দুই চাকায় মালয়েশিয়া-৩
কুপাং টু বান্দিং-৯০ কিলোমিটার

স্বাগতম জানানো হয়েছে র্যাফেলসিয়া বা কর্পস ফ্লাওয়ার এর ভাষ্কর্য দিয়ে
আমাদের হোমস্টেটা একদম সড়ক লাগোয়া হওয়ায় রাতে বার বার ঘুম ভেঙেছে। তার উপর হোমস্টে এর ঠিক বিপরীতে কুপাং নামক এই এলাকার সরকারি হাসপাতাল। সেটা ঘিরেও রাতে রোগী আর গাড়ির ভিড়। মাঝে দুবার ঘুম ভেঙেছে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনে। আজকে থেকে বিশাল সব পাহাড় চড়তে হবে। তাই রাতের ঘুমটা দরকারি ছিল। জুমন ভাইয়ের অবস্থাও তথৈবচ।
চলতে শুরু করেই মূল রাস্তা থেকে মোড় নিতে হলো বামে। ফেডারেল রুট ৪ বা ইস্ট-ওয়েস্ট হাইওয়ে ধরলাম। এই পথই আমাদেরকে নিয়ে যাবে আজকের গন্তব্যের দিকে। প্রথমে গেরিক, এরপরে বান্দিং। পথচলতি মালয় গ্রাম বা ক্যাম্পুং পড়ছে প্রচুর। পুরোনো সব বাড়ি। কিছু ক্যাম্পুং এর নাম নিশ্চয় মানুষের নামে। সাদেক, মুকিম নামে ক্যাম্পুং পেলাম পথচলতি। উল্টোদিক থেকে একজন সাইক্লিস্ট হাত দেখাল। রোড বাইক নিয়ে প্র্যাকটিসে নেমেছে সে। যাত্রার ৩য় দিনে এসে এই প্রথমবারের মতো সাইক্লিস্ট দেখলাম রাস্তায়।
ক্যাম্পুংগুলোর বাড়ির সামনে বাগানবিলাস, অলকানন্দা আর রঙ্গনের ছড়াছড়ি। কিছুটা এগিয়ে কুয়ালা কুয়াং ক্যাম্পুং। এর থেকে সামনে এগোতেই দুরিয়ান ক্যাম্পুং। মানুষের নামের পরে ফলের নামেও মালয় গ্রামের নাম পাওয়া গেল। পথের দুধারে এবার শুরু হলো ঘন জঙ্গল। ছোট ছোট শুঁড়িপথ নেমে গেছে বনের ভেতরে। এগুলো গিয়ে থেমেছে হোমস্টে এর সামনে। ওয়াকাফ নামে বড়সড় একটা স্থাপনা পড়ল। একবার ভাবলাম পানিটা ভরে নিই। কী মনে করে আর নিলাম না। তখন কী আর জানি, এরপরের ৩৫ কিলোমিটারে আর কোন গ্রাম কিংবা খাবারের দোকান মিলবে না।
এখান থেকেই শুরু হলো ঘন জঙ্গলের সাথে আপহিল আর আপহিল। সাইকেলের স্যাডল থেকে নেমে বারকতক ঠেলতেও হলো। সাইকেল চালাতে এসে ঠেলা জিনিসটা আমার অতীব অপছন্দ। জুমন ভাইয়েরও তাই। কিন্তু আমাদের উপায়ও নেই। আমাদের মূলধন যে সবে পা দুটো আর দু হাতের দশটা আঙুল। সাথে সাইকেলের চাকা দুটোর উপর ভর করেই চলতে হবে।
রাস্তার ধারেই বেশ কয়েকটা ছোট ঝরনা পড়ল। কিন্তু নামার জায়গাগুলো খাদের মতো বলে ঝরনার জলে অবগাহন আর হলো না। বনের ঘনত্ব বেড়েছে আরো। এক জায়গায় ভালুক বিষয়ক সাবধানবাণী চোখে পড়ল। অবশ্য আমি খুব একটা আমলে নিলাম না। এই রাস্তায় যে গতিতে ব্যক্তিগত গাড়ি চলে, বন্যপ্রাণী রাস্তার আশেপাশেও ঘেঁষার কথা না। ভুলক্রমে রাস্তায় এসে পড়লে হর্সপাওয়ারে বলীয়ান যান্ত্রিক দানবের কাছে হার মানতে বাধ্য! অবশ্য খানিক বাদেই Awas (সাবধান) লেখার নিচে হাতির আকৃতি দেখলাম। এরা গাড়ির সামনে পড়লে ক্ষয়ক্ষতি উভয়পক্ষেরই হতে পারে। আর আমাদের সামনে পড়লে কী করব? এত ভেবে কী লাভ! যা করার হাতিই করবে; আমরা নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকব! অনেকগুলো ধসপ্রবণ পাহাড় পেরোলাম। ধাপে ধাপে ঘাস লাগিয়ে ভূমিধস প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
কিছুদূর এগিয়েই কেদাহ প্রদেশের সীমানা পেরিয়ে পা রাখলাম নতুন প্রদেশ পেরাক-এ। এবার চড়াই আরো খাড়া হলো; জঙ্গল পুরু হলো আরো। হাতি বিষয়ক সাবধানবাণী আরো ঘন ঘন চোখে পড়ছে। বেশ কয়েক জায়গায় নেমে সাইকেল ঠেলতে হলো। জুমন ভাই চালানোর ফাঁকে ফাঁকে জেমিমির সঙ্গে চ্যাট করছে। তার হাঁটুখানা কাল থেকে বড্ড ভোগাচ্ছে। আজ এলিভেশন গেইন ১৩২০ মিটার বলে দুর্ভাবনাটাও বেশি। জেমিনির কাছে জানতে চান, আর কত পাহাড় চড়তে হবে আজ? এই ট্রিপের দিনমাফিক পরিকল্পনা করার সময় খুঁটিনাটি অনেক কিছু জানা হলেও কিছু ক্ষেত্রে সবকিছু জানতে আমি আগ্রহী না। সবকিছু জানলে অনেক ক্ষেত্রেই দুঃখ বাড়ে। পথের পুথি যাত্রাপথের জন্যই তোলা থাক।
চড়াই আর চড়াই। গিয়ার নামিয়ে অতি ধীরে চড়াই ভাঙি। প্যাডেলে জোর না পেলে সাইকেল ঠেলি মাঝে মাঝে। তার উপর তীব্র গরম। তবে এই পাহাড়ি রাস্তা নখের পিঠের মতো মসৃণ। রাস্তার কোথাও একটা ছোট গর্তও নেই। নাগরিক পরিসেবার দিক থেকে মালয়েশিয়া যোজন যোজন এগিয়ে আমাদের চেয়ে। অন্যদিকে পথের পাশে এই জঙ্গলে একটা দোকান কিংবা মসজিদও নেই। মালয়েশিয়ার মসজিদগুলোতে ঠান্ডা সুপেয় পানির ব্যবস্থা থাকে। অতি পরিষ্কার টয়লেটও থাকে। ছেলে-মেয়েদের জন্য আলাদা সুব্যবস্থাও আছে। আজ মসজিদ-ভাগ্যও পক্ষে নেই। এক জায়গায় থেমে গ্রানোলা বার আর পানি দিয়ে ব্রেকফাস্ট সারলাম। পানিও শেষের পথে ইতোমধ্যে। হঠাৎ করেই ভোজবাজির মতো একটা সুরাও বা ইবাদতখানা পাওয়া গেল। জুমার নামাজ ছাড়া অন্য ওয়াক্তের নামাজ হয় এই মসজিদে। তবে পুরো চত্বরে এক বুড়ো ছাড়া কাউকে পাওয়া গেল না। অবশ্য এই জঙ্গলে নামাজ পড়ার মানুষ কই? তবে আমাদের অতীব প্রয়োজনীয় পানি পাওয়া গেল।
হাতির সাবধানবাণীকে ছাপিয়ে চোখ আটকাল লাফোদ্যোত হরিণের প্রতীকে। পাহাড়ের বেশকিছু জায়গা সাফ করে ধাপ চাষ হচ্ছে। দূর থেকে কী গাছ ঠিক ঠাহর করা গেল না। বিশাল একটা উতরাই নামার পরে হাতের বামে চোখ আটকাল অতিকায় গুনুং কেন্দেরং নামক পাহাড়ে। চূড়া ঘিরে মেঘের আনাগোনা। সাথেই আছে গুনুং কেরুনাই নামে প্রতিবেশী পাহাড়। দুটোকে একসঙ্গে স্থানীয়রা কেটু নামে ডেকে থাকে। পথের পাশে টি ইন্ডিকেটর বলে খ্যাত দাঁতরাঙা গাছের সম্ভার। এই গাছ কোন জায়গায় প্রাকৃতিকভাবে জন্মালে সে জমিকে চা চাষের উপযোগী বলে ধরা হয়। এই অঞ্চলে চা চাষের চেষ্টা কেউ করেছে কি না কে জানে।
যত এগোচ্ছি, জঙ্গল গাঢ় হচ্ছে; বাড়ছে জঙ্গলের পুরুত্বও। চেনা-অচেনা নানান শব্দ আসছে জঙ্গলের ভেতর থেকে। বিশাল এই জঙ্গলে ধীরগতির দুই বাহনে দুই মানবসন্তান। এত বড় জঙ্গলে ছোট্ট দুটি ভেলায় যেন থইথই ভাসছি আমরা। বড় মানেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আতঙ্ক। কিছু জায়গায় ভূমিধস প্রতিরোধে সিমেন্টের ব্লক দিয়ে ছোট ছোট নল স্থাপন করা হয়েছে। পাহাড় চোঁয়ানো পানি যাতে ভূমিধস করতে না পারে, সেজন্যই এই ব্যবস্থা। পথচলতি খেয়াল রাখছি পরের গন্তব্য গেরিক এর মাইলপোস্টের দিকে। গেরিকের ৬ কিলোমিটার আগে থেকে জঙ্গল পাতলা হতে শুরু হলো। পথের দুধার পাম আর পেঁপে গাছের দখলে এখন।
গেরিক মজলিসের ফটকে থামলাম। 'সেলামত দাতাং' তথা স্বাগতম জানানো হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুল বলে পরিচিত র্যাফেলসিয়া বা কর্পস ফ্লাওয়ার এর ভাষ্কর্য দিয়ে। এটি জায়ান্ট পদ্ম নামেও বহুল পরিচিত। মালয়েশিয়া আর ইন্দোনেশিয়ার জঙ্গলে সহজলভ্য এই ফুল পূর্ণ প্রস্ফুটিত অবস্থায় এক মিটারের বেশি বড়ো আর ওজনে ১০ কেজিরও বেশি হয়ে থাকে। কর্পস নাম শুনেই মৃত ব্যক্তির সাথে সম্পর্কের কথাই মাথায় আসে। মৃতদেহের গন্ধের সাথে ডাক্তার, পুলিশ কিংবা ডোম বাদে অন্যদের পরিচয় নেই খুব একটা। কর্পস নামে এই ফুলের পরিচিতির মূল কারণ এই ফুলের পচা মাছের মতো কুবাস। ফুলের সুবাসের সাথেই আমরা পরিচিত। কুবাস ফুলের ক্ষেত্রে খুব সুলভ নয়। অবশ্য তীব্র গরমে সাইক্লিং এর কারণে আমাদের গাত্র-নিঃসৃত কুবাসও এই ফুলের দুর্গন্ধের কাছাকাছি হবে বলেই আমার ধারণা!
গেরিক ঢোকার মুখে প্রথম দোকানেই থামলাম। সকাল থেকে পেটে কিছু পড়েনি। তামিল মুসলিমদের পরিচালিত দোকান। একজনকে অনেক কষ্টে কী খেতে চায় বুঝিয়ে হাত ধুতে গেলাম। জুমন ভাই একটু পর আবিষ্কার করল দোকানের এক কর্মচারী বাংলাদেশি। বাড়ি কিশোরগঞ্জের তাড়াইলে। এবার আর ভাষার ভিখারি হতে হলো না। দুপুর বারোটা নাগাদ
ব্রাঞ্চ সেরে নিলাম এখানে। খাবারের ইতি টানলাম বার্লি আইস পান করে। জুমন ভাই অবশ্য আইস মাইলোর প্রতিই আনুগত্য দেখাল।
প্যাডেল ঘোরাতেই চাইনিজ গোরস্থান। একটা ছোট্ট পাহাড়ের গায়ে-কাঁধে থরে থরে সাজানো ইহজাগতিক অভিযান শেষ করা মানবসন্তানদের দেহাবশেষ। রাস্তার দুধারে প্রচুর ক্যাশিয়া গাছ। গেরিক শহর অদূরে বলেই রাস্তায় গাড়ির ব্যস্ততা।
দূর থেকে রাস্তার পিচের উপর দ্রুতগতির ব্যক্তিগত বাড়ির রাবারের টায়ার ঘষার শব্দ শোনা যায়। মাঝে মাঝে ভ্রম হয়, আসলেই টায়ারের শব্দ নাকি ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ? কিছুদূর এগোতেই ফের হাতি বিষয়ক সাবধানবাণী। এর একটু বাদেই রাস্তার উপর হাতির মল দেখলাম। দুপুরের তীব্র গরমে কাহিল অবস্থা দুজনের। প্রতি প্যাডেলে পায়ের চেটো থেকে ব্রহ্মরন্ধ্র পর্যন্ত অণুরণিত হচ্ছে। টানা চড়াই উঠে থামলাম JKR (জাবাতান কেরজা রায়া) এর স্থাপনায়। JKR মূলত মালয়েশিয়ান গণপূর্ত বিভাগ। এই বিভাগই ইস্ট-ওয়েস্ট হাইওয়েকে একে অপরের সাথে যুক্ত করেছে। ১৯৭০-১৯৮২ সালে মালয়েশিয়াজুড়ে কমিউনিস্ট বিদ্রোহের সময় যে সকল শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের স্মরণে একটি সৌধ বানানো হয়েছে এখানে।
আমরা চলছি সেন্ট্রাল ফরেস্ট স্পাইন ধরে। মালয়েশিয়ান উপদ্বীপের মেরুদণ্ডখ্যাত এই বনাঞ্চল। আয়তন ৬৭ লাখ হেক্টর! এই বনে হাতি, ভালুক, বাঘ, টাপির-সবই আছে। চার কিলোমিটারের দারুণ একটা ডাউনহিলে নামলাম। পুরোদিনের পথশ্রমের ক্লান্তি যেন এই এক ডাউনহিলেই কেটে গেল। যাক, এই পথ একদিকে কেড়ে নিয়ে অন্যদিকে ভরিয়ে দিলো যেন! এরপরেই নজরে এলো বান্দিং এর বিশাল লেক। আরেকটা উতরাই নামতেই পৌঁছে গেলাম বান্দিং-এ। জুমন ভাই খানিকটা পেছনে। সাইকেল রেখে ঘাসে বসলাম কিছুক্ষণ।
বান্দিং-এ দুটা থাকার জায়গা। বান্দিং লেকসাইড ইন আর রয়েল বেলুম। রয়েল বেলুমের কক্ষের ভাড়া আমাদের সাধ্যের বাইরে। অন্যদিকে বান্দিং লেকসাইড ইনের রিভিউগুলো জানান দিচ্ছে এই জায়গাটা আর খোলা নেই। তবুও একবার পাহাড় বেয়ে উঁকি দিলাম। গুগল ম্যাপের রিভিউই ঠিক। মালয় এক লোকের সঙ্গে কথাবার্তা বলে জানা গেল জায়গাটা খোলা নেই; তবে সংস্কার কাজ চলছে। ও রয়েল বেলুমে যেতে বলল। সাথে থাকা দুজন আমার দিকে ঠারে ঠারে দেখছিল। আন্দাজে ঢিল ছুঁড়ে বললাম, 'ভাই কি দেশি নাকি? উত্তর এলো হ্যাঁ-সূচক। আসাদ নামে একজন প্রস্তাব দিলো ওদের সঙ্গেই থেকে যেতে। তারা ছয়জন এখানে নির্মাণশ্রমিকের কাজ করেন। প্রস্তাবটা মনে ধরল। নিচে গিয়ে জুমন ভাইকে বলতেই তিনিও রাজি। ছয়জনের মধ্যে একজন বাদে সবাই বাড়িই নরসিংদীর মাধবদীতে। আসাদ এই দেশে এসেছে বছর চারেক। বান্দিং লেক থেকে ধরা শোল মাছ দিয়ে সারা হলো রাতের খাবার। ছয়জনের একজন বড়শিতে চিংড়ি মাছ গেঁথে ধরেছে এই বিশাল সাইজের শোল।













