অন্তর্ভুক্তিমূলক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শাসন এগিয়ে নিতে বিআইজিএফ ও এআইইউবির চুক্তি

সমঝোতা স্মারকে সই করছেন অধ্যাপক ড. প্রদীপ কুমার পাণ্ডে এবং বিআইজিএফের পক্ষে মোহাম্মদ আবদুল হক
ইন্টারনেট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অন্যান্য ডিজিটাল প্রযুক্তি কীভাবে পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হবে, সে বিষয়ে গবেষণা, জনআলোচনা এবং অংশগ্রহণ বাড়াতে বৃহস্পতিবার একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছে বাংলাদেশ ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ফোরাম (বিআইজিএফ) এবং আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশের (এআইইউবি) সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগ।
ডিজিটাল প্রযুক্তি যখন শিক্ষা, সরকারি সেবা, গণমাধ্যম, বাণিজ্য ও নাগরিক জীবনকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে, তখন জাতীয় বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্ম বিআইজিএফ ও এআইইউবির সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগ এই সমঝোতার মাধ্যমে একসঙ্গে কাজ করার উদ্যোগ নিয়েছে।
এআইইউবিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. প্রদীপ কুমার পাণ্ডে এবং বিআইজিএফের পক্ষে মোহাম্মদ আবদুল হক সমঝোতা স্মারকে সই করেন।
এই অংশীদারত্বের আওতায় প্রতিষ্ঠান দুটি যৌথভাবে গবেষণা, নীতিগত অ্যাডভোকেসি, জ্ঞান বিনিময়, প্রশিক্ষণ, জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং অংশীজন পরামর্শ আয়োজন করবে। পাশাপাশি ওয়ার্ল্ড সামিট অন দ্য ইনফরমেশন সোসাইটি, ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ফোরাম, এআই ফর গুড, প্যাক্ট ফর দ্য ফিউচার এবং জাতিসংঘের গ্লোবাল ডায়ালগ অন এআই গভর্ন্যান্স-সংশ্লিষ্ট জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ জোরদার করার চেষ্টা করা হবে।
এই উদ্যোগ এমন এক সময়ে নেওয়া হলো, যখন প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নতুন সুযোগ তৈরি করলেও প্রবেশাধিকার, সামর্থ্য, জবাবদিহি এবং জনঅংশগ্রহণের বিষয়গুলো যথাযথভাবে সমাধান করা না হলে বিদ্যমান বৈষম্য আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও তথ্যনির্ভর ব্যবস্থা নাগরিকদের জীবনে প্রভাব ফেলে এমন নানা সিদ্ধান্তে ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু ডিজিটাল অবকাঠামো, দক্ষতা এবং নীতিনির্ধারণী আলোচনায় অংশগ্রহণের সুযোগ এখনো সমান নয়। বিশেষ করে শহর ও গ্রামের মধ্যে এবং বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে বড় ধরনের বৈষম্য রয়ে গেছে।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী বক্তব্যে অধ্যাপক প্রদীপ কুমার পাণ্ডে বলেন, দায়িত্বশীল ডিজিটাল শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জননীতি ও সামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে এমন গবেষণা তৈরিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগের উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এ জে এম শফিউল আলম ভূঁইয়া এই চুক্তিকে বিভাগ ও বিশ্ববিদ্যালয় উভয়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ইন্টারনেট শাসন কেবল একটি কারিগরি বিষয় নয়। এটি প্রত্যেক নাগরিকের জীবনে প্রভাব ফেলে। তাই বিভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক পটভূমির মানুষের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিআইজিএফ বৃহত্তর ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ফোরাম প্রক্রিয়ার অংশ। এই প্রক্রিয়া সরকার, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কারিগরি সম্প্রদায়, গণমাধ্যম ও তরুণদের ইন্টারনেট-সংশ্লিষ্ট জননীতি নিয়ে আলোচনায় অংশ নিতে উৎসাহিত করে।
মোহাম্মদ আবদুল হক অংশীদারত্বের জন্য এআইইউবিকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, গবেষণা, সংলাপ, জনসম্পৃক্ততা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল শাসন প্রতিষ্ঠায় বিআইজিএফ বিশ্ববিদ্যালয়টির সঙ্গে কাজ করবে।
এ এইচ এম বজলুর রহমান বলেন, ডিজিটাল বৈষম্য কমাতে শুধু ইন্টারনেট সংযোগ বাড়ানো বা প্রযুক্তিগত অবকাঠামো স্থাপন যথেষ্ট নয়।
তিনি বলেন, “ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে ডিজিটাল বৈষম্য কমানো এবং জ্ঞানের ব্যবধান দূর করা জরুরি। শহর ও গ্রামের মধ্যে এবং বিভিন্ন আর্থসামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে যে দীর্ঘস্থায়ী বৈষম্য রয়েছে, তা দূর করতে ধারাবাহিক ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।”
ডিজিটাল রূপান্তরের সুফল যাতে সমাজের সব স্তরের মানুষ পায়, সে জন্য বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, কারিগরি বিশেষজ্ঞ ও গণমাধ্যমের মধ্যে আরও শক্তিশালী সহযোগিতার আহ্বান জানান তিনি।
এআইইউবির সহ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুর রহমান বলেন, সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কাছে প্রযুক্তির সুফল পৌঁছে দিতে আরও অনেক কাজ করা প্রয়োজন।
তিনি তৃণমূলের মানুষের কাছে পৌঁছানো এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের শুধু সুবিধাভোগী নয়, বরং সেই পরিবর্তন গড়ে তোলার সক্রিয় অংশীদার হিসেবে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
এআইইউবির উপাচার্য ড. সাইফুল ইসলাম বলেন, এই সমঝোতা শিক্ষার্থী, গবেষক ও শিক্ষকদের জন্য ইন্টারনেট শাসন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল নীতি এবং উদীয়মান প্রযুক্তি বিষয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনা ও উদ্যোগে অংশগ্রহণের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. তাজুল ইসলাম, সহযোগী ডিন ড. ফারিয়া সুলতানা, সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগের শিক্ষক এবং বিআইজিএফের প্রতিনিধিরা।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, কার্যকর ডিজিটাল শাসনের জন্য বৃহত্তর জনঅংশগ্রহণ প্রয়োজন। একই সঙ্গে নারী, তরুণ, গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং প্রযুক্তি নীতিবিষয়ক আলোচনায় সাধারণত কম প্রতিনিধিত্ব পাওয়া অন্যান্য গোষ্ঠীর অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
ইন্টারনেট ও ডিজিটাল শাসন বিষয়ে গবেষণা, জনআলোচনা এবং সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি কোম্পানি, নাগরিক সমাজ এবং উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বিআইজিএফ ও এআইইউবি।
এই চুক্তি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, জবাবদিহিমূলক, অধিকারভিত্তিক এবং পরিবেশগতভাবে টেকসই ডিজিটাল ব্যবস্থা গড়ে তোলার যৌথ অঙ্গীকারের প্রতিফলন। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে অংশীদারত্বটি প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার গণ্ডি পেরিয়ে ধারাবাহিক গবেষণা, জনসম্পৃক্ততা এবং বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরের প্রান্তে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য বাস্তব সুযোগ তৈরি করতে পারে কি না, তার ওপর।




