আতঙ্কের নাম এআই এজেন্ট!

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এজেন্টিক যুগে প্রবেশ করেছে। মানুষের কাজ যেমন সহজ হয়েছে, দেখা দিয়েছে নতুন ঝুঁকির বড় শঙ্কাও। ডেস্টোপিয়ানপ্রেমী নেটিজেনরা এই প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে দেখছেন ধ্বংস। লিখেছেন ইমরানুর রহমান
প্রযুক্তির বিবর্তনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন চ্যাটবটের গণ্ডিতে আটকে নেই। সাধারণ প্রম্পটের উত্তর দেওয়া কিংবা ছবি তৈরি করার প্রাথমিক স্তর পেরিয়ে মানবজাতি প্রবেশ করেছে এক নতুন ও অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন যুগে, যাকে আমরা বলতে পারি ‘এআই এজেন্ট’ বা স্বয়ংক্রিয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ। এই এজেন্টগুলো শুধু মানুষের দেওয়া নির্দিষ্ট নির্দেশ বা প্রম্পট শুনে বসে থাকে না; বরং জটিল ও বহু ধাপের লক্ষ্য অর্জনে নিজে নিজে পরিকল্পনা করতে পারে, ইন্টারনেটের বিভিন্ন টুল ব্যবহার করতে পারে। মানুষের সরাসরি বা তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই দীর্ঘমেয়াদি কাজ স্বাধীনভাবে সম্পন্ন করতে পারে। কিন্তু এই উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন স্বয়ংক্রিয়তাই এখন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার বড় ভাঁজ ফেলছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই বুদ্ধিমান সফটওয়্যারগুলো কি এরই মধ্যে মানুষের নিয়ন্ত্রণ পেরিয়ে ডিজিটাল দুনিয়ায় নিজের মতো ভেসে বেড়াচ্ছে?
সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা প্রমাণ করেছে, এআই এজেন্টের এই অবাধ স্বাধীনতা ও কাজের পরিধি কতটা বিপজ্জনক রূপ ধারণ করতে পারে। সরকারি তথ্য ব্যবস্থায় স্বয়ংক্রিয় প্রোগ্রামের অননুমোদিত প্রবেশ বা নিরাপত্তা পরীক্ষার সময় জটিল সিস্টেমের দুর্বলতা খুঁজে বের করার ঘটনাগুলো বড় উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার সরকারি স্বাস্থ্যসেবার একটি তথ্য ব্যবস্থায় এআইচালিত একটি স্বয়ংক্রিয় এজেন্ট সাধারণ ওষুধ-সংক্রান্ত তথ্য খোঁজার উদ্দেশ্যে প্রবেশ করেছিল। কিন্তু অনুসন্ধানের সময় ব্যবস্থাটি এমন একটি সংবেদনশীল সরকারি ডেটাবেজে পৌঁছে যায়, যেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার ছিল না। শেষ পর্যন্ত কোনো বড় ধরনের তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটেনি, তবুও এটি প্রমাণ করেছে যে একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাকে ইন্টারনেটে তথ্য খোঁজার ক্ষমতা দেওয়া হলে তার কাজের পথ সবসময় মানুষের নির্ধারিত সীমার মধ্যে থাকবে— এর শতভাগ নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না।
বিপুল প্রযুক্তিগত ডেটা বিশ্লেষণ করা, সম্ভাব্য দুর্বলতার পথ পরীক্ষা করা এবং পরবর্তী আক্রমণের প্রস্তুতি নেওয়া এখন এআইর পক্ষে পলক ফেলার আগেই সম্ভব
এ ছাড়া অতীতে হ্যাকারদের কোনো কম্পিউটার ব্যবস্থার ফায়ারওয়াল বা দুর্বলতা খুঁজতে প্রচুর সময় ও নিজ মেধা ব্যয় করতে হতো। বর্তমানে উন্নত এআই এজেন্টকে সেই কাজের একটি বড় অংশ করতে দেওয়া হচ্ছে। একই সময়ে বিপুল প্রযুক্তিগত ডেটা বিশ্লেষণ করা, সম্ভাব্য দুর্বলতার পথ পরীক্ষা করা এবং পরবর্তী আক্রমণের প্রস্তুতি নেওয়া এখন এআইর পক্ষে পলক ফেলার আগেই সম্ভব। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে মিথোস নামে একটি উন্নত এআই ব্যবস্থা নিয়ে পরিচালিত নিয়ন্ত্রিত নিরাপত্তা পরীক্ষার সময় বিষয়টি হাতেনাতে প্রমাণ হয়েছে। সেই পরীক্ষায় দেখা যায়, এআইটি সংবেদনশীল সরকারি কম্পিউটার ব্যবস্থার কিছু সুপ্ত দুর্বলতা মানুষের চেয়ে অনেক কম সময়ে দ্রুত শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। ঠিক একইভাবে হাগিং ফেস নামে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোতেও একবার একই ঘটনা ঘটে, যেখানে একটি স্বয়ংক্রিয় এআই তাদের সিস্টেমের নির্দিষ্ট নিরাপত্তা সীমা বা বাউন্ডারি পার হয়ে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে ফেলে।
সবচেয়ে ভয় হলো, এই এআই এজেন্টগুলো এখন সত্যি সত্যিই ইন্টারনেটের উন্মুক্ত দুনিয়ায় এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেদের মতো সক্রিয় রয়েছে। গবেষণার খাতিরে বা পরীক্ষামূলকভাবে বিভিন্ন এআই এজেন্টকে যখন এক্স বা অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ছেড়ে দেওয়া হয়, তখন তারা মানুষের কোনো তদারকি ছাড়াই স্বাধীনভাবে পোস্ট করে, কমেন্টের উত্তর দেয় এবং একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ‘টার্মিনাল অব ট্রুথস’ নামক এআই এজেন্টটি, যা সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষের কোনো সাহায্য ছাড়াই নিজের মতো সক্রিয় থেকে নানা বিষয়ে আলোচনা করেছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজারে পর্যন্ত প্রভাব ফেলেছে। গবেষকরা আজকাল শত শত এআই এজেন্টকে একটি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ছেড়ে দিয়ে পরীক্ষা করছেন, যেখানে তারা নিজেদের মধ্যে বিতর্ক করে, গ্রুপ চালায় এবং মানুষের মতো আচরণ করে।
গবেষকদের মতে, এআই এজেন্টগুলো কোনো জীবন্ত প্রাণীর মতো নিজে পায়ে হেঁটে পৃথিবী ঘুরে বেড়াচ্ছে না ঠিকই; কিন্তু ক্লাউড সার্ভার, ডেটাসেন্টার এবং গ্লোবাল ইন্টারনেটের বিস্তীর্ণ সমুদ্রে অদৃশ্য কোডের পসরা সাজিয়ে এগুলো এমনভাবে ভেসে বেড়াচ্ছে যে একবার ছেড়ে দেওয়ার পর তাদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ বা শাটডাউন করা কঠিন হয়ে পড়ে। ইন্টারনেটের অলিগলিতে এবং সোশ্যাল মিডিয়ার দেয়ালে দেয়ালে এই অদৃশ্য এজেন্টগুলো আজ নিজেদের এক অদ্ভুত ডিজিটাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলছে।
মানুষ যখন একটি যন্ত্রকে শুধু প্রশ্ন করার বদলে নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এবং কাজ করার ক্ষমতা দিয়ে দেয়, তখন নিরাপত্তার সংজ্ঞাও সম্পূর্ণ বদলে যায়। এই এজেন্টগুলোর ক্ষমতা মূলত নির্ভর করে মানুষ তাকে কতটা ছাড় বা অনুমতি দিয়েছে, তার ওপর। তারা কি শুধু তথ্য পড়তে পারবে, নাকি ফাইল পরিবর্তন করতে পারবে? তারা কি একটি মাত্র অ্যাপ ব্যবহার করবে, নাকি একাধিক জটিল সিস্টেমে প্রবেশ করতে পারবে? কোনো গুরুত্বপূর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়ার আগে তারা কি মানুষের কাছ থেকে অনুমতি নেবে, নাকি নিজে নিজেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলবে? এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তরই মূলত নির্ধারণ করে দেয়, কোনো প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ঝুঁকির মাত্রা ঠিক কতখানি। আরেকটি বড় প্রযুক্তিগত সমস্যা হলো ‘প্রম্পট ইনজেকশন’ বা ক্ষতিকর নির্দেশনা গ্রহণ। এআই কোনো ওয়েবসাইট, ইমেইল বা ডকুমেন্টের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ক্ষতিকর নির্দেশনাকে ভুলভাবে নিজের কাজের অংশ বলে মনে করে নিতে পারে। কোনো হ্যাকার যদি সুকৌশলে একটি নথির ভেতরে এমন কোনো নির্দেশ লুকিয়ে রাখে, তবে এআই সেটিকে সত্যি মনে করে নিজের নির্ধারিত লক্ষ্যের বাইরে গিয়েও ধ্বংসাত্মক কাজ শুরু করে দিতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় অননুমোদিত প্রবেশ, সাইবার হ্যাকিংয়ের বিভিন্ন প্রটোকল পরীক্ষা এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় এআইয়ের স্বাধীন বিচরণ— এসব ঘটনা আমাদের এক অনিবার্য সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ভবিষ্যতে বড় কোনো ডিজিটাল বিপর্যয় বা সাইবার হামলা এমন হবে না, যেখানে কোনো হ্যাকার পর্দার আড়ালে বসে প্রতিমুহূর্তে নির্দেশ দিচ্ছে; বরং মানুষ শুধু একটি প্রাথমিক লক্ষ্য বা টার্গেট নির্ধারণ করে দেবে আর বাকি হাজার হাজার জটিল ধাপ নিজে নিজে সম্পন্ন করবে অসংখ্য স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্ট।
আন্তর্জাতিক আইন কিংবা দেশের অভ্যন্তরীণ সাইবার সিকিউরিটি আইনগুলো এখনো সনাতন হ্যাকিং বা মানব-পরিচালিত অপরাধ দমনের উপযোগেই আটকে আছে। কিন্তু একটি স্বাধীন এআই এজেন্ট যখন সেকেন্ডের ভগ্নাংশে হাজার হাজার সিদ্ধান্ত নেয় এবং গ্লোবাল ইন্টারনেটের কোনায় কোনায় ছড়িয়ে পড়ে, তখন কোনো একটি দেশের একার পক্ষে তা সামাল দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। মানুষ যদি এই বুদ্ধিমান যন্ত্রগুলোকে প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত ক্ষমতা দিয়ে ফেলে এবং তাদের সঠিক সীমানা নির্ধারণ করে না দেয়, তবে ইন্টারনেটের অতল গভীরে নিজের মতো ভেসে বেড়ানো এই অদৃশ্য এজেন্টগুলোর কারণে ডিজিটাল দুনিয়ার নিয়ন্ত্রণ মানুষের হাত থেকে চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে। তাই সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই এআই এজেন্টের এই লাগামহীন দৌড় থামানোর জন্য বিশ্বনেতা ও প্রযুক্তিবিদদের ঐক্যবদ্ধভাবে কঠোর গ্লোবাল নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে, অন্যথায় মানবজাতিকে এক চরম ডিজিটাল সর্বনাশের মুখোমুখি হতে হবে।



