পৃথিবীর চেয়ে ১০০ গুণ শক্তিশালী বৃহস্পতির বজ্রপাত!

ছবি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি
আমাদের সৌরজগতের সবচেয়ে বড় গ্রহ বৃহস্পতি বা জুপিটার বরাবরই তার দানবীয় আকৃতি এবং শত শত বছর ধরে চলা একেকটি ভয়াবহ ঝড়ের জন্য বিজ্ঞানীদের কাছে এক পরম বিস্ময়। তবে এবার এই গ্যাসীয় গ্রহটি সম্পর্কে এমন এক রোমাঞ্চকর তথ্য সামনে এসেছে, যা বিজ্ঞানীদেরও চমকে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার 'জুনো' মহাকাশযানের পাঠানো সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা জানতে পেরেছেন, বৃহস্পতির বুকে যে বজ্রপাত হয়, তা আমাদের পৃথিবীর সাধারণ বজ্রপাতের চেয়ে গড়ে ১০০ গুণ বা তারও বেশি শক্তিশালী! কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই শক্তির পরিমাণ পৃথিবীর বজ্রপাতের চেয়ে কয়েক হাজার থেকে শুরু করে প্রায় ১০ লক্ষ গুণ পর্যন্ত বেশি হতে পারে।
২০২৬ সালের মে মাসে বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী 'এজিইউ অ্যাডভান্সেস'-এ প্রকাশিত ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলের একদল বিজ্ঞানীদের গবেষণা প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
যেভাবে উন্মোচিত হলো রহস্য
২০১৬ সাল থেকে নাসার জুনো মহাকাশযান বৃহস্পতির কক্ষপথে আবর্তন করে গ্রহটির বায়ুমণ্ডল পর্যবেক্ষণ করছে। এর আগে বিজ্ঞানীরা কেবল বৃহস্পতির অন্ধকার অংশের শক্তিশালী আলোর ঝলকানিই দেখতে পেতেন। কিন্তু জুনোর বিশেষ 'মাইক্রোওয়েভ রেডিওমিটার' যন্ত্রটির মাধ্যমে এবার গ্রহটির ঘন মেঘের ভেতরে তৈরি হওয়া বজ্রপাতের রেডিও তরঙ্গ বা মাইক্রোওয়েভ পালস পরিমাপ করা সম্ভব হয়েছে।
২০২১ এবং ২০২২ সালের দিকে বৃহস্পতির 'উত্তর নিরক্ষীয় বলয়'-এ ঝড়ের তাণ্ডব সাময়িকভাবে কিছুটা কমে আসে। বিজ্ঞানীদের জন্য এটি ছিল একটি বড় সুযোগ। ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির গ্রহবিজ্ঞানী মাইকেল ওং-এর নেতৃত্বে গবেষক দলটি এই শান্ত সময়ে বৃহস্পতির একক ঝড়গুলোকে আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।
তারা জুনোর মাধ্যমে মোট ৬১৩টি মাইক্রোওয়েভ পালস বা বজ্রপাতের সংকেত বিশ্লেষণ করে দেখতে পান যে, এই বজ্রপাতগুলোর শক্তি পৃথিবীর সাধারণ একটি বজ্রপাতের চেয়ে ১০০ গুণেরও বেশি মারাত্মক।
পৃথিবীর ১ বনাম বৃহস্পতির ১০০+
সাধারণত পৃথিবীতে একটি বজ্রপাত থেকে প্রায় ১ গিগাজুল (১ বিলিয়ন জুল) শক্তি নির্গত হয়, যা দিয়ে অনায়াসে প্রায় ২০০টি বাড়িতে এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব। আর বিজ্ঞানী মাইকেল ওং-এর হিসাব মতে, বৃহস্পতির একেকটি বজ্রপাতে এর চেয়ে ৫০০ থেকে ১০,০০০ গুণ বেশি শক্তি জমা থাকে।
বিজ্ঞানীদের মতে, পরিমাপের ভিন্নতার কারণে শক্তির এই হিসাব আরও অনেক বেশি হতে পারে। মাইকেল ওং বিষয়টিকে একটি রূপক দিয়ে ব্যাখ্যা করে বলেছেন, "এটি যেন এমন যে পুরো বজ্রপাতটি একটি 'লোচ নেস মনস্টার' (কাল্পনিক এক বিশাল সমুদ্রদানব), আর আমরা কেবল তার পানির ওপর জেগে থাকা সামান্য অংশ দেখেই অনুমান করার চেষ্টা করছি যে দানবটি আসলে কত বড়!"
কেন এত শক্তিশালী বৃহস্পতির বজ্রপাত?
পৃথিবী এবং বৃহস্পতির বজ্রপাত সৃষ্টির মূল প্রক্রিয়াটি প্রায় একই রকম। জলীয় বাষ্প যখন ওপরে উঠে ঘনীভূত হয়ে বরফ কণা ও পানির ফোঁটায় পরিণত হয়, তখন তাদের মধ্যকার পারস্পরিক ঘর্ষণে স্থির তড়িৎ বা চার্জ তৈরি হয়। এই চার্জের ভারসাম্যহীনতা থেকেই বজ্রপাতের সৃষ্টি। কিন্তু বৃহস্পতির ক্ষেত্রে পার্থক্য গড়ে দেয় তার বায়ুমণ্ডল।
বায়ুমণ্ডলের গঠন: পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল মূলত নাইট্রোজেনপ্রধান, যা জলীয় বাষ্পের চেয়ে ভারী। ফলে আর্দ্র বাতাস সহজে ওপরে উঠে মেঘ তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে, বৃহস্পতির বায়ুমণ্ডল মূলত হাইড্রোজেনপ্রধান, যা জলীয় বাষ্পের চেয়ে অনেক হালকা। এর ফলে বৃহস্পতিতে আর্দ্র ও ভারী বাতাসকে ওপরে উঠতে অনেক বেশি বেগ পেতে হয় এবং প্রচুর শক্তি সঞ্চয় করতে হয়।
মেঘের বিশালতা: পৃথিবীতে সাধারণ ঝড়ো মেঘের উচ্চতা যেখানে সর্বোচ্চ ১০ কিলোমিটার হয়ে থাকে, সেখানে বৃহস্পতির বায়ুমণ্ডলে মেঘের উচ্চতা ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি ছাড়িয়ে যায়।
'মাশবলের' উপস্থিতি: পৃথিবীতে মেঘের ভেতর শিলাবৃষ্টি হয়। কিন্তু বৃহস্পতির প্রচণ্ড ঠাণ্ডা বায়ুমণ্ডলে পানি ও অ্যামোনিয়া গ্যাস একসঙ্গে মিশে এক ধরণের আঠালো বরফের কাদা তৈরি করে, যাকে বিজ্ঞানীরা বলছেন 'মাশবল'। এই মাশবলগুলোর অস্বাভাবিক ঘর্ষণের ফলেই সেখানে দানবীয় তড়িৎ চৌম্বকীয় ক্ষেত্র বা ভোল্টেজ তৈরি হয়।
মহাজাগতিক প্রাণের সন্ধানে নতুন আশা
বৃহস্পতির বজ্রপাতের এই নতুন আবিষ্কার কেবল গ্রহটির বায়ুমণ্ডলের রহস্যই উন্মোচন করেনি, বরং তা মহাবিশ্বে প্রাণের উৎপত্তি সংক্রান্ত গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, বজ্রপাতের এই বিপুল শক্তি বায়ুমণ্ডলের রাসায়নিক উপাদানগুলোর মধ্যে এমন বিক্রিয়া ঘটাতে পারে, যা প্রাণ সৃষ্টির প্রাথমিক উপাদান বা জৈব অণু তৈরিতে ভূমিকা রাখে।
সৌরজগতের সবচেয়ে বড় গ্রহটি যে তার বুকে কতশত রহস্য লুকিয়ে রেখেছে, নাসার জুনো মহাকাশযান যেন প্রতি নিয়ত আমাদের সেটাই মনে করিয়ে দিচ্ছে। বৃহস্পতির এই তীব্র ও শক্তিশালী বজ্রপাত প্রমাণ করে যে, মহাজাগতিক আবহাওয়ার শক্তির সামনে আমাদের পৃথিবী কতটা শান্ত এবং নিরাপদ।






