উষ্ণ পৃথিবীতে ঘর বদলাচ্ছে প্রজাপতি

ছবি: ডিপোজিটফটোজ
বাগানে হঠাৎ এমন এক প্রজাপতি দেখা গেল, যাকে আগে কখনও দেখেননি। মুহূর্তটি আনন্দেরই হতে পারে। কিন্তু সেই নতুন অতিথি যদি এসে থাকে তার পুরোনো আবাস অতিরিক্ত গরম, শুষ্ক কিংবা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কারণে, তবে ছবিটা আর ততটা নিরীহ থাকে না। পৃথিবী উষ্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঠিক এমনভাবেই বদলে যাচ্ছে প্রজাপতিদের ঠিকানা।
দ্য কনভারসেশনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক শাওয়ান চৌধুরী, আলেটা বন ও জোনাথন লেনোয়া লিখেছেন, পৃথিবীর পরিচিত প্রজাপতি প্রজাতির প্রায় প্রতি দশটির একটির বিস্তৃতি এরই মধ্যে বদলে গেছে। তাদের গবেষণাটি একই দিনে নেচার ইকোলজি ও ইভোলুশন সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়।
গবেষণায় ১০৫টি দেশ ও অঞ্চলের ১ হাজার ৭৫৮ প্রজাতির তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। দ্য কনভারসেশন-এর হিসাবে, ৫৬৫টি গবেষণা ও ৬৮টি বিশেষজ্ঞ মূল্যায়নের ৬ হাজার ১৮০টির বেশি ‘রেঞ্জ শিফট’ রিপোর্ট এতে রয়েছে। মূল গবেষণাপত্রে অবশ্য ৫৬৭টি স্বতন্ত্র গবেষণা থেকে ৬ হাজার ১৮২টি রিপোর্টের হিসাব দেওয়া হয়েছে। নথিভুক্ত প্রজাতির ৮০ শতাংশের বিস্তৃতি অনুভূমিকভাবে বেড়েছে, ২৭ শতাংশের কমেছে এবং ২২ শতাংশ পাহাড়ি ঢালে উপরে বা নীচে সরে গেছে। একই প্রজাতির ক্ষেত্রে একাধিক পরিবর্তনও ঘটতে পারে।
উষ্ণতা বাড়লেই সব প্রজাপতি ঠান্ডার খোঁজে উত্তর দিকে বা পাহাড়ের ওপরে উঠছে। গবেষণা বলছে, গল্পটি এত সরল নয়। মেক্সিকোয় পেইন্টেড লেডি ১৯৮৮ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে বছরে প্রায় ৮৩ মিটার করে ওপরে উঠেছে। একই সময়ে কুইন বাটারফ্লাই বছরে প্রায় ৩২ মিটার নীচে নেমেছে। ভারতীয় উপমহাদেশের টনি কস্টার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পেরিয়ে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। আবার যুক্তরাজ্যের স্মল ব্লু গত ১৫০ বছরে হারিয়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ আবাস।
গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ও চরম আবহাওয়াই এই স্থানবদলের প্রধান কারণ।
মূল গবেষণায় নথিভুক্ত পরিবর্তনের ৭৯ শতাংশের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন ও চরম আবহাওয়ার যোগ পাওয়া গেছে। তবে কৃষি, বনভূমির পরিবর্তন, নগরায়ণ ও আবাসস্থল ধ্বংসও প্রজাপতির ঠিকানা বদলাচ্ছে। শুঁয়োপোকার প্রয়োজন নির্দিষ্ট পোষক উদ্ভিদ; পূর্ণবয়স্ক প্রজাপতির দরকার মধু, আশ্রয় ও নিরাপদ প্রজননক্ষেত্র। শুধু উপযুক্ত তাপমাত্রা পেলেই তাই নতুন জায়গায় টিকে থাকা যায় না।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তথ্যের ঘাটতি। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ থাকলেও মধ্য আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, নিউ গিনি ও আমাজন অববাহিকার প্রজাপতি সম্পর্কে তথ্য অল্প। অথচ জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এসব অঞ্চলের বহু প্রজাতি হয়তো ইতিমধ্যেই তাদের সহনীয় তাপমাত্রার সর্বোচ্চ সীমার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। সামান্য উষ্ণতাও তাদের বর্তমান আবাসকে অনুপযোগী করে তুলতে পারে।
গবেষকদের সতর্কতা তাই স্পষ্ট- সংরক্ষণ শুধু সেই জায়গাকে ঘিরে হতে পারে না, যেখানে কোনও প্রজাতি একসময় ছিল। ভবিষ্যতে তারা কোথায় যাবে, কোন ‘বন্যপ্রাণী করিডর’ ধরে নতুন আবাসে পৌঁছাবে, সেটিও পরিকল্পনায় রাখতে হবে। কারণ প্রজাপতি হারিয়ে যাওয়া শুধু কয়েকটি রঙিন ডানা কমে যাওয়া নয়। তারা পরাগায়নে সাহায্য করে, আর শুঁয়োপোকা পাখি, মাকড়সা ও অন্য পোকামাকড়ের খাবার। তাই ডানার এই নীরব স্থানান্তর আসলে বড় এক সতর্কবার্তা, উষ্ণ পৃথিবীতে বদলে যাচ্ছে শুধু আবহাওয়া নয়, জীবনের পরিচিত মানচিত্রও।





