বনে বনে রোমাঞ্চ

বর্ষায় আদমপুরের বনে লেখক
বর্ষায় বন সবুজ-সুন্দর। আবার জরুরি সতর্ক থাকাও। পাঠককে রোমাঞ্চকর সেই ভ্রমণে সঙ্গী করেছেন আলমাস জামান
সারা দিনের বৃষ্টিতে কাদায় ডুবে ছিল রাস্তা। অনেক কষ্টে সিএনজিচালিত অটোরিকশা আমাদের কমলগঞ্জ থেকে আদমপুর বন বিভাগের বাংলোর সামনে নামিয়ে দিল। একটি টিলার মাথায় ওটা। চারদিকে বিশাল গাছ, নিচে ঘন বন। ঘরে ঢুকেই চমক। ছাদের কাঠের আড়ায় ঝুলে আছে অসংখ্য বাদুড়। রাতের নীরবতায় মাঝে মাঝে ডানা ঝাপটানোর শব্দে ঘুম ভেঙে যাচ্ছিল। গল্পটা ২০১৯ সালের।
পরদিন সকালে আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন বনের অভিজ্ঞ গাইড জাফর ভাই। রোগা-পাতলা মানুষ, মুখে সবসময় পান, হাতে ধারালো দা। বন তার হাতের তালুর মতো চেনা। আদমপুরে হাঁটা মানেই ছড়া ধরে এগোনো। বর্ষায় সেই ছড়া কখনো হাঁটু, কখনো কোমর পর্যন্ত পানিতে ভরে যায়। ছড়া ছেড়ে যখন বনের ঢালে উঠতে শুরু করলাম, তখন পায়ের নিচে কী আছে, তা দেখারও উপায় নেই। সেদিনই প্রথম কাছ থেকে দেখলাম বাঘজোঁক। হলুদ-লাল ডোরাকাটা মোটা জোঁক। টের পাওয়ার আগেই রক্ত খেতে শুরু করেছে। জাফর ভাই দা দিয়ে আলতো করে একে একে জোঁকগুলো ছাড়িয়ে দিলেন। জোঁকের ভয় কাটতে না কাটতেই দেখলাম, আমাদের পায়ের নিচ দিয়েই সরু কয়েকটি সাপ দ্রুত এদিক-সেদিক চলে যাচ্ছে।
কয়েকটি উল্লুক গাছের চূড়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল। কিছুক্ষণ পরপর তাদের ডাক পুরো বন কাঁপিয়ে দিচ্ছিল।
সেদিন রাতেও আমরা বেরিয়েছিলাম। বৃষ্টি পড়ছে। টর্চের আলো ছাড়া চারপাশ অন্ধকার। রাতের অরণ্যের শব্দ আলাদা এক জগতে নিয়ে গেল আমাদের। ঝিঁঝি পোকার ডাক, দূরে ব্যাঙের আওয়াজ আর ভেজা পাতায় বৃষ্টির ফোঁটা পড়ার শব্দ।
দুই বছর পর বর্ষায় আবার রওনা হলাম। এবার গন্তব্য রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী। উদ্দেশ্য শুধু বন্যপ্রাণী দেখা নয়, বরং অরণ্যের সঙ্গে নতুনদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া। ভোর ৬টার দিকে কালেঙ্গা বিটে পৌঁছাই। বর্ষার ভেজা সকাল। গাছের পাতায় তখনো রাতের বৃষ্টির পানি ঝুলে আছে। সারা দিনের হাঁটায় বড় কোনো স্তন্যপায়ী প্রাণী দেখা যায়নি। তবে কাদামাটিতে পাওয়া অসংখ্য পায়ের ছাপ বলে দিচ্ছিল, আমরা আসার কিছুক্ষণ আগেও তারা এ পথেই চলাফেরা করেছে।
রাত নামার পর আবার বের হলাম। টর্চের আলো গাছের ডালে পড়তেই দুটি বড় চোখ জ্বলে উঠল। কিছুক্ষণ পর পরিষ্কার দেখা গেল— একটি লজ্জাবতী বানর। ধীরে ধীরে ডাল বদলাচ্ছে।
বর্ষার তৃতীয় অভিযান বারৈয়াঢালা বনাঞ্চলে। সঙ্গে ছিল আমার স্ত্রী। সম্ভবত ২০২২ সালের বর্ষা। আদমপুর বা রেমা-কালেঙ্গার সঙ্গে বারৈয়াঢালার বড় পার্থক্য পাহাড়। এখানে পাহাড় আরও উঁচু, ছড়াগুলো আরও পাথুরে আর পথ অনেক বেশি পিচ্ছিল। সামান্য অসাবধান হলেই পাথরে পিছলে পড়ার আশঙ্কা।
ভোরের আলো ফুটতেই আমরা ছড়া ধরে হাঁটা শুরু করি। বর্ষার ছড়া জীবন্ত। স্বচ্ছ পানির নিচে বড় বড় পাথর, দুপাশে বুনো গাছ আর মাথার ওপর ঘন সবুজ ছাউনি। চারদিকে পাখির ডাক।
বারৈয়াঢালার আরেকটি বৈশিষ্ট্য এর অসংখ্য ঝরনা। একটি শেষ না হতেই আরেকটি। ঝরনা পেরোতে পেরোতে আমরা একটি উঁচু টিলার মাথায় উঠে পড়ি। সেখান থেকে চারদিকে শুধু সবুজ পাহাড় আর অরণ্য। মানুষের কোনো শব্দ নেই। শুধু বাতাস আর পাখির ডাক।
বর্ষায় আমার চতুর্থ এবং এখন পর্যন্ত সবচেয়ে রোমাঞ্চকর বনভ্রমণ হাজারীখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে। গিয়েছিলাম চিতাবাঘের খোঁজে। ২০২৪ সালের কথা।
বর্ষার রাতে হাজারীখিলের গভীর বন অন্য এক জগৎ। চারদিকে টানা বৃষ্টি। কাদায় ডুবে থাকা পাহাড়ি পথ। রাত তখন প্রায় ১২টা। আমি আর এক বন্ধু মোটরসাইকেলে রওনা দিলাম। লক্ষ্য এমন একটি এলাকা, যেখানে বন শেষ হয়েছে, লোকালয় শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়েছিলাম, কয়েক সপ্তাহ ধরে সেখানে নিয়মিত ছাগল মারা পড়ছে।
অনেক জায়গায় চাকা পিছলে যাচ্ছিল। কোথাও নামতে হয়েছে, কোথাও ঠেলে তুলতে হয়েছে।
ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত প্রায় ১টা। তারপর শুরু হলো হাঁটা। বৃষ্টি তখনো থামেনি। টর্চের আলো ফেলে আমরা পায়ের ছাপ খুঁজছি। চিতাবাঘের দেখা না মিললেও সে সফরেই কয়েকবার দেখা হয় চিতাবিড়ালের। ক্যামেরায় ছবিও তুলতে পেরেছিলাম। একটি অজগরের বাচ্চাও চোখে পড়েছিল। বর্ষা যে সরীসৃপদের জন্য সবচেয়ে সক্রিয় সময়, সেটার আরেকটি প্রমাণ।
বাংলাদেশের বনকে যদি সত্যিকারের রূপে দেখতে চান, বর্ষার জন্য অপেক্ষা করুন। তবে সতর্ক থাকুন জোঁক, সাপ আর পা পিছলে হোঁচট খাওয়ার বিষয়ে।








