রংধনু পর্বতের দেখা পাবেন যে দেশে

সংগৃহীত ছবি
পৃথিবীতে কিছু দৃশ্য এতটাই সুন্দর যে সেগুলো দেখে মনে হয় কোনো দক্ষ চিত্রকরের তুলিতে আঁকা ছবি। যেন শিল্পী নিখুঁত তুলির টানে সাজিয়েছেন চারপাশ, যেখানে রঙের তীব্রতা প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মকে হার মানায়। প্রকৃতির সৃষ্টি হয়েও এত রঙিন দৃশ্য অনেকের কাছেই অবাস্তব মনে হয়। বিশ্বে এমন কিছু জায়গা তাদের অদ্ভুত ভূতাত্ত্বিক সৌন্দর্যের কারণে পর্যটকদের চুম্বকের মতো টানে। এই তালিকায় সবার ওপরে যে নামটি আসে তা হলো রেইনবো মাউন্টেন বা রংধনু পর্বত। পেরুর এক দুর্গম উচ্চতায় অবস্থিত এই পর্বতটি তার গায়ে লেগে থাকা নানা রঙের ছটায় পরিচিত। পর্বতটির ঢালগুলোতে রঙের এমন খেলা আলোর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
পেরুর আন্দিজ পর্বতমালায় অবস্থিত ভিনিকুনকা পাহাড়টিই মূলত সারা বিশ্বে রেইনবো মাউন্টেন নামে পরিচিত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে পাঁচ হাজার মিটারেরও বেশি উচ্চতায় অবস্থিত এই পর্বতটি গত কয়েক বছরে পেরুর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। এই পাহাড়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর গা বেয়ে নেমে যাওয়া বিভিন্ন রঙের স্তর। শত শত বছর ধরে বিভিন্ন খনিজ উপাদানের জমা হওয়ার ফলে পাহাড়ের গায়ে রঙের এই পরত তৈরি হয়েছে।
পাহাড়ের এই বিচিত্র রঙের পেছনে রয়েছে বৈজ্ঞানিক কারণ। মূলত ভূতাত্ত্বিক গঠন এবং খনিজ উপাদানের মিশ্রণই এই পাহাড়কে এত রঙিন করে তুলেছে। পাহাড়ের গায়ে আমরা যেসব রঙের ছটা দেখতে পাই তার পেছনে রয়েছে বিশেষ কিছু খনিজ পদার্থ। যেমন পাহাড়ের লাল রঙের জন্য দায়ী হলো আয়রন অক্সাইড। সোনালি বা হলুদ রঙের জন্য রয়েছে বিভিন্ন সালফাইড খনিজ। আবার সবুজাভ ভাব এসেছে ক্লোরাইট এবং অন্যান্য যৌগ থেকে। এ ছাড়া মিশ্র পাললিক স্তরের কারণে পাহাড়ের গায়ে বাদামি এবং বেগুনি রঙের ছোঁয়াও দেখা যায়। বছরের পর বছর ধরে আবহাওয়া এবং মাটির ক্ষয় হওয়ার ফলে এই রঙিন স্তরগুলো উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই পাহাড় কিন্তু সবসময় এভাবে দৃশ্যমান ছিল না। দীর্ঘ সময় ধরে এলাকাটি বরফে ঢাকা ছিল। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে যখন বরফ গলতে শুরু করল, ঠিক তখনই পাহাড়ের এই রঙিন রূপ মানুষের চোখের সামনে ধরা দেয়। এর আগে বিষয়টি খুব একটা জানা ছিল না। তবে বর্তমান সময়ে ভ্রমণ ফটোগ্রাফি এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রসারের কারণে এটি বিশ্ব জুড়ে পরিচিতি লাভ করেছে। আজ এই জায়গাটি হাইকার বা ট্রেকার, ল্যান্ডস্কেপ ফটোগ্রাফার, অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় পর্যটক এবং যারা মাচু পিচুর বাইরে পেরুকে নতুনভাবে আবিষ্কার করতে চান, তাদের জন্য এক স্বপ্নের গন্তব্য।
তবে রেইনবো মাউন্টেনে পৌঁছানো মোটেও সহজ নয়। ভিনিকুনকা পৌঁছাতে হলে পর্যটকদের একটি দীর্ঘ এবং উচ্চতার কারণে বেশ চ্যালেঞ্জিং ট্রেকিং করতে হয়। যারা এখানে ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য কিছু তথ্য জেনে রাখা জরুরি। ট্রেকিং করতে সাধারণত কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে। যেহেতু পাহাড়টি অনেক উঁচুতে অবস্থিত, তাই অনেকের ক্ষেত্রে উচ্চতাজনিত অসুস্থতা দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া সারাদিনে আবহাওয়া খুব দ্রুত পরিবর্তিত হয়। তাই পাহাড়ে ওঠার আগে শরীরকে উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। অধিকাংশ পর্যটক কুসকো শহর থেকে তাদের যাত্রা শুরু করেন, যা এই অভিযানের প্রধান কেন্দ্রস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
পাহাড়ের এই রঙিন রূপ ছাড়াও ট্রেকিংয়ের পথে পর্যটকরা বরফে ঢাকা আন্দিজ পর্বতের চূড়া দেখতে পান। পথের পাশে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায় আলপাকা এবং লামার দলকে। এ ছাড়া বিস্তীর্ণ পাহাড়ি উপত্যকা এবং স্থানীয় আন্দিজ সম্প্রদায়ের মানুষের জীবনযাত্রা পর্যটকদের এক অন্যরকম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করে। উচ্চতা, মনোরম দৃশ্য এবং অদ্ভুত ভূতাত্ত্বিক গঠনের সমন্বয়ে এই জায়গাটি সাধারণ পাহাড়ের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা এক অনুভূতি দেয়।
রেইনবো মাউন্টেনে পৌঁছানোর পথটিও বেশ রোমাঞ্চকর। আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্য প্রথমে কুসকোতে পৌঁছাতে হবে, কারণ এটিই নিকটতম বড় শহর। এরপর সড়কপথে কুসকো থেকে গন্তব্যের কাছাকাছি পর্যন্ত গিয়ে সেখান থেকে গাইডের সহায়তায় ট্রেকিং করে পাহাড়ে উঠতে হয়। অধিকাংশ পর্যটকই স্থানীয় ট্যুর গাইড বা এজেন্সির সাহায্য নিয়ে এই পথে পা বাড়ান।
এই পাহাড়ে ভ্রমণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হলো মে থেকে সেপ্টেম্বর মাস। এই সময়ে আবহাওয়া শুষ্ক থাকে এবং ট্রেকিং করার পরিবেশ স্থিতিশীল থাকে। বর্ষার মাসগুলোতে ট্রেকিং করার পথ পিচ্ছিল হয়ে যায় এবং কুয়াশার কারণে দৃশ্যপট অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। তাই পরিষ্কার দৃশ্য উপভোগ করতে এবং ভিড় এড়াতে সকাল সকাল যাত্রা শুরু করাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
রেইনবো মাউন্টেনের এই নাটকীয় রঙ এবং মেঘ ছোঁয়া উচ্চতা একে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম চেনা ও আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক দর্শনীয় স্থানে পরিণত করেছে। সব মিলিয়ে রেইনবো মাউন্টেন প্রকৃতির এক অসাধারণ কারুকাজ। যারা অজানাকে জয় করতে ভালোবাসেন এবং প্রকৃতির আসল রূপ দেখতে চান, তাদের জন্য রেইনবো মাউন্টেন এক জীবনের সেরা অভিজ্ঞতা হয়ে থাকতে পারে। প্রকৃতির এই রূপ আর কতদিন এভাবে টিকে থাকবে, তা সময় বলে দেবে। তবে যারা একবার এই পাহাড় দেখেছে, তাদের হৃদয়ে এই রঙিন স্মৃতি অমলিন হয়ে থাকবে।
সোর্স: এনডিটিভি









