খালি ফ্রেমের রহস্য

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মাঝরাতে মিউজিয়ামে পুলিশের পোশাকে দুই আগন্তুক। পরের ৮১ মিনিটে গায়েব হয়ে গেল খুবই মূল্যবান ১৩টি শিল্পকর্ম। অথচ ৩৫ বছরে ধরা পড়েনি কেউ। লিখেছেন আখলাকুজ্জামান অনিক
রাত তখন সোয়া ১টা। ১৯৯০ সালের ১৮ মার্চ। বোস্টন শহরে তখনো সেন্ট প্যাট্রিক’স ডে ফেস্টিভ্যালের রেশ কাটেনি রাস্তাঘাটে। ঠিক এই সময় ইসাবেলা স্টুয়ার্ট গার্ডনার মিউজিয়ামের দরজায় বেজে উঠল কলিংবেল। বাইরে দাঁড়ানো দুই লোক। গায়ে পুলিশের পোশাক। বলল, ‘একটা অভিযোগ পেয়েছি, ভেতরে ঢুকতে হবে।’ তখন ডিউটিতে থাকা এক তরুণ নিরাপত্তারক্ষী কোনো কিছু যাচাই না করেই, নিয়ম ভেঙে খুলে দিলেন কর্মচারীদের দরজা।
এই একটা ভুল সিদ্ধান্তই বদলে দিল সব। দরজা খোলামাত্রই মুখোশ খুলে গেল আগন্তুকদের। চোখের পলকে কাবু করে ফেলল দুই নিরাপত্তারক্ষীকে। ডাক্ট টেপে বেঁধে টেনে নিয়ে গেল বেসমেন্টে। একজনকে বাঁধা হলো পাইপের সঙ্গে, আরেকজনকে ওয়ার্কবেঞ্চে।
এরপর শুরু হলো সেই ৮১ মিনিট। মিউজিয়ামের দোতলার একটা ঘর থেকে চোরেরা নিয়ে গেল রেমব্রান্টের দুটো ছবি আর একটা ছোট্ট এচিং। সঙ্গে গেল ভারমিয়ারের আঁকা ‘দ্য কনসার্ট’— সারা পৃথিবীতে ভারমিয়ারের হাতেগোনা যে কয়েকটা ছবি টিকে আছে, তার একটি। আরও গেল দেগার পাঁচটা ড্রয়িং, মানের একটা ছবি, একটা পুরনো চীনা মদের পাত্র আর একটা সোনালি ঈগল-আকৃতির অলংকরণ।
মজার ব্যাপার হলো, কাজটা মোটেও খুব পরিপাটি ছিল না। কিছু ছবি ফ্রেম থেকে তাড়াহুড়ো করে, প্রায় এলোমেলোভাবে কেটে নেওয়া হয়েছিল— যেন খুব তাড়া ছিল। তবু সেই অগোছালো ৮১ মিনিটেই তারা নিয়ে গেল প্রায় ৫০ কোটি ডলার দামের ১৩টি শিল্পকর্ম।
নিজের ভেনিসীয় ধাঁচের বাড়িতেই এই মিউজিয়াম গড়েছিলেন ইসাবেলা স্টুয়ার্ট গার্ডনার নামের এক ধনী নারী। ১৯০৩ সালে খোলা এই জাদুঘরের প্রতিটি কোনায় রয়েছে তার রুচির ছাপ। নিজের হাতে সাজিয়েছিলেন পুরোটা। তখন হয়তো তিনি ভাবেননি, এই মূল্যবান সংগ্রহে ভাগ বসাবে চোর।
এদিকে চুরির পর যতই তদন্ত এগিয়েছে, ততই সামনে এসেছে এক গা ছমছমে প্যাটার্ন। তদন্তকারীদের ধারণা, মাফিয়া-সংশ্লিষ্ট কারমেলো মার্লিনো নামের এক লোক এই চুরির পেছনে ছিল। তার পরিকল্পনা ছিল, শুধু রেমব্রান্টের ছবি চুরি করে তাড়াতাড়ি কিছু টাকা কামানো।
আরেকজন সন্দেহভাজন ববি দোনাতি, আরেক মাফিয়া সদস্য। চুরির কিছুদিন পরই এক পরিচিত জহুরির কাছে গিয়ে সে বের করে সেই সোনালি ঈগল-আকৃতির অলংকরণ। জিজ্ঞেস করে, ‘এটার দাম কত হবে বলতে পারো?’
জহুরি চমকে ওঠে। পত্রিকায় ছাপা ছবির সঙ্গে মিলিয়ে সঙ্গে সঙ্গে চিনে ফেলে, এটা তো সেই চুরি যাওয়া জিনিস! ছুঁতেও রাজি হয় না, পাছে হাতের ছাপ লেগে যায়। কিন্তু এই সূত্র ধরে এগোনোর আগেই পরের বছর দোনাতিকে পাওয়া যায় এক পরিত্যক্ত গাড়ির ডিকিতে— ছুরিকাহত অবস্থায়। খুনি আজও ধরা পড়েনি।
শুধু দোনাতি নয়; চুরির পর দেড় বছরের মধ্যে এই মামলার সঙ্গে জড়িত প্রায় প্রত্যেক সন্দেহভাজন হয় খুন হয়েছে, নয়তো নিখোঁজ হয়ে গেছে। একের পর এক এমন মৃত্যুতে গোটা তদন্তই থমকে গিয়েছিল অনেক দিনের জন্য।
২০১৩ সালে এফবিআই ঘোষণা দেয়— তারা জানে, কারা এই চুরি করেছিল। তবে নাম বলেনি কখনো। তাদের ধারণা, ছবিগুলো হাতবদল হয়ে শেষমেশ পৌঁছেছিল কানেক্টিকাটের এক মাফিয়া সদস্যের কাছে। সে বছরই তার বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়। কিন্তু ছবির বদলে মেলে শুধু একটা কাগজ— চুরি যাওয়া শিল্পকর্মের তালিকা আর তাদের দাম লেখা।
আজ সাড়ে তিন দশক পার হয়ে গেছে। মিউজিয়ামের দেয়ালে এখনো ঝুলছে সেই খালি ফ্রেমগুলো। মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ আজও ঘোষণা দিয়ে রেখেছে এক কোটি ডলার পুরস্কার— কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পুরস্কার। তবু উত্তর নেই। কেউ ধরা পড়েনি। একটা ছবিও ফিরে আসেনি।



