কুকুরের নির্দেশে খুন করত সন অব স্যাম!

পুলিশের হাতে ধরা পড়ল এক খুনি। জিজ্ঞাসাবাদে করে বসল এক অদ্ভুত দাবি। তার দোষ নয়, প্রতিবেশীর কুকুরই এই খুনগুলো করতে বলেছে। লিখেছেন ইমরানুর রহমান
যুক্তরাষ্ট্রের ব্যস্ত শহর নিউ ইয়র্কে ১৯৭৬ সালের গ্রীষ্মের কোনো এক রাত। অন্ধকার রাস্তায় পার্ক করা গাড়িতে বসে থাকা তরুণ-তরুণীদের ওপর আচমকা গুলি চালিয়ে পালিয়ে যায় এক অজ্ঞাত বন্দুকধারী। কোনো সতর্কবার্তা নেই, পরিচিত শত্রুতার চিহ্ন নেই; শুধু কয়েক সেকেন্ডের গুলির শব্দ, তারপর রক্তাক্ত দেহ।
তারপর একটির পর একটি হত্যাকাণ্ড ঘটতেই লাগল। একসময় নিউ ইয়র্কের মানুষ বুঝতে পারল, তারা একজন সিরিয়াল কিলারের মুখোমুখি।
১৯৭৬ সালের ২৯ জুলাই থেকে ১৯৭৭ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত আটটি হামলায় ছয়জন নিহত ও সাতজন আহত হন। বেশিরভাগ হামলায় ব্যবহৃত হয়েছিল পয়েন্ট ৪৪ ক্যালিবারের একটি হ্যান্ডগান। লক্ষ্যবস্তুর অনেকেই ছিলেন রাতে গাড়িতে বসে থাকা তরুণ-তরুণী। আতঙ্ক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল পুরো শহরে। রাতের অন্ধকারে গাড়িতে বসা কিংবা নির্জন রাস্তায় হাঁটা— দুটিই যেন বিপজ্জনক হয়ে উঠল।
কিন্তু খুনি শুধু গুলি চালিয়েই থামেনি; সে পুলিশ ও সংবাদমাধ্যমের কাছে চিঠি পাঠাতে শুরু করল। চিঠিগুলো ছিল ব্যঙ্গাত্মক, রহস্যময় এবং উসকানিমূলক। সেখানে সে নিজেকে ‘সন অব স্যাম’ নামে পরিচয় দেয়।
শেষ পর্যন্ত ১৯৭৭ সালের ১০ আগস্ট গ্রেপ্তার হন ডেভিড বারকোভিটজ। তার কাছে পাওয়া যায় একটি পয়েন্ট ৪৪ ক্যালিবারের পিস্তল। তদন্তকারীরা জানতে পারেন, শেষ হামলার এলাকার কাছাকাছি তার গাড়িতে একটি পার্কিং টিকিট দেওয়া হয়েছিল। সেই সূত্র ধরে গাড়িটির মালিকের পরিচয় বের করতে গিয়েই পুলিশ বারকোভিটজের কাছে পৌঁছে যায়।
কিন্তু গ্রেপ্তারের পর মামলাটি আরও অদ্ভুত রূপ নেয়। জেরার সময় বারকোভিটজ দাবি করেন, তার প্রতিবেশী স্যাম কারের একটি কালো ল্যাব্রাডর রিট্রিভার ছিল। কুকুরটির নাম হার্ভে। তার দাবি, হার্ভের মধ্যে কোনো অশুভ শক্তি বা ডেমন বাসা বেঁধেছিল। সেই শক্তিই তাকে রাতে মানুষের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দিত।
গল্পটি এতটাই অস্বাভাবিক ছিল যে ‘ডেমন ডগ’ কাহিনি দ্রুত মামলার অন্যতম আলোচিত অংশ হয়ে ওঠে। তবে কারাগারে যাওয়ার পর বারকোভিটজ নিজেই এই গল্প থেকে সরে আসেন। তাহলে কেন এমন গল্প তৈরি করেছিলেন তিনি? এর একক ও নিশ্চিত উত্তর নেই। তবে ‘প্রচারের লোভ’ বা নির্দিষ্ট কোনো মানসিক বিকারই যে তাকে গল্পটি বানাতে বাধ্য করেছিল— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
শেষ পর্যন্ত ছয়টি হত্যার ঘটনায় তিনি দোষ স্বীকার করেন। আদালত প্রতিটি হত্যার জন্য ২৫ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।
তবে কারাগারে যাওয়ার পরও বিভিন্ন সময়ে বারকোভিটজ নিজের অপরাধ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। একপর্যায়ে তিনি দাবি করেছিলেন, হত্যাকাণ্ডের পেছনে আরও মানুষ ও একটি শয়তানপূজারি গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা ছিল। কিন্তু এসবের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পরবর্তী জীবনে বারকোভিটজ ধর্মীয় জীবনের দিকে ঝুঁকেছেন এবং নিজের অপরাধের জন্য অনুতাপ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু এসব ফিরিয়ে দিতে পারেনি সেই ছয়টি প্রাণ।



