দুই চাকায় মালয়েশিয়া ১১
মার্সিং টু মাওয়াই- ৮২ কিলোমিটার

সাইকেল থামিয়ে পিলবক্সের সামনে
থাইল্যান্ড সীমান্ত ঘেঁষা পাদাং বেসার থেকে তিতিওয়াংসা পর্বতমালা ও কোটা বাহরু হয়ে জোহর বাহরু—দুই চাকায় ১২০০ কিলোমিটার পাড়ি দিচ্ছেন এভারেস্টজয়ী বাবর আলী। তার প্রতিদিনের ভ্রমণগল্প দুই চাকায় মালয়েশিয়া।
রাত আর দিন যখন একাকার হয়ে আঁধারের পাতলা পর্দা ছিঁড়ে দিন শুরু হব হব করছে, এমন সময়ে ঘুম ভাঙল। হোমস্টে-এর জানালা দিয়ে দেওয়ালের ওপাশে টেবিলের উপর শুয়ে থাকা মেকুরটাকে দেখি। এই ভোরে নিজের পা চাটতে ব্যস্ত ও। আজ অ্যালার্ম দিয়েছিলাম অন্যদিনের তুলনায় আধা ঘন্টা দেরিতে। কিন্তু চির অভ্যস্ত বডি ক্লক সে খবর জানলে তো!
তারপরও আজকে বেশ দেরিতে বেরিয়েছি। বেরোতে বেরোতে পৌনে নয়টা। আজ দূরত্বও অপেক্ষাকৃত কম। তার উপর ডলার ভাঙানোর ব্যবস্থাও করতে হবে। গত দুদিন ধরে মানি এক্সচেঞ্জ খুঁজে বেড়াচ্ছি। মার্সিং-এ সবেধন নীলমণি একটা মানি এক্সচেঞ্জ আছে। মূল রাস্তা এড়িয়ে ধরলাম ভেতরের রাস্তা। 'দ্য ফরগটেন হাফ অব মালয়েশিয়া' বলে পরিচিত ইস্ট কোস্ট এর শান্ত, সমাহিত জীবনধারা। আরেকটা দিন ধীরলয়ে আকাশে পাখা মেলছে। সূর্য শুরু করেছে তার দৈনিক পরিক্রমা। আড়াই কিলোমিটার চালিয়ে এর বাস টার্মিনালের কাছের মানি এক্সচেঞ্জে। এই যাত্রায় এর আগে তিন জায়গায় ডলার ভাঙিয়েছি- কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্ট, পাদাং বেসার আর কোটা বারু। মজার ব্যাপার হলো, তিন জায়গার চেয়ে এখানে এক্সচেঞ্জ রেট বেশ ভালো।
এর চৌরাস্তার মোড়ে হেলমেট পরা এক সাইক্লিস্টের ভাষ্কর্য আছে।পাশেই ফু শুন নামক তাও মন্দির। শত বছরেরও বেশি পুরোনো এটি। চাইনিজ কৃপার দেবতা তুয়া পেক কং-কে উৎসর্গ করা এই মন্দির। পাশেই ভগবান কার্তিকের মন্দির শ্রী সুব্রামানিয়াম টেম্পল। এটির বয়স ১৩০ বছরেরও বেশি। রাস্তার দুপাশে প্রচুর মালয় চাইনিজদের বাড়ি। চাইনিজদের বাড়ি দূর থেকে চেনা যায়। বাড়ির গোছানো চত্বরে লাল রঙের ভগবানের বেদি থাকে। মার্সিং শহরের স্থানে স্থানে Mesmerizing Mersing লেখা। একটু এগিয়েই বিশাল এক সেকোলাহ বা স্কুল পেলাম। স্কুলের স্লোগান 'Nothing Impossible। বাক্যের ক্রিয়াপদ is কোথায় যে উবে গেছে। অবশ্য মালয় চাইনিজদের বেশিরভাগ ইংরেজি এমন। Can do, can't do- ইত্যাদিতেই এদের ইংরেজি জ্ঞান সীমাবদ্ধ। লম্বা সময় এদের সাথে থাকলে আপনার ইংরেজিও খারাপ হতে বাধ্য!
মালয়েশিয়া অর্থনীতি আর উন্নয়নের সূচকে ধনী দেশ হলেও ভূমিপুতেরা (পড়ুন ভূমিপুত্র) মালয়দের সাথে অন্যদের প্রচুর বৈষম্য আছে। শিক্ষা, শিক্ষাবৃত্তি, সরকারি চাকরি ইত্যাদি সবক্ষেত্রেই অগ্রাধিকার পায় মালয়রা। এরপরেই মালয় চাইনিজ আর ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের স্থান হয়। বিষয়টাকে অনেকেই দেখেন প্রাতিষ্ঠানিক জাতিগত বৈষম্য হিসেবে। তবে চাইনিজরা যথেষ্ট উদ্যমী জাত বলে এই বৈষম্য অনেকাংশেই কাটিয়ে উঠেছে। ব্যবসায়িক কাজে চাইনিজরা জিনগতভাবেই সিদ্ধহস্ত। অনেক বড় বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের চাবিকাঠি মালয় চাইনিজদের হাতে। এক বাড়ির সামনে আরাম কেদারায় থুত্থুড়ে এক চাইনিজ মহিলাকে বসে থাকতে দেখলাম। দেখে মনে হয়, জীবনের সব কাজ শেষ করে মৃত্যুর অপেক্ষায় আছে বৃদ্ধা।
খানিক এগিয়ে এক পাহাড়ের কাঁধে-মাথায় গোছানো একটা চাইনিজ গোরস্থান। মিনিট দশেক সামনে এক পুলিশ স্টেশনের সামনে ফেলনা বোতল দিয়ে সুন্দর করে বানানো মালয়েশিয়ার । এরপরেই শুরু হলো পাম বাগান। পাম বাগান আর চড়াই যেন রীতিমতো সমার্থক। এর মধ্যেই বৃষ্টি চোখ রাঙাচ্ছে। দুই-চার ফোঁটা গায়েও পড়ল। ওয়াক সালাম পেরোতেই বৃষ্টির ফোঁটার সংখ্যা আরো বাড়ল। তবে ঝেঁপে বৃষ্টি আসছে না বলে রক্ষা। ের বাঁকে ফের গোছানো চাইনিজ গোরস্থান। চড়াই-উতরাই পেরিয়ে পৌনে এগারোটা নাগাদ পৌঁছে গেলাম জেমালুয়াং।
প্যাডেলে চাপ দেই আর কৌতূহলী দৃষ্টি ফেলে চারপাশ দেখি। যথারীতি পাম বাগান থেকে রাস্তা পেরোনোর জন্য বেরোনো প্রচুর বিষধর সাপ গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে মরে পড়ে আছে। এক জায়গায় অতি চিকন দড়ির মতো সাপকে বুকে ভর দিয়ে অতি কষ্টে রাস্তা পেরোতে দেখলাম। আমি সময়মতো খেয়াল না করলে আমার সাইকেলের চাকার নিচেই পড়ত। রোদের উত্তাপে ততক্ষণে গা চড়চড় করছে। এমন রোদে সাইকেল চালানোর সাথে গাল বাড়িয়ে চড় খাওয়ার কোন তফাত নেই! এ নিয়ে কারো কাছে অনুযোগের সুযোগও নেই। ভোগের জিনিস সবাইকে ভাগ করে দেওয়া যায়; এতে আনন্দ বাড়ে। অন্যদিকে এহেন দুর্ভোগ পোহাতে হয় একা একা!
কিছু এগিয়ে ধাপ চাষের জন্য প্রস্তুত করা সুবিশাল জমি। কয়েক কিলোমিটার সামনে ইবজি নামক বাগান। ে পড়ল সুংগাই জেমালুয়াং নদী! পায়ের গোড়ালির গভীরতার পানি এই নদীতে; প্রস্থে সুয়ারেজের নালার সমান! এও নাকি নদী! আমাদের দেশের চা বাগানের ছড়ায় শুষ্ক মৌসুমে এর চেয়ে অনেক বেশি পানি থাকে! একের পর এক ঢেউ খেলানো রাস্তা। জোর কদমে
প্যাডেল মেরে চড়াই উঠি, পায়ে ডানা লাগিয়ে উতরাই ধরে নামি। অন্তহীন ঢেউয়ের মতো রাস্তা আসতে থাকে। আমাদের দরকার তরী বেয়ে এগোনো। সে কাজই করতে থাকি। দুপাশে পাম বাগান ছাড়া কেউ নেই, কিচ্ছু নেই। ছোটখাট দোকানও পড়ছে না একটা। মসজিদ বা এবাদতখানাও আজ দুষ্প্রাপ্য।
দূরের পাহাড়ে ধাপে ধাপে পাম চাষ শুরু হয়েছে। পাম বাগানের সাথে অরণ্য বিনাশের একটা সম্পর্ক রয়েছে। আর যেকোন মনো-কালচার বৈচিত্র্যের জন্যও ভালো নয়। পাম গাছ দেখলেই খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গায় মাহফুজ রাসেল ভাইয়ের পিটাছড়ার পাশের পাম বাগানের কথা মনে পড়ে। দুই দশক আগে পাম তেলকে তরল সোনা আখ্যা দিয়ে লোকজনকে উদ্বুদ্ধ করতে শুরু করে একটা শ্রেণী। তখন অনেকে উদ্যোগী হয়ে পাহাড়ে প্রচুর পাম গাছ লাগালেও পরে দেখা গেল পাম ফল থেকে তেল সংগ্রহ করার কাঠামো গড়ে উঠেনি দেশে। সেসব গাছের একটা বড় অংশ এখনো রয়ে গেছে আমাদের পার্বত্য অঞ্চলে।
গরমে অতিষ্ঠ হয়ে এক জায়গায় মাইলো ব্রেক। জুমন ভাই গলা ভেজায় মাইলো সেজুক (ঠান্ডা মাইলো) এ, আর আমার পছন্দ নেস পানাস (গরম নেস)। পানীয় খেয়ে একটু ধাতস্থ হয়ে ফের সাইকেলে। আবার সেই ঢেউখেলানো । দিগন্ত অবধি শুধু রাস্তার ঢেউই দেখা যাচ্ছে। তেংগারো নামক একটা অতিকায় বাগান পেরিয়ে সুরাওতে থামলাম। পানিতে গলা ভিজিয়ে আবার রওনা দিলাম। যতই পানি পান করি না কেন, সব ঘাম হয়েই বেরিয়ে যাচ্ছে। দুপাশে দিগন্ত অবধি পাম বাগান। গাছের উপরের আর নতুন ডালগুলো সবুজ আর নিচেরগুলো ধূসর। মাঝে মাঝেই থোকা থোকা পাম ফল দেখা যাচ্ছে। চলতে চলতে ভাবছি, এটাই কি পাম-পাকা গরম? আমাদের দেশের ভাদ্রের তাল-পাকা গরমের মতো এদেশে পাম-পাকা গরম প্রবাদে থাকতেই পারে!
চোখে পড়ল সুংগাই দহল নামক নদী। নামেই নদী, প্রবাহের দিক থেকে খাল বললেও অত্যুক্তি হবে! কিছুটা এগিয়ে ের পাশে সুরক্ষিত দুর্গের মতো দেখতে ব্রিটিশদের বানানো । এগুলো যুদ্ধকালীন বাংকারের কাজ করত। ১ম বিশ্বযুদ্ধ থেকেই নিজেদের সুবিশাল সাম্রাজ্যের নানান স্থানে এই কংক্রিটের ছোট্ট দুর্গগুলো বানাতে শুরু করে ব্রিটিশরা। তবে মালয়েশিয়ায় বানানো এসব পিলবক্স ২য় বিশ্বযুদ্ধকালীন। জাপানিজ ইম্পেরিয়াল আর্মির সিঙ্গাপুর অভিমুখী অগ্রযাত্রা রুখতে ১৯৪১ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে এগুলো বানানো হয়। প্রসঙ্গত, তখন সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়ার অংশ ছিল। পিলবক্সগুলো এতগুলো বছর পরেও বেশ মজবুত। নিয়মিত যত্নআত্তি পায় এরা। সাদা রং করা বেশকিছু পিলবক্স আছে র পাশেই; কিছু পাশের জঙ্গলে। দূর থেকে পিলবক্সগুলো দেখলে মাথায় বর্ম পরা চোখ দুটো দৃশ্যমান চওড়া কাঁধের সৈনিক বলে ভ্রম হয়। উপরে আর নিচে অল্প কয়েকটা ফোকর আছে। এই ধরনের পিলবক্সগুলো ভেতরে থাকা সৈন্যদের সুরক্ষিত রেখে অগ্রসরমান শত্রুপক্ষের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে তাদের উপর হামলা করতে ব্যবহৃত হতো। পিলবক্সের কংক্রিটের দেওয়ালগুলো অতীব পুরু। নিশ্ছিদ্র দেওয়ালের গায়ে 'ফায়ারিং পোর্ট' হিসেবে ব্যবহৃত অল্প কয়েকটা ফোকর আছে শুধু।
রাস্তার পাশে প্রচুর ছিন্নবিচ্ছিন্ন টায়ার। কড়া ব্রেকের ফলেই কি টায়ারের এমন পরিণতি? এরকম ব্যাপার শুধু মালয়েশিয়াতেই চোখে পড়েছে। এরপরেই ফের হাতি পারাপারের সতর্কবাণী। কিছুটা এগিয়েই পান্তি পাখি অভয়ারণ্য। এই এক জায়গাতেই ৩০০ এর অধিক প্রজাতির পাখি বাস করে বলে পাখিপ্রেমীদের পছন্দের জায়গা এটি। লোমশ ডানাওয়ালা বন্ধুদের দেখার জন্য পান্তি আদর্শ। তবে এখানে ভ্রমণের অনুমতিপত্রের জন্য লম্বা সময় আগেই আবেদন করে রাখতে হয়। একটু খাটাখাটনি করলেই এখানে ধনেশের দেখা মেলে। মুখের লালা দিয়ে বাসা বানানোর জন্য বিখ্যাত বাতাসি পাখিরও দেখা মেলে এখানে। সময়, ধৈর্য, অনুমতিপত্র আর নিজস্ব গাড়ি-এই চারই প্রয়োজন পান্তি অভয়ারণ্যের অভিজ্ঞতা নিতে।
অভয়ারণ্যে চোখ রাখতে রাখতে আড়াইটা নাগাদ মাওয়াই এর মোড়ে। থামলাম প্রথম খোলা দোকানটাতেই। দুই ভাইবোন আদম-হাওয়ার দোকানে আসাম পেডাস আর আইস সিরাপ দিয়ে দুপুরের খাবার সারলাম। আমাদের আজকের হোমস্টে এখান থেকে আর সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে। প্যাডেল মেরে মিনিট দশেক পরেই হোমস্টে-এর আঙিনায়। কাল অতি কষ্টে এই হোমস্টে ম্যানেজ করা গেছে। বুকিং.কম এ এই অঞ্চলের একটা হোমস্টেও নেই। পরে গুগলে খোঁজ করে চার-পাঁচটা হোমস্টের নম্বর জোগাড় করে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করেছিল জুমন ভাই। এর মধ্যে সবার কাছ থেকে প্রত্যুত্তরও পাওয়া যায়নি। প্রথম যিনি রিপ্লাই দিয়েছিলেন, তার হোমস্টে-তেই আজকের স্টে।
মালয়েশিয়ার পূর্ব উপকূলে এমনিতেই পর্যটক-সংখ্যা কম। এদিকটাতে মূলত আসে মালয়রা। মালয়রা খুবই পরিবার-কেন্দ্রিক জাতি। তাই এই পুরো অঞ্চলে হোটেলের চেয়ে হোমস্টে এর সংখ্যাই বেশি। ওরা নিজেদের গাড়িতে পুরো পরিবার নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। একে এই অঞ্চলে বিদেশি পর্যটক নেই। তার উপর শুরু হতে হচ্ছে লম্বা বর্ষাকাল। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত এই অঞ্চলে পর্যটক-বান্ধব মোটামুটি সবকিছুই বন্ধ থাকে। রাতে খাবার খেয়ে ফেরার সময় সুরাও বা এবাদতখানায় গেলাম খাবার পানি নেওয়ার জন্য। এখানেই পরিচয় হলো এক মালয়ের সাথে। ২০২৩ সালে তাবলিগ জামাতের সাথে বাংলাদেশে গিয়ে চার মাস কাটিয়ে এসেছেন। ঢাকা, টঙ্গী, খুলনা, টাঙ্গাইলের নানান মসজিদে থেকে আশেপাশের লোকেদের ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন। সে গল্পই ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে করে গেলেন মিনিট দশেক ধরে।












