দুই চাকায় মালয়শিয়া ৯
বেসেরাহ টু নেনাসি- ১০৫ কিলোমিটার

সুলতান আহমদ শাহ মসজিদের সামনে
থাইল্যান্ড সীমান্ত ঘেঁষা পাদাং বেসার থেকে তিতিওয়াংসা পর্বতমালা ও কোটা বাহরু হয়ে জোহর বাহরু—দুই চাকায় ১২০০ কিলোমিটার পাড়ি দিচ্ছেন এভারেস্টজয়ী বাবর আলী। তার প্রতিদিনের ভ্রমণগল্প দুই চাকায় মালয়েশিয়া।
সকালটা শুরু হলো কফি আর সয় মিল্ক পান করে। হোমস্টে এর এই রুমটি ছোট্ট, কিন্তু অসম্ভব গোছানো আর ছিমছাম। পর্যটকদের প্রয়োজনে লাগে হেন কিছু নেই, যা এই কক্ষে অনুপস্থিত। কিন্তু সবকিছু আকারে ছোট আর ফোল্ডেবল। বেছে বেছে এমন সব জিনিসপত্র কেনা হয়েছে, যেগুলো খুব কম জায়গা দখল করে। পথে নামতেই শজারুর কাঁটার মতো দেখতে দুরিয়ান ফল বিক্রি হচ্ছে জায়গায় জায়গায়। এগোচ্ছি কুয়ান্টান শহরের দিকে। আমাদের চট্টগ্রামের সিআরবির মতো দোতলা রাস্তা পেলাম বেশ কয়েকটা। তবে আজ রাস্তায় ছোট ছোট অনেক গর্ত। এতদিনের পেরিয়ে আসা রাস্তা যদি লালিত্যের দিক থেকে জীবনানন্দের বনলতা সেন হয়ে থাকে, আজকের রাস্তা নিঃসন্দেহে ব্রণ-লতা সেনের মুখের মতো! শ্রাবস্তীর অতি নিঁখুত কারুকার্য দূরে থাকুক, আছে নানান সাইজের গর্ত। দুয়েকটা গোরস্থান চোখে পড়ছে; প্রতিটাই অসম্ভব গোছানো। একটাতে সদ্যই কবরে নামিয়ে ফিরছে একদল লোক। 'আমি তাকে রেখে এলাম অন্ধ অজানাতে'- নিজের প্রিয়জনকে ঈশ্বরের হাতে সঁপে দিয়ে ফিরছে লোকজন। পথের দুপাশে গাঢ় সবুজের মেলা; অনেক কনকচূড়া গাছ। পাহাং এর কোথাও এখন পর্যন্ত সাইনবোর্ডে সুলতানকে পাওয়া গেল না। পাহাং প্রদেশের পূর্বনাম ছিল ইন্দ্রপুরা। সুলতান কোন ইন্দ্রপুরীতে লুকিয়েছেন, কে জানে! পথে পড়ল IIUM এর বিশাল ক্যাম্পাস। কুয়ান্টান এর বাস স্টেশনটাও বেশ সুন্দর। কুয়ান্টান শহর মালয়েশিয়ার পূর্ব উপকূলের সবচেয়ে বড় শহর। মূল শহরে না ঢুকে আমরা বাইপাস দিয়ে এগোচ্ছি। কুয়ান্টান নদী পেরিয়ে বামে ঘুরলাম। এই পথে অনেক ক্যাম্পুং। মানুষের বাড়িতে বিত্তের ছাপ। কিছুটা এগিয়ে ইউনিভার্সিটি আল কোরানের বিশাল ক্যাম্পাস। ধর্মগ্রন্থ আল-কোরানকে মূল উপজীব্য করে এই বিশ্ববিদ্যালয় বানানো হয়েছে। মালয়েশিয়াতে এই ধরনের বিশ্ববিদ্যালয় এটাই প্রথম। একটু সামনে যেতেই প্রথমবারের মতো অতিকায় এক হোর্ডিং-এ সুলতান এলেন। আসা তো নয়, যেন আবির্ভাব। সুলতানের পুরো নাম নানান উপাধিসহ তিন লাইন লম্বা! নাম পড়তে পড়তে এক কিলোমিটার রাস্তা অনায়াসে পেরিয়ে যাওয়া যায়! পেকানের দিকে যত এগোচ্ছি, সুলতানকে তত ঘন ঘন দেখা যাচ্ছে। পাহাং প্রদেশের প্রশাসনিক রাজধানী কুয়ান্টান হলেও এটি রাজকীয় শহর নয়। সুলতানের রাজপ্রাসাদ 'ইস্তানা আবু বকর' পেকান শহরেই অবস্থিত বলে এখনো রাজকীয় শহরের মর্যাদা পেকানের করতলে। সুলতান আবু বকর ছিলেন বর্তমান সুলতানের দাদা। আর কিছুটা সামনে যেতেই সাইক্লিং এর আলাদা লেইন পেলাম। কিলোমিটার ছয়েক লম্বা এই লেইনে বেশ আরাম করেই সাইক্লিং করলাম। জায়গায় জায়গায় বেশকিছু পাম বাগান। তবে যত্নআত্তির সুস্পষ্ট অভাব। বেশিরভাগ গাছের গুঁড়িই ফার্নে মোড়া। আর রাস্তার দুপাশে মাঝে মাঝে একাশিয়া গাছ ছাড়া আর কিচ্ছুটি নেই। একদম ম্যাড়মেড়ে রাস্তা। হঠাৎ হঠাৎ মানুষের দেখা মেলে। ওরাও মূলত রাস্তা সংস্কারের কাজে নিয়োজিত ইন্দোনেশিয়ান অভিবাসী। সাইকেল-সমেত দেখলেই খুব উৎসাহ নিয়ে হাত নাড়ায়। ইন্দোনেশিয়ান ভাষায় কী সব বলেও। ঠোঁটের ডগায় ধরা সিগারেট থেকে ইন্দোনেশিয়ানদের সহজেই চেনা যায়। অনেকেই ভাবে, মালয়েশিয়াতে বাংলাদেশিরাই অবেৈধ অভিবাসী তালিকার শীর্ষে। কিন্তু এই তালিকার শীর্ষস্থান দখল করে আছে প্রতিবেশী দেশ ইন্দোনেশিয়া। সুংগাই পেনর নদী পড়ল পথে। অনেক দিন পর একটা স্বচ্ছতোয়া নদী দেখে আনন্দ হলো। টলমলে জলে নিজের প্রতিবিম্ব দেখলাম; নিজের সাথে দেখা হলো কি? চেনা গন্তব্যের বাইরে ভ্রমণে বেরোলে অপ্রত্যাশিতভাবে দেখা হয় অনেকের সঙ্গে; তবে সবচেয়ে বেশি আনন্দ হয় নিজের সঙ্গে দেখা হলে! কিন্তু সেই দেখা পাওয়ার পথটা মোটেও সহজ নয়। বিষয়টা অনেকটা স্পিরিচুয়াল হওয়ার মতো; প্রতিনিয়ত নিজের ভেতরে খোঁড়া, নিজেকে নানান প্রশ্নের সম্মুখীন করা। নিজের হ্রদয়ের ভাণ্ডের সাথে ব্রহ্মাণ্ডের যোগাযোগ খুঁজতে তৎপর হওয়া। চলতি পথে অনেক বানর চোখে পড়ছে। ইলেকট্রিকের দশাসই সাইজের মোটা তারের উপর বসে পথের পানে চোখ রেখে বসে আছে। পেকানের দিকে যত এগোচ্ছি, পথে গাড়ির ভিড় তত বাড়ছে। ছোট ছোট ক্যাম্পুং এর সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। পথে ছোট্ট একটা দোকানে সকালের খাবারের জন্য থামলাম। নাসি বা ভাত ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায় না দেখে ভাতই নিতে হলো। খাবার ব্যাপারে আমার ভোট সব সময় রাস্তার ধারের দোকানের বাক্সেই পড়ে। পুঁজিবাদের ঝান্ডাধারী ঝাঁ চকচকে বিজ্ঞাপনওয়ালা বড় বড় চেইন শপগুলোতে সবকিছু একই মাপের, একই ধাঁচের। এমনকি বিক্রেতার মুখের হাসিটাও একইরকম মেকি। বড় চেইনশপগুলোতে খাবারগুলোও চেনা, একঘেয়ে। এরা বানায় ফাস্ট ফুড; বানাতে সময় কম লাগলেও হজম করতে সময় লাগে ঢের। কিন্তু রাস্তার ধারের দোকানে কত বৈচিত্র্য। পথপার্শ্বের এসব দোকান একই ধাঁচের হতে সহজে দেখা যায় না। আমি ভাতের সাথে নিলাম স্প্রাউট, মিক্সড ভেজিটেবল, রান্না করা আনারস আর দুরিয়ানের চাটনি। যদিও ঔদরিক বলে আমার কোন কুখ্যাতি নেই। তবে নতুন খাবার চাখতে আমার সব সময় ভালো লাগে। জুমন ভাই আইয়াম (চিকেন) আর মিক্সড ভেজিটেবলেই আস্থা রাখল। খাবার সেরে ফের পথে নামা। এবার মাঝে মাঝেই আটকাচ্ছি ট্রাফিক সিগন্যালে। পেরামু জায়া নামক এক জায়গায় অটোমোটিভ সিটি পেলাম। মার্সিডিজ বেঞ্জ, ইসুজু, মিতসুবিশি এর মতো বিশ্বমানের গাড়ির নানান অংশের কাজ হয় এখানে। অটোমোটিভ একটা বিশ্ববিদ্যালয়ও আছে এখানে। তামান শ্রী মওলানা ছাড়িয়েই পাহাং নদী। নদীর ওপার থেকে পেকানের মূল শহরের শুরু। সোনালি গম্বুজের সুলতান আহমদ শাহ মসজিদ দেখে থামলাম। এই মসজিদের স্থাপত্য শোভা অতুলনীয়। পাশেই সুলতান আবু বকর মিউজিয়াম। সোমবার বলে এই জাদুঘরের দোরগোড়ায় আজ তালা। তবে বাইরের সবুজ চত্বরে ঘুরে বেড়াতে বাধা নেই। পাহাং সুলতানাতের নানান সামগ্রী এই জাদুঘরে সংরক্ষণে করে রাখা হয়েছে। লনে রাখা ফাইটার জেট, হেলিকপ্টার আর ট্যাংক দেখেই আপাতত কৌতূহল নিবৃত্ত করতে হলো। তবে আমি সবচেয়ে আনন্দ পেয়েছি গাছের শেকড় বাঁকিয়ে বানানো ঘোড়াগুলো দেখে। মিউজিয়ামের পাশেই বেলবিস ক্যাফেতে ট্রেনের পুরোনো বগিকে ডাইনিং হলে রূপান্তরিত করা হয়েছে। পেটে খিদে আর পকেটে অত রেস্ত না থাকায় সে পথে আর গেলাম না। পেকান রাজকীয় শহর হলেও এই প্রদেশের প্রশাসনিক রাজধানী কুয়ান্টানের মতো একে ঘিরে ভিড় চাক বাঁধেনি। রাস্তাঘাট বেশ ফাঁকা। লোকের নৈমিত্তিক যাপনে বেশ আলস্য। শহর পেরোতেই পড়লাম হেড উইন্ডের কবলে। আজকে গরম অপেক্ষাকৃত কম বলে ভেবেছিলাম আরাম করে সাইকেল চালাতে পারব। হেড উইন্ড আর সেটা হতে দিলো কই? রাস্তার ওপারে অল্প দূরত্বে সৈকত। বিচ আর আমাদের মাঝে আছে নারকেল বীথি আর গোলপাতার বন। হঠাৎ ভোজবাজির মতো উদয় হওয়া একটা-দুটো বাড়ি ছাড়া কোথাও কেউ নেই, কিচ্ছু নেই। একটা মসজিদ নেই যে একটু থেমে জিরিয়ে নেব। শ্রান্ত পা দুটো প্যাডেল মেরেই চলছে। বেশিরভাগ মহিরুহের আপাদমস্তক ঢাকা পড়েছে ফার্নের চাদরে। এক জায়গায় বিশাল এক আনারসের ভাষ্কর্য। আর তার পাশেই প্রমাণ সাইজের Nenas MD2 নামক আনারস বিক্রি হচ্ছে। আমরাও থেমে অতীব রসালো, মাংসল সেই আনারসের স্বাদ নিলাম। টানা চালিয়ে সোলার ফার্ম; হাজার হাজার সোলার প্যানেল কিলোমিটারের বেশি এলাকাজুড়ে স্থাপন করা। রাস্তার দুপাশে পুড়ে যাওয়া ঘাস দেখতে দেখতে এগোচ্ছি। যতই সামনে যাই, একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তিরই যেন মঞ্চায়ন। একটু আগে দেখে আসা পথের ধারের দৃশ্যের সাথে পরের দৃশ্যগুলোর কোন পার্থক্য নেই। আর মাঝে মাঝেই বিষফোঁড়ার মতো হাজির হচ্ছে হেড উইন্ড আর ক্রস উইন্ড। পথের বৈচিত্র্যের দিক থেকে আজকের মতো ম্যাড়মেড়ে দিন গত কদিনের সাইক্লিং এ পাইনি। এহেন পথের জন্যই সম্ভবত শরীরেও ম্যাজম্যাজে ভাব একটা। ম্যাদামারা অবস্থায় তাঞ্জুং বাতু এসে থামা। আইয়াম পাপরিক খেয়ে ফের যখন সাইকেলে চড়ে বসলাম, তখন আমাদের অভীষ্ট গন্তব্য নেনাসির চ্যালেট (কাঠের তৈরি ছোট্ট ঘর) মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে।
নারকেল বাগান আর ঝাউবনের মাঝে একদম সমুদ্রের ধার ঘেঁষা চ্যালেট-এ পৌঁছে গেলাম সাড়ে চারটার অল্প পরে। এক মালয় মহিলা আমাদের জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। চাবি বুঝিয়ে দিয়ে উনি চলে গেলেন। সন্ধ্যাটা কাটল সৈকতে বসে দক্ষিণ চীন সাগরের উথালপাথাল হাওয়ায় গা জুড়িয়ে।












