ধর্মের নামে রাম রহিমের কাণ্ড

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কথিত ধর্মের সুতায় বোনা এক বিশাল সাম্রাজ্যের অন্দরে যখন পাপের ফানুস ফুটো হতে শুরু করে, তখন তার পতন যে কতটা ভয়ানক হতে পারে, তার এক জীবন্ত ও লোমহর্ষক উপাখ্যান হরিয়ানার ডেরা সাচ্চা সৌদার প্রধান গুরমিত রাম রহিম সিংয়ের কাহিনি। রাম রহিম শুধু একজন সাধারণ ধর্মগুরু ছিলেন না; তিনি নিজেকে বলতেন ‘গুরু রাম রহিম সিং ইনসান’। তার সাম্রাজ্যও ছিল এক অদ্ভুত দুনিয়া। মাথায় বাহারি পালক, গায়ে জমকালো ও চোখধাঁধানো পোশাক, সিনেমার পর্দায় হিরো সেজে নিজেই নিজের ছবি পরিচালনা— সব মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক জীবন্ত মিথ।
তার ইশারায় উঠবস করত কোটি কোটি অনুসারী। ভক্তদের কাছে তিনি ছিলেন অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী এক অবতার, যার পা ছুঁয়ে আশীর্বাদ নেওয়া মানেই জীবনের সব পাপ ধুয়ে যাওয়া।
কিন্তু মানুষের এই অন্ধ ভক্তি আর ক্ষমতার অহংকার চিরকাল সত্যকে লুকিয়ে রাখতে পারেনি। ২০০২ সাল। এক দুঃসাহসিক বেনামি চিঠি এসে পৌঁছায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও পাঞ্জাব-হরিয়ানা হাইকোর্টের বিচারকদের টেবিলে। ডেরা সাচ্চা সৌদারই এক নারী অনুসারী রক্তে লেখা বা কান্নায় ভেজা সেই চিঠিতে তুলে ধরেন রাম রহিমের গুহার ভেতরের এক নির্মম সত্য।
চিঠিতে উঠে আসে, কীভাবে ‘পিতাজির’ ডেরায় আশ্রিত তরুণীদের ওপর নেমে আসত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। সেই চিঠি প্রকাশের সাহস দেখানোর খেসারতও দিতে হয়েছিল নির্মমভাবে। ওই বছরই হরিয়ানার সিরসায় সাংবাদিক রাম চন্দর ছত্রপতি তার ‘পুরা সচ’ পত্রিকায় এই ডেরার ভেতরের অন্ধকার দিকগুলো নিয়ে একের পর এক সাহসী প্রতিবেদন প্রকাশ করতে শুরু করেন। আর ঠিক তার পরেই এক বিকালে পত্রিকার অফিসের সামনেই আততায়ীর গুলিতে লুটিয়ে পড়েন সেই নির্ভীক সাংবাদিক।
চিঠিতে উঠে আসে, কীভাবে ‘পিতাজির’ ডেরায় আশ্রিত তরুণীদের ওপর চলত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন
তদন্তের চাকা ঘুরতে শুরু করে। ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (সিবিআই) অত্যন্ত গোপনীয়তা ও চাপের মুখে সেই মামলার জট খুলতে নামে। ডেরার বিশাল নিরাপত্তাবলয় ভেদ করে যখন ভুক্তভোগী নারীরা একে একে মুখ খুলতে শুরু করেন, তখন বেরিয়ে আসতে থাকে একের পর এক রোমহর্ষক তথ্য। কিন্তু এই সত্য প্রকাশের পথটি মোটেও সহজ ছিল না। প্রমাণের মুখেও সাক্ষীদের ভয় দেখানো, হুমকি দেওয়া এবং গোটা প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা চলে অবিরত।
অবশেষে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট। হরিয়ানার পঞ্চকুলা বিশেষ সিবিআই আদালতের চারপাশ ঘিরে ফেলে সশস্ত্র বাহিনী। বাতাসে উড়ছিল চরম উত্তেজনা। বিচারক যখন রায় ঘোষণা করে রাম রহিমকে দুই নারী ধর্ষণের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করলেন, তখন মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল সেই জনপদের দৃশ্যপট। রায়ের খবর বাইরে আসতেই ডেরার লাখো উন্মত্ত অনুসারী যেন এক ঝড়ের বেগে রাস্তায় নেমে পড়ে।
মুহূর্তের মধ্যে পঞ্চকুলা ও তার আশপাশের এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সরকারি-বেসরকারি গাড়িতে আগুন, সংবাদমাধ্যমের গাড়ি ভাঙচুর, গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ— সব মিলিয়ে নারকীয় তাণ্ডব চালায় ভক্তরা। পুলিশের গুলিতে ও সংঘর্ষে প্রাণ হারান বহু মানুষ, আহত হন শতাধিক। একটি ধর্মান্ধতার মোহগ্রস্ততা কীভাবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে জিম্মি করতে পারে, সেদিন তা পুরো বিশ্ব প্রত্যক্ষ করেছিল। ২৮ আগস্ট রাম রহিমকে দুই মামলায় মোট ২০ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।
এরপরও আইনি লড়াইয়ের চাকা থেমে থাকেনি। ২০১৯ সালে সাংবাদিক ছত্রপতি হত্যা মামলায় আদালত রাম রহিমকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। তবে দীর্ঘ আইনি পরিক্রমায় ২০২৬ সালের ৭ মার্চ পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্ট সেই হত্যা মামলা থেকে তাকে খালাস দেন। তবে ধর্ষণের দায়ে দীর্ঘ কারাবাস ও বন্দিদশা বহাল থাকায় তার সেই বহুরূপী সাম্রাজ্যের পতন আজ চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে।



