মন খারাপ করা ভূতের গল্প

অলংকরণ করেছেন রজত
ছিল দুই ভূত। সম্পর্কে ওরা ভাই। কিন্তু মানুষকে ভয় দেখানোর কথা থাকলেও গোলমাল পাকিয়ে ফেলত। ওদের গল্প লিখেছেন আবুল কালাম আজাদ
মিনু আর বিনু। ওরা দুই বোন। মিনু বড়। ক্লাস থ্রিতে পড়ে। বিনু ছোট। ক্লাস ওয়ানে পড়ে।
ওদের ভালো লাগে গল্প শুনতে। সবচেয়ে ভালো লাগে ভূতের গল্প। রাতে ভূতের গল্প শুনলে গা ছমছম করে। এই গা ছমছম করাটাই ভূতের গল্পের মজা।
মিনু আর বিনু সেদিন রাতে ওদের দাদাকে বলল, ‘দাদা, গল্প বলো।’
দাদা বললেন, ‘কীসের গল্প বলব?’
দুজন একসঙ্গে বলে উঠল, ‘ভূতের গল্প।’
দাদা বললেন, ‘তাহলে সেই ভয়ংকর ভূতের গল্পটা বলি।’
মিনু বলল, ‘সব ভূতই তো ভয়ংকর!’
‘তবে এটা একটু ভিন্নরকম ভয়ংকর। এই ভূতের একটা ভাইও আছে। তার নাম বিপজ্জনক ভূত।
‘তাহলে ভূত ভাইদের গল্প শোনাও।’
দাদা গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে শুরু করলেন, “ভূতটার যখন জন্ম হয়, তখন ওদের বাবা-মা ভালোবেসে ছেলের নাম রাখে, ‘ভয়ংকর ভূত’। হয়তো এ নামের কারণেই তাদের ছেলে আরও ভয়ংকর হয়ে উঠবে। বাবা-মায়ের ইচ্ছা, ছেলে বড় হয়ে তাদের মুখ উজ্জ্বল করবে।’
বিনু বলল, ‘দাদা, ভূতেরা কেমন করে বাবা-মায়ের মুখ উজ্জ্বল করে?’
‘যে ভূত যত ভয়ংকরভাবে মানুষকে ভয় দেখাতে পারে, সেই ভূতের সুনাম তত বেশি। সেই ভূতের বাবা-মাকে ভূতসমাজ বেশি সম্মান দেয়।’
দাদা একটু থামলেন। তারপর বললেন, ‘কিন্তু হলো তার উল্টো। বড় হয়ে ভয়ংকর ভূতটা মানুষকে ভয় দেখাবে কি, মানুষ দেখলে সে নিজেই ভয় পায়।’
‘হিহিহি। ভূত মানুষকে ভয় পায়!’— হেসে উঠল মিনু-বিনু।
দাদা বললেন, “হু, ভয়ংকর ভূতটা মানুষ দেখলেই পালায়। একবার তার বাবা-মা জোর করে তাকে এক শেওড়াগাছের ডালে বসিয়ে দিল মানুষকে ভয় দেখানোর জন্য। ঠিক তখনই সেখান দিয়ে যাচ্ছিল তমিজ দফাদর। সে হাট থেকে দুটি ইলিশ মাছ কিনে নিয়ে যাচ্ছিল। ভয়ংকর ভূতটা নাকি কণ্ঠে বলল, ‘এই দফাদার, তোর ইলিশ মাছগুলো দিয়ে যা।’ তমিজ দফাদর ঝট করে দাঁড়িয়ে গেল। তার মেজাজ খুব গরম। বলল, ‘একটা ইলিশের দাম কত জানিস? তুই সামনে আয়। থাবড়া দিয়া তোর আটত্রিশটা দাঁত যদি না ভাঙছি তো আমি তমিজ দফাদর না।’”
মিনু বলল, ‘দাঁত তো বত্রিশটা।’
‘মানুষের দাঁত বত্রিশটা। ভূতের দাঁত থাকে আটত্রিশটা। তমিজ দফাদরের এই কথা শুনে ভয়ংকর ভূতটা এমন ভয় পেল যে, প্রাণপণে পালিয়ে গেল। গেল তো গেল; তাকে আর কোনোদিন খুঁজেই পাওয়া গেল না। তার বাবা-মা কত খুঁজল! নাই নাই নাই।’
‘আহারে! ভয়ংকর ভূতটা অনেক ভালো ছিল’— আফসোস ঝরে পড়ল মিনু-বিনুর কণ্ঠ থেকে।
দাদা বললেন, “তার অনেক দিন পর সেই ভূত বাবা-মায়ের আরেকটা ছেলে হলো। বাবা-মা এটার নাম রাখল ‘বিপজ্জনক ভূত’। কিন্তু বড় হয়ে এই ভূতও মোটেই বিপজ্জনক হলো না।”
বিনু বলল, ‘এটাও কি মানুষকে ভয় পেত?’
দাদা বললেন, “না, এটা মানুষকে ভালোবাসত। মানুষের কাছে কাছে থাকতে চাইত। মানুষের সঙ্গে খেলাধুলা করতে চাইত। ফুটবল, ক্রিকেট, হাডুডু ইত্যাদি খেলা তার খুব প্রিয় ছিল। বিকালে ছেলেরা যখন মাঠে খেলত, তখন সে মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে থেকে খেলা উপভোগ করত। তার খুব ইচ্ছা হতো ছেলেদের সঙ্গে এসব খেলতে। একদিন সে এক ছেলেকে অনুরোধ করল তাকে ফুটবল খেলায় নিতে। তার কপালে একটা চোখ, থ্যাবড়ানো নাক, বিরাট হাঁ, হাঁয়ের মধ্যে লকলকে জিহ্বা দেখে ছেলেটি বলল, ‘এই, তুই কে?’
‘আমি ভূত।’
‘ভূত! ভূত হয়ে মানুষের সঙ্গে ফুটবল খেলতে চাস, ফাজিল কোথাকার! তোর কাজ মানুষকে ভয় দেখানো। যা, শেওড়াগাছে বসে মানুষকে ভয় দেখাগে।’
‘মানুষকে ভয় দেখাতে আমার ভালো লাগে না। আমি মানুষকে ভালোবাসি; আই লাভ পিপল।’
এ কথা শুনে ছেলেটা হেসে ফেলল, ‘ভূত মানুষকে ভালোবাসে! এই কথা কেউ বিশ্বাস করবে না। মানুষই মানুষকে ভালোবাসে না, আর ভূত...!’
‘সত্যি বলছি, আই লাভ পিপল...।’
‘ইংরেজি বাদ দাও, বাংলা বলো। হয়েছ বাংলাদেশি ভূত আর ইংরেজি ফুটাচ্ছ!’
‘অ্যান্ড আই লাভ টু প্লে ফুটবল, ক্রিকেট।’
‘তোকে আমরা খেলতে নেব না। এখান থেকে চলে যা। আমাদের সবাই এসে পড়লে তোর বিপদ হবে। তোর থ্যাবড়া নাক আরও থ্যাবড়া করে দেবে।’
বিপজ্জনক ভূতটা মন খারাপ করে সেখান থেকে চলে গেল। গেল তো গেল; আর ফিরে এলো না। বড় ভাই ভয়ংকর ভূতের মতো সেও হারিয়ে গেল। ওদের বাবা-মা আজও ছেলে দুটির জন্য অপেক্ষা করে আছে। বাবা-মা কি সন্তানকে ভুলতে পারে?”
সাধারণত ভূতের গল্প শুনে মিনু-বিনুর গা ছমছম করে। রাতে ওরা স্বপ্ন দেখে জেগে উঠে মাকে জাপটে ধরে। চোখ মেলে তাকাতে পারে না। কিন্তু এই প্রথম ভূতের গল্প শুনে মিনু-বিনুর খুব মন খারাপ হলো। দুই ভূত ভাইয়ের জন্য ওদের খুব মায়া হলো— ‘আহা! বেচারারা হারিয়ে গেল।’



