শরীরে ডেবিট কার্ড হাতের ছোঁয়ায় লেনদেন!

এআই ডেবিট কার্ড
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওয়ালেটমোর বাজারে নিয়ে এসেছে শরীরের ভেতরে বসানোর উপযোগী এক অদ্ভুত ব্যাংকিং চিপ। এ নিয়ে লিখেছেন আখলাকুজ্জামান অনিক
কল্পনা করুন, ছুটির দিনে শহরের নামিদামি রেস্তোরাঁয় দারুণ ডিনার শেষ করেছেন। ওয়েটারকে বিল আনতে বললেন। পকেটে হাত দিতেই আবিষ্কার করলেন, মানিব্যাগটা ভুলে বাড়িতেই ফেলে এসেছেন! ভাবলেন মোবাইল ব্যাংকিং দিয়ে পেমেন্ট করবেন? ফোনটা বের করে দেখলেন চার্জ ফুরিয়ে স্ক্রিন কালো হয়ে আছে। চারপাশের মানুষজন আপনার দিকে তাকাচ্ছে। এবার মৃদু হেসে ক্যাশিয়ারের দিকে এগিয়ে বাঁ হাতটা ডিজিটাল কার্ড রিডারের ওপর ধরলেন। কোনো কার্ড ছাড়াই জাদুর মতো স্ক্রিনে ভেসে উঠল, ‘ট্রানজেকশন কমপ্লিট’!
কোনো সায়েন্স ফিকশন দৃশ্য নয়। এটি আমাদের বাস্তব পৃথিবীরই অংশ। সম্প্রতি পোলিশ ব্রিটিশ স্টার্টআপ কোম্পানি ওয়ালেটমোর বাণিজ্যিকভাবে বাজারে এনেছে এক অভিনব প্রযুক্তি। তারা বিশ্বের প্রথম একটি মাইক্রোচিপ তৈরি করেছে, যা মানুষের ত্বকের নিচে প্রবেশ করানো যায়।
বৈদ্যুতিক কার্ডের বদলে এ প্রযুক্তিতে অর্থ বিনিময়ের কেন্দ্রবিন্দু ক্ষুদ্র মাইক্রোচিপ। চালের দানার মতো চিপটি মানুষের হাতের চামড়ার নিচে, বৃদ্ধাঙ্গুলি ও তর্জনীর মাঝখানে ইনজেকশনের মাধ্যমে বসানো হয়। রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন প্রযুক্তিতে চলা চিপগুলোতে নিজস্ব ব্যাটারির প্রয়োজন হয় না। এটি বায়োকম্প্যাটিবল উপাদান দিয়ে তৈরি হওয়ায় রক্তপ্রবাহে বাধা দেয় না। কার্ড রিডারের কাছে হাত নিলেই এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সক্রিয় হয়।
বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হচ্ছে বায়োহ্যাকিং। প্রকৃতি এবং যন্ত্রের সমন্বয়ে সাইবর্গ হওয়ার পথে এটি যুগান্তকারী ধাপ। মানব সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য এ বায়োহ্যাকিংকে চারটি ভাগে ভাগ করা যায়। সাবডার্মাল এন্ট্রি বা ত্বকের নিচে প্রবেশ এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও নিরাপদ।
চিপটি মানুষের হাতের চামড়ার নিচে, বৃদ্ধাঙ্গুলি ও তর্জনীর মাঝখানে ইনজেকশনের মাধ্যমে বসানো হয়। রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন প্রযুক্তিতে চলা চিপগুলোতে ব্যাটারির প্রয়োজন হয় না
১৯৯৮ সালে ব্রিটিশ অধ্যাপক কেভিন ওয়ারউইক প্রথম মানুষের দেহে মাইক্রোচিপ স্থাপন করেন। অনেকেই তখন অবাক হয়েছিলেন। আর এখন ইউরোপে এর ব্যবহার বাড়ছে। সুইডেন এই প্রযুক্তির ব্যবহারে বিশ্বকে পথ দেখাচ্ছে। দেশটির ছয় হাজারের বেশি মানুষ চামড়ার নিচে চিপ বসিয়েছেন। তারা চিপ দিয়ে ট্রেনের টিকিট কাটছেন, দরজা খুলছেন, জিমের কার্ড হিসেবেও ব্যবহার করছেন। সুইডেনের এসজে রেল বিশ্বের প্রথম ভ্রমণ সংস্থা যারা চিপের মাধ্যমে ভাড়া মেটানোর সুযোগ দিচ্ছে। উইসকনসিনভিত্তিক থ্রি স্কয়ার মার্কেট কর্মীদের শরীরে চিপ পরিয়েছে, যা দিয়ে তারা কম্পিউটার লগইন করতে পারছেন।
ওয়ালেটমোরের চিপটির দাম ১৯৯ ইউরো। এটি আইকার্ড নামের মোবাইল অ্যাপের সঙ্গে যুক্ত থাকে, যেখান থেকে ফান্ড রিচার্জ করা যায়। কোম্পানির মতে, এই চিপ হারানোর সুযোগ নেই। হ্যাক করাও অসম্ভব। আগামী কয়েক বছরে হিউম্যান মাইক্রোচিপিংয়ের বাজার বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। চিকিৎসা ক্ষেত্রেও চিপ যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে।
আধুনিক
ও নিরাপদ মনে হলেও, এর
একটি অন্ধকার ও শিহরন জাগানো
দিক রয়েছে। প্রযুক্তি মানিব্যাগ হারানোর ভয় দূর করেছে,
কিন্তু বদলে তৈরি করেছে
জীবনের মারাত্মক
এক ঝুঁকি।
ভাবুন তো, নির্জন গলি দিয়ে রাতে বাড়ি ফিরছেন। হঠাৎ অন্ধকারে একদল দুর্ধর্ষ ছিনতাইকারী পথ আটকে দাঁড়াল। পকেটে মানিব্যাগ থাকলে তারা ফোনটি বা মানিব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে আপনাকে অক্ষত অবস্থায় ছেড়ে দিত। কিন্তু যখন জানবে আপনার কোনো মানিব্যাগ নেই, বরং সব ব্যাংক ব্যালান্স হাতের চামড়ার নিচে চিপে লুকিয়ে আছে, তখন কী ঘটবে?
চিপটি হাতিয়ে নিতে ছিনতাইকারীরা হয়তো আপনার হাতের চামড়া কেটে ফেলা বা গুরুতর জখম করে শরীর থেকে সেটি বের করে নেওয়ার মতো নৃশংস পথ বেছে নিতে পারে। এমনকি অস্ত্রোপচারের জন্য অপহরণের ঝুঁকিও থাকবে। অর্থাৎ, পকেটের সম্পদ সুরক্ষিত রাখতে গিয়ে খোদ জীবনের ঝুঁকিই বেড়ে যাচ্ছে।
শুধু ছিনতাই নয়, ভবিষ্যতে হ্যাকাররা আরও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে দূর থেকেও আপনার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চুরি করার চেষ্টা করতে পারে। তখন শরীরের ভেতরের এই ছোট্ট চিপটি হয়ে উঠবে মারাত্মক এক ফাঁদ।




