অন্য গল্প
নদীর জলে ধ্যানমগ্ন রাজা পাথর

রাজা পাথর
থানচি দিয়ে নৌপথে তিন্দু পেরোনোর পর সাঙ্গুর বুকে যে পাথররাজ্যে প্রবেশ ঘটে, সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো রাজা পাথর। এর আশপাশে আরও বেশ কটি ছোট-বড় পাথর আছে। নদীপথে যেতে যেতে এই পাথরগুলো পর্যটকদের মুগ্ধ করে। এগুলোর সঙ্গে ছবি তোলেন তারা মন্ত্রমুগ্ধের মতো। তবে এগুলোর পুরো ভঙ্গিমা চিত্র চোখের ফ্রেমে ধরা পড়ে না।
ড্রোন উড়িয়ে ছবি নিলে মনে হবে, এটি কোনো মহারাজার দরবার কক্ষ। পাগড়ি মাথায় সিংহাসনে বসে আছেন মস্ত রাজা। উজির-নাজির-সেনাপতি ও সভাসদরা মগ্ন হয়ে রাজার আদেশ শুনছেন।
পাহাড় ধোয়া ঘোলাজল প্রমত্তা সাঙ্গুকে তোলপাড় করে যখন দুই কূল ভাসিয়ে নিয়ে যায়, তখনো ধ্যান ভাঙে না রাজা পাথরের। নিশ্চল মৌনতা নিয়ে যেন সে স্রোতের গর্জনের শব্দমাত্রা গুনে। কবে, কখন, কত শতাব্দী আগে শঙ্খের বুকে আসন পেতে বসেছে বিশাল পাথরটি— কেউ জানে না।
রাজা পাথর নিয়ে নানা মিথ আছে সমাজে। কেউ মনে করেন, ওপর থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের তোড়ে টিকতে না পেরে পাথুরে পাহাড় ভেঙে খানখান হয়ে আছড়ে পড়েছে নদীর বুকে। কারও কারও ধারণা, প্রবল ঢেউ ঠেকিয়ে জনপদ ও ফসল রক্ষার জন্য স্রষ্টা এই পাথরকে এখানে পাঠিয়েছেন।
অন্যদিকে মারমা জনগোষ্ঠী বিশ্বাস করে, শত শত বছর আগে ওপারের (মিয়ানমার) কোলাদাইন নদী পেরিয়ে গুপ্তধনের সন্ধানে আসেন কোনো এক মহাঋষি। নদীর বুকে পাথরখণ্ডের ওপর আস্তানা পেতে গুপ্তধনের সন্ধানে ধ্যানে বসেন তিনি। গুপ্তধন নিয়ে ফিরে যাওয়ার সময় ভুল করে ফেলে যান মাথার পাগড়ি। মহাঋষির পরিধেয়ের পবিত্রতা রক্ষায় বড় পাথরের মাথায় গেঁথে যায় সেই পাগড়ি।
কারও কারও মতে, শঙ্খ নদীর তলদেশে একটি অন্ধকার পাথুরে গুহায় গুপ্তধনের সন্ধান পেয়ে যান মহাঋষি। এ অবস্থায় গুহামুখ বিশাল এক পাথরখণ্ড চাপা দিয়ে রেখে যান তিনি। চিহ্ন হিসেবে পাথরখণ্ডের ওপর তার অলৌকিক পাগড়িটি রেখে যান।
মারমারা এই পাথরকে চেনে ‘বংড’ নামে। মারমা ভাষায় পাগড়িকে ‘গবং’ বলা হয়। অন্যদিকে ‘ডং’ বা ‘ড’ অর্থ পাথর। ‘গবং’ শব্দ থেকে কালক্রমে ‘বং’ এবং পাথর থেকে ‘ড’ মিলে ‘বংড’ নামের উৎপত্তি বলেও মনে করেন কেউ কেউ। মহাঋষির পাগড়ি চিহ্নের কারণে স্থানীয়রা বংডকে পাগড়ি পাথরও বলে থাকেন। ঋষির কৃপা লাভের আশায় টাকা-স্বর্ণ-রৌপ্য এবং মূল্যবান উপকরণ এই পাথরের পাগড়িসদৃশ স্থানে পূজা হিসেবে রেখে যান অনেকেই।
জেনে নিন
বান্দরবান সদর থেকে যেকোনো বাহনে করে ৮০ কিলোমিটার সড়কপথ পাড়ি দিলে থানচি সদর। সেখান থেকে ইঞ্জিন বোটে চড়ে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে রাজা পাথরের অবস্থান। এটি পেরিয়ে আরও কিছুটা গেলেই রেমাক্রি ফল বা রেমাক্রি ঝরনা।
রাজা পাথর দেখতে হলে প্রতি পাঁচজনের জন্য সঙ্গে নিতে হয় একজন স্থানীয় ট্যুর গাইড। থানচি বাজারসংলগ্ন সাঙ্গু নদীর ঘাট থেকে পাঁচ হাজার টাকার ইঞ্জিন বোট রিজার্ভ করে তিন-চার ঘণ্টার মধ্যেই ঘুরে আসা যায়।




