জাদুর জুতো

ছবি এঁকেছেন রজত
আজব এক ফুটবল ম্যাচের গল্প লিখেছেন কামাল হোসাইন।
শহরের একটি জায়গা। গলির শেষ মাথা। সেখানে একটা ভাঙা ল্যাম্পপোস্ট রাত বাড়লেই আলো-ছায়ার খেলা তৈরি করে। সেখানেই থাকে চৌদ্দ বছরের কিশোর আয়ান। তার নিঃশ্বাস জুড়ে ফুটবল। ঘরের দেয়ালে সাঁটানো রয়েছে একটা পুরনো রঙ জ্বলে যাওয়া পোস্টার— আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সিতে লিওনেল মেসি দুই হাত উঁচিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। আয়ান রোজ রাতে ঘুমানোর আগে সেই পোস্টারের দিকে তাকিয়ে ভাবে, কখনো কি আমার পায়েও অমন জাদু আসবে?
আয়ান ফুটবলটা দারুণ বোঝে, তার ড্রিবলিংয়ের গতি মন্দ না। কিন্তু সমস্যা হলো ওর মনে। মাঠে হাজারো মানুষের চিৎকার, প্রতিপক্ষের বড় বড় ডিফেন্ডারের চোখ রাঙানি দেখলেই ওর পা দুটো কেমন যেন জমে বরফ হয়ে যায়! বল এলেই সে ঘাবড়ে গিয়ে ভুল পাস দিতে শুরু করে; আর গ্যালারি থেকে ধেয়ে আসে দুয়ো।
সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। শহরের এ মহল্লার ঐতিহ্যবাহী দুরন্ত কাপের ফাইনালের আগের রাত। বিকালের অনুশীলনে খুব বাজে খেলার কারণে আয়ানকে দলের একাদশ থেকে বাদ দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন কোচ। মন খারাপ করে, চোখে টলোমলো অশ্রু নিয়ে আয়ান যখন অন্ধকার গলি ধরে বাড়ি ফিরছিল, তখন ওর চোখে পড়ল একটা পুরনো দোকান। যেন অনেক অনেক বছরের পুরনো কাঠের দরজা, তার ওপরে ঝুলছে একটা টিমটিমে জ্বলে থাকা হারিকেন। দোকানের সাইনবোর্ডে কোনো নাম নেই, শুধু একটা ফুটবলের ছবি আঁকা। এই দোকান সে আগে কখনো দেখেনি।
কৌতূহল চাপতে না পেরে আয়ান দোকানের ভেতরে ঢুকে পড়ল। চারদিকে চামড়ার গন্ধ আর পুরনো বুট জুতোর স্তূপ। দোকানের ভেতরে বসে আছেন এক বৃদ্ধ। তার ধবধবে সাদা দাড়ি, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা আর গায়ে জড়ানো জীর্ণ কিন্তু পরিষ্কার একটা নীল-সাদা চাদর।
আয়ানের চোখের কোণে অশ্রু দেখে বৃদ্ধ মৃদু হাসলেন। যেন সবকিছু তিনি বুঝতে পেরেছেন। খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী রে ভাই, ফুটবল কি তোকে আজ কাঁদিয়ে ছাড়ল?’
আয়ান মাথা নিচু করে বলল, ‘ফুটবল নয় দাদু, আমার নিজের ভেতরের ভয় আমাকে কাঁদিয়ে যাচ্ছে। প্রয়োজনীয় মুহূর্তে আমি আমার পায়ের কোনো নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারি না!’
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ আয়ানের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর কাউন্টারের নিচ থেকে একটা কাঠের বাক্স বের করলেন। বাক্সটা খুলতেই আয়ানের চোখ ধাঁধিয়ে গেল। ভেতরে রাখা এক জোড়া চমৎকার বুট জুতো— গাঢ় নীল আর সাদার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ মেশানো তাতে। যেন আকাশের মেঘ কেটে রোদের আলো পড়ে ঝলমল করছে! জুতোর তলায় অদ্ভুত এক খাঁজ কাটা, যা আয়ান আগে কখনো দেখেনি।
বৃদ্ধ বললেন, ‘এটা কোনো সাধারণ বুট নয়, বাছা। বহু বছর আগে এক জাদুকর এটা পরে মাঠে নেমেছিলেন। এ জুতো তোর মনের ভয় দূর করে দেবে আর পায়ে এনে দেবে ড্রিবলিংয়ের বিদ্যুৎগতি। তবে মনে রাখিস, জুতোটা তখনই কাজ করবে, যখন তুই শুধু মাঠের দিকে মন দিবি; গ্যালারির দিকে নয়।’
আয়ান আর কোনো কথা না বলে মন্ত্রমুগ্ধের মতো জুতো জোড়া বুকে জড়িয়ে ধরে বাড়ির পথ ধরল। সেই রাতে সে জুতো জোড়া বালিশের পাশে রেখে ঘুমিয়ে পড়ল।
পরদিন বিকালে ফাইনাল ম্যাচ। পুরো মাঠ লোকে-লোকারণ্য। প্রথমার্ধেই আয়ানের দল ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ল। দলের স্ট্রাইকার ইনজুরিতে পড়ায় দ্বিতীয়ার্ধের ঠিক পনেরো মিনিট আগে বাধ্য হয়ে কোচ আয়ানকে মাঠে নামালেন। আয়ান তখন পায়ে পরে নিয়েছে সেই নীল-সাদা জুতো জোড়া।
মাঠে নামার পর প্রথম যখন বলটা আয়ানের পায়ে এলো, গ্যালারিতে তখন চিৎকার আর টিটকারির আওয়াজ। আয়ানের চেনা ভয়টা আবার ফিরে আসতে চাইল। কিন্তু ঠিক তখনই তার মনে পড়ল সেই বৃদ্ধের কথা— ‘মাঠের দিকে তাকাও, গ্যালারির দিকে নয়।’ সে আর কোনো কিছু ভাবল না। নিচের দিকে তাকাল। নীল-সাদা জুতো জোড়া যেন রোদে চকচক করছে।
হঠাৎ করেই তার মনে হলো, পায়ের সব জড়তা কোথায় উবে গেছে। সে বলটা আলতো টোকা দিয়ে প্রতিপক্ষের মিডফিল্ডারের পায়ের ফাঁক দিয়ে বের করে নিল। গ্যালারির চিৎকার তখন একমুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল। আয়ান যেন তখন বাতাসে ভেসে চলেছে। তার গতি চিতাবাঘের মতো। দুজনকে কাটিয়ে সে ডান পায়ের দুর্দান্ত এক ইনসুইঙ্গার শটে বল জালে জড়িয়ে দিল, ১-২!
খেলা শেষের আর মাত্র দুই মিনিট বাকি। স্কোর তখন ২-২। আয়ান বল পেয়ে মাঝমাঠ থেকে একাই দৌড় শুরু করল। প্রতিপক্ষের তিনজন ডিফেন্ডার তাকে ঘিরে ধরল। ঠিক যেভাবে মেসি ডিফেন্স ভেঙে ভেতরে ঢোকেন, আয়ান শরীরটাকে একদিকে ঝুঁকিয়ে অন্যদিক দিয়ে বলটা বের করে নিল। গোলরক্ষক এগিয়ে এলো তাকে রুখতে। আয়ান আলতো করে বলটা চিপ করল গোলরক্ষকের মাথার ওপর দিয়ে; আর বল জড়িয়ে গেল জালে। ৩-২! রেফারি শেষ বাঁশি বাজালেন। চ্যাম্পিয়ন হলো আয়ানের দল।
সতীর্থরা তাকে কাঁধে তুলে নিল, গ্যালারিতে তখন তার নামের জয়োধ্বনি। কিন্তু আয়ানের চোখ তখন নিজের পায়ের দিকে। সে লক্ষ করল, উত্তেজনার চোটে বাম পায়ের জুতোর ফিতেটা খেলা শুরু হওয়ার আগে ছিঁড়ে গিয়েছিল আর ডান পায়ের জুতোটা আসলে তার পায়ের মাপের চেয়ে এক সাইজ বড়, যা খেলার সময় সে খেয়ালই করেনি! ঢিলেঢালা, ফিতে ছেঁড়া জুতো কখনো কাউকে জেতাতে পারে না।
আয়ান বুঝতে পারল, জাদুটা জুতোয় ছিল না। জাদুটা ছিল বৃদ্ধের দেওয়া সেই আত্মবিশ্বাসে, যা তার ভেতরের ভয়টাকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। আসল জাদুকর তো সে নিজেই!
মেডেল গলায় দিয়ে আয়ান এক ছুটে গেল সেই পুরনো গলির দোকানে। সে দাদুকে জড়িয়ে ধরে বলতে চাইল, ‘আমি পেরেছি!’ কিন্তু সেখানে গিয়ে সে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। দোকানটি আর নেই! সেখানে পড়ে রয়েছে একটা ছোট্ট চিরকুট। তাতে মুক্তোর মতো অক্ষরে লেখা, ‘মাঠের জাদুকররা জুতোয় ভর করে বাঁচে না; তারা বাঁচে মনের জোরে। তোর নিজের ভেতরের মেসিকে প্রতিদিন জাগিয়ে রাখিস, আয়ান।’
চিরকুটটা পকেটে নিয়ে আকাশের দিকে তাকাল সে। রাত নেমে এসেছে আকাশের কোনায় কোনায় আর মেঘের ফাঁক দিয়ে একটা তারা ঠিক মেসির সেই পোস্টারের মতোই উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছে।





