মানুষ নয়, এবার রোবটই সামলাবে হোটেল!

পুরো রোবট চালিত হোটেলে ২০২৭ সাল থেকে পর্যটকরা অবস্থান করতে পারবেন। ছবি: ডিপোজিটফটোস
কল্পবিজ্ঞান সিনেমার সেই দৃশ্যগুলো এবার বাস্তব রূপ নিতে যাচ্ছে পৃথিবীর বুকেই। যেখানে হোটেলের গেটে আপনাকে স্বাগত জানানো থেকে শুরু করে লাগেজ বহন, রুম সার্ভিস, এমনকি ঘর পরিষ্কার করার কাজটিও করবে কোনো না কোনো রোবট।
কোনো মানুষের ছোঁয়া ছাড়াই সম্পূর্ণ রোবট দ্বারা পরিচালিত বিশ্বের প্রথম ‘ফুল-সিনারিও রোবট-সার্ভিসড হোটেল’ চালু হতে যাচ্ছে চীনে।
পার্ল রিভার ডেল্টায় নির্মিত দেশটির অন্যতম মেগাপ্রজেক্ট ‘শেনজেন-ঝংশান লিংক’-এর ‘ওয়েস্ট আর্টিফিশিয়াল আইল্যান্ড’-এ কৃত্রিম পশ্চিম দ্বীপে গড়ে উঠছে এই সাম্রাজ্য।
দেশটিতে রোবট দিয়ে খাবার সরবরাহ বা সাধারণ কিছু কাজ করানো নতুন কিছু নয়। তবে এই প্রথম কোনো হোটেলের অভ্যর্থনা, রুম সার্ভিস, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, খাবার তৈরি থেকে শুরু করে অতিথি আপ্যায়নের প্রতিটি স্তরে মানুষের বিকল্প হিসেবে শতভাগ রোবট কাজ করবে।
বিখ্যাত রোবটিকস কোম্পানি ‘পুডু রোবটিকস’ ও ‘শেনজেন কালচার অ্যান্ড ট্যুরিজম ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট’ যৌথভাবে এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।
আইল্যান্ড যখন প্রযুক্তির স্বর্গরাজ্য
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হওয়া এই পশ্চিম কৃত্রিম দ্বীপটিকে আগামী ৪ বছরের মধ্যে একটি ডেডিকেটেড রোবটিকস এবং উন্নত প্রযুক্তির পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই মহাপরিকল্পনারই প্রথম ও প্রধান আকর্ষণ হলো এই রোবট হোটেল।
হোটেলটিতে মোট ৪৪টি হাই-এন্ড (প্রিমিয়াম) রুম, একটি আধুনিক রেস্তোরাঁ এবং জিমসহ অতিথিদের জন্য সব ধরনের বিলাসবহুল সুবিধা থাকবে।
কারা থাকছে হোটেলের ‘স্টাফ’ তালিকায়?
হোটেলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এরই মধ্যে কিছু রোবট মডেলের কার্যক্ষমতা প্রদর্শন করা হয়েছে। সেখানে ‘বেলাবট প্রো’ অতিথিদের কফি পরিবেশন করেছে এবং ‘কেটিবট প্রো’ স্ন্যাকস ও রিফ্রেশমেন্ট সরবরাহ করেছে। মূল হোটেলে যে রোবট স্কোয়াড কাজ করবে তাদের মধ্যে রয়েছে:
পুডু টি৩০০: ফয়ার বা লবি থেকে অতিথিদের ভারী লগেজ ও ব্যাগপত্র নিখুঁতভাবে রুমে পৌঁছে দেবে।
ফ্ল্যাশবট: এটি একটি ইন্টেলিজেন্ট ভেন্ডিং সিস্টেম হিসেবে কাজ করবে। অতিথিরা স্মার্টফোনের মাধ্যমে ড্রিংকস অর্ডার করলেই ফ্ল্যাশবট তা রুমে পৌঁছে দেবে।
পুডু সিসিওয়ান প্রো ও পুডু এমটিওয়ান: হোটেলের পরিচ্ছন্নতার ‘ডার্টি ওয়ার্ক’ সামলাবে এই দুটি ক্লিনিং বট। এগুলোতে রয়েছে এআই বর্জ্য-শনাক্তকরণ প্রযুক্তি, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ময়লা চিনে তা পরিষ্কার করতে পারে।
পেছনে কাজ করছে যে ‘মস্তিষ্ক’
হোটেলের সব রোবট দেখতে আলাদা এবং তাদের দায়িত্ব ভিন্ন হলেও তারা সবাই একটি নির্দিষ্ট নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকবে। পুডু রোবটিকসের তৈরি এমবেডেড ইন্টেলিজেন্স ফাউন্ডেশন মডেল ‘পুডু এফএমওয়ান’ ও ‘পুডুএজেন্ট’ সফটওয়্যারের সমন্বয়ে এই পুরো হোটেলটি একটি আন্তঃসংযুক্ত ‘স্মার্ট সার্ভিস ইকোসিস্টেম’ হিসেবে পরিচালিত হবে।
এই সমন্বিত এআই প্রযুক্তির কারণে রিসেপশনের রোবট মানুষের ইশারা ও সামাজিক আচরণ বুঝতে পারবে, ডেলিভারি রোবট স্বয়ংক্রিয়ভাবে সবচেয়ে সহজ রাস্তা খুঁজে নেবে এবং ক্লিনিং রোবট চারপাশের পরিবেশের পরিবর্তন দেখে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবে।
কোনো মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই একটি ক্লোজড-লুপ বা স্বয়ংসম্পূর্ণ চেইনে চলবে পুরো হোটেলের কাজ।
পুডু রোবটিকসের কো-ফাউন্ডার এবং সিটিও (প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা) চং গুও চীনা সংবাদসংস্থা সিনহুয়াকে বলেন, "এই পার্টনারশিপ প্রিমিয়াম হসপিটালিটি সেক্টরে বড় আকারে এমবডিড ইন্টেলিজেন্স ব্যবহারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই 'ফুল-সিনারিও' মডেলের অর্থ হলো পুডু রোবটগুলো হোটেলের প্রতিটি অপারেশনে এত গভীরভাবে জড়িত থাকবে যে, সেখানে সেবার কোনো ঘাটতি থাকবে না এবং কোনো মানুষের ইন্টারাপশনের প্রয়োজন হবে না।"
কবে নাগাদ উন্মুক্ত হচ্ছে?
প্রকল্পটির কাজ ধাপে ধাপে সম্পন্ন করা হচ্ছে। যারা এই রোবট হোটেলের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা সবার আগে নিতে চান, তাদের জন্য সুখবর হলো- চলতি বছরের শেষের দিকে (লেট ২০২৬) শুরু হতে যাচ্ছে এর প্রথম ট্রায়াল রান। প্রাথমিক এই ট্রায়ালে সাধারণ দর্শনার্থীরা অল্প কিছু রুমে থেকে রোবটের চেক-ইন ও স্বয়ংক্রিয় ইন-রুম ডেলিভারি সেবার অভিজ্ঞতা নিতে পারবেন।
আর সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ২০২৭ সালে হোটেলটি পূর্ণাঙ্গভাবে বিশ্ববাসীর জন্য তার দরজা উন্মুক্ত করে দেবে।
ভবিষ্যতে এই কৃত্রিম দ্বীপের পুরো পর্যটন ও হসপিটালিটি সেক্টরকেই এই রোবোটিকসের নেটওয়ার্কের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে উদ্যোক্তাদের। প্রযুক্তির এই অবিশ্বাস্য অগ্রগতি টেক দুনিয়াকে আরও একবার মনে করিয়ে দিল- ভবিষ্যৎ আর দূরে নয়, ভবিষ্যৎ এখনই!
সূত্র: পুডু রোবটিকস





