ক ভিজুয়াল রিফ্লেকশনের উপর নির্ভরশীল হতে শুরু করে। যার কারণে খুব তাড়াতাড়ি আবার মাধ্যাকর্ষে ফিরে এসে সে অনুযায়ী কাজ করতে কিছুটা সময়ের প্রয়োজন পড়ে।
একজন সুস্থ ব্যক্তির জন্য এই ২৪ ঘণ্টা নিশ্চয়ই ক্ষতিকর নয়। একজন সুস্থ ব্যক্তি শূন্য মাধ্যাকর্ষণে থাকলে মৃদু মাথা ব্যথা। নাক বন্ধ ভাব, পেশি ব্যথা, মাথা ঘোরা, এই উপ গুলো দেখা দিতে পারে, এর বাইরে হাড় ভাঙা অথবা পেশির ক্ষতির মতো আর গুরুতর কিছু হবে বলে আশা করা যায়।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে



