আষাঢ়স্য ইওংরিং

পাহাড়ের চূড়ার বা ঝিরির পাশের পাড়াগুলো দূর থেকে দেখতে ছবির মতো। মনে হয় কোনো শিল্পী রঙতুলির আঁচড়ে পাহাড়ের সবুজ শরীরে খয়েরি কুঁড়েঘর এঁকে রেখেছেন। এমনই এক ছোট্ট-সুন্দর পাড়ার সন্ধানে আমার এবারের যাত্রা। পাড়াটির নাম ইওংরিং। চিম্বুক রেঞ্জের প্রায় ১ হাজার ৮০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থান। সেখানে পৌঁছানোর পথও রোমাঞ্চকর।
সাধারণত একলা ঘোরাতেই আনন্দ। নিজেকে যাচাই করা যায়। স্বাধীনভাবে পথ খুঁজে যাওয়ার রোমাঞ্চও হারাতে চাই না। তাই এবারও একলাই বেরিয়ে পড়ি। প্রথমে আলীকদম থেকে বাইকে চলে যাই কুরুপপাতা বাজার। সেখান থেকেই মূল যাত্রা শুরু। মাতামুহুরী নদী পেরিয়ে শুরু মূল ট্যাকিং। খাড়া রাস্তা, তারপর আবার বৃষ্টিতে পিছল। কিছুটা বেগ পেলেও থামি না। একটি পাহাড়ে উঠতেই চোখ আটকে গেল। সামনে মাতামুহুরী ভ্যালিতে মেঘের ওড়াউড়ি। আর যতদূর দুচোখ যায় সবুজের চাদর। এক পর্যায়ে পৌঁছে যাই তৈন খালে।
এবার পথ কঠিন, তবে আরও সুন্দর। তৈনের ওপরের দিকটা বড় বড় পাথরে ঠাসা, আর আছে দুর্গম গিরিখাদ। বছরের পর বছর পানির স্রোত পাথর কেটে গিয়ে তৈরি করেছে নকশা। এই নির্জন খালের তীর ধরে একলা যাত্রা। কখনো খাল পেরোনোর সময় পানির কলকল শব্দে ছেদ পড়ে আমার পায়ের আওয়াজে। খালের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে একসময় একটি ঝিরিপথ ধরে সোজা চিম্বুকে ওঠা শুরু করি। ঝিরিটা দুর্দান্ত। চিম্বুকের সব ঝিরিই অনেক খাড়া আর বড় বড় পাথরে ঠাসা।
একেকটা পাথর প্রায় একতলা সমান উঁচু। সাবধানে ঝিরি ধরে উঠলাম। এবার পাহাড়ি পথ। আর গোটা পাহাড় ঢেকে আছে জুমে। ছোট কচি ধান বাতাসে দুলছে। মনে হচ্ছে, পুরো এলাকাটি সবুজ কার্পেটে মুড়ে রেখেছে প্রকৃতি।
জুম থেকে উঠতেই প্রথম পাড়ার দর্শন। দূর থেকে পাড়ার ঘর দেখা যাচ্ছে, কিন্তু পথ এখনো অনেক বাকি। চারদিকে চিম্বুকের রেইন ফরেস্টের মাঝে কয়েকটি ঘর উঁকি দিচ্ছে। পাড়ার পেছনে মাথা উঁচু করে আছে চিম্বুকের এক চূড়া। নাম নন-খ।
হঠাৎ মাথার ওপর দিয়ে বাতাসে শোঁ শোঁ শব্দ তুলে উড়ে গেল রংরাং পাখি। ম্রোরা রাজ ধনেশকে রংরাং নামে চেনে। সামনেই যাচ্ছে মিরিঞ্জা রেঞ্জের বড় বড় পাহাড়। হঠাৎ শুরু হলো বৃষ্টি। শরীরটা যেন জুড়িয়ে গেল। পাহাড়ে বৃষ্টি দেখতে মোহময়। একই সঙ্গে বর্ষায় পথচলা অনেক কঠিন। সামনেই পুরনো জুমের রাস্তা। পাড়ায় প্রবেশের আগেই আশ্চর্য সুন্দর এক বন। সেখানে আকাশছোঁয়া সব প্রাচীন বৃক্ষ।
মাথা উঁচু করে যেন আমাকে অভিবাদন জানাচ্ছে তাদের ঘাঁটিতে। মাঝেমধ্যে নাম না জানা পাখির ডাক ছাড়া অরণ্য একরকম নিশ্চুপ। তারপর হঠাৎ শুরু হয়ে গেল ঝিঁঝিঁ পোকার দলগত সংগীত। কেমন ঘোর লাগা অবস্থায় এই মায়াবন দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম পাড়াটিতে। অবশ্য ততক্ষণে আমার পায়ের দখল নিয়েছে জোঁকের দল।
মাত্র সাত ঘর মানুষের বাস। যখন পৌঁছালাম পাড়া খালি। সবাই জুমে গেছে কাজ করতে। বিকালে সবাই ফিরলে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে কারবারির ঘরে জমে ওঠে আড্ডা। তাদের আন্তরিকতার অভাব নেই। সারা দিনের পরিশ্রমের পর চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে চলে গল্প। সে গল্প জঙ্গলের বাসিন্দাদের, পাহাড়ের, জুমের। দিদিরাও তুলা থেকে সুতা তৈরি করতে করতে যোগ দেয় আড্ডায়।
অনেক কথা বুঝতে না পারলেও সে আড্ডায় যে আনন্দের কমতি নেই, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। আর আমিও তাদের একজন হয়ে কাটিয়ে দিলাম পাঁচ-পাঁচটা দিন। পাড়ার বাসিন্দাদের সঙ্গে জুমে গেলাম, রান্না করলাম, তাদের খাবার খেলাম, গল্প করলাম।
তবে সবচেয়ে বেশি যেটি করলাম, সেটি পাড়ায় শুয়ে-বসে বর্ষা দেখা। এই মেঘে ঢেকে যায় চারপাশ, তারপর হঠাৎ শুরু হয় ঝুম বৃষ্টি। ওই বৃষ্টিতে পাড়ার বাড়িগুলো কেমন অস্পষ্ট হয়ে যায়। দূরের অরণ্য-পাহাড়কে মনে হয় ঝাপসা, অন্য জগতের কিছু।







