কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে মানুষ?

ছবি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি
দিন দিন মানুষের তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এত বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠছে যে, এটি এখন মানুষের কোনো সাহায্য ছাড়াই নিজে নিজে বিকশিত হওয়ার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। আর এই বিষয়টি নিয়েই চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ এআই প্রতিষ্ঠান ‘অ্যানথ্রোপিক’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক ক্লার্ক।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি-র ‘নিউজনাইট’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি সতর্ক করে বলেন, “এআই প্রযুক্তির লাগাম টেনে ধরার এখনই সময়।”
খুব সহজ ভাষায় বিষয়টি বুঝিয়ে ক্লার্ক বলেন, “ধরুন আপনি একটা গাড়ি চালাচ্ছেন, আপনার কাছে গাড়ির গতি বাড়ানোর জন্য এক্সিলারেটর বা গ্যাস পেডেল আছে, কিন্তু গাড়িটি থামানোর জন্য কোনো ব্রেক পেডেল নেই! বর্তমানের এআই শিল্পের অবস্থাও ঠিক তেমন। আমাদের এখনই এমন ব্যবস্থা বা সরকারি নীতিমালা তৈরি করতে হবে, যাতে প্রয়োজনে আমরা এআই-এর গতি কমিয়ে দিতে পারি।”
জ্যাক ক্লার্ক একটি চমকপ্রদ তথ্য জানান। তাদের তৈরি জনপ্রিয় চ্যাটবট ‘ক্লড’ বর্তমানে যে কোড বা প্রোগ্রামের ওপর ভিত্তি করে চলছে, তার ৮০ শতাংশ কোড মানুষের হাত ছাড়াই সিস্টেমটি নিজে নিজে লিখেছে! আগামী দুই বছরের মধ্যে এটি ১০০ শতাংশে পৌঁছে যাবে। আর এমনটা হলে তা পুরো পৃথিবীর ওপর এক বিশাল প্রভাব ফেলবে।
এমন পরিস্থিতিতে এআই-কে কীভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, তার উদাহরণ দিতে গিয়ে ক্লার্ক গত শতাব্দীর শুরুর দিকের 'তেল বিপ্লব'-এর কথা মনে করিয়ে দেন। তিনি বলেন, “সে সময় যখন বড় বড় ব্যবসায়ীরা তেলের বাজার দখল করছিল, তখন সরকার এমন কিছু নিয়ম ও নীতিমালা তৈরি করেছিল যাতে সাধারণ মানুষ তেলের সঠিক ব্যবহার ও এর নিরাপত্তার ওপর ভরসা পায়। এআই-এর ক্ষেত্রেও ঠিক এমন নিয়মকানুন দরকার, যাতে কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানির মর্জির ওপর বিশ্বকে নির্ভর করতে না হয়।”
তবে বাস্তবতা হলো, সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এআই কোম্পানিগুলোর সুরক্ষায় যে নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন, তাকে স্বাগত জানিয়েছে অ্যানথ্রোপিকও। এই আদেশে কোম্পানিগুলোর ওপর কড়া কোনো নিয়ম বা বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা পরীক্ষা রাখা হয়নি। এমনকি অ্যানথ্রোপিক, ওপেনএআই কিংবা গুগলের মতো বড় কোম্পানিগুলোও তাদের নিজেদের গবেষণা থামানোর কোনো ঘোষণা দেয়নি।
মাত্র পাঁচ বছর আগে শুরু হওয়া অ্যানথ্রোপিক প্রতিষ্ঠানটি এখন এতটাই বড় যে, তারা শেয়ার বাজারে নাম লেখানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। পুঁজিবাজারে এটিই হতে যাচ্ছে ইতিহাসের অন্যতম মূল্যবান লিস্টিং, যার বাজারমূল্য প্রায় ১ লাখ কোটি ডলার! অভিযোগ রয়েছে, এআই কোম্পানিগুলো নিজেদের ভ্যালু বাড়াতে আসন্ন এআই বিপদ বা এপোকেলিপ্স নিয়ে কথা বলে থাকে।
তবে জ্যাক ক্লার্কের দাবি, তিনি ব্যবসার উদ্দেশ্যে নন, বরং এই প্রযুক্তির ভেতরে আসলে কী বিপজ্জনক কাণ্ডকারখানা ঘটছে, তা বিশ্ববাসীকে জানাতেই এসব কথা বলছেন। তিনি নিজের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “সমাজ যদি এখনই এআই-এর ভালো-মন্দ নিয়ে সিরিয়াসলি আলোচনা না করে, তবে সামনে বড় বিপদ আছে।”
এরই মধ্যেই এআই-এর কারণে বিশ্বজুড়ে বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানিতে ব্যাপক কর্মী ছাঁটাই হয়েছে। মানুষের বদলে অনেক রুটিন কাজ এখন একা একটি ‘এআই এজেন্ট’ বা রোবটই করে দিচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে এআই-এর এই যুগে তরুণরা কি তাহলে চাকরি হারাবে? তরুণদের আশ্বস্ত করে জ্যাক ক্লার্ক বলেন, “এআই যতই উন্নত হোক, এটি মানুষের মতো সত্যিকারের সৃজনশীল হতে পারে না।” তাদের কোম্পানিতেও এখন কোডিং জানা ইঞ্জিনিয়ারের চেয়ে ভালো আইডিয়া বা নতুন চিন্তা দিতে পারে এমন মানুষের অভাব বেশি।
ভবিষ্যতের চাকরি বাজার নিয়ে চিন্তিত তরুণদের উদ্দেশ্যে এই এআই বিশেষজ্ঞ পরামর্শ দিয়ে বলেন, “সবাই এখন শুধু কম্পিউটার বা প্রযুক্তি নিয়ে মেতে আছে। কিন্তু আমি বলব- তোমরা নতুন কোনো শখ গড়ে তোলো, প্রচুর বই পড়ো এবং মানবিক বিদ্যায় (লিবারেল আর্টস) পড়াশোনা করো। যারা গভীরভাবে চিন্তা করতে পারে এবং যাদের কৌতূহল বেশি, এআই-এর যুগে তারাই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে।”




